১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ফকির অ্যাপারেলস নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত। ফকির এন্টারপ্রাইজের শিকড় বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ১৯৬০-এর দশকে, যখন মূল প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ ইউসুফ আলী ফকির এ শিল্পে প্রবেশের জন্য প্রথম পদক্ষেপ নেন এবং টেক্সটাইল খাতের কাঁচামাল ও কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। সেই সময়ে সংগৃহীত কয়েক দশকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ফল হিসেবে যাত্রা শুরু করে ফকির গ্রুপ। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় নাম ফকির অ্যাপারেলস লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফকির অ্যাপারেলস প্রতি বছর প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ফকিরের সম্পূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়া (নিট উৎপাদন থেকে কাপড় বুনন হয়ে সরবরাহ পর্যন্ত) একই জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত হয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। কারখানার মোট জনবলের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার, যার মাঝে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ১৩:৭।

ফকির অ্যাপারেলসের সেলাই বিভাগে (নিট ইউনিট) ১৪০টি সেলাই লাইন রয়েছে, যা প্রতি বছর ১৫০ মিলিয়ন পিসের বেশি নিট গার্মেন্টস তৈরি করে। এ উৎপাদনকে কাঁচামাল সরবরাহ করার জন্য খাড়াভাবে যুক্ত টেক্সটাইল মিল রয়েছে ফকিরের, যার দৈনিক ফ্যাব্রিক উৎপাদনক্ষমতা ৫৫ টন। সেলাই ইউনিটসহ অন্যান্য বিভিন্ন কারখানা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়া হলো।

টেক্সটাইল প্লান্ট: ফকিরের টেক্সটাইল প্লান্টটি দৈনিক ৪৫ টন ফিনিশড ফ্যাব্রিক উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। এখানকার উৎপাদিত পণ্য ফ্লিস, টেরি, রিবস ও মিশ্রিত কাপড়ের বাজারে শীর্ষস্থানীয়। অটো-স্ট্রাইপ, পিক, রিবস ও অন্যান্য বিভিন্ন মিশ্রণের মতো বিশেষায়িত কাপড় তৈরির লক্ষ্যে ইউরোপ, জাপান ও তাইওয়ান থেকে এখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে। ডাইং প্লান্টটি গ্রিস থেকে আমদানি করা তৃতীয় প্রজন্মের অত্যাধুনিক পানিসাশ্রয়ী ডাইং মেশিন দিয়ে সজ্জিত। কারখানার যন্ত্রপাতিগুলো সেডোমাস্টার দ্বারা সংযুক্ত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। সেডোমাস্টার একটি অত্যাধুনিক সফটওয়্যার, যার মাধ্যমে ফিনিশড কাপড়ের গুণমান নিশ্চিত করা হয়৷। সুইডেনভিত্তিক সংস্থা সুইডেন টেক্সটাইল ওয়াটার ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে একটি যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে ফকির অ্যাপারেলস তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পানির পরিমাণ প্রায় ৬৭ শতাংশ কমানোর ব্যবস্থা করেছে।

উভেন (বুনন) ইউনিট: ফকিরের বুনন পোশাকের (উভেন গার্মেন্টস) উৎপাদন শুরু হয় ২০১৮ সালে। এ কারখানা থেকে ওয়াশড বটম (শরীরের নিচের অংশে পরার পোশাক), সুইম শর্টস, প্যাডেড জ্যাকেট থেকে শুরু করে ভারী এবং প্রযুক্তিভিত্তিক আউটারওয়্যার জ্যাকেট, কোট, অত্যাধুনিক স্পোর্টসওয়্যার ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ করা হয়। এ কারখানার কিছু বিশেষ সরঞ্জাম হলো টেমপ্লেট কুইল্টিং মেশিন, ডাউন ফিলার মেশিন ও সিম সিল মেশিন। উভেন কারখানার ইউনিটে বর্তমানে ২৮টি সেলাই লাইন রয়েছে, যা বার্ষিক ২০ লাখ ইউনিটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতাবিশিষ্ট। এ কারখানা থেকে আন্তর্জাতিক বেশকিছু ব্র্যান্ডের পণ্য তৈরি হয়, যার মাঝে রয়েছে সিঅ্যান্ডএ, সিলিও, এলসি ওয়াইকিকি, এলপিপি, সিওএস ও গ্যারি ওয়েবার।

