অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি একেক দেশে একেক রকম। তার পরও বর্তমানের সার্বিক পরিস্থিতিকে বিবেচনা করতে গেলে বলতে হয়; আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছি, যখন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি— দুটোরই হার কমেছে। এর বিপরীতে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ পদ্ধতির অকার্যকারিতা বেড়েছে। একই সঙ্গে আরো ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক রাজনীতি।
সদ্য শেষ হওয়া ২০১৬ সালেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আটকে গেছে পাঁচ বছরের গড় হারেরও নিচে, এ ধারা বজায় থাকতে পারে চলতি বছরেও।
বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট নয়। এ নিয়ে আলোচনায় বিদগ্ধজনের ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ওঠার বিষয়টিও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের এও মনে রাখতে হবে, পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারত। ‘গ্লাসের অর্ধেক জলে পূর্ণ’ গোছের মনমানসিকতার লোকদের মতো আমাদের হাতেও সান্ত্বনা পাওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ মজুদ রয়েছে। কারণ বতর্মান বিজনেস সাইকেল অস্বাভাবিক রকমের দীর্ঘ হয়ে উঠেছে, এটা যেমন ঠিক। একই সঙ্গে এটাও ঠিক, এ মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা ধরতে গেলে একেবারেই অনুপস্থিত।
প্রবৃদ্ধির গতির এ দুরবস্থার কারণ খোঁজার আগে আমাদের কিছু বিষয় লক্ষ করা জরুরি। যেমন, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির নিম্নগতির প্রভাব পড়েছে সামান্যই। অন্তত বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার সময়কার মতো তো নয়ই। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশগুলো যে এগিয়ে রয়েছে, তা বলা যায় না ঠিকই। তার পরও স্বাভাবিক প্রবণতার কাছাকাছি অবস্থানেই রয়েছে এসব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখিতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোসহ (ব্রিকস) তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকায়। দেখা যাচ্ছে, উদীয়মান বাজারগুলোর গ্রোথ প্রিমিয়াম (উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাড়তি প্রবৃদ্ধির হার) ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ শতাংশে উঠে দাঁড়ায়। ২০১০ সালের মধ্যে তা নেমে আসে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০১৬ সালে এসে এর প্রাক্কলিত হার দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশেরও নিচে। পরিবর্তনটা অনেক বড়। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর এ সার্বিক দুরবস্থায় ভূমিকা রেখেছে ব্রাজিল ও রাশিয়ার মন্দা। ২০১৬ সালে দেশ দুটির মন্দা পরিস্থিতি ঠেকে একেবারে তলানিতে। সহসাই এ পরিস্থিতি বদল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সব মিলিয়ে দেখতে গেলে সম্মিলিতভাবে আমাদের সবার প্রবৃদ্ধিই ধীর হয়ে এসেছে। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ শ্লথতার মাত্রা আরো বেশি।
কীসে বাধা পাচ্ছে প্রবৃদ্ধি?
দেশভেদে পরিস্থিতির ভিন্নতা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসার প্রধান তিনটি কারণ হলো— প্রতিকূল জনমিতি (ডেমোগ্রাফিকস), উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও বিশ্বায়নের ধীরগতি। কারণ তিনটি বিভিন্ন অর্থনীতির ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেললেও, মোটামুটি সবখানেই এগুলোর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
এত দিন পর্যন্ত জনমিতির প্রতিকূলতাকে শুধু উন্নত বিশ্বের সমস্যা বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই জাপানের জনসংখ্যা হ্রাসের কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বেবি বুমার প্রজন্মের বয়স বাড়ার কথা। কিন্তু এসব সমস্যাকে অনেকটাই ধোঁয়াশাময় করে রেখেছে কম খরচে উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে চীনের সফলতা। যদিও জনমিতির দিক থেকে চীন নিজেও এক নতুন সমস্যার মুখে। ২০০৩ সালে চীনের কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ হারে। এ হ্রাসবৃদ্ধি ২০১৫ সালে নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোটায়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৬ সালে তা সীমিত আকারে হ্রাস পেয়েছে।
ধরে নেয়া যাক, শ্রমের সহজলভ্যতার সঙ্গে উৎপাদন সম্ভাবনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে বর্তমানে জনমিতি পরিস্থিতি কিছুটা ‘টলটলায়মান’। এখন যদি আমরা বিষয়টিকে ‘গ্লাসের অর্ধেক পূর্ণ’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে যাই; সেক্ষেত্রে বলতে হয়, ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সমান হারেই চীনের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পাবে। অর্থাৎ সান্ত্বনার বিষয় হলো পরিস্থিতি কোনোভাবেই এখনকার চেয়ে খারাপ হবে না।
এবার আসা যাক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির শ্লথতার দ্বিতীয় কারণ অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা হ্রাস নিয়ে আলোচনায়। একে তো কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে; এর ওপর যারা কর্মক্ষম, তাদের উৎপাদনশীলতাও কমে এসেছে। অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এর মাপকাঠি নিয়ে যেহেতু অনেক বিতর্ক রয়েছে, কর্মক্ষমদের উৎপাদনশীলতার অবস্থা বুঝতে গেলে শুধু জিডিপির প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের সহায়তা নিলেই হবে। মোট জিডিপিকে কর্মীর সংখ্যা দিয়ে ভাগ দিলেই, উৎপাদনশীলতা পরিস্থিতি নিয়ে মোটামুটি একটি ধারণা পাওয়া যাবে।
