স্বাধীনতার পর অর্ধশতকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। আমাদের শিক্ষা খাতকে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে?

উচ্চ শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক। এ দুই স্তরে আমরা ফেল করেছি। স্কুল-কলেজে মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর দেয়া হয়েছে এবং যে ধরনের পাঠ্যক্রম করা হয়েছে তাতে আমরা মূলত শিক্ষার্থীদের তোতাপাখি বানিয়েছি। অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে। এক সময়ে পার্সেন্টেজে নম্বর দেয়া হতো, আবার জিপিএ-ভিত্তিক মূল্যায়ন শুরু হলো। এতে কিছু করেও বাচ্চাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং কিংবা কল্পনাশক্তি বাড়ানোর কাজটি করা সম্ভব হয়নি। আমরা রেজাল্ট ও নম্বরভিত্তিক ইঁদুর দৌড়ে দৌড়িয়েছি। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী আসছে তারা নিজ থেকে জ্ঞান আহরণের যে ক্ষমতা তা অর্জন করে আসতে পারেনি। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়। স্বাধীনতার পর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে, বিশেষ করে গত দুই দশকে ব্যাঙের ছাতার মতো বেড়েছে। সংখ্যা বৃদ্ধির যে প্রবণতা তার পেছনে শিক্ষা প্রসারের কতটা চিন্তা ছিল তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। কারণ কোয়ালিটির দিক থেকে দেখলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় হাইস্কুলের পর্যায়েও পড়ে না। নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চালুর ব্যাপারে আমাদের দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতেই হবে। কারণ আমরা গুণগত মানে পিছিয়ে গেছি। গ্র্যাজুয়েটরা আমাদের দেশেই চাকরি পাচ্ছে না। আবার যারা নিয়োগকর্তা তারা বলছে চাকরিযোগ্য কোনো গ্র্যাজুয়েট তারা পাচ্ছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা চাকরির বাজারকে সঠিকভাবে সার্ভ করতে পারছে না।

বাংলাদেশে যে প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালু হয় সেটাকে আপনি সঠিক মনে করেন? গুণগত মানের বিবেচনায় এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে কিনা?

সত্যিকার অর্থে শিক্ষানীতিতে বাজারের চাহিদার আলোকে শিক্ষার সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি দুটির সমন্বয়েই করতে হবে। চাকরির বাজারে কী ধরনের গ্র্যাজুয়েট আমরা তৈরি করতে চাই সে রকম কোনো নীতিমালা নেই। চারদিকে বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে করা হচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ভালো পরিকল্পনা না করে শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষিসহ কোন দিক থেকে কীভাবে এগোব, কোথায় মানবসম্পদের চাহিদা আছে সেটি চিন্তা না করে অপরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয়েছে। যেখানে উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সেখানে শিক্ষার প্রসার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টাকে কতটা যথাযথ মনে করেন? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?

