সদ্যবিদায়ী ২০১৬ সালে সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে অনেক অপ্রত্যাশিত বিষয় দেখেছে বিশ্বের আর্থিক বাজার। আর্থিক গণমাধ্যমের পাতাজুড়ে সারা বছরই দেখা যাচ্ছিল নানা মুনির নানা মত, যেখানে এসব ঘটনার ফল বাজারের জন্য ভালো হবে না বলেই মনে করছিলেন সিংহভাগ বিশ্লেষক। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগের সিদ্ধান্ত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়, চীনের অর্থনীতিতে শ্লথগতির মতো ইভেন্টগুলো শেয়ারবাজারের জন্য আপাত দুঃসংবাদমাত্র। এক ব্রিটিশ পাউন্ড ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধাক্কা সামলে এগিয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট বাজার।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাব্য গতিধারা সবকিছুকে ছাপিয়ে বিশ্লেষণ ও আলোচনায় উঠে এসেছে কমোডিটি বাজারের পুনরুদ্ধারপর্ব। গেল বছরে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের আরেকটি আচরণ ছিল উল্লেখ করার মতো। দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা উন্নত ও বিকাশমান বাজারের মধ্যে শ্রেণীবিভাগের চেয়ে সুনির্দিষ্ট অর্থনীতির প্রতি বেশি মনোযোগী ছিলেন। এদিকে নিজ অর্থনীতির ব্যাপারে নীতিগত অবস্থানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান দূরত্বও পর্যবেক্ষণ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের চোখে, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফ্রন্টে ২০১৬ সালের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগের সিদ্ধান্ত। পারস্পরিক স্বার্থে একই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাজার একীভূত করার দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন ব্রিটিশ ভোটাররা। জার্মানি, ফ্রান্সের মতো ইউরোপের অনেক দেশেই রক্ষণশীল রাজনীতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ইউরো মুদ্রার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো উদ্বেগ বাড়েনি। তবে সংরক্ষণবাদের আবেদন এ হারে বাড়তে থাকলে আগামীতে ইউরোপের একক বাজার ও মুদ্রার অস্তিত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তার সুযোগ আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলও বিনিয়োগকারীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। অর্থনীতির বৈশ্বিক সংযুক্তি ঝেড়ে ফেলে হলেও স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা। ব্রেক্সিট, ট্রাম্প দুটো ইস্যুতেই প্রথমে বিক্রয়চাপে পড়ে আর্থিক বাজার। গণভোটের পর ব্রিটিশ পাউন্ডের মান এক-চতুর্থাংশ কমে যায়। দরপতনে ছিল লন্ডনের শেয়ারবাজারও। তবে একঘরে অর্থনীতিও বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে— এমন বিশ্বাসের জোরে শেষ পর্যন্ত এফটিএসই সূচক বাড়ে।
রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে কট্টর সব মন্তব্য করে আলোচনায় উঠে আসা ট্রাম্পের বিজয়ের পরও এক দফা বিক্রয়চাপ গেছে বিশ্বের আর্থিক বাজারের ওপর দিয়ে। ঝুঁকি প্রশমনে ওয়াল স্ট্রিটেও অনেক পুঁজির নগদায়ন হয়। তবে সপ্তাহের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীরা হিসাব-নিকাশ করে ফেলেন, ট্রাম্প এখনো এত দুশ্চিন্তার কারণ নন। নির্বাচন-পরবর্তী দেড় মাসে কয়েকবারই উচ্চতার নতুন রেকর্ড গড়ে ওয়াল স্ট্রিটের সূচকগুলো।
রাজনৈতিক ফ্রন্টে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জিলমা হুসেফের চূড়ান্ত অভিশংসনও ছিল বিনিয়োগকারীদের একাংশের জন্য আলোচনার বিষয়বস্তু। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে নিছক ব্যক্তির পরিবর্তনে ব্রাজিলীয়রা বিশেষ কিছু আশা না করলেও নিজ নিজ হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে সেখানকার আর্থিক বাজারে বিনিয়োগ বাড়ানো কমানোর কাজ চালিয়ে গেছেন বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা।
২০০৮ পরবর্তী বৈশ্বিক বিনিয়োগপ্রবাহে উন্নত বিশ্বের আর্থিক বাজার আর বিকাশমান বাজারের যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছিল, গেল বছর তা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। বৈশ্বিক তহবিলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাজারের শ্রেণীবিভাগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে স্থানীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এ কারণে উন্নত বিশ্ব থেকে বিকাশমান বাজারে বিনিয়োগপ্রবাহ কিংবা এর উল্টো দিকমুখিতার মাত্রা গত ছয়-সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে।
এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক ফ্রন্টেই উন্নত-বিকাশমান এ বিবেচনাগুলো কিছুটা দুর্বল ছিল। পণ্যবাজার ঘুরে দাঁড়ানোয় কৃষিজ ও খনিজ কাঁচামাল বিক্রির ওপর নির্ভর করা দেশগুলো কিছুটা স্বস্তিতে ছিল। আর্থিক বাজারেও তাদের নিয়ে আশাবাদ বেড়েছে। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো নিজ নিজ সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়েছে। শ্রেণীভুক্তদের সমস্যা-সম্ভাবনায় সাদৃশ্য বিগত বছরগুলোর তুলনায় কমে এসেছে।
বছরের শেষ কার্যদিবসের মাঝামাঝি সময়ে দেখা গেল, এমএসসিআই সংকলিত ইমার্জিং মার্কেট ইনডেক্স ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে বারো মাসে ডাও জোনস সংকলিত ডেভেলপড মার্কেট ইনডাইসেস ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। গত এক বছরে বিশ্বের বিকাশমান বাজারগুলোয় নিট বিনিয়োগ অন্তঃপ্রবাহ ছিল ৬০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার গেছে ইটিএফের (এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড) মাধ্যমে।
গেল বছর বিকাশমান বাজারের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ভারত। এক বছরে সেখানকার শেয়ারবাজারে বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলগুলো ৩৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। তবে নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে বছরের শেষ দুই মাসে তারা ৩৬০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছে। সারা বছরে ভারতে অন্তত ৬৮০ কোটি ডলারের বন্ড বেচেছেন তারা। কিন্তু স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বাজারে এর প্রভাব পড়তে দেননি। গেল বছর ভারতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা ৫৪০ কোটি ডলারের শেয়ার এবং ৪৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বন্ড কিনেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিতে ক্রমবর্ধমান দূরত্বও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকরা। ব্যাংক অব জাপান তাদের মুদ্রানীতির ক্রমবর্ধমান শিথিলতা অব্যাহত রেখেছে। একই পথে আছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসিবি। তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ উল্টো পথে হাঁটছে। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০১৭ সালে ফেড সুদের হার অন্তত ৭৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়াবে। অর্থনীতি চাঙ্গা করতে তার প্রশাসন মুদ্রানীতির পরিবর্তে ফেডারেল বাজেটকেই ব্যবহার করবে। বাজারও বিশ্বাস করছে, অবকাঠামোয় সরকারের ব্যয়বৃদ্ধি ও বিভিন্ন স্ল্যাবে করহ্রাসের প্রভাবে জিডিপির উপাত্ত অন্তত খারাপ আসবে না।
এদিকে ২০১৭ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি আরো কমবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। ২০১৬ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কিন্তু বিকাশমান অর্থনীতির দেশটির জিডিপি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, ২০১৭ সালে যা ৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে। বাজারসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সেখানকার সরকার একদিকে অর্থনীতিকে নীতি সমর্থন দিয়ে যাবে, অন্যদিকে চলমান সংস্কারও অব্যাহত রাখবে। চীন প্রসঙ্গে তারা মনে রাখছেন, দেশটি একটি অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ ও রফতানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজ ভোক্তাদের শক্তিমত্তা পরীক্ষা করছে তারা। তবে ঋণের আধিক্য, সম্পত্তির বাজারে বাবল ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ ভুলে যাচ্ছেন না কেউই।
বিভিন্ন বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৭ সালে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের জন্য নিয়ামক হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দর, ট্রাম্পের নীতি ও খোদ ওয়াল স্ট্রিট।
লেখক: আইডিএফসি সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
দ্য ইকোনমিক টাইমস থেকে ভাষান্তর মাহফুজ উল্লাহ বাবু






