বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি বাস্তব। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় কমাতে অপেক্ষাকৃত নবীন শিক্ষক নিয়োগ করে। পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরির প্রবণতা রয়েছে। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে—

নিয়োগ প্রক্রিয়ার মানোন্নয়ন: উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাদানে যথেষ্ট দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগে গুরুত্ব দেয়া উচিত।

পেশাগত উন্নয়ন: নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে পাঠদানের কৌশল, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন ও গবেষণা পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

প্রণোদনা: প্রতিযোগিতামূলক বেতন, ক্যারিয়ারে উন্নতির সুযোগ ও গবেষণায় অনুদান শিক্ষকদের আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে সহায়তা করবে।

সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করা: বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের মতো সংস্থাগুলোকে শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উচিত প্রতি টার্মে শিক্ষক মূল্যায়ন করা, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

পাঠদান নির্দেশিকা: প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য একটি নির্দিষ্ট পাঠদান নির্দেশিকা থাকা উচিত। সেখানে মূল্যায়ন পদ্ধতি, শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পাঠ পরিকল্পনার দিকনির্দেশনা থাকবে।

আমি মনে করি, ইউল্যাব অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শিক্ষক আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ভালো করছে। এখানকার কাজের পরিবেশ উন্নত, গবেষণার সংখ্যা বেশি এবং র‍্যাংকিংয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি, ইউল্যাব প্রবীণ ও নবীন শিক্ষকদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নিয়োগ দিচ্ছে, যা গবেষণার সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা উভয়ের সমন্বয় নিশ্চিত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ব্যাপ্তি ও মানোন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আগ্রহের ঘাটতির কথাটিও শোনা যাচ্ছে। আপনারা গবেষণায় কতটা মনোযোগ দিচ্ছেন?

গবেষণায় আগ্রহের অভাব দেশের উচ্চ শিক্ষায় একটি বড় সমস্যা। সীমিত অর্থায়ন, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও একাডেমিক চর্চার প্রতি অবমূল্যায়নের কারণে এ সমস্যা আরো জটিল হয়ে উঠেছে। সমস্যা সমাধানে যা করা যেতে পারে—

বরাদ্দ বৃদ্ধি: গবেষণা কেন্দ্র, পরীক্ষাগার ও গ্রন্থাগার স্থাপনে পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন।

গবেষণায় উৎসাহ দেয়া: আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশের জন্য আর্থিক প্রণোদনা, স্বীকৃতি ও ক্যারিয়ারে অগ্রগতির সুযোগ দেয়া উচিত।

যৌথ উদ্যোগ: আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে প্রয়োগযোগ্য গবেষণার প্রসার ঘটে।

পাঠ্যক্রম সংস্কার: স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে গবেষণা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে গবেষণাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শক্তিশালী সহায়তা প্রদান জরুরি।

ইউল্যাবে গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। এখানে বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্র নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে। শিক্ষকদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণায় অংশগ্রহণের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয়। গবেষণায় ব্যয়ের দিক থেকে ইউল্যাব বাংলাদেশের শীর্ষ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক স্বীকৃত। ইউল্যাবের সবচেয়ে সক্রিয় গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সিএসডি, সিইএস ও সিকিউএস। এ কেন্দ্রগুলো ইন্টারডিসিপ্লিনারি কাজে গুরুত্ব দেয়।

বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নিচের দিকে। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিস্টেমের সমস্যাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। এ অবস্থার উন্নতির জন্য যে প্যারামিটারগুলো গুরুত্বপূর্ণ—

গবেষণা প্রকাশনা ও মান: উচ্চ মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশ ও সাইটেশন বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক বিনিময় কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

শিক্ষকের মান: যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক, গবেষকদের নিয়োগ ও সক্রিয় রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা: পাঠদান ও গবেষণার জন্য আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টি: পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন, ক্যারিয়ার সহায়তা ও পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত এসব বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া। কারণ র‍্যাংকিংয়ের উন্নতি বৈশ্বিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী ভর্তি ও অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করে। ভালো র‍্যাংকিং অর্জন করতে হলে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

ইউল্যাব আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিজস্ব সাফল্য মূল্যায়ন করে, যা আমাদের মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের প্রতিফলন।

টানা চার বছর ধরে ইউল্যাব উরি (WURI) র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি। আমরা টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ইমপ্যাক্ট র‍্যাংকিং ২০২৪-এ এসডিজি-৫ (লিঙ্গসমতা) ও এসডিজি-১১ (টেকসই নগরায়ণ ও সমাজ) ক্যাটাগরিতে শীর্ষস্থান অর্জন করেছি। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং এশিয়া ২০২৫-এ ইউল্যাব স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং আমাদের মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রমাণ।