সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানা গড়ে তোলেন প্রয়াত এম নাসির উদ্দিনসহ তিন বন্ধু। অন্য দুজন হলেন কাজী জাফরউল্লাহ ও নূর মোহাম্মদ। এই জাহাজভাঙা কারখানার জন্য পুরনো জাহাজ কিনতে ইতালি যেতে হতো নাসির উদ্দিনকে। ১৯৮২ সালের দিকে ইউরোপের দেশটিতে গিয়ে পোশাকের ব্র্যান্ড কারেরার স্বত্বাধিকারীর সঙ্গে আলাপ হয়। ঘুরে দেখেন তাদের জিনস তৈরির কারখানাটি। সেটি তার হৃদয়কে আন্দোলিত করে। দেশে ফিরেই নাসির উদ্দিন তার এক শ্রীলংকান বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন। উৎসাহ পান ওই বন্ধুর কাছ থেকেও। জিনস কারখানার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য জাপানি এক কোম্পানিকে নিয়োগ দিলেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পরই ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট এলাকার ইকবাল রোডে গড়ে উঠল জিনস তৈরির কারখানা। তিন বন্ধুর নামের আদ্যক্ষর নিয়ে নামকরণ করা হয় ‘এনজেডএন ফ্যাশন’। দুই লাইনের এ কারখানা থেকে প্রথম ১২ হাজার ডলারের জিনসের চালান পাঠানো হয় ইতালিতে। ক্রেতাও সেই কারেরা। আর এটাই বাংলাদেশ থেকে বিদেশের বাজারে প্রথম জিনস রফতানি।

এনজেডএন কারখানা চালুর সময় কর্মীদের প্রশিক্ষিত করতে হংকং থেকে দক্ষ ১৭ জনকে নিয়ে এসেছিলেন নাসির উদ্দিন। প্রথমদিকে ইতালিতেই ওয়াশ করে ফিনিশিং করা হতো। ১৯৮৫ সালের দিকে ইতালির কারেরা জিনস থেকে একটি ওয়াশিং প্লান্ট কিনে এনে কারখানায় বসালেন। তখন জিনস ওয়াশে বিশেষ ধরনের পাথর (পিউমিক স্টোন) আমদানি করতে হতো ইন্দোনেশিয়া থেকে। পাথর আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আপত্তি করল। নাসির উদ্দিন তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো সিলেটের পাথর ব্যবহারের পরামর্শ দেন! পরে প্র্যাকটিক্যালি বিশেষ এ পাথরের গুরুত্ব বোঝাতে কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইতালি নিয়ে সেখানকার ওয়াশিং কারখানা ঘুরিয়ে দেখান। এরপর অনুমোদন পান।

পরবর্তী সময়ে নাসির উদ্দিন ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) গড়ে তোলেন প্যাসিফিক জিনস নামে একটি আধুনিক কারখানা। এর আগেই বাকি দুই বন্ধু এনজেডএন ফ্যাশন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলে এককভাবে পথচলা শুরু হয় নাসির উদ্দিনের। নিজের হাতে গড়া এ প্রতিষ্ঠানকে তিনি তৈরি পোশাকের জগতে এক অনন্য উচ্চতায় রেখে গেছেন। তার সেই প্রতিষ্ঠানকে এখন দক্ষ হাতে এগিয়ে নিচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্ম। বর্তমানে প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের চালকের আসনে নাসির উদ্দিনের বড় ছেলে সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। দায়িত্ব পালন করছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। তার স্ত্রী লুৎফেমা ফরিদও ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। ব্যবসায় যুক্ত আছেন তানভীরের বাকি দুই ভাই সৈয়দ মোহাম্মদ তানসীর ও সৈয়দ মোহাম্মদ তাহমীরও।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমানে ডেনিম পোশাক রফতানিতে শীর্ষে রয়েছে প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার ছাড়ালেও নেই কানো ব্যাংক ঋণ। মূলত মুনাফা থেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণের কাজ করে চলেছে তারা। এখন বৈশ্বিক লাইফওয়্যার সলিউশন অর্থাৎ জীবনযাপনে দরকারি সব পোশাক প্রস্তুতের সক্ষমতা তৈরিতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ।

প্যাসিফিক জিনস শুরু থেকেই বেশি দামের জিনস তৈরি করছে। ফ্যাশন ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে ক্রেতার জন্য আলাদা আলাদা নকশার জিনসের নমুনা তৈরিতে দেয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। সারা বছর যে পরিমাণ পোশাক তৈরি হয় তার অর্ধেকই নিজস্ব নকশা। এছাড়া পরিবেশবান্ধব ও আর্থিক সাশ্রয়ী উদ্যোগেও এগিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠান। পানির অপচয় শতভাগের কাছাকাছি হ্রাস করা হয়েছে কারখানায়। বিদ্যুৎ চাহিদারও উল্লেখযোগ্য অংশ আসে সৌরবিদ্যুৎ থেকে, যেটা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে চায় প্যাসিফিক। একই সময়ের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৬৫ শতাংশ নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

গ্রুপটির সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলো হচ্ছে প্যাসিফিক জিনস, এনএইচটি ফ্যাশন, জিনস ২০০০, ইউনিভার্সেল জিনস, প্যাসিফিক ক্যাজুয়াল ও প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার। ইউনিভার্সেল জিনসের কারখানায় উৎপাদন শুরু হয় ২০০৮ সালে। বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার কমানো ও ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে কম রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে করা হয়েছে কারখানা ভবনের নকশা। এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রতিটি তলায় যেন প্রাকৃতিক বাতাস আসতে পারে। প্রতিটি তলার মেঝেতে বিশেষ রঙের যে প্রলেপ দেয়া হয়েছে তাতে আলো প্রতিফলিত হয়। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বাতিতে শ্রমিকরা কাজ করতে পারেন। কারখানাটির ওয়াশিংয়ের তরল বর্জ্য পরিশোধনাগারের (ইটিপি) পাশাপাশি পুনরায় ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক প্লান্ট। এতে শতভাগের কাছাকাছি কমানো সম্ভব হয়েছে পানির অপচয়।