ফকির অ্যাপারেলসের উভেন কাপড় ডিজাইন টিমটি যুক্তরাজ্য থেকে কাজ করছে। এ টিম চীনে অবস্থিত সোর্সিং হাবের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাহকদের জন্য নতুন ডিজাইনের পণ্য উদ্ভাবনে কাজ করছে। কারখানাটি চালু করার পর প্রথম বছরে ১৫ লাখ ইউনিট রফতানি করতে সক্ষম হয়।

ওয়াশিং প্লান্ট: ওয়াশিং প্লান্টটি প্রতিদিন ২৬ হাজার পিস কাপড় ওয়াশিং ক্ষমতাসম্পন্ন। এখানে বিভিন্ন ধরনের ওয়াশিং সুবিধা রয়েছে। যেমন গার্মেন্টস সিলিকন ওয়াশ, গার্মেন্টস এনজাইম ওয়াশ, গার্মেন্টস বার্নআউট ওয়াশ, ইন্ডিগো গার্মেন্টস হেভি ওয়াশ, গার্মেন্টস ক্রিঙ্কল ওয়াশ, গার্মেন্টস পিগমেন্ট ডাইং, গার্মেন্টস নিয়ন ডাইং, গার্মেন্টস কুল পিগমেন্ট ডাইং, গার্মেন্টস ডাইরেক্ট ডাইং, অ্যাসিড ডি ওয়াশ ইত্যাদি।

বর্জ্য পানি শোধন প্রক্রিয়া: কারখানায় উৎপন্ন বর্জ্য পানি নিজস্ব বায়ো ইটিপি প্লান্টের মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। বর্জ্য পরিশোধন পদ্ধতিটি H&M দ্বারা অনুমোদিত গ্রিন ইটিপি সার্টিফায়েড। ফকিরের কারখানায় উৎপন্ন দূষিত পানি থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক দূর করার জন্য ইটিপি ও ডব্লিউটিপি সুবিধা কারখানার খোলা জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে।

নিট সেলাই প্লান্ট: ফকিরের সেলাই প্লান্টগুলোয় কাপড় কাটা থেকে প্যাকিং পর্যন্ত সম্পূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করা হয়। শিল্প খাতে ব্যবহারোপযোগী অত্যাধুনিক সফটওয়্যার FASTREACT দিয়ে সজ্জিত পুরো অপারেশন। ১৩৯টি সেলাই লাইনের পাশাপাশি ফকির অ্যাপারেলস বাংলাদেশের প্রথম কারখানা, যেখানে মেকানিক্যাল ওয়ান পিস ফ্লো কনভেয়র বেল্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে।

প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারি প্লান্ট: প্রিন্টিং ইউনিটের কাপড় প্রিন্ট করার ক্ষমতা দৈনিক ১ লাখ ৩০ হাজার ইউনিট। এ ইউনিটে মূলত পিগমেন্ট প্রিন্ট, রাবার প্রিন্ট, ফয়েল প্রিন্ট, ফ্লক প্রিন্ট, পাফ প্রিন্ট, মেটালিক প্রিন্ট, হাই ডেনসিটি প্রিন্ট, ডিসচার্জ প্রিন্ট, গ্লিটার প্রিন্ট, সিলিকন প্রিন্ট ও ফটো প্রিন্ট করার ব্যবস্থা রয়েছে। কারখানার এমব্রয়ডারি ইউনিটের ক্ষমতা দৈনিক ১৮ হাজার ইউনিট যা ফ্ল্যাট এমব্রয়ডারি, কালার সিকোয়েন্স এমব্রয়ডারি এবং ছয় রংবিশিষ্ট শেনিল এমব্রয়ডারির মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়।

উল্লিখিত ইউনিটগুলো ছাড়াও ফকির অ্যাপারেলসের রয়েছে নিজস্ব টেস্টিং ল্যাব, যা ইতালির ব্র্যাচি টেস্টিং ল্যাবের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত কাপড় ও কাপড়ের রাসায়নিক উপাদান নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছে।

ফকির গ্রুপের পণ্য বর্তমানে রফতানি হচ্ছে বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশে। যার মধ্যে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রধান আন্তর্জাতিক রফতানি বাজার। উন্নতমানের স্পোর্টসওয়্যার উৎপাদনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম কারখানা হিসেবে আইএসপিও পুরস্কার পেয়েছে ফকির অ্যাপারেলস। উভেন কারখানায় উৎপাদিত ক্যালর জ্যাকেট নামের বিশেষ জ্যাকেটটির জন্য মূলত এ সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয় ফকির অ্যাপারেলস।