স্বাধীনতার পর অর্ধশতকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। আমাদের শিক্ষা খাতকে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে।
বাংলাদেশ এক সম্ভাবনাময় দেশ। আমি সবসময় ইতিবাচক ও আশাবাদী মানুষ। সে হিসেবে বলব আমরা খুব একটা খারাপ করিনি। যদিও আরো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে আমাদের, সুযোগও ছিল অনেক, আমরা তেমন কাজে লাগাতে পারিনি। একটি পরিসংখ্যান মতে, স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ শতাংশের বেশি। আর ৫০ বছর পর এসে এখন দেশে সাক্ষরতার হার হয়েছে ৭৫ শতাংশের বেশি। এর মানে দেশের চার ভাগের তিন ভাগ মানুষই মোটামুটি পড়তে ও লিখতে পারে। এখন আমাদের জোর দিতে হবে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে। গুণগত মানের সংকট এখন দৃশ্যমান। আগামী পৃথিবীতে প্রথাগত শিক্ষা দিয়ে আর চলবে না। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবকে মাথায় রেখে পুরো শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষায় পরীক্ষানির্ভরতা, শেখার চেয়ে ফলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া, কোচিং-প্রাইভেটনির্ভরতা বাদ দিয়ে নতুন চিন্তাচেতনায় কর্মমুখী ও বাস্তবমুখীভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
গত কয়েক বছরে চুয়েটের উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন এবং দেশের প্রকৌশল অঙ্গনে চুয়েটের অবদান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
আমি মনে করি, উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু একাডেমিক কারিকুলাম আর পাঠদানের ওপর নির্ভর করে না, পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির দায়িত্ব নিরন্তরভাবে পালন করতে হয়। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে ও পরিবর্তনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। এদিকটা লক্ষ্য রেখেই আমরা চুয়েটের উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণাকে এগিয়ে নিতে চাই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণাকে বিশ্বমানের হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। যুগোপযোগী সিলেবাস তৈরি, গুণগত পাঠদান, বিশ্বমানের ল্যাব ইকুইপমেন্টসহ গবেষণাগারের ব্যবস্থা, একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন ও অনুসরণ করার নিমিত্তে আমরা নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা সেন্ট্রাল রিসার্চ ল্যাবের নির্মাণ শুরু করেছি। এরই মধ্যে এ ল্যাবের দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আরো সমৃদ্ধ হবে বলে আশাবাদী। এছাড়া সব ধরনের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মধ্যে চুয়েট সবসময় শীর্ষের দিকেই অবস্থান করে, আমরা এ অবস্থানকে আরো সুসংহত করতে সচেষ্ট। আমাদের শিক্ষকদের অনেক গবেষণা বিশ্বমানের জার্নালে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেক প্রজেক্ট বাংলাদেশ পেরিয়ে বিশ্বদরবারেও সমাদৃত হচ্ছে। বেশকিছু প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা সফলতার পরিচয় দিচ্ছে।
দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করছেন। এর পরও এ সেক্টরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশী কর্মী প্রয়োজন হচ্ছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন? এ সমস্যা নিরসনে করণীয় কী?
আসলে বিশ্বে দক্ষ প্রফেশনালদের সর্বক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা সুদক্ষ প্রফেশনালদের নিয়োগ করতে চায়। এখানে দেশী-বিদেশী তেমন ফ্যাক্টর আছে বলে মনে করি না। লোকবল দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হলে যেকোনো প্রতিষ্ঠান লাভবান হয়। আমাদের দেশেও এখন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে উঠছে। বিদেশীদের নিয়োগের পেছনে নিয়োগকর্তারা প্রফেশনালদের ওপর নির্ভর করেন। আমাদের আরো বেশি হারে সময়ের চাহিদা অনুসরণ করে কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে। আমাদের প্রমাণ করতে হবে, আমাদের দেশের মানুষও কিন্তু পারেন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত করতে হবে। সফট স্কিলে আমাদের দেশের লোককে আরো দক্ষ হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নতকরণ। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল সংযুক্তকরণ, ইন্টার্নশিপ, থিসিস, কমিউনিকেশন, ম্যানেজমেন্ট আর আইটি শিক্ষা, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিক গবেষণার ওপর গুরুত্ব—সব বিষয় থাকতে হবে। সিলেবাসের নিয়মিত আধুনিকীকরণ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি আধুনিক করি, আমরা অনেক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠিয়ে বিদেশে আমাদের পজিটিভ ইমেজও ছড়িয়ে দিতে পারব।
গত কয়েক বছরে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজ ক্যাডারের পরিবর্তে বিসিএস সাধারণ ক্যাডারে যোগদানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? এছাড়া শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং দেশ মেধাবী শিক্ষার্থীদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক্ষত্রে রাষ্ট্রের করণীয় কী?
