পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা নীতিমালা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন নীতিমালা প্রয়োজন রয়েছে কি?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর অনেক আগেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা হয়েছে। সেদিক থেকে একই নীতিমালায় চলা সম্ভব ছিল না। তবে শুনেছি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে, যা আরো বেশি সুযোগ তৈরি করবে। আমি আশা করি, একটা সময় আসবে যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় বেশি পার্থক্য থাকবে না। যেহেতু সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান একই নয়, সেহেতু এখনই অভিন্ন নীতিমালা করার সুযোগ নেই। তবে আশা করছি, খুব দ্রুতই সব বিশ্ববিদ্যালয় একই মানের হয়ে উঠবে। তখন এটা করা যেতে পারে।

স্বাধীনতার পর অর্ধশতকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষা খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে?

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে পরে প্রায় সব আন্দোলন হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানও শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। এ শিক্ষা ব্যবস্থা পুরো জাতিকে এগিয়ে নিতে সম্মুখ ভূমিকা পালন করছে। এখন যদি শিক্ষা ব্যবস্থা মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে শুধু উচ্চ শিক্ষার মূল্যায়ন করলে হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থার একদম গোড়া থেকে মূল্যায়ন করতে হবে। আজকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষার আদান-প্রদানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে আগের মতো সন্তুষ্টি নেই। এর অন্যতম কারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ঘাটতি। শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হলে এ ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এ খাতে আমাদের ব্যয় কিন্তু কম। ইউনেস্কো তার এসডিজিতে বলে দিয়েছে জিডিপির ন্যূনতম ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। কিন্তু গত ৫০ বছরে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ আমরা ব্যবহার করতে পেরেছি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে এবারো ২ শতাংশের কম ব্যবহার হয়েছে। আমরা যখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষার স্তরগুলোকে ভালোভাবে গড়ে নিয়ে আসতে পারব তখন এর সাফল্যগুলো ইতিবাচকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরতে পারব।

বর্তমান সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে কোনো কমিশন হয়নি। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে কি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে?

এখানে সংস্কার করা কোনো দাবি নয়; এটি প্রয়োজনীয়তা। আমাদের বুঝতে হবে এখানে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাটা কী। আমাদের ভাবতে হবে আমরা যাদের তৈরি করছি তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র আছে কিনা। সে ক্ষেত্র কিন্তু তৈরি হচ্ছে না। এর একটাই কারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরকে গুরুত্ব না দেয়া। শিক্ষা সংস্কারের বিষয়ে সবার আন্তরিক হওয়া জরুরি। দেশের সব পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু দেশ ও জাতি গঠনে যেন এ ব্যবস্থাকে পেছনে ঠেলে দেয়া না হয়। এ খাতের উন্নয়নে সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টাকে কতটা যথাযথ মনে করেন? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?

প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ শিক্ষা—সব পর্যায়ে আমাদের যোগ্য শিক্ষক সংকট রয়েছে। এখানে ‘‌টিচিং ফ্যাক্টরি’ বলে একটি টার্ম আছে অর্থাৎ শিক্ষক উৎপাদন। আগে আমাদের শিক্ষক উৎপাদনের একটি ব্যবস্থা ছিল। যেমন আগে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষকরা ল্যাবরেটরি স্কুলগুলো নিয়ে ক্লাস কার্যক্রেম অংশগ্রহণ করত। এখন কিন্তু সেটি কমে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষক উৎপাদনটি সন্তোষজনক না। শিক্ষক হিসেবে তাদের নিতে হবে যারা এ পেশাকে ধারণ করবে। তাকে অনেক কিছু ত্যাগ করার মানসিকতা থাকতে হবে। এটি না থাকলে শিক্ষক পেশায় এসে উন্নতি করা সম্ভব নয়। আমাদের দেখতে হবে একজন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষককে আমি কোন পর্যায়ে রেখেছি, কী প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এই যে ভালো শিক্ষক না পাওয়া সেটি উচ্চ শিক্ষায় এসে আমরা অভাব বোধ করছি। কারণ আমরা জ্ঞান উৎপাদন না করে জ্ঞান আহরণ করছি। আমরা যাদের শিক্ষক হিসেবে পেতে চাই তাদের দেশে রাখতে পারছি না। তবে আশার কথা হচ্ছে অনেকে আবার এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেশে ফিরে আসছে। বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। তারাও চাচ্ছে আমরা যাদের শিক্ষা দিচ্ছি তারা যেন মানসম্পন্ন শিক্ষা নিয়ে বহির্বিশ্বে একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ গবেষণা করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পিএইচডি করার সুযোগ নেই। ইউজিসি আলোচনা করছে কিছু মানদণ্ড তৈরি করে দেবে। এ বিষয়ে আপনি কী ভাবছেন?

বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিশ্বের জ্ঞান। সেখানে যদি গবেষণা না থাকে তাহলে জ্ঞান তৈরি হবে কীভাবে? কীভাবে এগোনো সম্ভব? আমাদের বলা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় বড় করো, কিন্তু গুণগত মান বাড়ানো হচ্ছে না। এটা আমাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছে। আমাদের হাত-পা খুলে দেয়া উচিত। আমি বলব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবিলম্বে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা উচিত। গবেষণার জন্য এখন অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের দিক দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এগিয়ে আছে। সেখানে পিএইচডির সুযোগ করে দিলে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে একটি অবারিত দ্বার উন্মোচন হবে। এখান থেকেই ভালো শিক্ষক তৈরি হবে। গবেষণা একটি অভ্যাস ও সংস্কৃতি। সেটি যদি খুলে দেয়া না হয় তাহলে যাদের এখন সক্ষমতা আছে তারাও পিছিয়ে যাবে। এখনই সঠিক সময়। আমার অনুরোধ অবিলম্বে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালু করা হোক।

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আলাপটি কয়েক বছর ধরে জোরালোভাবে উঠে আসছে। বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের কথা। এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?

এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক যে সিস্টেমগুলো আসছে সেগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগটা খুবই রুগ্‌ণ। ইন্ডাস্ট্রি বলছে তারা যে ধরনের দক্ষ জনশক্তি চায় সেটি পাচ্ছে না। এখানে একটি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ঘাটতির কারণে আমরা ইন্ডাস্ট্রির মালিকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছি না। অবশ্য এখন অনেক ইন্ডাস্ট্রি গবেষক নিয়োগ করছে। যারা ইন্ডাস্ট্রি করছে তারা তো কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। তারা তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণায় সহযোগিতা চাইতে পারে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোও এখন কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষা তৈরিতে কাজ করছে। যেমন ইন্ডাস্ট্রিতে যারা কাজ করছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। এ বৈচিত্র্য তৈরি হলে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার দূরত্ব কমে আসবে।

শ্রুতলিখন: এবিএস ফরহাদ