২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষা খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে।

এ কথা সত্য যে স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে সক্ষম হইনি। তবে নিশ্চয়ই অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ার জন্য আমাদের আরো অনেক কাজ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি সম্মানিত শিক্ষকরা। মানসম্মত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় আধুনিক উপকরণ ভালো শিক্ষার পূর্বশর্ত, যে বিষয়ে আমাদের বেশ দুর্বলতা রয়েছে। যে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে জনশক্তি, সে দেশের শিক্ষার প্রতি আরো বেশি গুরুত্ব আরোপ করা আবশ্যক। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে, এখনো বহুমুখী পদ্ধতি রয়েছে। এসবের মধ্যে সমন্বয় করে কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো কার্যকরী করা যায় সে বিষয়ে কাজ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টাকে কতটা যথাযথ মনে করেন? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?

উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে আমাদের দেশে শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক ক্ষেত্রে যারা ছাত্র হিসেবে খুব ভালো নয় এবং কোনো ভালো চাকরি জোগাড় করতে ব্যর্থ তারাই শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেন। এ ধরনের কম মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে কোনো ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত শিক্ষার জন্য আরো বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও গবেষক প্রয়োজন।|আমার মতে, বাংলাদেশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।|যার প্রভাব পড়েছে উচ্চ শিক্ষার মান রক্ষার ক্ষেত্রে। যোগ্যতাসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ শিক্ষক পর্যাপ্ত না থাকা এবং এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য যথাযথ যোগ্য শিক্ষাবিদ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অতীতে ওইসব গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় ভিত্তিতে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের নিয়োগ শিক্ষা ব্যবস্থার আরো অবনতি লক্ষ করা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও ইনস্টিটিউট ডিরেক্টর পদে শিক্ষাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ গবেষণার কৃতিত্ব ও অভিজ্ঞতা থাকা অবশ্যক। একজন শিক্ষক কী কী প্রোগ্রাম তৈরি বা রিভিউ করেছেন এবং কী কী কোর্স উদ্ভাবন করেছেন সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে কী ধরনের ইনভেশন ও টেকনোলজি ব্যবহার করেছেন, সেগুলোয় গুরুত্ব দেয়া উচিত।|

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আলাপটি কয়েক বছর ধরে জোরদারভাবে উঠে আসছে। বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের কথা। এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পায়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যাকে ওয়ার্ক ইন্টিগ্রেটেড লার্নিং বা উইল বলা হয়। তার উদ্দেশ্য ছাত্র-ছাত্রীদের অধ্যয়নকালীন বাস্তব জগতের সঙ্গে পরিচিতি ঘটানো এবং নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে সহায়তা করা। ফলে পাঠক্রম শেষে তারা ওই শিল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পায় এবং তাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি করতে পারে। কর্মমুখী ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির জন্য শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে কারিকুলাম তৈরি করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ব্যাপ্তি ও মানোন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আগ্রহের ঘাটতির কথাটিও শোনা যাচ্ছে। এটা কতটা সত্য? অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনুপস্থিত। পরিস্থিতি বদলাতে কী করা যেতে পারে? আপনারা গবেষণাকে কতটা মনোযোগ দিচ্ছেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার জন্য উচ্চতর বেতন ভাতার কোনো বিকল্প নেই। ভালো শিক্ষকদের পেশায় ধরে রাখার জন্য তাদের গবেষণার পরিবেশ প্রদান করা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখা অবশ্যক। আমাদের দেশের শিক্ষার বাজেট ক্রমান্বয়ে ৫ শতাংশে উন্নত করা আবশ্যক।

বর্তমানে বাংলাদেশে শুধু পাবালিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার অনুমোদন রয়েছে। সেক্ষেত্রেও অনেক বেশি বিদ্যালয়ের দেয়া পিএইচডি ডিগ্রির মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। উচ্চ মানের ভালো প্রকাশনাসমৃদ্ধ সুপারভাইজার ছাড়া ভালো মানের পিএইচডি গ্র্যাজুয়েট উৎপাদন করা সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি ছাত্রদের সুপারভাইজ করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ও গবেষণায় অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সুনাম রয়েছে, তাদের পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করতে দেয়ার ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। যেসব প্যারামিটার র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে, সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে আমরা সহকর্মীদের গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিক্ষকদের পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণাকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। বিদেশী উচ্চ মানের জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য আমরা সহযোগিতা দিচ্ছি। এক্ষেত্রে স্কোপাস ইনডেক্স বা কি ওয়ান জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলে আমরা সহকর্মীদের আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকি। এছাড়া আমরা প্রকাশনা খরচ হিসেবে ভালো মানের বিদেশী জার্নালের প্রকাশনা ফ্রি প্রদান করি। আমরা প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে এম্পেরিকাল রিসার্চ করার জন্য বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি এবং এ ব্যাপারে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। আমরা নিয়মিত সাপ্তাহিক গবেষণা সেমিনারের আয়োজন করছি। সম্প্রতি আমরা রিসার্চ ইকোসিস্টেম ফর সাকসেসফুল ইউনিভার্সিটি ও রাইটিং জার্নাল আর্টিকেলস অ্যান্ড পাবলিশিং ইন ইন্টারন্যাশনাল জার্নালস অ্যান্ড ক্রিয়েটিং বিষয়ে ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছি। আমাদের সহকর্মীদের গবেষণার জন্য আর্থিক অনুদান প্রদান করা, কোলাবরেশনের জন্য উৎসাহিত করা, রিসার্চ মেথড ও ডিজাইনের পরে সেমিনার উপস্থাপন করা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ গ্রান্ট পাওয়ার জন্য আবেদন করার ব্যাপারে উৎসাহিত করছি।

বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। উচ্চ শিক্ষার পর কোয়ালিটি জবে এটা একটা নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?

আপনার এ প্রশ্নের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত হতে পারছি না। আমি নিজে একজন বাংলাদেশী বা এনআরবি হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেছি এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংস্থা থেকে স্বীকৃতি পেয়েছি। আমার জানামতে, আরো ভালো স্বীকৃতি পেয়ে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী বা শিক্ষাবিদ বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষার মান বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় হয়তো কিছু অসুবিধা হচ্ছে। আমি মনে করি, এটা অত্যন্ত সাময়িক।|আমি এও জানি, এখনো বাংলাদেশ থেকে অনেক ছাত্র-ছাত্রী উচ্চ শিক্ষার ও সম্মানজনক পেশার খোঁজে বিভিন্ন উন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।