স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার করে দেশের উচ্চ শিক্ষা খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শিক্ষা খাত নিয়ে জাতির যে আকাঙ্ক্ষা তা পূরণ হয়নি। একেবারেই যে সফল হয়নি সেটাও বলা যাবে না। দেশের তরুণদের মাঝে উচ্চ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। সরকারি পর্যায়ে ৫৩-এর অধিক এবং বেসরকারি পর্যায়ে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এতে বোঝা যায় শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এছাড়া যুগোপযোগী নতুন নতুন বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যুক্ত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্জন হয়নি। কোয়ালিটি এডুকেশন, নিড বেজড কারিকুলাম আমাদের দেশে নিশ্চিত করতে পারিনি। আমি আশাবাদী সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চলমান প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা এবং জাতি গঠনে শক্তিশালী ভিত্তি রচনায় আমরা যারা শিক্ষক সমাজ তারা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছি। সমাজের শিক্ষিত অংশকেও এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন দেশের প্রাইমারি থেকে উচ্চ শিক্ষা সব পর্যায়েই কোয়ালিটি শিক্ষকের সংকট রয়েছে। বিষয়টাকে কতটা যথাযথ মনে করেন? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতে করণীয় কী?

এটা সত্য যে আমরা মানসম্মত শিক্ষক পাই না। গ্র্যাজুয়েশেনের পরেই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা উচিত; বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে। অন্যান্য দেশের মতো এ দেশের নতুন শিক্ষকদের একটি ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের দরকার আছে বলে আমি মনে করি। যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশে এক বছরের কোর্স করা না থাকলে কেউ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান না। শিক্ষকতার গুণাবলি অর্জনের জন্য একটি ফাউন্ডেশন কোর্স প্রচলন করা দরকার। বিইউএফটি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ও ইউজিসি নির্ধারিত নিদের্শনাগুলোর সঙ্গে আপস করে না। নিদের্শনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। নিয়োগের শর্ত পূরণ, লিখিত পরীক্ষা, ডেমো ক্লাস, সর্বশেষ ভাইভার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেই সেহেতু যোগদানের আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা হয়।

গত কয়েক বছর ধরে জোরদারভাবে উঠে আসছে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আলাপ। বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের কথা। এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ কোলাবোরেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১২ সালে বিইউএফটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ বিষয়ে আমরা জোর দিচ্ছি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ ২১ সদস্যের সবাই গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী। তাদের ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম সাজাই এবং শিক্ষার্থীদের অফার করি। আবার যেহেতু এটি কারিগরি ও ফ্যাশন সম্পর্কিত বিশ্ববিদ্যালয় সেহেতু এমন ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সম্পর্ক রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শিল্প মালিকদেরও এগিয়ে আসা উচিত। এতে উইন-উইন সিচুয়েশন তৈরি হবে। আমাদের দেশে গার্মেন্ট সেক্টরে পার্শ্ববর্তী দেশের অনেক দক্ষ জনবল কাজ করেন। যদি এ কোলাবরেশন তৈরি করা যায় তাহলে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা তাদের স্থানগুলোয় সুযোগ পাবেন। বিদেশনির্ভরতা কমবে। সেজন্য প্রতিটি কারিকুলামে ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট, প্রজেক্ট ওয়ার্ক, ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম নিশ্চিত করি। ফলে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির সুযোগের হার প্রায় ৯০ শতাংশের ওপরে। একাডেমিয়া, ইন্ডাস্ট্রি, গভর্নমেন্ট কোলাবেরেশন­ যা থ্রি-হেলিক্স মডেল নামে চীনে পরিচিত, এতে গুরুত্বারোপ করা জরুরি। এরই মধ্যে আমরা ১৪টি প্রথিতযশা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা চুক্তি করেছি।

বিইউএফটি থেকে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হয়েছেন। তার পরও এখনো গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ পর্যায়ে বিদেশীরা। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কতটুকু অর্জন হয়েছে?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১২-১৩ বছর, যেটি একটি ইনস্টিটিউট দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেই হিসেবে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৪ বছর ধরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদের চাহিদা মেটাতে কাজ করে যাচ্ছে। এ অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের বেশকিছু গ্র্যাজুয়েট ভালো ভালো পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। সিইও পর্যায়েও পৌঁছে গেছেন। কেউ কেউ উদ্যোক্তা হয়েছেন। ক্ল্যাসিক হ্যান্ডমেইড প্রডাক্টসের ওপর জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি আমাদেরই শিক্ষার্থী। এইচঅ্যান্ডএম, নেক্সট, পুমাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পর্যায়ে কাজ করছে। মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার কোম্পানির কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিইউএফটির সফল গ্র্যাজুয়েট। শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। আগে যে পরিমাণ বিদেশী কাজ করতেন এখন অনেক কমে গেছে। আমরা মনে করি, আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য এটা সম্ভব হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে বিদেশীদের স্থান দখল করা কঠিন হবে না বলে আমার বিশ্বাস।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার ব্যাপ্তি ও মানোন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আগ্রহের ঘাটতির কথাটিও শোনা যাচ্ছে। এটা কতটা সত্য? এ পরিস্থিতি বদলাতে আপনারা কতটুকু জোর দিচ্ছেন?

আসলে আমাদের দেশে গবেষণার কালচার দেখা যায় না। তবে একেবারে যে নেই তা না। সীমিত পরিসরে শুরু করেছি। আমাদের ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণায় আগ্রহী হন। কেননা পোশাক শিল্প খাতে গবেষণার হার খুবই কম। আমরা মনে করি, আমাদের যে শিক্ষার্থীরা আছেন, তারাই এ জায়গাগুলোয় নেতৃত্ব দেবেন। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত দিকনিদের্শনা শিল্প মালিকদের পথ দেখাতে পারবে। গবেষণা না হলে আমাদের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়বে। পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণের জন্য গবেষণা প্রয়োজন। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের সার্বিক উন্নয়নে জাতীয়ভাবে একটি গবেষণা কাউন্সিল করা দরকার।

বিশ্বের বিভিন্ন র‍্যাংকিংয়ের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। র‍্যাংকিংয়ে বিইউএফটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

এটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এখনো ওই পর্যায়ে যেতে পারিনি। র‍্যাংকিং অনেকগুলো মাপকাঠির ওপর বিচার করা হয়। আমাদের এখানে উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষক সংকট রয়েছে। তা কাটানোর চেষ্টা করছি। তাই আমরা পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোয় জোর দিচ্ছি। আমাদের ইমপ্লায়াবিলিটি রেট ঠিক আছে। গবেষণার দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দুই-তিন বছরে পাঁচ শতাধিক আর্টিকেল ভালো মানের জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে আশা করি আমাদের র‍্যাংকিংয়ে প্রভাব পড়বে। তবে এর আগে আমরা র‍্যাংকিংয়ে খুব নজর দিইনি। এজন্য আমরা সম্প্রতি সেদিকে নজর দিয়েছি। তবে এটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। বলামাত্রই তো হবে না। কিছুদিন হয়তো সময় লাগবে।

তবে একটি কথা বলতেই হয়, এরই মধ্যে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোয় নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তবে নিকট ভবিষ্যতে আমরা আরো ভালো করতে পারব বলে নিশ্চিত করে বলতে পারি।

শ্রুতলিখন: আনিসুর রহমান