মীর্জা শামস মাহমুদের ব্যবসায় হাতেখড়ি মূলত বাবার হাত ধরে। বাবার সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই নিজে ব্যবসা দাঁড় করানোর অনুপ্রেরণা পান। সে অনুপ্রেরণা থেকে এসএম সোর্সিংয়ের যাত্রা শুরু ২০১৩ সালে, মাত্র ১০০ বর্গফুটের ছোট একটি রুম থেকে। প্রথম দিকে ছোট ছোট অর্ডারের সোর্সিং করা হতো। ২০১৭ সালে তাদের প্রথম ফ্যাক্টরি এসএম সোর্সিংয়ের প্রতিষ্ঠা হয়; রফতানি শুরু করা হয় বিদেশে। পরবর্তী সময়ে যথাক্রমে ম্যাংগোটেক্স লিমিটেড (২০২০), অ্যাপারেল টুডে লিমিটেড (২০২৩) ও এসএম সোর্সিং ইউনিট-২ (২০২৩) কারখানাগুলো চালু করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এসএম সোর্সিং বিশ্বের এক নম্বর গ্রিন প্লাটিনাম ফ্যাক্টরি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমানে এসএম সোর্সিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মীর্জা শামস মাহমুদ। তার ভাষ্য অনুসারে, ‘২০১৩ সালের ১ জুন এসএম সোর্সিং যাত্রা শুরু করে। তখন একটি ছোট অফিস ছিল। চিন্তা করেছি–পুঁজি নেই তো কী হয়েছে, কাজ তো বুঝি। আমার প্রথম অর্ডার ছিল ৩৭ হাজার পিসের, নিট ওয়্যারের লেডিস টপ। এ অর্ডারটি কমিশনের ভিত্তিতে আমি একটি ফ্যাক্টরিকে হ্যান্ডওভার করি। পরবর্তী সময়ে এটি এমন একটি বায়িং হাউজে পরিণত হয়েছে যেটার মাধ্যমে আমরা ২০-৩০ লাখও সোর্সিং করতাম। ২০১৭ সালের আগে যে অর্ডারগুলো আসত, তার সোর্সিং আমরা বাইরে থেকে করতাম। কারণ তখনো আমাদের কোনো নিজস্ব ফ্যাক্টরি ছিল না।’

প্রতিষ্ঠাকালে এসএম সোর্সিংয়ের কারখানায় ছিল ৭০টি মেশিনবিশিষ্ট আড়াই লাইনের উৎপাদন ব্যবস্থা। শ্রমিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২২০। বর্তমানে তাদের ৩০৫টি মেশিনবিশিষ্ট কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক। ফ্যাক্টরিতে বর্তমানে সব ধরনের নিটেড পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাচ্চাদের লেগিংস, টপস, টি-শার্ট, বড়দের পায়জামা, নাইট ড্রেস, পোলো শার্ট, আন্ডারগার্মেন্টস (বক্সার, প্যান্টি, বডিস্যুট), সোয়েট শার্ট, হুডি, স্পোর্টস ওয়্যার ইত্যাদি। নিটেড পণ্যের মাঝে বাচ্চাদের পোশাকই সবচেয়ে বেশি। ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের তিনটি প্রতিষ্ঠানের চারটি কারখানায় ৬০ শতাংশ বাচ্চাদের পোশাক, ২৫ শতাংশ লেডিসওয়্যার ও ১৫ শতাংশ জেন্টসওয়্যার উৎপাদন করা হচ্ছে। তাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৭ কোটি পিস গার্মেন্টস। নিট ফ্যাব্রিকস ও গার্মেন্টস কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতিই এখানে রয়েছে। যন্ত্রপাতিগুলোর অধিকাংশই আনা হয়েছে জাপান, চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও জার্মানি থেকে।

6

কারখানা নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সাধারণ ফ্যাক্টরি থেকে একে গ্রিন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তর করা। সবুজ ও পরিবেশবান্ধব কারখানায় রূপান্তরের সব বিষয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াটি ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তবে মালিকপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।