এটুকু বোঝা যায়, অর্থনীতির নিম্নগামিতা মোটামুটি সবখানেই দেখা গেছে। এক্ষেত্রে ইউরোপের বিষয়টি একটু কৌতূহলোদ্দীপক। এখানকার উৎপাদনশীলতার নিম্নমুখী ধারায় ছেদ পড়ার মোটামুটি একটা ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও; তা যে সহসাই ঘটবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
তবে কিছু কিছু আশাবাদী বিশ্লেষণ বলছে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মতো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন (ইলেকট্রিসিটি, বাষ্পীয় ইঞ্জিন বা কম্পিউটার আবিষ্কার) যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখান থেকে তা হয়তো বাড়ানো যাবে সামান্যই।
অন্যদিকে আরেকটু আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারীদের বক্তব্য হলো, প্রযুক্তিগত সাম্প্রতিক উন্নয়ন অর্থনীতির এমন কিছু কার্যক্রমের সূচনা করেছে, ব্যষ্টিক অর্থনীতির কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে যার গভীরতা মাপা সম্ভব নয়। এসব পরিসংখ্যানের মাপকাঠি তো তৈরি হয়েছিল শিল্পায়নের সদ্যসাবেক যুগের জন্য, যা আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু এ যুক্তির মধ্য দিয়ে আমরা সম্ভবত জিডিপির গুরুত্বকে একটু কমই মূল্যায়িত করছি। উৎপাদনশীলতার নিম্নগতির মূল কারণটা সম্ভবত অন্য কোথাও।
সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক একীভূতকরণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোথাও কোথাও এখন তা হয়ে পড়েছে উল্টোরথের যাত্রী। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন থেকে শুরু করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের অন্তর্ভুক্তি পর্যন্ত সর্বশেষ ২৫ বছরের রাজনৈতিক ঘটনাবলি বলছে, এ সময় বৈশ্বিক অর্থনীতির মূলধারায় এসব অঞ্চলের অন্তর্ভুক্তি হয়েছে পূর্ণ গতিতে। আর এ অন্তর্ভুক্তির ঘটনাটি ঘটেছে প্রধানত বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে। এছাড়া আরো বিভিন্ন মাধ্যম তো ছিলই। ১৯৯০-২০০৮ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পর্যায়ে মোট বাণিজ্যের বিপরীতে সম্মিলিত জিডিপির অনুপাত প্রায় ১০ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছিল রেকর্ড ২৫ শতাংশে। ২০০৯ সালের মহামন্দার মাঝামাঝি এসে এ অনুপাত কমতে শুরু করে। এর পর আবার কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার কমতে শুরু করেছে। অর্থাৎ ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়কে অতিক্রমের বদলে, আমরা সেখান থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি।
আমাদের এ আলোচনা থেকে এটুকু বোঝা যায়; অর্থনীতির চক্রাকারে আবর্তনশীলতায় নয়, মূল সমস্যাটা হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয়। কিন্তু এসব সমস্যা মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে কাঠামোর চেয়ে আবর্তনশীলতারই সম্পর্ক বেশি। বিশেষ করে মুদ্রানীতির মাধ্যমে সমস্যা মোকাবেলার ক্ষেত্রে দেখা যায়; একে তো এ ধরনের পদক্ষেপ অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে, তার ওপর উৎপাদনশীলতা হ্রাসেও বড় ভূমিকা রাখছে। ঋণাত্মক সুদহার সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে সত্যি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ‘লাভজনক সঞ্চয় বা ঋণগ্রহণের ব্যয়সংকুলতার’ (সঞ্চয় ও ঋণের সুদ) মতো সাধারণ অর্থনৈতিক ধারণার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।
তবে কিছুটা পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির উপযোগী আর্থিক নীতি গ্রহণ ও মূল্য সংকোচনের ধারা ভঙ্গের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রবৃদ্ধি হারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস নিচ্ছে। পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে আনছে কিছু দেশের নির্বাচনের ফলাফল সম্ভাবনাও। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে হয়তো ২০১৭-১৮ সালের মধ্যেই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হারের গতিতে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখিতা দেখতে পাব আমরা।
এছাড়া প্রকৃতির মতো অর্থনীতিও নিজেই নিজের চিকিত্সার ক্ষমতা রাখে। যদিও এখানেও সেরে ওঠার মাত্রা কম। দীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথাই বলা যাক। এখানকার পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতির ফিলিপস কার্ভ (বেকারত্বের নিম্নহারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক নির্দেশক) ধারণাটিও বেশ সমালোচনার শিকার হয়েছে। কারণ এখানে বেকারত্বের হার কমা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি হয়েছে সামান্যই। কিন্তু একে একেবারে উড়িয়েও দেয়া যায় না। কারণ অর্থনীতির স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী, জোগান (এক্ষেত্রে শ্রম) হ্রাস পেলে, মূল্য বাড়ে (এক্ষেত্রে মজুরি) এবং মজুরি বৃদ্ধির ধারাবাহিতায় সামষ্টিক চাহিদাও বেড়ে যাওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে জনগণের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যেরও মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার কথা, যার প্রতিক্রিয়ায় উৎপাদনকারীরাও বাজারে পণ্যের জোগান বাড়িয়ে দেবেন। এভাবেই চলে অর্থনীতির চক্রাকারে আবর্তন।
বর্তমান যুগে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে অর্থনীতির বিভিন্ন তত্ত্ব ও মডেল। বর্তমান পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমানের কাজ হলো, ধৈর্যধারণ ও অর্থনীতিকে নিজের গতিতেই সুস্থ হয়ে ওঠার সময় দেয়া। সেক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের ‘সৃজনশীল’ মুদ্রানীতির মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করার লোভকে সামাল দিতেই হবে। না হলে এতে শুধু বিশৃঙ্খলাই বাড়বে।
লেখক: স্টেট স্ট্রিট গ্লোবাল অ্যাডভাইজর্সের সিনিয়র ইকোনমিস্ট
ভালব ম্যাগজিন থেকে ভাষান্তর সাইফ বাপ্পী






