ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আরিফুর রহমান স্পিনিং কারখানার মাধ্যমে গার্মেন্ট খাতে প্রথম পা রেখেছিলেন। ২০০৫ সালে চালু হওয়া কারখানাটি প্রথম দুই-তিন বছর ভালো লাভ করে। এরপর উদ্যোক্তাদের মনে হয় আরেকটি স্পিনিং কারখানা খোলা উচিত। ২০০৮ সালে সেটি চালু করার দেড়-দুই বছরের মধ্যেই তুলার বাজার কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ব্যবসায় কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় উদ্যোক্তারা অনুভব করলেন, শুধু স্পিনিং কারখানা নয়, সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা যদি চালু করা যায় সেক্ষেত্রে ভালো ফল আসবে। কোনো এক ধাপে দাম বাড়লেও পুরো ব্যবসা কখনো ক্ষতির শিকার হবে না। সে চিন্তা থেকেই ২০১০ সালে ব্লু প্ল্যানেট গার্মেন্ট সেকশনের প্রথম নিট গার্মেন্ট কারখানা চালু হয়।

তবে ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি বস্ত্র খাতের ব্যবসায় যাত্রা করতে গিয়ে কিছুটা ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গ্যাস ও বিদ্যুৎ শক্তির সরবরাহ সংস্থান করা। গত দুই দশকে জ্বালানি, বিশেষ করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে রাতারাতি। পাশাপাশি বেড়েছে গ্যাসের দামও। আবার অনেক দেশে সরকার থেকে গার্মেন্টস ব্যবসার সুবিধার্থে সারা বছর সরকারের পক্ষ থেকে ইনসেনটিভের ব্যবস্থা রাখা হয়, যা বিশেষ ইস্যু ছাড়া সাধারণত বাংলাদেশে দেয়া হয় না। বর্তমানে ব্লু প্ল্যানেটের সব কারখানা মিলে নয় হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন। অ্যাক্টিভওয়্যার, লঞ্জারি ও স্পোর্টসওয়্যার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চীন থেকে তিনজন বিশেষজ্ঞ এসে ট্রেনিং দিয়ে গিয়েছিলেন শুরুর দিকে। আবার অনেকে বিদেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন ও পরে কারখানার বাকি শ্রমিকদের ট্রেইন করেছেন। এছাড়া শুরুর দিকে শ্রীলংকার একজন কনসালট্যান্ট কাজ করেছেন।

বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও উদ্যোক্তাদের নিজেদের সমন্বিত মেধা ও ঐক্যের ফলে তারা ধীরে ধীরে এ খাতে এগিয়েছেন অনেকটাই। প্রতিটি কারখানায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা ও চিন্তাধারার সমন্বয় রেখেছেন উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদনের মান রক্ষায়। বর্তমানে ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের অধীনে একাধিক প্রতিষ্ঠান ও কারখানা রয়েছে। সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়া হলো এখানে।

প্রথম কারখানা এমএম স্পিনিং মিল অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধাসহ গবেষণা ও উন্নয়ন টিম নিয়মিত নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সাবধানতার সঙ্গে যাচাই করে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করছে। এ কারখানায় মোট ৬৬টি মেশিনে ৫৭০ জন কর্মী দৈনিক ১৬ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদন করছেন।

ব্লু প্ল্যানেট নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানাটি অবস্থিত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মুলাইদে। শুরুর সময় ১২টি সেলাই লাইন থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৪২টি। কারখানাটি নির্মাণে ১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। কারখানার বর্তমান বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ কোটি ১৬ লাখ পিস পোশাক ও বার্ষিক টার্নওভার ৭৭৮ কোটি টাকা। কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মরত আছেন। ব্লু প্ল্যানেট নিটওয়্যার বিশ্বমানের টেক্সটাইল প্রস্তুতকারকদের বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি ব্যবস্থাপনা দল তৈরি করে ব্লু প্ল্যানেট নিটওয়্যারের কাজ পরিচালিত করা হচ্ছে। তাদের পোশাক উৎপাদন ফ্যাসিলিটিতে অনেকগুলো বিভাগ রয়েছে। যেমন স্পিনিং, নিটিং, প্রিন্টিং, এমব্রয়ডারি ও প্যাকেজিং।

বদর স্পিনিং মিলস লিমিটেড মানসম্পন্ন সুতা উৎপাদনে নিয়োজিত ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের দ্বিতীয় স্পিনিং কারখানা। ২০০৮ সাল থেকে উচ্চ উৎপাদন দক্ষতাবিশিষ্ট এ কারখানায় সর্বোচ্চ মানের সুতা তৈরি হচ্ছে সাফল্যের সঙ্গে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বদর স্পিনিং মিলস লিমিটেড প্রতিদিন ১৫ টন সুতা উৎপাদন করছে। কারখানাটির ৫০টি মেশিনে ছয় শতাধিক কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।

