ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের ভোট এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়— বিশ্বায়ন নিয়ে উন্নত দেশগুলোর নাগরিকদের অসন্তোষের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। সঠিকভাবে অথবা ভুলভাবে তারা বিশ্বায়নকে দোষারোপ করছে অথবা কমপক্ষে আয়ের অচলাবস্থা নিরসন, বাড়তে থাকা বেকারত্ব ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলো বিশ্বায়ন যেভাবে সামলাচ্ছে, তা নিয়ে তারা মোটেই খুশি নয়।

অনেক আগ থেকেই উন্নয়শীল দেশগুলোর নাগরিকরা একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করে আসছে। যদিও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিশ্বায়ন অনেক সুযোগ বয়ে নিয়ে এসেছে, তবে অনেকেই এর ব্যবস্থাপনার নির্দেশদানকারী নব্য-উদারনীতিবাদী অর্থনীতি নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। নির্দিষ্ট করে বললে, কথিত ওয়াশিংটন কনসেনসাস, যা শৃঙ্খলামুক্ত উদারীকরণ ও বেসরকারীকরণের ডাক দিয়েছে এবং কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির প্রতি গুরুত্বারোপ করা সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিগুলোর ওপর জোর দিয়েছে তা সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক জ্ঞান পুনর্বিবেচনার সময় কি এসে গেছে?

সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিডা) মনে করছে, এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবার সময় এসেছে। তাই তারা বিশ্বের ১৩ জন অর্থনীতিবিদকে (লেখক থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাংকের সাবেক চার প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন) আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য।

আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে, প্রথাগত উন্নয়ন অর্থনীতির অন্তর্নিহিত কিছু আইডিয়া হয়তো প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে বিশ্ব যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হয়েছে, তার কয়েকটি তৈরি করতে সাহায্য করেছে। নির্দিষ্টভাবে বললে, এটি এখন প্রতীয়মান যে, শুধু রাজস্ব ভারসাম্য ধরে রাখা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ব্যবহার করার ওপর জোর দিয়ে বাকি কাজটা বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করবে না। এটা মনে রেখে, আমরা আটটি নীতি চিহ্নিত করেছি, যেগুলো উন্নয়ন নীতি তৈরিতে ব্যবহার করা উচিত।

প্রথমত. জিডিপি প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা হিসেবে ধরা উচিত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিষয়টি জরুরি, কেননা এটি মানবকল্যাণের বিভিন্ন দিক যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, টেকসই ভোগ, আবাসন, নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো জোরদার করতে যে সম্পদ প্রয়োজন, তা সরবরাহ করে।

দ্বিতীয়ত. অর্থনৈতিক নীতিকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রচার করতে হবে। উন্নয়ন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা না করে বরং নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে যে লিঙ্গ, জাতি বা অন্য কোনো সামাজিক নির্দেশক দ্বারা চিহ্নিত জনগোষ্ঠী যেন পেছনে পড়ে না থাকে। বেকারত্ব থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাগ্রহণ পর্যন্ত সব ধরনের বৈষম্য অবশ্যই নীতিনির্ধারকদের সামাল দিতে হবে। কারণ এ বৈষম্য গরিবদের চরম ক্ষতি করে।

নৈতিক অপরিহার্যতার বিষয়টি ছাড়াও এ ধরনের উদ্যোগ অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। কারণ অতিরিক্ত আয়বৈষম্য, সামাজিক নিপীড়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সহিংস দ্বন্দ্ব অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ের শোরগোল ফেলে দেয়া কিছু রাজনৈতিক ঘটনার পেছনে যেমন ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের বিজয়, অতিরিক্ত বৈষম্য বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছে।

তৃতীয়ত. পরিবেশগত ধারণক্ষমতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। জাতীয় পর্যায়ে আয় প্রবৃদ্ধি যা পরিবেশের ক্ষতি করার মাধ্যমে আসে, তা টেকসই হয় না এবং এজন্য এটি গ্রহণযোগ্য নয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন স্বাস্থ্য, জীবিকা ও আবাসনের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এটা এখন আবশ্যক যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ের উন্নয়ন নীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও নিরসন নীতিগুলোকে অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। এটা এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নেই। চতুর্থত. বাজার, রাষ্ট্র ও কমিউনিটির মধ্যে ভারসাম্য আনার প্রয়োজন রয়েছে। বাজার হচ্ছে মৌলিকভাবে সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সম্পদের অর্থনৈতিক বরাদ্দ সুষ্ঠুভাবে করার জন্য বাজারের নিয়মনীতির প্রয়োজন রয়েছে। গত ২৫ বছরে অবাধ বাজার প্রতি টান তৈরি হয়েছে, তা ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট, বৈষম্য ও অ-টেকসইতার অসমর্থনীয় মাত্রাসহ বর্তমান বিশ্বের অনেকগুলোর সমস্যা তৈরি করেছে।

