একটি জাতির অগ্রগতির মূল হাতিয়ার শিক্ষা। যেকোনো রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে জোর দেয়া হয়। বাংলাদেশেও কয়েক দশকে বারবার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে দুঃখজনক বিষয় স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও আমরা এখনো দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। কেন পাঁচ দশকেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে আমরা শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই বেশকিছু সংকট দেখতে পাব। এদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের সংকট তুলনামূলক অধিক গুরুত্বের দাবিদার। কারণ প্রাথমিক শিক্ষাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা ও মননের ভিত্তি তৈরি করে। এ স্তরে তৈরি হওয়া সংকটগুলোই পরবর্তী স্তরগুলোয় আরো বেশি বিস্তৃত হয়।

প্রাথমিক শিক্ষায় সংকটের একটি প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলোয়। এসব প্রতিবেদনে আমরা প্রায় নিয়মিতই দেখি আমাদের শিক্ষার্থীরা শ্রেণী অনুযায়ী উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না। বেশির ভাগ তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সঠিকভাবে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারছে না, তাদের শ্রেণী উপযোগী গাণিতিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছে না। অর্থাৎ বিদ্যালয়গুলোয় যে শিখন-শেখানোর ঘাটতি সে বিষয়টিই এ প্রতিবেদনগুলোয় প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ঘাটতির কারণ অনুসন্ধানে গেলে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়, যার মধ্যে অন্যতম দক্ষ শিক্ষকের অভাব। সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশের শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় এ সংকট সবচেয়ে বেশি। মূলত কয়েকটি বিষয় দক্ষ শিক্ষকের এ ঘাটতির পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত বেতন-ভাতার অভাব, সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সামাজিক সম্মানের ঘাটতি, সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা।

বাংলাদেশের প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা বর্তমানে ১৩তম গ্রেডে এবং প্রধান শিক্ষকরা ১২তম গ্রেডে বেতন পান। অথচ একই শিক্ষাগত যোগ্যতায় পুলিশের এসআই, ব্যাংক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দশম গ্রেড পান। এছাড়া শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও অত্যন্ত সীমিত। বেতন-ভাতার এ স্বল্পতার প্রভাব দেখা যায় সামাজিক সম্মানের ক্ষেত্রেও। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময়ই প্রাথমিক শিক্ষকরা সমাজে কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও গুরুত্ব পান না। এসব কারণে স্নাতক-স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা মেধাবী শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় সাধারণত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার বিষয়টি থাকে না। তারা শিক্ষকতার তুলনায় অধিক বেতন ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধাসংবলিত অন্যান্য চাকরির প্রতি বেশি আগ্রহী হন। এমনকি অনেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের পর অন্য চাকরির চেষ্টায় মনোযোগী থাকেন। অর্থাৎ স্বল্প বেতনের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। এছাড়া দেশের প্রাথমিক শিক্ষার নিয়োগ নিয়েও দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করাও অনেক সময় মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হন।

আমাদের দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতির আরেকটি কারণ উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব। প্রতিটি দেশেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হয়। আমাদের দেশেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে, তবে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ সিলেবাস ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতির অভাবে এসব প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মানের দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না।

দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতির পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে মানসম্মত টেক্সটবুকের অভাব, অতিরিক্ত কনটেন্ট অন্তর্ভুক্তি, প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতি ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার মতো বিষয়গুলো। শ্রেণীকক্ষে যে পাঠ্যপুস্তকগুলো পড়ানো হয়, সেগুলোয় প্রয়োজনীয় গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শের অভাব রয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ ও অসংলগ্ন বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের ধারণা স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে না। পাশাপাশি অনেক সময় পাঠ্যসূচিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিলেবাসে বাস্তবতার চেয়ে আদর্শ লক্ষ্য বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং বিষয়ভিত্তিক ভীতি তৈরি হয়। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত। প্রযুক্তি সরঞ্জামের অভাব, বিদ্যুৎ সংযোগের ঘাটতি এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাবে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক মানের শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। এ বিষয়গুলোই শিক্ষার্থীদের শ্রেণী অনুযায়ী উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

শিক্ষার মান নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মনিটরিং ব্যবস্থাও। যথাযথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের শিক্ষার চিত্র পাওয়া যায়, সংকটগুলো নিরূপণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়। মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা নেই এবং পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির দক্ষতা কম। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ের এ সংকটগুলো পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিকসহ শিক্ষার অন্যান্য স্তরে বিস্তৃত হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে শিখন ঘাটতি তৈরি হয় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পরবর্তী স্তরগুলোয়ও তা কাটিয়ে উঠতে পারেন না। ফলে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও আমরা দেখতে পাই এ স্তরেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীই শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না। এক্ষেত্রেও সংকটগুলো প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রের মতো একই। এ স্তরেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এমপিওভুক্ত। প্রবেশন পর্যায়ে এ শিক্ষকদের বেতন ১৪ হাজার টাকা এবং পেনশনের অর্থ কেটে নেয়ার পর বেতন দাঁড়ায় ১২ হাজার ২২৫ টাকা। এ স্তরের শিক্ষকদের জন্যও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া মানসম্মত টেক্সটবুকের অভাব, অতিরিক্ত কনটেন্ট অন্তর্ভুক্তি, প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার মতো বিষয়গুলো এ স্তরেও বিদ্যমান। শুধু এ দুই স্তরেই নয়, এ সংকটগুলো উচ্চ মাধ্যমিকসহ শিক্ষার পরবর্তী প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে যে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে আছে শিক্ষা। বাংলাদেশকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে অবশ্যই শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এ সংস্কার শুরু করতে হবে প্রাথমিক পর্যায়ে থেকেই। কারণ প্রাথমিক স্তরে তৈরি হওয়া সংকটগুলোই পরবর্তী স্তরগুলোয় বিস্তৃত হচ্ছে। এ কারণে এ স্তরের সংকটগুলো দূর করতে পারলে পরবর্তী স্তরের সংকটগুলোও সহজেই কাটিয়ে ওঠা যাবে। কিছু কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বহুলাংশে প্রাথমিক স্তরের সংকটের সমাধান সম্ভব।

প্রথমত, শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, দক্ষ শিক্ষক তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে হবে। এছাড়া দক্ষ শিক্ষক তৈরির কার্যকর উপায় হলো মানসম্মত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা। সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ সিলেবাস ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং সহজ ও বাস্তবসম্মত সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরি ও নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে মানসম্পন্ন পাঠ্যপুস্তক নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া সিলেবাস তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে তাদের প্রয়োজনীয় ও সহজবোধ্য তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে মানসিক চাপ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে এবং নিয়মিত পরিদর্শন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। আশা করা যায়, এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলে আমাদের শিক্ষা খাতের মূল সংকটগুলো দূর হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।

লেখক: পরিচালক ও অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়