বাংলাদেশের অর্থনীতি বিবেচনায় কৃষিশিক্ষা খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে নয়টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কৃষিশিক্ষা খাত নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

কৃষিশিক্ষা খাতে আমার কাছে মনে হয়েছে কোয়ালিটির পরিবর্তে কোয়ান্টিটিতে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কয়েক বছরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক বিবেচনায় তৈরি হয়েছে এবং সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এর পরেও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে যায়নি। ফলে মানসম্মত শিক্ষার অভাব তৈরি হয়েছে। সরকার যদি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ই মানসম্মত গবেষণার সুযোগ করে দিত, ল্যাবগুলোকে আরো বেশি গতিশীল করত এবং ল্যাবের জন্য হাতেকলমে করার যেসব ইনপুট লাগে, যেমন কেমিক্যাল, ফসলের মাঠ, গবাদিপশু, সেগুলো দিয়ে হাতেকলমে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ করে দিত তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও গুণগত প্রবৃদ্ধি ঘটত। জায়গাটিতে আমরা এখন পিছিয়ে আছি।

বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষার মান ও গবেষণায় বাকৃবি ভালো অবস্থানে আছে। আপনার কাছ থেকে কয়েক বছরে বাকৃবির উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন এবং দেশের কৃষি অঙ্গনে বাকৃবির অবদান সম্পর্কে জানতে চাই।

কৃষি নিয়ে গবেষণায় দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের গবেষকরা সুনাম অর্জন করেছেন। বিশেষত বাংলাদেশের কৃষি খাতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, যার একটি ইতিবাচক প্রভাব আমরা অর্থনীতিতে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের গবেষকরা বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কার করেছেন, কৃষিক্ষেত্রে যেসব রোগ কৃষকদের বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেগুলোর সমাধান করছেন। এছাড়া বৃষ্টি,খরা, তাপমাত্রাসহ আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও বিভিন্ন জাত আবিষ্কার করেছেন। তাদের এ গবেষণাগুলো তারা কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে করছেন। ফলে কৃষকরা নতুন নতুন যে সমস্যায় পড়ছেন, সেগুলো তারা জানতে পারছেন এবং বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতে পারছেন। গবেষকদের এ ধরনের প্রচেষ্টা আমাদের কৃষকদের ঝুঁকি কমিয়েছে এবং কৃষিকে লাভজনক করেছে। কৃষি খাতের এ উন্নয়নের ফলে এখন অনেকেই কৃষি খাতে ইনভেস্ট করতে আগ্রহী হচ্ছেন, কৃষিতে উদ্যোক্তা সংখ্যা বেড়েছে।

দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছে?

বাংলাদেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে বাজেট সেটা থেকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটও দূরে নয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না। যে বাজেটগুলো থাকে সেটা দিয়ে কৃষির কার্যকর গবেষণা করা সম্ভব হয় না। কারণ কৃষির জেন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করতে হয়, ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট আমরা পাই না। ফলে ভালো আউটপুট জেনারেট করা যায় না। এছাড়া এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আগে শস্য যেমন উৎপাদন হতো এখন তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়া ও পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় তেমন হচ্ছে না। উচ্চফলনশীল যে জাতগুলোয় পোকামাকড় বেশি আক্রমণ করে সে জাতগুলোয় কীটনাশক প্রয়োগ করলে সেটি আবার ফুড সেইফটির ওপর প্রভাব ফেলছে। কাজেই ক্লাইমেট রেজিলেন্টে পাশাপাশি ফুড সেইফটি এ বিষয়গুলো কৃষির জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে উঠছে এবং এ বিষয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ করা প্রয়োজন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষাবৃত্তি। আগে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গ্রামাঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা, কৃষকের সন্তান ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা বেশি আসত। তারা এসে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করত, বৃত্তিও ছিল। সে বৃত্তিটায় এখন থেকে ৪০ বছর আগে যে টাকা ছিল এখনো সে বৃত্তির হার ২০০ টাকা। এটা বাড়ানো দরকার। মাসিক বৃত্তি ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা হওয়া উচিত।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরো কার্যকরভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে সরকারের কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া উচিত?

সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের করতে হবে, যেন কানাডা থেকে ছেলেমেয়েরা আমার এখানে পড়তে আসে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে আবার আমার দেশের ছেলে-মেয়েরা যেন কানাডায় অর্থাৎ স্যান্ডুইচ সিস্টেমে যদি লেখাপড়া, স্কলারশিপের সিস্টেম করা যায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাহলে সারা বিশ্বের গ্লোবাল কৃষি ও বাংলাদেশের কৃষির ভেতরে ফিউশন হবে, এক্সচেঞ্জ হবে। আমি মনে করি, এতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানগুলো আরো বেশি টেকসই হবে, সঙ্গে সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই বা গ্র্যাজুয়েটরা পৃথিবীতে কন্ট্রিবিউট করার সুযোগ পাবে। এ চ্যালেঞ্জগুলো আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টেকআপ করা উচিত এবং সরকারের এ জিনিসগুলোকে নারিশ বা সাপোর্ট করা উচিত।

বাকৃবি নিয়ে আপনার পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে আগ্রহী। বিশেষত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে আপনার পরিকল্পনা কী?

যে কনসেপ্টে ইউনিভার্সিটিটা হয়েছিল, আমেরিকার ল্যান্ডগেন সিস্টেমে, ছেলেমেয়েরা যেখানে খামারে, ফসলের মাঠে হাতেকলমে কাজ করার সুযোগ পায় এবং সেখান থেকে কিছু ইনকামও করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ল্যান্ডকেই ইউজ করা হবে, টু প্রডিউস, টু আর্ন এবং টু লার্ন। এটাই ছিল এ ল্যান্ডগেন ইউনিভার্সিটিগুলোর কনসেপ্ট। ব্যক্তিগতভাবে আমি ওই জিনিসটা নিয়েই ভাবি যে কীভাবে করা যায় এবং এরই মধ্যে আমি চিন্তাচেতনা শেয়ার করেছি অনেকের সঙ্গে এবং ছেলেমেয়েরাই যেন আমাদের এখানের মাঠ, খামার, শস্যবীজ, ফলের বাগান, সব জায়গায় যেন কাজ করতে পারে। এটা থেকে তারা যেন কিছু ইনকাম করতে পারে। তখন তাদের নলেজগুলো দুই ধরনের বেনিফিশিয়াল হবে। আরো দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, সঙ্গে সঙ্গে তারা আয়ও করতে পারবে, বাবা-মায়ের ওপর চাপও কমবে। আরেকটা বিষয় আমার চিন্তায় আছে, সেটা হলো এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির যেসব সাবজেক্ট রয়েছে, সেগুলোয় বিশ্ববরেণ্য যেসব অধ্যাপক রয়েছে তাদের দ্বারা লেকচারের ব্যবস্থা করা। এক্ষত্রে আমরা অনলাইন ক্লাসরুমকে কাজে লাগাব। আর তিন নম্বর পরিকল্পনা আমি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের বাকৃবিতে আমন্ত্রণ করব। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমাদের বাস্তবতা তুলে ধরে শিক্ষা ও গবেষণায় কোলাবরেশনের ব্যবস্থা করব।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন সংস্কারগুলো সর্বাগ্রে প্রয়োজন বলে মনে করেন?

অপ্রয়োজনীয় যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে সার্বিক অর্থে টাকা খরচ করা হচ্ছে কিন্তু দেশের বা মানুষের কোনো সত্যিকারের উপকার হচ্ছে না, সেগুলো বাদ দিতে হবে। এজন্য আমাদের কারিকুলামে সংস্কার করতে হবে এবং সে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেগুলো আমাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে, সমাজ গঠনে, চরিত্র গঠনে এবং জাতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ পাবনা ডেইরি প্রডাক্টের জন্য বিখ্যাত। এ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য থাকবে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। এভাবে প্রতিটি এলাকা এবং সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে। আরেকটি বিষয়ে

আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে সেটি হলো শিক্ষা ও গবেষণায় প্রযুক্তির ব্যবহার। আমাদের প্রযুক্তির সাহায্যে মাঠ পর্যায়ের তথ্য তুলে আনতে হবে এবং সে বিষয়গুলো মাথায় রেখে শিক্ষা ও গবেষণায় উদ্যোগ নিতে হবে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিউল করিম জীম