রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের সামনের সারির একজন সফল উদ্যোক্তা এসএম খালেদ। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে স্নাতক পাস করে তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সাল থেকে সরাসরি ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তার দক্ষ নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাক রফতানি প্রতিষ্ঠান ‘স্নোটেক্স গ্রুপ’। বিদেশে পণ্য পাঠানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের জন্য তিনি গড়ে তোলেন লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘সারা লাইফস্টাইল’। এসএম খালেদের গড়ে তোলা স্নোটেক্স গ্রুপের সবগুলো প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করছেন প্রায় ২২ হাজার কর্মী।

বায়িং হাউজের মাধ্যমে ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে ‘স্নোটেক্স’। নিজেদের প্রথম কারখানা ‘স্নোটেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০০৪ সালে রাজধানীর মিরপুরে। সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে ‘কাট অ্যান্ড সিউ’ এবং ২০১৪ সালে ‘স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে ‘স্নোটেক্স স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড’ যাত্রা করে। বর্তমানে ‘স্নোটেক্স’ চারটি বড় কারখানার সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। 

শুরু থেকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ও শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয়ায় বর্তমানে সবুজ পোশাক কারখানা হিসেবে বিশ্বে জায়গা করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে এর স্বীকৃতিস্বরূপ পোশাক খাতে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে স্নোটেক্স আউটারওয়্যার। কারখানার প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের পর নির্মল এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকৃষ্ট করবে যে কাউকে। প্রথম ভবনের সামনে রয়েছে সবুজে ঘেরা বাগান। অন্য পাশে গড়ে তোলা হয়েছে সবজি বাগান। তার ঠিক পাশেই সীমানাপ্রাচীর ঘিরে রয়েছে ধানখেত। আর দ্বিতীয় ভবনের দিকে এগোতেই দেখা যাবে স্ট্রবেরি গাছ দিয়ে সাজানো বাগান।

স্নোটেক্সের প্রতিষ্ঠাতা এসএম খালেদ বেশ বিনয়ী ও সদালাপী মানুষ। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও খেলাধুলাভিত্তিক সংগঠনের অংশ ছিলেন। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে স্কুল ও কলেজজীবন শেষ করে ঢাবির ম্যানেজমেন্ট বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এসএম খালেদ। শিক্ষাজীবনে কখনো ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন না দেখলেও সমাজসেবা, শিক্ষার প্রসার ইত্যাদি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিল বেশ। স্নাতকোত্তর চলার সময়ই কিছু করার আগ্রহ থেকে একটি পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে এক বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মিরপুর জোনের বই পড়া প্রতিযোগিতার প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু স্বল্প আয়ে চলতে কষ্ট হওয়ায় পরবর্তী সময়ে যোগ দেন একটি বায়িং হাউজে।

চাকরি শুরু করলেও প্রতিনিয়ত এসএম খালেদ ভাবতেন কীভাবে অন্যের অধীনে না থেকে নিজেই কিছু শুরু করা যায়। কয়েকজন বন্ধু মিলে কাপড়ের লেবেল তৈরির একটি কারখানা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন প্রাথমিকভাবে। বন্ধুদের সঙ্গে ব্যবসা শুরুর পর বিভিন্ন বাধায় সে উদ্যোগ আর সফল হয়নি। পরে ১৯৯৮ সালে তিনি একাই চালু করেন স্নোটেক্স বায়িং হাউজ। স্বল্প পুঁজিতে বাসায় একটি কম্পিউটার নিয়ে প্রাথমিকভাবে ইনভয়েস তৈরি, তালিকা তৈরি, বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা ইত্যাদি শুরু করেন, লেবেল অর্ডার নেয়ার জন্য। মাসিক ১৮০০ টাকা বেতনে নিয়োগ দেন একজন কর্মীকেও। মাত্র একজন কর্মী নিয়ে শুরু করা এ ব্যবসা চালানো কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। প্রায় দুই সপ্তাহ পর তিনি এক বন্ধুর মাধ্যমে দুই হাজার পিস লেবেল তৈরির প্রথম অর্ডার পান। দেশে তখন অল্প কিছু লেবেল তৈরির কারখানা ছিল, যাদের অর্ডার আসত প্রধানত হংকং থেকে। অর্ডার পাওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যেই লেবেল ম্যানেজ করতে সক্ষম হন খালেদ। এতে ক্লায়েন্ট খুশি হন এবং পুনরায় কিছু অর্ডার দেন। নিজের কর্মদক্ষতায় ছয় মাসের মধ্যেই ব্যবসা বড় হতে থাকে স্নোটেক্স বায়িং হাউজের। দেড় বছরেই বড় ব্যবসার জন্য পুঁজি সঞ্চয় করতে সক্ষম হন এসএম খালেদ।