ব্লু প্ল্যানেট নিট কম্পোজিট লিমিটেড হলো একটি নিট কম্পোজিট ফ্যাক্টরি, যা এক জায়গায় নিটিং, ডায়িং, ফিনিশিং, অল ওভার প্রিন্টিং, গার্মেন্টস ডায়িং, ওয়াশিং ও ইয়ার্ন ডাইংয়ের সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কারখানাটি শ্রীপুরের বড়টোপাতে ২০২১ সালে চালু করা হয়। এটি নির্মাণে ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপ বিনিয়োগ করেছে ৮২০ কোটি টাকা। কারখানার মোট আয়তন ২৯ দশমিক ১০ একর এবং এখানে ২০০টির বেশি মেশিনে ১০৫০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন। কারখানাটির বার্ষিক রেভিনিউর পরিমাণ ১০১৫ কোটি টাকা। এই কারখানা পাঁচটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। সেগুলো হলো নিটিং (বুনন), ডায়িং (সুতা ও কাপড়ের রং), ফিনিশিং, অল ওভার প্রিন্টিং (এওপি) এবং গার্মেন্ট ডায়িং ও ওয়াশিং। এর বিভিন্ন বিভাগের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হলো ফ্যাব্রিকস ডায়িং ১৮৯০৬ টন, ফ্যাব্রিকস নিটিং ৫৬৩৮ টন, এওপি ৮০৯ টন, গার্মেন্টস ওয়াশিং ৩৩৪৯ টন ও ইয়ার্ন ডায়িং ১২০৭ টন। পরবর্তী ধাপে এ কারখানায় অ্যাকসেসরিজ এবং ট্রিম, টেবিল প্রিন্টিং, এমব্রয়ডারি ইত্যাদি বিভাগও যুক্ত হতে চলেছে।

ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরো পরিপক্ব হয়ে ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের উদ্যোক্তারা নিজেদের দ্বিতীয় গার্মেন্টস কারখানা ব্লু প্ল্যানেট ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেড চালু করেন। এ কারখানা নির্মাণ করা হয়েছিল লঞ্জারি বা সিনথেটিক আন্ডারগার্মেন্টস পণ্য তৈরির জন্য। কারখানাটি ২০১৭ সালে গাজীপুরের মাওনায় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা বিনিয়োগে ৫০ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে স্থাপন করা হয়। এখানে ২৫৮০ জন শ্রমিক বার্ষিক ১ কোটি ৩৭ লাখ পিস লঞ্জারি ও বক্সার উৎপাদন করছেন। তাদের বার্ষিক টার্নওভারের পরিমাণ আড়াইশ কোটি টাকা। এটি মূলত শতভাগ রফতানিমুখী একটি কারখানা। অভিজ্ঞতার মিশেলে চালু হওয়ায় লঞ্জারি কারখানাটি খুব দ্রুতই ব্রেক ইভেনে পৌঁছে গিয়ে ব্যবসায় লাভের মুখ দেখেন উদ্যোক্তারা।

কালার অ্যান্ড কোং ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের অ্যাক্টিভওয়্যার সেকশনের নাম, যার সহযোগী সংস্থা হিসেবে রয়েছে গ্রুপের নিটওয়্যার ও ফ্যাশনওয়্যার বিভাগ। প্রায় তিন লাখ বর্গফুট আয়তনের এ ফ্যাসিলিটি ২০২২ সালে কার্যক্রম শুরু করে। প্রায় ৪৮০০ মানুষ কাজ করছেন মাসিক ২৭ লাখ পিস উৎপাদন সক্ষমতার এ কারখানায়। ১৮০০ মেশিনবিশিষ্ট এ কারখানার বার্ষিক রেভিনিউর পরিমাণ ৮৪ মিলিয়ন ডলার। এ কারখানায় অ্যাক্টিভওয়্যার, স্পোর্টস ব্রা, ট্র্যাকসুট ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি করা হচ্ছে।

এছাড়া ব্লু প্ল্যানেটের একটি আনুষঙ্গিক (লেবেল, কলার ট্যাগ ইত্যাদি) উৎপাদনের কারখানা রয়েছে ব্লু প্ল্যানেট অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড নামে। এ কারখানার বার্ষিক রেভিনিউর পরিমাণ ৪০ লাখ ডলার এবং উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ১০ লাখ পিস। কারখানাটিতে ১৩৯টি মেশিনে ১৬০ কর্মী কাজ করছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবতা হলো পোশাক খাতের রফতানি ও উৎপাদনের ওপর দেশের অর্থনীতি এতটাই নির্ভরশীল যে তা সহজে পরিবর্তন হয়ে অন্য কোনো খাতের সহায়তা নেয়া সম্ভব নয়। আর তাই এ খাতের ব্যবসায়ী ও কারখানাগুলোর সম্প্রসারণের সুবিধার্থে জ্বালানি খরচ কমানো, ইনসেনটিভ প্রদান ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের সুদৃষ্টি আশা করেন ব্লু প্ল্যানেট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পোশাক খাতের মোট আয় বৃদ্ধির প্রতিও আশাবাদী ব্লু প্ল্যানেট কর্তৃপক্ষ।