স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ ১৯৮৪ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড কোম্পানির গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। দেশ তখন নতুন শিল্প বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাটি তৈরি হয়েছিল পোশাক খাতে। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং, বর্তমান বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সদ্য স্নাতক পাস করা দুই বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান একসঙ্গে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এক বছর পরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় ব্যবসা করার পরিকল্পনা আপাতত পিছিয়ে যায়। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন দুই বন্ধু।
শুরুর সময় মোশাররফ হোসেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আতিকুর রহমান চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন প্রতিষ্ঠানটির, যা এত বছর পরও পরিবর্তন হয়নি। নির্মাণভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড জাতীয় পর্যায়ে অনেক পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। যখন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের বৈপ্লবিক যাত্রা শুরু হয় তখন দুই উদ্যোক্তা গার্মেন্টস শিল্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। আজ স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের তথ্যমতে বর্তমানে কোম্পানির গার্মেন্টস বিভাগে মোট ১১টি ওভেন, সোয়েটার, নিটওয়্যার ও ডায়িং কারখানা রয়েছে, যাতে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মরত। সব কারখানার মোট ওভেন পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক দেড় লাখ পিস।
১৯৮৪ সালে দেশের গার্মেন্টস শিল্পের পথিকৃৎদের একজন হিসেবে যাত্রা করে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তারা মূলত ওভেন (বোনা) কাপড়ের বিভিন্ন পণ্য (আউটারওয়্যার বা জ্যাকেট ও সোয়েটার জাতীয় পণ্য, শীতকালীন ব্যবহার্য টপস ও বটম) তৈরির জন্য ক্রেতাদের কাছে বিশেষ সুনামের অধিকারী। প্রথম কারখানাটি ছিল রাজধানীর কলাবাগানে, যেখানে ৫০০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। তখন উৎপাদিত হতো মূলত সোয়েটার। তবে বর্তমানে গ্রুপের বড় কারখানাগুলো গাজীপুরের শ্রীপুর ও কোনাবাড়ী, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত। ১৯৮৬ সালে গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কারখানার নিজস্ব প্রাঙ্গণে কুইল্টিং সুবিধা চালু করা হয়।
তৈরি পোশাকের প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পলি ব্যাগের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯৮৭ সালে পলিথিন প্যাক তৈরির প্লান্ট ইনস্টল করা হয়। ফলে পোশাক উৎপাদনের পর প্যাকেজিং ও সরবরাহের ক্ষেত্রে খরচ ও সময় দুই-ই সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৯০ সাল নাগাদ কারখানাটির মোট ১৪টি ইউনিট চালু হয়ে যায়। পরের বছর কারখানা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নিজস্ব ১২ তলা বিল্ডিং প্রাঙ্গণে তাদের প্রডাকশন ফ্লোর স্থাপন করে। ১৯৯৩ সালে মানসম্পন্ন প্যাকেজিং এবং শক্ত কাগজের বাক্সের মসৃণ ডেলিভারি নিশ্চিত করার জন্য শক্ত কাগজ উৎপাদনের একটি ফ্যাসিলিটি চালু করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। স্ট্যান্ডার্ড স্টিচ এমব্রয়ডারি ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে, যেখানে সেই সময়কার সবচেয়ে বেশি রঙের (১৫টি) স্টিচ কভার করত। গত শতাব্দীর শেষ নাগাদ মোট ২৩টি ইউনিটে সম্প্রসারিত হয় স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস।
এ শতাব্দীর শুরুতে, ২০০০ সালে হাসপাতাল ও মেডিকেয়ার সেন্টার, ওয়াশিং প্লান্ট, স্যান্ড ব্লাস্টিং ও পলিব্যাগ ইউনিটের সুবিধাসহ ২০ তলার নতুন একটি নিজস্ব কারখানা ভবন স্থাপন করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। শ্রীপুরের পর গাজীপুরের কোনাবাড়িতে ২০০৩ সালে ৯ তলাবিশিষ্ট ছয় লাখ বর্গফুট আয়তনের একটি কারখানা এবং ছয়তলার দেড় লাখ বর্গফুটের আরেকটি কারখানা চালু করা হয়। দ্বিতীয় কারখানায় ওয়াশিং প্লান্ট, কুইল্টিং, প্যাকেজিং, হাসপাতাল ও মেডিকেল সেন্টারের সুবিধা রাখা হয়।