অনেক প্রচেষ্টার পর এসএম খালেদ বার্ন অ্যাপারেল নামে একটি মার্কিন ব্র্যান্ডের সন্ধান পান। ২০০০ সালের দিকে ব্র্যান্ডটির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তাদের কাছ থেকে তিনি পাঁচ হাজার পিস জ্যাকেটের অর্ডার পান। দিন-রাত পরিশ্রম করে চার মাসের মধ্যেই অর্ডারটি বিদেশে শিপমেন্ট করেন। মূলত সেই থেকে শুরু হয় স্নোটেক্স গ্রুপের মহাযাত্রা। ক্রেতারা তার কাজ এতই পছন্দ করেন যে নতুন করে আরো ৩০ হাজার পিস পণ্যের অর্ডার কনফার্ম করা হয়। এসএম খালেদকেও আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

নিয়মিত অর্ডার আসার একপর্যায়ে ২০০৩ সালে বার্ন অ্যাপারেলস কর্তৃপক্ষ এসএম খালেদকে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে নিজেদের একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দেন। তখন খালেদের কাছেও প্রায় দুই কোটি টাকার পুঁজি জমা হয়েছিল। বার্ন অ্যাপারেলস তাকে জানায় যে তারা কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন দেয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে। ১০ বছর পর এ ফ্যাক্টরির মেশিনসহ সম্পূর্ণ মালিকানা এসএম খালেদের হয়ে যাবে, এ চুক্তিতে কাজ শুরু হয়। সেই কারখানাটি ২৯-৩০ হাজার বর্গফুটের ভাড়া করা একটি ভবনে স্থাপন করা হয়েছিল।

বায়িং হাউজে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে একটি কারখানার ইকোসিস্টেম কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে ভালোই ধারণা হয়ে গিয়েছিল খালেদের। ৫০০ সদস্য নিয়ে স্নোটেক্স অ্যাপারেলসের কারখানা মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্নোটেক্স গ্রুপের দ্বিতীয় ফ্যাক্টরি চালু হয় ২০০৭ সালে। তবে প্রথম থেকেই এসএম খালেদের পরিকল্পনা ও চেষ্টা ছিল একটি ভালো এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা করার। এজন্য দিনের পর দিন উদ্যোক্তাদের প্রচুর পরিশ্রম ও পড়াশোনা করতে হয়েছে। কেননা গ্রিন ফ্যাক্টরিসংক্রান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানের কিছুই তার জানা ছিল না। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার বিষয়টিও যথেষ্ট কঠিন ছিল। তাই ইউটিলিটি কস্ট কম লাগবে, কারখানার সবকিছুই ভালো হবে, পরিবেশের ক্ষতিও হবে না—এ চিন্তা থেকে ঢাকার ধামরাইয়ে ২০১২-১৩ সালের দিকে শুরু করেন স্নোটেক্সের গ্রিন ফ্যাক্টরির কাজ। ১০ বিঘা জায়গা নিয়ে কাজ শুরু হলেও বর্তমানে কারখানাটি প্রায় ৮০ বিঘার ওপর বিস্তৃত। ২০১৭ সাল নাগাদ প্রথম গ্রিন ফ্যাক্টরির নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ২০২১ সালে সম্পন্ন হয় দ্বিতীয় ফ্যাক্টরির নির্মাণ। তবে পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ শেষ হতে সময় লাগলেও কারখানার উৎপাদন শুরু হয়েছিল ২০১৪ সাল থেকেই, দুই-তিনশ কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে। তবে সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা পেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা।

