&dquote;স্টিফেনঠিক এক বছর আগে সুদহার বাড়িয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভ। নয় বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ওটাই ছিল সুদহার বৃদ্ধির প্রথম ঘটনা। এক বছর আগের মতো এবারো ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারকদের ডিসেম্বর বৈঠকে আশাবাদের আবহ বিরাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, আবারো ক্রমাগত বাড়িয়ে সুদহারকে স্বাভাবিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু এবার সামনে এগোতে ফেডারেল রিজার্ভকে কিছু বিষয়ে দুবার করে ভাবতে হচ্ছে। আসন্ন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কোন পথে এগোবে, সে কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নানা ঘটনার কথাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছে না।

জানুয়ারির প্রথমার্ধে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ সূচক ২০ শতাংশের বেশি পতন দেখেছিল। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে সূচকের এ পতন দ্রুত সংক্রমণের মতো অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছিল। এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হতে থাকেন। পরিস্থিতি সামলাতে চীন সরকার আবারো একটি অতিকায় প্রণোদনা কর্মসূচি সামনে এনেছিল। বছরের প্রথম ছয় মাসে চীন সরকার সে দেশের অর্থনীতিতে ১৪ লাখ কোটি ইউয়ান (২ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার) সঞ্চার করে। প্রণোদনার এ অর্থ চীনা বিশ্বের ৩৫ শতাংশের সমান।

অতিকায় এ প্রণোদনা চীনের পুঁজিবাজারের টালমাটাল তরীকে স্থিতিশীল করেছে। কিন্তু বিষয়টির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে অন্যত্র। চীনের আর্থিক ব্যবস্থায় ঋণের চাপ বেড়ে এখন জিডিপির আড়াই গুণ হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, চীনের অর্থনীতি এখনো দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের অনুগত রয়েছে। বাণিজ্য, শিল্পোৎপাদন, স্থিত বিনিয়োগসহ বেশকিছু সূচকে পতন হলেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি চীনা পিপলস কংগ্রেস নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারের মধ্যেই রয়েছে। সার্বিকভাবে চীন ২০১৬ সালটি ভালোভাবেই শেষ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নীতিনির্ধারকরা সুদহারকে আরো মাটির কাছাকাছি ধরে রাখার চেষ্টায় বছরের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। বেকারত্বের হার কমে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে, যা ২০০৭ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও ৩ শতাংশের উপরে উঠেছে।

গত জুনে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর মানে হলো, একমাত্র নিশ্চিত বিষয়টিই এবার অনিশ্চয়তার বড় উত্স হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, অর্থনীতির নতুন ঝুঁকিটি রাজনীতি থেকেই আসবে। উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে এক ধরনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও বিশ্বায়নবিরোধী হাওয়া বিরাজ করছে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) নেতিবাচক সুদহারের মতো ভীষণ শিথিল নীতি গ্রহণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপে মূল্যস্ফীতি নিচের দিকেই থাকবে এবং ইসিবির কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং কর্মসূচিও আপাতত বহাল থাকছে।

ইইউতে কর্মসংস্থানে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে। তবে মূল শিরোনামের আড়ালে কিছু বৈসাদৃশ্য ঢাকা পড়তে পারে। যেমন— জার্মানিতে বেকারত্বের হার ৪ শতাংশে নামলেও স্পেন ও গ্রিসে বেকারত্ব যথাক্রমে ১৯ ও ২৩ শতাংশ। ইউরোপজুড়ে তরুণ বেকারত্বও ২০ শতাংশের আশঙ্কাজনক স্তরে রয়ে গেছে।

উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক থিংকট্যাংক ওইসিডি বলেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। সরকারি বিনিয়োগ শ্লথ। বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পতন দেখা যাচ্ছে। এতে করে কর্মসংস্থান, শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও বেতন প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে।

ওইসিডি বলেছে, নিম্ন প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙে স্থায়ীভাবে বেরোতে হলে আর্থিক ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি সাধন করতে হবে। বর্তমানে এক্ষেত্রে ‘সাহস ও সামঞ্জস্যের অভাব’ রয়েছে বলে ওইসিডি মন্তব্য করেছে।

ওইসিডি মনে করছে, উন্নত দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ২ শতাংশে উন্নীত হবে। ওইসিডির বাইরের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি এর চেয়ে তেজি হবে বলে সংস্থাটি মনে করছে। ওইসিডি-বহির্ভূত দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

মুদ্রানীতি শিথিলতা থেকে সরে নতুন বিকল্প খোঁজাই ২০১৭ সালের বড় প্রপঞ্চ হতে পারে। কেননা সুদহার বড় জোর শূন্যের নিচে নামতে পারে আর কত নোট ছাপানো যাবে, তারও একটি সীমা রয়েছে। এবার বরং সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি ও কর ব্যবস্থাপনার মতো অন্য বিকল্পে জোর দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কথাই ভাবছেন। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তিনি অবকাঠামোয় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবেন। এছাড়া ধনী ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর কর হ্রাসেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন বছরে বিশ্ববাজারের সামনে রাজনৈতিক ঝুঁকির বেশির ভাগই ইউরোপে। ফেব্রুয়ারিতে জার্মানিতে প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচন। মার্চে নেদারল্যান্ডসের ভোটাররা ভোট দেবেন। এর এক মাস পর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটগ্রহণ হবে। সবক’টি ভোটই আসলে ইইউর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক ধরনের গণভোট।

ইউরোপজুড়ে সংরক্ষণবাদের যে জোয়ার, তার মূল কারণগুলো সহজে দূর হচ্ছে না। অসাম্য বেড়ে যাওয়া, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, বর্ণবাদী উত্তেজনা ও অভিবাসন পুরো মহাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সংরক্ষণবাদী আন্দোলনের প্রথম সারির মানুষ। আর্থিক স্বয়ম্ভরতার কথা বলছেন তিনি। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনেই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি বাতিলের কথাও বলছেন।

ইউরোপে নির্বাচন ও যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায়নের ফল যা-ই হোক না কেন, এটা নিশ্চিত যে, ২০১৭ হবে রূপান্তরের কাল। ওইসিডি যাকে ‘প্রবৃদ্ধির বৃত্ত’ বলেছে, সেই স্তিমিত অবস্থা থেকে বেরোনোর বছর ২০১৭। 

লেখক: সাংবাদিক

এবিসি ডটনেট ডটএইউ থেকে ভাষান্তর সাইদ হাসান