২০০৪ সালে মহাখালীর বাণিজ্যিক এলাকায় ২০ তলার একটি সুউচ্চ ভবনে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ নিজেদের করপোরেট অফিস স্থাপন করে। একই বছর ২০০ মেশিনসহ নতুন একটি সোয়েটার কারখানার প্রকল্প হাতে নেয় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। পরের বছর নিজেদের প্রিন্টিং সুবিধা চালু করে তারা। ২০০৬ সালে ১২ তলা ও তিন লাখ বর্গফুট আয়তনের নতুন একটি উৎপাদন কারখানা চালু হয় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের। এত বছরে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের গড়ে তোলা বিশাল সাম্রাজ্যের মাধ্যমে কমপক্ষে চার লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। কর্মসংস্থানে তাদের এ বিশাল অবদানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে যমুনার চরাঞ্চলে গেলে। সেই চরের গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে কোনো বেকার মানুষ নেই, সবাই স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের অধীনে চাকরি করছেন।
কারখানা চালু করার পর স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় ২০১৩ সালে। সেই বছরের ২৮ নভেম্বর গাজীপুরের সদর উপজেলার কোনাবাড়ী এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একটি ১০তলা ও দুটি ছয়তলা ভবন এবং ১৮টি কাভার্ড ভ্যানসহ মোট ৩১টি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ওই সময় ভবন তিনটিতে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, প্যাকেজিংসহ মোট আটটি ইউনিটে ১৮ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
দেশের পোশাক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় এ অগ্নিকাণ্ডের পর স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ নতুন ইতিহাসের সূচনা করে। ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির জেগে ওঠার রূপকথাকে বাস্তবে পরিণত করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ তাদের দুই প্রধান উদ্যোক্তা এবং হাজার হাজার শ্রমিকের হাত ধরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য কয়েকটি বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণে মাত্র ছয় বছরের মাঝেই ঘুরে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠানটি। অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া কারখানা সচলে বড় অংকের ঋণ নিলেও কখনো খেলাপি হয়নি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। সেই সময় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের পাশে এগিয়ে এসেছিলেন ক্রেতারাও। যেসব পণ্য পুড়ে গিয়েছিল, সেগুলোর শিপমেন্টের সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়। এজন্য কোনো প্রকার বিলম্ব মাশুল গুনতে হয়নি। ওই সব ক্রেতা এখন পর্যন্ত নিয়মিত কাজ দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি করোনাকালেও প্রতিষ্ঠানটির পাশে কাজ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন ক্রেতারা। কোনাবাড়ী কারখানা বন্ধ হওয়ার পর যেসব শ্রমিক অন্যত্র চাকরি নিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই আবারো আগের কর্মস্থলে ফিরে এসেছিলেন।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ৮ হাজার ৭০০-এর বেশি ক্রেতা রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীন ও জাপানের। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতাদের মতে, তাদের এ অগ্রযাত্রা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সততা, বিশ্বাস ও হাজারো শ্রমিকের ঘাম। উদ্যোক্তারা নিজেরা যেভাবে একে অন্যকে বিশ্বাস করেন তেমনি স্ট্যান্ডার্ডের সব কর্মচারীও প্রতিষ্ঠানটিকে ভালোবাসেন। তাই শ্রমিকদেরই প্রতিষ্ঠানের প্রাণ ধরে নিয়ে সামনের দিনগুলোয়ও নিজেদের সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ।










