দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড বা ডিবিএল। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসা দিয়ে ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে তারা। কোম্পানির ওয়েবসাইট অনুসারে, গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ জব্বারের বড় ভাই দুলালকে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করেছিল। সে ভাইকে স্মরণ করেই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় ‘দুলাল ব্রাদার্স’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন খাতে সম্প্রসারিত এক শিল্পগোষ্ঠীতে রূপ নেয় ডিবিএল। প্রায় তিন যুগের এ পথচলায় কার্যক্রমে আনা হয়েছে বৈচিত্র্য। পোশাক, টেক্সটাইল, টেক্সটাইল পেইন্টিং, ওয়াশিং, গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ, সিরামিক টাইলস, ফার্মাসিউটিক্যালস, ড্রেজিং, খুচরা ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন সেবাসহ আরো নানা খাতে রয়েছে তাদের ব্যবসা।

বর্তমানে গ্রুপটি ২৪টি শিল্প ইউনিট পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার লোকের। গত বছর তারা ১ বিলিয়ন ডলারের আকর্ষণীয় বার্ষিক টার্নওভার অর্জন করে বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে।

ডিবিএল গ্রুপের শুরুটা হয়েছিল খুব ছোট পরিসরেই। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে বাবার ব্যবসায় হাত দেন এমএ জব্বার। পরে বাকি তিন ভাই আবদুল ওয়াহেদ, এমএ রহিম ও এমএ কাদেরের সঙ্গে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা থেকে শুরু করেন তৈরি পোশাকের ব্যবসা। ১৯৯১ সালে ঢাকার ১০২ গ্রিন রোডে নিজেদের বাড়িতেই গড়ে তোলেন ছোট একটি পোশাক কারখানা।

বিভিন্ন কারখানা থেকে জোগাড় করেন দক্ষ শ্রমিক। প্রথম দিকে তারা অন্য কারখানা থেকে ঠিকায় কাজ করতেন। পণ্যের মান ও সময়মতো কাজ বুঝিয়ে দিয়ে অল্প দিনেই দু-চারজন ক্রেতার সুনজরে পড়েন চার ভাই। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্যের এক ক্রেতার কাছ থেকে পেলেন সরাসরি ক্রয়াদেশ। বানিয়ে দিতে হবে তিন হাজার পিস পোলো শার্ট। ওই কাজই তাদের ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সরাসরি ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে ভিত শক্ত হতে থাকে ডিবিএলের।

১৯৯৯ সালে গাজীপুরের কাশিমপুরে বড় বিনিয়োগ করলেন চার ভাই। সেখানে ধাপে ধাপে পোশাক কারখানার পাশাপাশি চালু করলেন নিটিং, ডায়িং, অল ওভার প্রিন্ট সেকশন। কারখানার জন্য আনলেন ইউরোপের সর্বশেষ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি। তাতে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ বেশি হলেও পণ্যের মানের দিক দিয়ে এগিয়ে নেন তাদের ব্যবসা। বর্তামানে পোশাক শিল্পের শীর্ষ রফতানিকারকদের অন্যতম ডিবিএল। তাদের বড় দুই ক্রেতা সিঅ্যান্ডএ ও এইচঅ্যান্ডএম।

শুরুর দিকে টি-শার্ট ও পোলো টি-শার্ট উৎপাদন করা হতো ডিবিএলের কারখানায়। বর্তমানে মধ্যম ও উচ্চ মূল্যের পোশাক উৎপাদন করা হচ্ছে। তৈরি হয় শিশুদের পোশাকও। এসব পোশাকের নকশা করা হয় নিজেদের ডিজাইন সেন্টারে। এছাড়া ব্যবহৃত ও পুরনো কাপড় থেকে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের কাজও করছে ডিবিএল গ্রুপ। সুতা উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তি, পরিবেশসম্মতভাবে বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ, সম্পদ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের নিঃসরণ শূন্য রাখার অঙ্গীকারসহ নানা পদক্ষেপও নিয়েছে তারা।

ডিবিএল গ্রুপের অধীন একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান জিন্নাত ফ্যাশনস লিমিটেড। কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এ নিট ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন মোট ২ হাজার ২৯৬ কর্মী। কারখানাটিতে যন্ত্রপাতির সংখ্যা ৮৭৬। বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ২০ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬০ ডজন। সাধারণত পোলো শার্ট, ড্রেস, টি-শার্ট, ট্যাংটপ তৈরি হয় এখানে।

গ্রুপটির আরো একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ফ্লেমিংগো ফ্যাশনস লিমিটেড। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কারখানাটিতে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ৪ হাজার ৬৬৫ ও নারী কর্মী রয়েছেন তিন হাজার। এ কারখানায়ও ট্রাউজার, ট্যাংটপ, টি-শার্ট ও পোলো টি-শার্ট তৈরি হয়।

পরিবেশ রক্ষার জন্য ডিবিএল বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নেয় এবং পোশাক তৈরিতে তুলানমূলক কম ব্যবহর করা হয় ক্ষতিকারক রাসায়নিক। এর জন্য স্বনামধন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় সেরা কাঁচামাল। ডিবিএল ২০১১ সালে হাতে নেয় ক্লিনার প্রডাকশন প্রকল্প, যার মাধ্যমে কাপড় রঙ করার পুরো প্রক্রিয়ায় পানি কম লাগে। আগে যেখানে এক কেজি কাপড় ডায়িংয়ে ১৫০ লিটার পানি লাগত, সেটি নেমে এল ৬০ লিটারে। একইভাবে তারা ডায়িং মেশিনের তাপমাত্রা ১০০ থেকে ৬০ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনার পাশাপাশি রাসায়নিক ব্যবহার কয়।

দেশে নতুন করে বড় ধরনের বিনিয়োগে যাচ্ছে ডিবিএল। শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে নতুন পোশাক কারখানা ও কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য ফ্যাক্টরি করবে তারা।

ডিবিএলের টেকসইতা অর্জনের বিভিন্ন উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ জব্বারকে ২০২৩ সালের লোকাল এসডিজি পাইওনিয়ার সম্মাননা দিয়েছে জাতিসংঘের গ্লোবাল কমপ্যাক্ট। মূলত যারা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন তাদেরই এ তালিকায় রাখা হয়। সাত বছর ধরে স্থানীয় এসডিজি পথপ্রদর্শকদের এ সম্মাননা দিয়ে আসছে গ্লোবাল কমপ্যাক্ট। টানা দুবারসহ ডিবিএল মোট তিনবার এ সম্মাননা পেয়েছে।