বাংলাদেশের শিক্ষা খাত, বিশেষত উচ্চ শিক্ষা পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষত উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে। ১৯৭২ সালে গঠিত কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের প্রতিবেদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসার যেমন লক্ষণীয় তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১০ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শুরু হয়, যার ফলে ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোট ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২ কপি বই বিতরণ করা হয়েছে (সূত্র: শিক্ষা মন্ত্রণালয়), যা শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে উচ্চ শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। যেমন উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর প্রস্তুতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার বেড়েছে এবং ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সামঞ্জস্য এখনো যথাযথভাবে স্থাপন করা যায়নি। ২০২৫ সালে এসে উচ্চ শিক্ষায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন যেমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা, ই-লার্নিংয়ের প্রসার এবং গবেষণার প্রতি ক্রমবর্ধমান মনোযোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে কাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষকদের যোগ্যতা বৃদ্ধি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য।
উচ্চ শিক্ষায় আমরা যতই অগ্রসর হচ্ছি ততই গুণমান নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা প্রদান জরুরি হয়ে উঠছে। বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আরো সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টিকে কতটা যথাযথ মনে করেন? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?
উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি জ্বলন্ত সমস্যা, যা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রকট এবং উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও লক্ষণীয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের শিক্ষকই শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কিছুদিন আগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই একজন নারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারতেন, যা বর্তমানে পরিবর্তন হলেও এখনো শিক্ষকের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। একজন উচ্চ মাধ্যমিক পাস শিক্ষক কতটা উপযুক্ত, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশকারীরাও কতটা প্রস্তুত, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চিত করতে হলে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা, আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদান, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, আদর্শ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে ভারসাম্য রাখা। পাশাপাশি শিক্ষকদের দক্ষতা, গবেষণা অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার্থীদের মেন্টরিং সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো মানসম্মত করতে হবে।
অনলাইন ও ব্লেন্ডেড শিক্ষা পদ্ধতি শিক্ষকের অভাব মেটানোর একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। তবে গুণমান নিশ্চিতকরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। দেশের ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো এবং শক্তিশালী ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষকের মান নিশ্চিত করতে শিক্ষায় এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আলাপটি কয়েক বছর ধরে জোরদারভাবে উঠে আসছে। বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের কথা। এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?
ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে এবং এটি বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি সম্ভব। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টকে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ সুযোগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপ চুক্তি করা, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ এবং ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সেমিনার ও ওয়ার্কশপ আয়োজনের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে দক্ষতা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের জন্য তাদের আরো ভালোভাবে প্রস্তুত হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ব্যাপ্তি ও মান উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আগ্রহের ঘাটতির কথাটিও শোনা যাচ্ছে। এটা কতটা সত্য? অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনুপস্থিত। পরিস্থিতি বদলাতে কী করা যেতে পারে? আপনারা গবেষণায় কতটা মনোযোগ দিচ্ছেন?
গবেষণার মান উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, পাশাপাশি শিক্ষকদের গবেষণায় সম্পৃক্ততার ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণার জন্য অর্থ রয়েছে, কিন্তু তা সবসময় যথেষ্ট হয় না এবং অনেক সময় দক্ষ প্রকল্পায়নের অভাবে সঠিকভাবে সেই অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে গবেষণার প্রতি আগ্রহের অভাব সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলছে।
আমাদের বিশ্বাস, গবেষণাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিচিতি। তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তহবিল বৃদ্ধি, শিক্ষকদের জন্য ইনসেনটিভ প্রোগ্রাম চালু এবং গবেষকদের জন্য বৃত্তি ও বিভিন্ন সুযোগ প্রদান করছে। বৈশ্বিক গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ, বিদেশী গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতা, গবেষণা প্রকল্পকে সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশ ও প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গবেষণাকে আরো জনপ্রিয় করার পাশাপাশি আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল প্রকাশ করছি এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করছি। গবেষণার প্রতি এ ধারাবাহিক মনোযোগ ও প্রচেষ্টা গবেষণার মানোন্নয়ন এবং দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বের বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। যেসব প্যারামিটার র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৪’-এ বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ এবং ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২৪’-এর এশিয়ার শীর্ষ ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হলো গবেষণার মান ও আওতার অভাব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং উন্নত করতে আমরা গবেষণা আউটপুট, সাইটেশন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, আন্তর্জাতিকীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ও টেকসই শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছি। মৌলিক গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য বৃত্তি ও অনুদান বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার মাধ্যমে গুণমান ও সাইটেশন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার মান বজায় রাখতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ভারসাম্যপূর্ণ রাখা এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিদেশী শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আকর্ষণের জন্য কোর্সের মান উন্নয়ন ও ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক খ্যাতি বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা বাড়ানো, টেকসই শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন কোর্স ও গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় ওয়েবসাইট হালনাগাদ করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি ইউজিসির উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার আধুনিকায়নের বিভিন্ন উদ্যোগ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান হার উন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছি।
বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। উচ্চ শিক্ষার পর কোয়ালিটি জবে এটা একটা নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?
বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বৈশ্বিক বাজারে ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরির অভাব ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। প্রতি বছর সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ভবিষ্যতের শীর্ষ নির্বাহী ও কোম্পানি লিডারদের উৎস দেশগুলোর সম্ভাবনা তালিকাভুক্ত করে। ২০২৪ সংস্করণে ৯৩টি দেশের র্যাংকিং করা হয়েছে, কিন্তু এ তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। ফলে উচ্চ শিক্ষার পর বাংলাদেশী পেশাদাররা গুণগত চাকরিতে পিছিয়ে থাকেন।
এ সমস্যা মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে আমরা সফট স্কিল, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বহুভাষিকতা অর্জনে গুরুত্ব দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম, শিল্পকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি গ্র্যাজুয়েটকে একজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা, যা বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করবে।