স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব রয়েছে এ ব্যাপারে আমার দ্বিমত নেই। খুব ভালো বিশ্বিবদ্যালয় যেগুলো সেখানে মানসম্মত শিক্ষক আছে কিন্তু একটি বড়সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষক নেই এবং স্কুল-কলেজেও অভাব রয়েছে। কেনে মানসম্মত শিক্ষক নেই তার মূল কারণ দেখতে হবে। শিক্ষকতা পেশা কি খুব আকর্ষণীয়? বর্তমানে স্কুল-কলেজের শিক্ষকতা আকর্ষণীয় কি? ভালো ছাত্ররা শিক্ষকতা করবে কিন্তু খেয়ে-পরেও বাঁচতে হবে তাকে। স্কুল-কলেজের বেতন ভালো ছাত্রদের আকর্ষণ করার মতো প্যাকেজ নেই। শুধু জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় ভালো ছাত্ররা আসবে তা ভাবাও অবাস্তব চিন্তা। প্রথমত, এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা শিক্ষকতায় আছে তাদের জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। বিদ্যমান শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য জোর দিতে হবে। বাজেট বাড়াতে হবে। বিশ্বিবদ্যালয়ে পিএইচডি করা শিক্ষকের অভাব। তার কারণও শিক্ষকতা এখন এতেটা আকর্ষণীয় না। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলাবরেশন হয়নি। তার মূল কারণ উচ্চ শিক্ষায় গবেষণার যদি প্রায়োগিক দিক না থাকে তাহলে গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে আমি কিছু অর্জন করছি না, ব্যক্তিগত স্যাটিসফেকশনও নেই, দেশেরও কাজে আসছে না। গবেষণার চর্চা শিল্প ক্ষেত্রে আনতে হবে। বিশ্বিবদ্যালয়ে মাস্টার্স, পিএইচডি করবে তার চাকরির ক্ষেত্র কোথায়? সে একটি ভালো পজিশনে চাকরি করতে চাইবে বা একটি ইনসেনটিভ চাইবে। সিস্টেমে শিক্ষার ভূমিকা সঠিকভাবে নির্ধারণ হচ্ছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বয়স তিন দশকেরও বেশি। কিন্তু এখন পর্যন্ত পিএইচডি প্রোগ্রামের অনুমোদন দেয়া হয়নি। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে এক সময়ে এটি অচিন্ত্যনীয় বিসয় ছিল। প্রতিষ্ঠার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে গুণগত মানের শিক্ষা দিতে পারবে সেটি দেখার একটি বিষয় ছিল। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হয়েছে। আমি মনে করি, এখন বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে কোনো অংশে কম নয় কিংবা পিছিয়ে নেই। অনেক ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও উঁচু স্তরে রয়েছে। ইউজিসি বেসরকারিতে পিএইচডি চালুর জন্য কাজ শুরু করেছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা, প্রকাশিত গবেষণা, শিক্ষক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে পিএইচডি চালুর ব্যাপারে ভাবা হচ্ছে। আমি মনে করি, পিএইচডি চালুর অনুমোদন দেয়া উচিত। অনেকগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু বিভাগ পিএইচডি দেয়ার সক্ষমতা রাখে। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও তাদের ভালো সক্ষমতা আছে বলে আমি মনে করি।

বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। উচ্চ শিক্ষার পর কোয়ালিটি জবে এটা একটা নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?

কোয়ালিটি নিয়ে চাকরিদাতাদের অভিযোগ রয়েছে। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে নয়। একেবারে ভালো গ্র্যাজুয়েট যে বের হচ্ছে না আমি তা বলব না। অবশ্যই অনেক ভালো ভালো গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। তারা ভালো কাজও পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার যে রূপান্তর দরকার তা খুব ধীরগতিতে হচ্ছে। এ রূপান্তর দ্রুত হওয়া দরকার। বাজারের চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে এবং দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে। তাই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তিশালী কোলাবরেশন দরকার। হঠাৎ করে নতুন কোনো কারিকুলাম তৈরি করার প্রক্রিয়া খুব দীর্ঘ। দীর্ঘ প্রক্রিয়া থেকে বের হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোর্স চালুর জন্য ইউজিসির অনুমোদন নিতে হয়, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে। একটি কোর্স চালু করতে গেলে ছয় মাস থেকে এক বছর পর অনুমোদন আসছে। একটি ফাস্ট মুভিং কোর্সের যা যা অনুমোদন নিয়েছি তা এ সময়ে অনেক কিছু বাদ হয়ে গেছে, নতুন কিছু চলে আসছে। অ্যাডাপটেবিলিটি ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এছাড়া পড়াশোনার ধরনও বদলাতে হবে। আগের পড়াশোনা ছিল জ্ঞানভিত্তিক। আমরা জ্ঞান দিতাম শিক্ষার্থীরা ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে দক্ষতা অর্জন করত। একবছরের প্রশিক্ষণ দিত। তখন ইন্ডাস্ট্রির গতিও স্লো ছিল। এখন ইন্ডাস্ট্রির প্রশিক্ষণ দেয়ার মতো সময় নেই, তারা প্রশিক্ষিত জনবল চায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের স্কিলড ম্যানপাওয়ার বের করতে হচ্ছে। স্কিল ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পিছিয়ে আছে।