১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাবনার এক হিন্দু ওষুধ প্রস্তুতকারক ভারতে চলে যান। তিনি ছোট্ট এক দোকানে ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরি করতেন। তার প্রস্থানের পর নতুন মালিক সেই দোকান থেকেই গড়ে তুললেন একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। এ দৃশ্য গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল তরুণ স্যামসন এইচ চৌধুরীকে। তার মনে প্রশ্ন জাগল, ‘যদি একটি সাধারণ দোকান থেকে শিল্প গড়ে উঠতে পারে, তবে আমি কেন পারব না?’ এ উপলব্ধিই ছিল ভবিষ্যতের স্কয়ারের বীজ।

পাবনার নিভৃত শহরে একসময় ছোট্ট এক টিনশেড ঘরেই শুরু হয়েছিল সে অনন্য যাত্রা। ১৯৫০-এর দশকে ওষুধ শিল্প তখন অচেনা এক দিগন্ত; হাতে ছিল সামান্য মূলধন, বুক ভরা স্বপ্ন। স্যামসন এইচ চৌধুরী সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে খুঁজে নিলেন সঙ্গী—তার কাছের বন্ধু ডা. কাজী হারুনুর রশিদ, ডা. পিকে সাহা ও রাধা বিনোদ রায়কে। শুরুতে স্যামসনের পাশে দাঁড়ান ডা. কাজী হারুনুর রশিদ। প্রতি সপ্তাহে রবি ও বুধবার আতাইকুলার হাটবারে দোকানে এসে বসতেন তিনি। আলোচনা হতো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। পরে যুক্ত হন ডা. পিকে সাহা ও রাধা বিনোদ রায়। চারজন মিলেই দাঁড় করান নতুন প্রতিষ্ঠান। চারজনের বিনিয়োগ বলে নামকরণ করা হয় স্কয়ার, যার নেতৃত্বে ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী।

শুরুতে মূলধন ছিল মাত্র ১৭ হাজার টাকা। সেই টাকায় পাবনা শহরের একটি টিনশেড ঘর ভাড়া নেয়া হলো। সেটিই রূপ নিল প্রথম কারখানায়। নিয়োগ দেয়া হলো মাত্র ১২ জন শ্রমিক। প্রথম উৎপাদিত ওষুধ ছিল রক্তপরিশোধক ‘ইস্টন সিরাপ’। বাজারে আনলেও প্রথম তিন বছর লাভের মুখ দেখা গেল না। বরং বারবার অতিরিক্ত পুঁজি ঢালতে হলো। তৃতীয় বছর শেষে বিনিয়োগ দাঁড়াল ৮০ হাজার টাকায়। তবু তারা হার মানেনি। চতুর্থ বছরে যখন প্রথম লাভ এল, তখনই বুঝলেন এ যাত্রা আর থামবে না। ১৯৬২ সালে ঢাকার হাটখোলায় খোলা হলো শাখা অফিস। ১৯৬৪ সালে স্কয়ার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপ নেয়। অনুমোদিত মূলধন দাঁড়াল ৫ লাখ টাকায়, পরিশোধিত মূলধন ৪ লাখ।

তবে প্রকৃত টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৭৪ সালে। তখন স্কয়ার বেলজিয়ামের জানসেন ফার্মাসিউটিকার লাইসেন্স পায়। জনসন অ্যান্ড জনসনের এ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্কয়ারকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেয়। আধুনিক কারখানা গড়ে তোলা হয়, ওষুধ উৎপাদন শুরু হয় নতুন মানদণ্ডে। বাজারে আসে ডায়রিয়ার ওষুধ ভিরমক্স ও ইমোডিয়াম। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

১৯৮২ সালের ড্রাগ পলিসি স্কয়ারের জন্য হয়ে দাঁড়াল বড় আশীর্বাদ। এ নীতি বহুজাতিক কোম্পানির উৎপাদন সীমিত করে দেয়, যাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে স্কয়ার মাত্র তিন বছরের মধ্যে বাজারে শীর্ষে চলে আসে। ১৯৮৫ সালে তারা হয়ে ওঠে দেশের সেরা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। মাত্র দুই বছর পর, ১৯৮৭ সালে, তারা ইতিহাস গড়ে—প্রথম বাংলাদেশী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি হিসেবে বিদেশে ওষুধ রফতানি করে।

১৯৯১ সালে স্কয়ার শেয়ারবাজারে এলে মানুষ দেখাল অকুণ্ঠ আস্থা। ১০০ টাকার শেয়ারের জন্য লোকজন ৯০০ টাকা পর্যন্ত দিতে দ্বিধা করেনি। এটি ছিল শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। শুরু হয় এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) উৎপাদন, যা বাংলাদেশের শিল্পকে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে সাহায্য করে।

১৯৯৭ সালে স্কয়ার পায় জাতীয় রফতানি ট্রফি। ১৯৯৮ সালে অর্জন করে আন্তর্জাতিক মানের আইএসও ৯০০১ সার্টিফিকেশন। আর ২০১০ সালে ডেইলি স্টার ও ডিএইচএল তাদের দেয় বেস্ট এন্টারপ্রাইজ খেতাব।

টিনশেড ঘরে জ্বলা প্রদীপ থেকেই যে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল, তা আর নেভেনি। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগই রূপ নিয়েছিল এক শিল্পবিপ্লবে, গড়ে তুলেছিল এক প্রতীক। আজ স্কয়ার শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; বাংলাদেশের শিল্পায়নের অবিচল মানচিত্র। স্যামসন এইচ চৌধুরী দেখিয়ে গেছেন, স্বপ্ন যদি হয় নির্মল আর দৃষ্টি যদি হয় সৎ, তবে সামান্যও একদিন মহীরুহ হয়ে ওঠে।