মেধাবী ও যোগ্যদের জন্য বিশ্বে অবারিত সুযোগ রয়েছে। কোনো কাজের ক্ষেত্র আসলে ছোট-বড় নয়। যোগ্যরা সবখানে সমাদৃত। ক্যাডার-নন ক্যাডার, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, শিক্ষক কিংবা প্রফেশনাল এভাবে মেধাবীদের বন্দি করার সুযোগ নেই। আমি চাই, মেধাবী ও যোগ্যরা সবখানে নিজেদের পছন্দমতো বিচরণ করুক। তাদের জগৎটা উন্মুক্ত থাকুক। এতে প্রতিযোগিতায় আরো বেশি মেধার চর্চা আসবে। প্রতিটি উন্নত দেশই নতুন প্রজন্মের মেধা, ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রমে উন্নত হয়েছে। তরুণদের মেধা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে না, প্রযুক্তিতে পরনির্ভরশীলতা ঘুচবে না, ভালো নেতৃত্বও আসবে না। চলমান চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব বাস্তবায়ন নির্ভর করছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ, মেধাবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ওপর।
এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর থেকেই ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ নামক টার্মটি শুনতে পাচ্ছি। আমরাও রিভার্স ব্রেন ড্রেন চাই, মেধাবীদের ফিরিয়ে আনতে চাই। তবে এ কথা সত্যি, যারা বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছেন, সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন তাদের সবাইকে শারীরিকভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির যে বিকাশ আমরা এখন দেখছি, যে সুবিধা এখন পাচ্ছি, তাতে শারীরিক উপস্থিতি সব ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে এখন গবেষক, ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব। শ্রেণীকক্ষে কিংবা নিজের ঘরের পড়ার টেবিলে থেকেও বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে নোবেল বিজয়ীসহ প্রথিতযশা অধ্যাপক, গবেষকদের আলোচনা শোনার ব্যবস্থা করা যায়। আমাদের চুয়েটেও সে সুযোগ সুন্দরভাবে বিদ্যমান।
দেশের প্রকৌশল শিক্ষায় কোন সংস্কারগুলো সর্বাগ্রে প্রয়োজন বলে মনে করেন?
যেকোনো দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা-গবেষণার বিকল্প নেই। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যা বিশ্বমানের এবং প্রযুক্তিগত ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। প্রকৌশল শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে উপযোগী ল্যাব, কোর্স পরিকল্পনা, সিলেবাস প্রণয়ন, গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ দক্ষ শিক্ষক থাকতে হবে। গবেষণায় বেশি হারে সময় ও শ্রম দিতে হবে। শিক্ষকদের শ্রেণীকক্ষে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্তসহ মানসম্মত পাঠদানের অভিনবত্ব সৃষ্টির মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে শিক্ষার গুণগত মান। শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত আধুনিক সফল, যথাযথ ও নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পাওনা। শিক্ষকদের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দরকার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশে সুশিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ফলোআপ খুবই জরুরি।
শিক্ষার্থীদেরও উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকবে। বর্তমান প্রতিযোগিতার সময়ে শুধু মেধা দ্বারা সফলতা অর্জন সম্ভব নয়, একই সঙ্গে থাকতে হবে যথাযথ দক্ষতা। মেধা থাকা সত্ত্বেও দক্ষতার অভাবে অনেকেরই সঠিকভাবে ক্যারিয়ার গড়ে ওঠার সুযোগ হয়ে ওঠে না। ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টা ক্যারিয়ার গঠনের সর্বোচ্চ সময়। সময়টিকে কাজে লাগাতে পারলে ভালো ক্যারিয়ার গঠন সম্ভব। এজন্য শ্রেণীকক্ষের লেখাপড়া কিংবা ল্যাব ওয়ার্কের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ, ক্যারিয়ার বিষয়ক কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, প্রেজেন্টেশন প্রোগ্রাম, পাবলিক স্পিকিং, সিভি রাইটিং আইডিয়া কম্পিটিশন, লিডারশিপ প্রোগ্রাম, বিজনেস কেইস কম্পিটিশন এসব কার্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা বাঞ্ছনীয়। শিক্ষার্থীদের চৌকস ও বিশ্বমানের যোগ্যাতাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আমি মনে করি, উচ্চ শিক্ষা-গবেষণার আন্তর্জাতিক মান ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য ছাত্র, শিক্ষক এবং গবেষকদের জন্য বিনিময় প্রোগ্রাম আরো সহজতর করতে হবে। বৈশ্বিক মানদণ্ডের আয়োজিত বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও সম্মেলনে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে। এ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সরকার, একাডেমিয়া, শিল্প ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।










