কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চলছে, কিন্তু কর্মমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সংকটের জায়গাটা কোথায়?
কর্মমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে গেলে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। এজন্য আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। একটা ছেলে যখন মাধ্যমিক পাস করে তাকে যদি টেকনিক্যাল ট্রেনিং করানোর পাশাপাশি ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়, তখন তার দেশ ও দেশের বাইরে কর্মসংস্থান করা যাবে। কেবল গতানুগতিক পড়াশোনার মাধ্যমে সেটি সম্ভব নয়। প্র্যাকটিক্যাল নলেজ বাড়াতে হবে। তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে।
আমাদের শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি নিয়ে আপনার কী মূল্যায়ন?
আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। একটা দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে সেটা ওই দেশের উচ্চ শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার মান খুবই খারাপ, যার কারণে আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। এর অনেক কারণ আছে। আমাদের উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য স্পষ্টীকরণ দরকার। কারণ একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তার শিক্ষাজীবন শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে। কিন্তু সবার তো উচ্চ শিক্ষিত হওয়া কিংবা এত ডিগ্রি নেয়ার দরকার নেই। যখন আমরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করি, তখন দেখা যায় সে দেশের সব শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে না। কেউ মাধ্যমিক পর্যন্ত, কেউ প্রফেশনাল ট্রেনিং করে, কেউ ডিপ্লোমা করে, শুধু যারা মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট তারাই অনার্স-মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি করে। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটা নেই।
ধরেন একজন ড্রাইভার, তার জন্য মাস্টার্স-পিএইচডি ডিগ্রির কোনো প্রয়োজন নেই। একজন কেরানি তার মাস্টার্স-পিএইচডি ডিগ্রির আদৌ প্রয়োজন আছে কি? কিন্তু আমাদের দেশে এ বিষয়ে নির্ধারিত কোনো নীতিমালা নেই। ফলে এটি আমাদের বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের যা করতে হবে তা হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে স্পষ্টীকরণ। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের বাজেট বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান এবং তাদের উৎসাহ দিতে হবে। এছাড়া দুর্নীতি ও সুশাসন কায়েম করতে হবে। তাহলে আমাদের শিক্ষা খাতে আশানুরূপ ফল পেতে পারি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?
প্রাইমারি শিক্ষাটা যদি যথাযথ না হয়, তাহলে উচ্চ শিক্ষায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা যখন শিক্ষক নিয়োগ করছি, তখন আমরা তাদের মেধা অনুযায়ী নিয়োগ করতে পারি না। নিয়োগটা অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিংবা দুর্নীতির আশ্রয়ে হয়। যারা শিক্ষক হওয়ার কথা নয় তারাও শিক্ষক হচ্ছে। মেধার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক নিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে করা হয় না।
এছাড়া শিক্ষকদের যে বেতন কাঠামো এটাও পর্যাপ্ত নয়। সাধারণত দেখা যায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসে, কিন্তু বেতনের ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হয়। তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। গবেষণার জন্য তাদের আলাদা কোনো অনুদান দেয়া হয় না। ফলে শিক্ষকদের কাছে প্রত্যাশার প্রতিফলন হয় না।
বিশ্বের বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। যেসব প্যারামিটার র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে, সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?
র্যাংকিংয়ে আসার জন্য আমরা শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাতটা দেখছি। আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত র্যাংকিংয়ের জন্য যেটা দরকার সেটা করার। এছাড়া কী ধরনের গবেষণা হয় এবং গবেষণাটি মানসম্মত হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা। যেসব শিক্ষক গবেষণা করতে চান তাদের আমরা ইউনিভার্সিটি থেকে অনুদান দিচ্ছি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অ্যালামনাই আরো শক্তিশালী করতে হবে। আমরা সবাই জানি, বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থা আউটকাম বেজড এডুকেশন সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে করা হচ্ছে। আমরাও এখন প্রতিটি প্রোগ্রামে আউটকাম বেজড শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই সিলেবাস তৈরি করছি, যেন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে একটা স্থান পেতে পারি।
বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। উচ্চ শিক্ষার পর কোয়ালিটি জবে এটা একটা নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে যেসব শিক্ষার্থী বের হয়ে দেশের বাইরে চাকরি করছেন তাদের থেকে বিদেশীরা ফিডব্যাকটা পায় নরমালি। আমাদের দেশের স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে দেশের বাইরে যখন মাস্টার্স করে যখন চাকরি ক্ষেত্রে যাচ্ছে, তখন তাদের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে আমাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ছে। যেমন বুয়েট কিংবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে দেশের বাইরে ভালো করছে।
বাংলাদেশ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। তারা শিক্ষা শেষে আর দেশে ফিরছে না। বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থীদের রাখার জন্য কী করা দরকার?
এটা হচ্ছে মেধা পাচার। আমাদের দেশে একজন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর চাকরি ক্ষেত্রে যে পরিমাণ বেতন হওয়া উচিত সেটা পাচ্ছে না। কিংবা মেডিকেল থেকে বের হওয়ার পর যা বেতন হওয়া উচিত সেটি পাচ্ছে না। একজন ইঞ্জিনিয়ার বুয়েট থেকে বের হলো কিংবা একজন ডাক্তার ঢাকা মেডিকেল থেকে বের হয়ে ২২ হাজার টাকা বেসিক সাকল্যে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার বেশি তার বেতন হচ্ছে না। সে ছেলে যদি বিদেশে একটা ডিগ্রি নিয়ে পড়াশোনা করে, সেখানে বছরে ১ লাখ ডলার স্যালারিতে সে কাজ পাচ্ছে, যা মাসে ৮ হাজার ডলারের বেশি হচ্ছে। আমাদের দেশে এসব মেধাবীকে ধরে রাখতে হলে তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। স্যালারি থেকে শুরু করে সব সুযোগ-সুবিধা দিলে অবশ্যই এদের রাখা সম্ভব।










