১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ৩৩ বছর পার হয়েছে। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরতদের ৭০ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষায় যদি ১০০টি সার্টিফিকেট দেয়া হয় তার মধ্যে ৭০টিই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রদান করে। বিষয়টি বিবেচনায় উচ্চ শিক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান বা পরিস্থিতির কথা বলি সেটি খুব একটা সন্তোষজনক নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো ভালো অবস্থানে থাকার সুযোগ ছিল।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের একটি বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য জানতে চাচ্ছি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও ভালো করছে। আমরা যদি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্র বিবেচনা করি, তাহলে বেকারত্বের যে বিষয়টি বলা হচ্ছে সেটি ২৫-৩০ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কিন্তু চাকরি পাচ্ছে। এ কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান খুব খারাপ এমনটি বলার সুযোগ নেই। তবে আমাদের অধীনে কয়েক হাজার কলেজ রয়েছে। কিছু কলেজে দক্ষ শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার সংকট রয়েছে। সে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা মনে করি, আমাদের শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট মেধাবী এবং আমরা যদি তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে পারি, তবে তারা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন শতবর্ষী কলেজগুলোর শিক্ষার মান একসময় প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু ক্রমে এ কলেজগুলো তাদের ঐতিহ্য হারাচ্ছে। এর কারণ কী? কলেজগুলোর মানোন্নয়নে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

শতবর্ষী কলেজগুলোর শিক্ষার মান এখনো ভালো আছে। এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা ভালো অবস্থানে যাচ্ছেন। এ কলেজগুলো আরো ভালো করুক সে চিন্তা আমাদের অবশ্যই আছে। তবে আমরা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা কলেজগুলোয়। এসব কলেজে যাতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে আমরা জোর দিচ্ছি।

দেশে প্রতিনিয়ত উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন? এ সমস্যা নিরসনে করণীয় কী?

আমাদের দেশে কর্মবাজারের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের পঠিত বিষয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে। এ প্রভাবই আমরা কর্মবাজারে দেখতে পাই। এছাড়া আমরা সবাই চাকরির পেছনে ছুটি। ফলে অনেকে বেকার থেকে যাচ্ছি। এর পরিবর্তে আমরা যদি শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল শিক্ষা প্রদান করতাম তাহলে বিষয়টি সহজ হতো। তখন শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজের কর্মের ব্যবস্থা করতে পারত। আমার মনে হয় বেকারত্ব দূর করতে আমাদের তরুণদের টেকনিক্যাল শিক্ষা প্রদান করা এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর দেয়া উচিত। এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কলেজ রয়েছে, যার মধ্যে বেশির ভাগেই পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধা নেই। এসব কলেজের বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

আমাদের দেশে রিসোর্চের কিন্তু ঘাটতি নেই। ঘাটতি মূলত রিসোর্চগুলো সঠিক ব্যবহারের। দক্ষ শিক্ষকের বিষয়েই যদি বলি, তাহলে আমি বলব আমাদের দেশে অনেক মেধা রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক পাওয়া সম্ভব। যেসব বেসরকারি কলেজ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে পিছিয়ে আছে তাদের আমরা বন্ধ করে দেব, এমন পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা কলেজগুলোকে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য সময় দেব, কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে করব। এর পরও যদি কোনো কলেজ দক্ষ শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে তাহলে কঠোর পদক্ষেপ নেব। এছাড়া নতুন কোনো কলেজ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমরা উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশকে গুরুত্ব দেব। যেসব প্রতিষ্ঠান দক্ষ শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে তারাই অনুমোদন পাবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় নকলের অভিযোগের বিষয়টি আমরাও অবগত। দায়িত্ব গ্রহণের পরই বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করেছি এবং কঠোর অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ শিক্ষার মান নিশ্চিতে যথাযথ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ আইন কলেজের পরীক্ষাগুলোয় আমরা পরীক্ষার হলে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছিলাম এবং কোনো শিক্ষার্থী যাতে অনৈতিক পন্থা অবলম্বনের সুযোগ না পায় তা নিশ্চিত করেছি। আমাদের পরবর্তী সব পরীক্ষাও একই পদ্ধতিতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হয় সেটি আর থাকবে না বলেই আমরা আশাবাদী। এর বাইরে ব্যবস্থাপনার ঘাটতির যে বিষয়টি বলা হচ্ছে, সেটি নিয়েও আমরা কাজ করছি। আশা করি, এক্ষেত্রেও পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে।

সামগ্রিকভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়াতে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছেন?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিশ্চিতে আমাদের বেশকিছু পরিকল্পনা আছে। আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজের উদ্যোগ নিয়েছি। ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছি। এছাড়া আমরা আমাদের সব শিক্ষার্থীকে তাদের পঠিত বিষয়ের পাশাপাশি একটি টেকনিক্যাল কোর্স করানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরই মধ্যে এ বিষয়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সভা হয়েছে। সব ঠিক থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই এ কার্যক্রম শুর হবে। এটি চালু হলে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো একটি টেকনিক্যাল কোর্স বেছে নেবেন এবং সনদও পাবেন। আশা করা যায় কোর্সটি তাদের বেকারত্ব দূর করতে এবং কর্মক্ষেত্রে সফলতার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া আমরা সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করেছি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিংয়ে বেশ ভালা করছেন। বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা আমাদের অন্তত ৫০ নারী শিক্ষার্থীকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের একটি উদ্যোগ নিয়েছি। এক্ষেত্রে যদি তাদের কাছ থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় তাহলে আমরা পরে আরো বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেব। সামগ্রিকভাবে যদি বলি, তাহলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা, সুব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে বেকার না থাকেন এবং কর্মক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারেন সে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।