আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষা খাতে নানা সংকট রয়েছে। আপনার মতে উচ্চ শিক্ষা খাতের মূল সংকট কোনগুলো?
উচ্চ শিক্ষার সমস্যাগুলো মোটা দাগে সবারই জানা। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মানসম্মত গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। দেশের দলান্ধ ও হিংস্র রাজনীতি প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমাদের দুটি দার্শনিক বিতর্ক রয়েছে। তবে এগুলোর উত্তর আমার জানা নেই। প্রথমত, কর্মসংস্থান কিংবা চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করা উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যের মধ্যে পড়ে কিনা? এ রকম একটি শক্ত বিতর্ক আছে। উচ্চ শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (ভিইটি)। কর্মসংস্থান কিংবা চাকরির ব্যবস্থা করার সঙ্গে ভিইটি সরাসরি জড়িত। এর বাইরে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য মনুষ্যত্বের স্ফুরণ। চাকরির বাজারের সরাসরি সম্পর্ক কিংবা দায় উচ্চ শিক্ষা নেবে কিনা সেটা আমার জানা নেই। আমি কেবল বিতর্কটি উপস্থাপন করেছি।
আরেকটি বিষয় হলো পাবলিক-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজন। এটি অত্যন্ত সংকীর্ণ বিভাজন। উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অর্থে মানুষ করে গড়ে তোলা, সেক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পাবলিক-বেসরকারি হচ্ছে পরিচালন ব্যবস্থার একটি বিশেষায়িত রূপ। এক্ষেত্রে শুধু পরিচালন পরিচয়ের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য ও পদ্ধতিতে পাবলিক-বেসরকারির আলাদা কোনো বিভাজন থাকার কারণ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে আমাদের প্রচলিত কাঠামোর আওতায় ছাত্রদের নেতৃত্বের বিকাশ, গণতান্ত্রিক চর্চা ইত্যাদি কারণে ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতির কিছু সুযোগ এমনিতেই আছে। আমাদের ছাত্র সংসদ, হল সংসদ পর্যায়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা আছে। একটা কাঠামোর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত রাজনীতি করার কিছু বিধান আছে। আমরা এগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এছাড়া আমরা অত্যন্ত বিজ্ঞ কিছু মানুষের সমন্বয়ে একটা কমিটি করেছি। সেখানে বিচারপতি মতিন উদ্দিন, অধ্যাপক তাহমিদা ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা আছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে মতামত চাচ্ছি যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতির প্রকৃতি বা ধরন কেমন হতে পারে। এ কমিটির কাজ বেশ এগিয়েছে। আমরা তাদের মতামতের জন্য অপেক্ষা করছি। এছাড়া সংগঠনগুলোর সঙ্গে আমরা নিয়মিত বৈঠক করি। গত চার মাসে আমরা তিনবার বসেছি। অনানুষ্ঠানিকভাবেও তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ে বর্তমানে কোন বিষয়গুলোয় আপনারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?
আমরা যখন আগস্টের শেষে দায়িত্ব নিই তখন বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। একাডেমিক কার্যক্রম একেবারে বন্ধ ছিল। হলগুলো এক রকম ভাসমান অবস্থায় ছিল। আমাদের প্রথম কাজ ছিল একাডেমিক কার্যক্রম নতুন করে শুরু করা অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে। হলগুলোর সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করেছি। একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। ক্লাস চলছে নিয়মিত। পরীক্ষা হচ্ছে। অভিভাবকদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। এক রকম স্থিতিশীল অবস্থা ফিরে এসেছে। আমরা এ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার অভাব একটি বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সংকট নিরসনে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
আমরা বহু বছর পর একটা প্রশাসন স্ট্রাকচার তৈরি করেছি। অনেকে বলেন, গত ৫০ বছরে এটা প্রথম। এ প্রশাসন এখন হলে সিট বরাদ্দ দিচ্ছে। প্রশাসনই হল চালাচ্ছে ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে। এটা একটা বড় মাপের অর্জন বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা সেটি এক রকম করার চেষ্টা করছি। আবাসন সুবিধা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে আমরা ছাত্রীদের বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। কেননা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৩ শতাংশ ছাত্রী। সেই হিসেবে তাদের জন্য আবাসন একেবারেই অপ্রতুল। আমরা দিন-রাত কাজ করছি এ সংকটা সমাধানে। আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে কিছু বাঙ্ক বেডের ব্যবস্থা করেছি। প্রায় ৫০০ নতুন সিট তৈরি করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের গুরুত্ব দিয়ে আবাসন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমাদের মনে হয়েছে এ সময়ে একজন শিক্ষার্থী নতুন এসে দুর্বল অবস্থায় থাকে। তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া আপৎকালীন আর্থিক সাহায্যেরও ব্যবস্থা করেছি। বর্তমানে চীনা সরকারের সহায়তায় মেয়েদের একটি হলের কাজ শেষ পর্যায়ে এসেছে। এছাড়া ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটা বরাদ্দ আমাদের মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আছে। এর অধীনে নতুন তিনটি হল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ঢাবির অবস্থান সন্তোষজনক নয়। গবেষণা ও র্যাংকিংয়ের বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের সামর্থ্য সীমিত। রিসোর্স সীমিত। এর পরও চেষ্টা করছি গবেষণাকে হাইলাইট করতে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে আমি চেষ্টা করছি কিছু ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা যদি করতে পারি। আমাদের অনেকগুলো বিশেষায়িত সাবজেক্ট আছে। যেগুলোয় আধুনিক ল্যাবরেটরি দরকার। সে ব্যবস্থা আমরা এখনো করতে পারিনি। সেটা নিয়ে আমরা খুবই চেষ্টা করছি দেখি কিছু করতে পারি কিনা। আর আমাদের প্রধান যে র্যাংকিংগুলো যেমন কিউএস এশিয়ায় সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। এখনো অনেক বড় পথ আমাদের বাকি আছে। পুরো সমাজ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তো সেখানে আমরা চেষ্টা করছি। আর র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু জিনিস নতুন করে চেষ্টা করছি। প্রথমবারের মতো কিউএসের সাসটেইনেবিলিটি র্যাংকিং বলে আলাদা উপাদান আছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নিয়েছে। মোটামুটি মাঝারি ধরনের একটা ফল এসেছে সেখানে। দেশের মধ্যে ভালো করেছি। এশিয়া পর্যায়ে ফল মাঝারি। আরো ভালো করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলার অগ্রগতির জন্য ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার সংযোগ স্থাপন অত্যন্তত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আপনাদের ভাবনা কী?
ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার সংযোগ স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজটি আমরা করতে চাইছি মূলত কিছু বিশেষায়িত বিভাগ আছে, যারা কাজটি মোটামুটি অন্যদের চেয়ে ভালো পারেন। তাদের আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছি। যেমন আমাদের বিজনেস ফ্যাকাল্টির কিছু বিভাগ আছে, আমাদের আইটি-সংক্রান্ত কিছু বিভাগ আছে, এদের শক্তিশালী করা। এছাড়া ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য আমরা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ব্যবহার করতে চাইছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বড় শক্তি হচ্ছে তাদের অ্যালামনাই। দেশজুড়ে তারা ছড়িয়ে আছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন, আমাদের দেশের পলিসি মেকিং লেভেলে উচ্চ পদে পাবলিক-বেসরকারি উভয় খাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইরা আছেন। তাদের কাজ লাগিয়ে আমরা ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগটা করতে চাই। এছাড়া কিছু গবেষক আছেন, যারা অত্যন্ত ভালো করছেন। এ গবেষকদের মাধ্যমে আমরা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদাটা কী এটা ভালোমতো বোঝার চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীদের জন্য যে সিলেবাস তৈরি করা হয় সেই সিলেবাস কমিটিতেও আমরা ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধি রাখার চেষ্টা করছি। যাতে তারা আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন। এভাবে কিছু ছোটছোট উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি যাতে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার রিলেশনটা শক্তিশালী হয়।
দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে আপনার পরামর্শ কী?
সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে অনেক বড় ব্যাপার, অত্যন্ত জটিল। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা আছে। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়েই প্রথমত চিন্তা করতে চাই। আমরা যদি ভালো ভালো কাজ করতে পারি তাহলে এটি স্কিল-আপ হয়ে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বড় দাগে যদি বলি আমাদের সমস্যাগুলো আসলে সবাই মোটামুটি জানি। একটা হচ্ছে অস্বাভাবিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। এটি হচ্ছে বড় মাপের সমস্যাগুলো। এ কুটিল, দলান্ধ, হিংস্র যে দলীয় রাজনীতি সেটি আমাদের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে করেছে, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে করেছে, সিভিল সার্ভিসকে করেছে, পুলিশকে করেছে সিভিল সার্ভিসের একটা অংশ হিসেবে। অনেক ক্ষেত্রে এনজিওগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এ দলান্ধ রাজনীতি। এটি দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের আমাদের সঙ্গে রাখতে হবে। প্রতিটি স্তরে যেকোনো ধরনের সংস্কার আমরা করি না কেন অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে করতে হবে। অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে করতে হবে। আমরা কিছু ভালো কাজ যে করিনি তা না, কিন্তু আমরা সেটি এত ঘন ঘন এক্সপেরিমেন্ট করেছি, পরিবর্তন করেছি, বিশেষ করে আমরা স্কুল পর্যায়ে ঘন ঘন বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিদেশী মডেলকে অবিকল এনে বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং বাংলাদেশী বাস্তবতা, পরিবেশ, প্রেক্ষিত কনটেস্ট না বুঝে হঠাৎ করে এনে বসিয়ে দেয়ার যে চেষ্টা এ বিষয়টিকে বিরক্ত করেছে। বিশেষ করে অভিভাবকদের বিরক্ত করে ফেলেছে। এ বিষয়গুলো দূর করতে হবে। এগুলো আমাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে করতে হবে। রাতারাতি এগুলোর ফল আসবে না। এ সবকিছুর মধ্যে একটা স্থিতিশীলতা ও প্রতিশ্রুতি দরকার। রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে করা যাবে না এটা ঠিক। তাদেরকে তাদের জায়গায় রেখে করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে সব জায়গায় ক্ষমতার দর্প এবং এক রকম দলান্ধ হস্তক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত করছে, এ কাজগুলো করতে দেয়া যাবে না।