বাজার ও বাজার নয়, এমন প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নিয়মনীতির জন্য রাষ্ট্র অপরিহার্য। রাষ্ট্র যেন দক্ষতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে, তা নিশ্চিতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চমত. সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নীতির নমনীয়তা দাবি করে। মাঝে মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রথাগত নীতি বাজেট ভারসাম্যের উপদেশ দেয়। আরো ভালো পদ্ধতি রাজস্ব ও বহির্ব্যালান্সকে মধ্যম মেয়াদি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখত। এ পথে আর্থিক প্রণোদনা যেমন সরকারি বিনিয়োগ ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে প্রাণ জোগাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে। এখানে যে কাজটা করতে হবে, তা হলো ভালো সময়ে সরকারি ঋণ ও মূল্যস্ফীতিজনিত চাপ দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেয়াকে নিশ্চিত করা।

ষষ্ঠত. প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রভাব বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দাবি করছে। সাম্প্রতিক সময়ের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করেছে, কোম্পানির আয় বাড়িয়েছে এবং এর হাত ধরে বৈষম্যের মাত্রাও বৃদ্ধি করেছে। আদতে অটোমেশনের কারণে কোম্পানিগুলোকে মজুরির ওপর কম ব্যয় করতে হচ্ছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বৃদ্ধি করেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে যা মৌলিকভাবে এটি ‘শ্রমিক বনাম মূলধন সমস্যা’ হলেও প্রায় এটিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে ‘শ্রমিক বনাম শ্রমিক সমস্যা’ হিসেবে, যেখানে কিছু উন্নত অর্থনীতি দাবি করছে যে, উন্নয়শীল দেশগুলো তাদের কর্মসংস্থান ছিনিয়ে নিচ্ছে। এটি মুক্তবাজার প্রত্যাহার করা ও সংরক্ষণবাদের ডাক দেয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। আমাদের এখন যেটা প্রয়োজন, তা হলো এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যা মানবসম্পদে বিনিয়োগ ও দক্ষতা বাড়াবে, যা প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে এর সম্পূরক হয়ে উঠবে এবং শ্রম আয় বৃদ্ধি করবে এবং একই সঙ্গে শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে এবং সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তাদের কথা বলার অধিকার শক্তিশালী করবে।

সপ্তমত. সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও মনোভাব অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করে। একটি সমাজ, যেখানে বসবাসরত নাগরিকরা একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তা অর্থনীতিতে ভালো করে অন্য সমাজের তুলনায় যেখানে এ বিশ্বাস অনুপস্থিত। সামাজিক আদর্শ ও মনোভাব দুর্নীতিরা লাগাম টেনে ধরতে এবং ন্যায্যচর্চায় উত্সাহ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য সুশীল সমাজ ও সরকারের উচিত সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও মনোভাবের প্রতি জোর দেয়া।

অষ্টমত. বৈশ্বিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। বৈশ্বিক শক্তি ও জাতীয় নীতি এমন বাহ্যিকতা তৈরি করছে, যা নীতিতে সুযোগ রাখার পথ ক্রমে বন্ধ করে দিচ্ছে। সম্ভবত এ বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় হলো, উদীয়মান দেশগুলো থেকে মূলধন প্রবেশ ও বহির্গমনের ওপর উন্নত দেশগুলোর মুদ্রানীতির প্রভাব। অন্যান্য উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে— অভিবাসন সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্য নীতি ও কর স্বগের্র নিয়মনীতি।

একমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পারে এ ধরনের নীতির কারণে সৃষ্ট এমন বাহ্যিকতাকে সামাল দিতে। এ সংস্থাগুলো যেন কার্যকর ও ন্যায্যভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিশ্চিতের সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হলো এসব সংস্থায় উন্নয়শীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব জোরদার করা।

২০১৬ সাল শেষ হয়েছে। তাই অর্থনীতির পুরনো পদ্ধতি, যেগুলো বেশ অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করছে এবং দ্বন্দ্ব আরো বৃদ্ধি করছে, সেগুলোরও ইতি ঘটা উচিত। উন্নত অর্থনৈতিক চিন্তার সঙ্গে মিলিতভাবে অতীতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমাদের সামনে এমন একটি চিত্র দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা থেকে আমরা বুঝতে পারব কোনটি কাজ করবে আর কোনটি করবে না। এখন বিশ্বের যে নতুন উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োজন, তার মূলে থাকা উচিত এ জ্ঞান।

 

স্বত্ব-প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

লেখক: বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ

ভাষান্তর আবু সাঈদ