একটি সাধারণ ফ্যাক্টরিকে গ্রিন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তরের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানির সরবরাহ, সবুজায়ন, বর্জ্য হ্রাসকরণ, দূষণ নিরাময়–প্রতিটি কাজই ছিল চ্যালেঞ্জিং। এর কারণ হলো যেকোনো ফ্যাক্টরির গ্রিন সার্টিফিকেট পেতে হলে তার কিছু পূর্বশর্ত অনুযায়ী কাজ করতে হয়। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এসএম সোর্সিংও কাজ শুরু করে। গ্রহণ করে বেশকিছু পদক্ষেপ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ফ্যাক্টরির কার্বন নিঃসরণ ৩ হাজার ৭৪১ টন থেকে ১ হাজার ৫৭ টনে নামানো, যা কিনা প্রায় ৬৭ হাজার ১০০টি গাছ রোপণের মতো বিশাল উদ্যোগ। ফ্যাক্টরির বিদ্যুৎ চাহিদাকে ৫০ দশমিক ৭৩ শতাংশ সাশ্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ৩৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ পুনঃউৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা। ২১ শতাংশ সবুজায়ন বৃদ্ধি করতে ফ্যাক্টরি প্রাঙ্গণে প্রচুর বনায়ন নিশ্চিত করা। পানির সাশ্রয়ের ৪৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বৃষ্টির পানি ধারণের ব্যবস্থা এবং পরিশোধনাগার স্থাপন। দিনের আলো ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ফ্যাক্টরিতে স্থাপন করতে হয় স্কাই লাইট প্রযুক্তি।

এছাড়া রয়েছে ফ্যাক্টরির দূষণ নিরাময় ৭৬ দশমিক ৩৮ শতাংশে নামিয়ে আনা। পর্যাপ্ত পরিমাণ নির্মল বাতাস চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও এয়ার ভেন্টিলেশন সিস্টেম স্থাপন করা। সর্বোপরি ASHARAE, IESNA, ANSI, ASTM, EPA, EPACT, IGCC, SCAQMD, SMACNA ইত্যাদি সংস্থার বিধিমালা অনুযায়ী ফ্যাক্টরিকে তৈরি করা। এসএম সোর্সিং ফ্যাক্টরি তার গ্রিন প্লাটিনাম সার্টিফিকেটের কাজ হাতে নেয় ২০২০ সালে। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য, বিশ্বের এক নম্বর গ্রিন প্লাটিনাম ফ্যাক্টরি হিসেবে স্বীকৃতি পায় তারা।

দেশের অন্য কারখানাগুলোর চেয়ে এসএম সোর্সিং ভিন্ন হওয়ার প্রধান কারণই হলো গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ (পরিবেশবান্ধব) কারখানা। এখানে ফ্যাক্টরির স্থান নির্ধারণ থেকে শুরু করে টেকসই স্থাপনা, পানির সংরক্ষণ, বিদ্যুতের সর্বোত্তম ব্যবহার, কাজের পরিবেশ তাদের অন্যান্য কারখানা থেকে করেছে আলাদা। এছাড়া ফ্যাক্টরির দক্ষ শ্রমিক ও কর্মচারী, উৎপাদন দক্ষতা, সঠিক সময়ে শিপমেন্ট, নিজস্ব ডিজাইন টিম, সঠিক মূল্য, ছোট ছোট অর্ডারের সক্ষমতা, সর্বোপরি এক জায়গায় সব ধরনের সুবিধা এসএম সোর্সিংয়ের উন্নতির মূল চালিকাশক্তি।

কারখানায় কর্মীবান্ধব পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের বিদ্যমান শ্রম আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী এসএম সোর্সিং তার সব শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে। সব শ্রমিকের বেতন, ওভারটাইমের টাকা পরিশোধ করা হয় প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে। কর্ম থেকে অব্যাহতি পাওয়া সব শ্রমিকদের সঠিক সার্ভিস বেনিফিট সময়ের মধ্যেই পরিশোধ করা হয়। শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্ধারিত বকেয়া ছুটির টাকাও পরিশোধ করা হয় সঠিক সময়ের মধ্যে। এছাড়া মালিকের নিজ তহবিল থেকে যেকোনো প্রকার চিকিৎসার খরচ শর্তসাপেক্ষে প্রদান, সম্ভাবনাময় সন্তানদের পড়াশোনার খরচ শর্তসাপেক্ষে বহন এবং বিশেষ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেয়া হয় আর্থিক সহায়তাও।

