আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষা খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে?

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে নিয়ে সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রধান একটি কারণ জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব না দেয়া। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে দুই-আড়াই শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়, অথচ প্রয়োজন ৫-৬ শতাংশ। বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি না হলে কর্মসংস্থান কিংবা পেশাগত উন্নতি সম্ভব নয়। সবাইকে যে উচ্চ শিক্ষিত হতে হবে এমনটি আমি মনে করি না। তবে একটা স্তর পর্যন্ত শিক্ষিত হতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বাস্তবিক অর্থে সবাইকে পাওয়া যাবে না। যারা এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষিত না তাদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। সেটির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেহেতু সবাই উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে না। তাই তাদের জন্য ডিপ্লোমা কোর্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করতে হবে। তাহলে দেখবেন সে কর্মসংস্থানের বাইরে থাকছে না। এগুলোর জন্য আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু যথাযথ ব্যবহার নেই। উচ্চ শিক্ষা এখন আমাদের জন্য মান-মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অভিভাবকরা মনে করেন উচ্চ শিক্ষিত না হলে সন্তান শিক্ষিত হলো না। এ ধারণা ভুল। সবার তো আর মাস্টার্স ডিগ্রি বা পিএইচডির দরকার নেই। কিন্তু দেখবেন চাকরির বাজারেও সে ডিগ্রিগুলো খোঁজা হয়। এর কারণ শিক্ষার গুণগত মানের অভাব। একটি পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। তাহলে উচ্চ শিক্ষিত হয়েও কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা পিছিয়ে রয়েছেন। তাই বলব প্রত্যেক স্তরে শিক্ষার মান বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টাকে কতটা যথাযথ মনে করেন?

এখানে আমাদের কয়েকটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, কয়েক দশক ধরে শিক্ষার সব পর্যায়ের সিলেবাস পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেটি একটি লম্বা সময়ের পর। অথচ এ দেশে কিছু সময় পরপর কারিকুলামে, সিলেবাসে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১৯ শতক পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল নলেজভিত্তিক অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনই মূলকথা। কিন্তু এখন আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে কাজ করি। তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করতে কাজ করছি। যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। শুধু বেসরকারি নয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আউটকাম-ভিত্তিক সিলেবাস চালু হয়নি। স্কুল পর্যায়ে সৃজনশীল সিলেবাস চালু করা হয়েছিল, কিন্তু সেটিও সফল হয়নি। কারণ শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত না করে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন না করে কারিকুলাম প্রণয়ন করলে হবে না। শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে, তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। তা না হলে যতই আন্তর্জাতিক কারিকুলাম প্রণয়ন করি না কেন সফলতা আসবে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে শিক্ষার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। যেমন শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলা, পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি ও উন্নত মানের শিক্ষা উপকরণ প্রদান। শিক্ষাঙ্গনকে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

উচ্চ শিক্ষাকে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ায় কাজে লাগাতে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন কতটা জরুরি?

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের ইন্ডাস্ট্রির উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে একাডেমিয়ার সঙ্গে তাদের একটি সংযোগ থাকা জরুরি। এখানে আমরা যেমন আমাদের কারিকুলাম, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের রাখতে পারি তেমনি তারা শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে। আরেকটি হচ্ছে গবেষণার ক্ষেত্রে সংযোগ তৈরি করা। ইন্ডাস্ট্রি কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। গবেষণা করে যেটির সমাধান পেতে পারেন এবং সেটি করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি গবেষণার বিষয়ে সেভাবে আগ্রহী না। তারা যদি আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করেন তাহলে সংযোগটি তৈরি হয়। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো সেভাবে আগ্রহ দেখছি না।

বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?

আমাদের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা, কানাডায় চলে যান এবং সেখানে পড়ে ভালো চাকরিও পাচ্ছেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত বিশ্বে চাকরির জন্য মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট এখনো তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মসংস্থানের জন্য যে লেভেলের মানসম্মত শিক্ষা দরকার সেটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিতে পারছে না। আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে যদি আমরা অংশীদার হতে চাই তাহলে তাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কোয়ালিটি অব এডুকেশন সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরিখে দেখে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা কতটুকু মানসম্মত। ‌এক্ষেত্রে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অনেক এগিয়ে গেছে। গ্র্যাজুয়েটদের যোগ্যতা যদি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হয় তাহলেই আন্তর্জাতিক চাকরিগুলো তারা পাবে। আমরা সে পর্যায়ে এখনো যেতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমাদের কাজ করতে হবে। যেমন শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হলে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাছাই করতে হবে এবং সেখানে পর্যাপ্ত উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। সেটি প্রথমে পরীক্ষামূলক যাচাইও হতে পারে। এখানে ভূমিকা রাখেত হবে সরকারকে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে আমার একটি প্রত্যাশা থাকবে, বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে সরকার উদ্যোগ নেবে।

শ্রুতলিখন: এবিএস ফরহাদ