ব্যবসা শুধু নিজে ভালো থাকার জন্য নয়, কর্মীরাও যাতে ভালো থাকেন সে চেষ্টাও সবসময় করে এসেছেন এসএম খালেদ। এজন্য স্নোটেক্সের প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজ করা কর্মীদের তিনি নিজ পরিবারের অংশ মনে করেন। তাই পরিবারের সব সদস্যের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে একেবারে বিনামূল্যে। কারখানার নিচতলায় বিশাল ডাইনিং রুমে শ্রমিকরা দুপুরের খাবার খান। একেক শিফটে দেড়-দুই হাজার মানুষ খাবার খেতে পারেন। ধামরাইয়ের ধুলিভিটায় অবস্থিত কারখানা ভবনটির একটু দূরেই রয়েছে স্টোর ও বিশাল রান্নাঘর। সেখান থেকে তৈরি হয়ে খাবার পৌঁছে যায় ডাইনিং রুমে। সবার জন্য রয়েছে আলাদা প্লেট। শ্রমিকদের বসে খাওয়ার জন্য রয়েছে সারি সারি বেঞ্চ। সে বেঞ্চে আগে থেকেই সরবরাহকারীরা সাপ্তাহিক রুটিনমাফিক খাবার দিয়ে থাকেন। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে দুপুরের খাবার খান। এছাড়া সকালের ও বিকালের নাশতার জন্য সুলভ মূল্যের দোকানও খুলে দিয়েছেন তিনি, যেখান থেকে স্বল্পমূল্যে হালকা নাশতা সেরে নিতে পারেন শ্রমিকরা। আবার শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে মেডিকেল সেন্টার। সেখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ দেয়া হয়। তাদের চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছেন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স। এসব সুবিধার বাইরেও কারখানাটি তার মুনাফার একটি অংশ শ্রমিকদের দিয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠাতা এসএম খালেদের মতে, স্নোটেক্সের সবচেয়ে অনন্য বিষয় তাদের স্বচ্ছতা। কারখানার শ্রমিকদের প্রতি মাসের বেতন মাসের শেষ নাগাদই অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেয়া হয়, বায়ারদেরও প্রতি মাসের শুরুর সপ্তাহের মাঝে অর্ডার বুঝিয়ে দেয়া হয়। সব কারখানায় ব্যবহার করা হয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানি প্রযুক্তি। ছাদে বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল। এতে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে স্নোটেক্সের ১২ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা হয়। পাশাপাশি সরকারি ছুটির দিনগুলোয় অব্যবহৃত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় জাতীয় পাওয়ার গ্রিডে। এছাড়া গ্রিন কারখানায় রয়েছে জাপানি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট।

স্নোটেক্সের তৈরি পোশাক বিশ্বের নামিদামি প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছে রফতানি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ন অ্যাপারেল, অ্যালফাব্রোডার, হ্যাগার ক্লদিং, ভিএফ ও কলম্বিয়া স্পোর্টসওয়্যার; কানাডার রিচলু ও কানাডা স্পোর্টসওয়্যার; ফ্রান্সের ক্যামাই ইউ ও ডেকাথলন; ইংল্যান্ডের মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার ও ডেভেনহ্যামস; বেলজিয়ামের সিঅ্যান্ডএ; স্পেনের ম্যাঙ্গো এবং ডেনমার্কের বেস্টসেলার। নানা ধরনের ক্যাজুয়াল ও ফরমাল পোশাকের পাশাপাশি স্পোর্টসওয়্যার, সব ধরনের জ্যাকেট ও আউটারওয়্যার তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের এখন বার্ষিক টার্নওভার ৩০০ মিলিয়ন ডলার এবং কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ কোটি ৭০ লাখ পিস।

২৩ বছরের ব্যবসায়িক জীবনের পথচলায় বেশকিছু সম্মানজনক অর্জনও রয়েছে এসএম খালেদের। ২০২২ সালে ‘স্নোটেক্স আউটারওয়্যার’ ট্যাক্স কার্ড সম্মাননা পায়। তৈরি পোশাক শ্রেণীতে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী হিসেবে এ পুরস্কার পায় স্নোটেক্স। ২০২১ সালে প্রথমবার ও ২০২৩ সালে দ্বিতীয়বার স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেডকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ দেয়। ডিএইচএল ও দ্য ডেইলি স্টারের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’-এ বছরের সেরা ব্যবসায় উদ্যোক্তা শ্রেণীতে পুরস্কার পায় স্নোটেক্স। গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে স্নোটেক্স আউটারওয়্যার অর্জন করেছে ইউএসজিবিসির লিড প্লাটিনাম সার্টিফিকেট। পাশাপাশি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘হেলথ অ্যান্ড সেফটি’ অ্যাওয়ার্ডসহ প্রতিষ্ঠানটি পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি উত্তম চর্চা পুরস্কার ২০১৭, বেস্ট প্র্যাকটিস অ্যাওয়ার্ড ২০১৮, বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড ২০১৯, জাতীয় রফতানি ট্রফি ২০১৯-২০ ইত্যাদি পুরস্কার অর্জন করেছে। এছাড়া ২০২৩ সালে বেস্ট ফ্যাক্টরি হিসেবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছে স্নোটেক্স।

‘সমাজের ও রাষ্ট্রের উপকার করাই আমাদের লক্ষ্য’—এ বার্তা নিয়েই এসএম খালেদ ও তার স্বপ্নের স্নোটেক্স গ্রুপ এগিয়ে যাচ্ছে আগামীর পথে।