বিদ্যমান কর্মীদের সুবিধা নিয়ে স্বত্বাধিকারী মীর্জা শামস মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির পলিসি আমরা সব ভেন্ডরদের টাকা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শোধ করে দিই। আমরা স্টাফ সেলারি রানিং মাসের ৩০ তারিখ দিই। আর ৩০ তারিখ শুক্রবার হলে সেটা ২৮ তারিখ দিয়ে দিই। আমাদের সেলারি কখনো ৫ তারিখের পরে যায় না। গ্রুপে প্রায় ৮৫০ স্টাফ এবং ওয়ার্কার ছয় হাজার। তাদের বাবা-মা, স্ত্রী ও বাচ্চাদের মেডিকেল খরচটা আমরা আমাদের প্রফিট থেকে দিই।’

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এসএম সোর্সিংয়ের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রতিষ্ঠান এবং তাদের বিশ্বাস দেশের মানুষের সেই ধরনের কর্মদক্ষতা আছে, যা দিয়ে একটি পোশাক কারখানা সঠিকভাবে চালানো সম্ভব। তাই এসএম সোর্সিংয়ের কারখানায় কোনো বিদেশী কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়নি। দেশের মানুষের হাতে তৈরি পণ্যই ছড়িয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

এসএম সোর্সিংয়ের রফতানি পণ্যের ক্রেতা মূলত পৃথিবীর নামকরা সব রিটেইল ব্র্যান্ড। এর মধ্যে আলদি, এলপিপি, কিক, পিয়েরে কারডিন, বেস্ট সেলার, ম্যাংগো অন্যতম। রফতানি পণ্যের বাজারে এসএম সোর্সিং পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইতালি, জাপান, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশে নিজেদের পণ্য সরবরাহ করছে। বর্তমান সময়ের বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী কারখানা সম্প্রসারণ অত্যাবশ্যকীয় কাজের অন্তর্গত। এসএম সোর্সিংও ২০২৬ সালের মধ্যে নিজেদের রফতানির পরিমাণ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে কারখানার উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। নিজস্ব ফ্যাব্রিক উৎপাদন, প্রিন্টিং ও অ্যাকসেসরিজ ফ্যাক্টরির উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিরও পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাকে গভীরভাবে দেখেছেন মীর্জা শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কমবেশি সব কারখানাই একাডেমিক বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করতে চায়। তবে আমাদের প্রধান সমস্যাটা হলো প্রথমে আমরা অভাবে পড়ে যাই, এরপর অভাবের কারণে আমাদের স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। তারপর ব্যবসা করা ভুলে যাই। আমাদের ট্রেডটি কিন্তু অনেক অসহায়। মালিকগুলো ভালো কিন্তু মালিকগুলো অপারগ হয়ে যায়। আমার বাবাকে দেখছি ফেইলর হতে। তাই আমি চিন্তা করেছি কোম্পানি কোনোদিন যাতে বন্ধ না হয়।’

নিজেদের কারখানাকে বিশ্বে অনন্য হিসেবে স্থান দেয়ার জন্য এসএম সোর্সিংয়ের পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের গ্রিন ফ্যাক্টরির সার্টিফিকেট অর্জনের বিষয়টিতে। যাচাই করার সময় ১১০ নম্বরের মধ্যে ১০৬ অর্জন করে এসএম সোর্সিং, যা কারখানাটিকে পৃথিবীর সেরা গ্রিন প্লাটিনাম ফ্যাক্টরির মর্যাদায় আসীন করে। অর্জনটি শুধু এসএম সোর্সিংয়ের নয়, বরং দেশের জন্যও গর্বের। সমাজ, দেশ, পৃথিবী এবং সর্বোপরি পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এসএম সোর্সিং কখনই নিজেদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না এমনটাই আশাবাদ কর্তৃপক্ষের।