বেইজিং-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অবনমন বৈশ্বিক শিল্প খাতে প্রভাব ফেলছে। এ কারণে বর্তমানে অনেক কোম্পানি ব্যবসা খাতেও পরিবর্তন আনছে। চীনে আইফোন উৎপাদনকারী হিসেবে ফক্সকন বেশ পরিচিত। কিন্তু দুই দেশের দ্বৈরথে এ কোম্পানিও সেলফোন থেকে গাড়ি উৎপাদন ব্যবসায় মনোযোগ বাড়াচ্ছে। খবর বিবিসি।

তাইওয়ানের কোম্পানি ফক্সকন চীন থেকে কিছু সরবরাহ ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়েছে। আসন্ন দশকে কোম্পানিটির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) মাধ্যমে। তাইওয়ানের কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চেয়ারম্যান ইয়ং লিউ একটি স্বতন্ত্র সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন। মার্কিন-চীন উত্তেজনার কথা মাথায় রেখে ফক্সকনকে অবশ্যই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘‌আমরা আশা করি শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি দুই দেশের নেতারা মাথায় রাখবেন।’

তাইওয়ানকে অবরুদ্ধ করার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বেইজিং তাতে বাজে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও জানান তিনি। ফক্সকন হন হাই প্রযুক্তি গ্রুপ হিসেবে পরিচিত, যা ১৯৭৪ সালে যাত্রা করে। শুরুতে এটি টেলিভিশনের নব তৈরি করত। নব হলো গোল বোতাম, যা দিয়ে পুরনো প্রযুক্তির টেলিভিশনে ছবির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ স্ক্রিনের সঙ্গে সমন্বয় করা হতো। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানি, যার বার্ষিক আয় ২০ হাজার কোটি ডলার। 

ফক্সকনের সর্বাধিক জনপ্রিয়তার কারণ আইফোন নির্মাণ। আইফোন থেকে ম্যাক পর্যন্ত অ্যাপলের অর্ধেকের বেশি পণ্য তৈরি করে কোম্পানিটি। আবার পাশাপাশি মাইক্রোসফট, সনি, ডেল, অ্যামাজনও ফক্সকনের বড় ক্রেতা। কয়েক দশক ধরে এটি বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর নিখুঁত ছকে কাজ করে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য ডিজাইন করে, চীনে সেগুলো তৈরির পর বিশ্বে বিক্রি করেছে। এভাবেই এটি ছোট উপাদান তৈরির ব্যবসা থেকে আজ ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের জায়ান্টে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার তিক্ত সম্পর্কের কারণে ফক্সকন বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতির কাছে অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে পড়েছে। বাণিজ্য থেকে শুরু করে ইউক্রেনের যুদ্ধ পর্যন্ত অনেক বিষয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। তবে সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় বিবাদগুলোর একটি হলো তাইওয়ান, যেখানে ফক্সকনের সদর দপ্তর অবস্থিত।

তাইওয়ান দীর্ঘদিন একটি কণ্টকাকীর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়েছে। কিন্তু চীনা নেতা শি জিনপিং চীন ও তাইওয়ানকে একর্ত্রীকরণে বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছেন।

একাধিক মার্কিন মুখপাত্র চীনের নীতির তোয়াক্কা না করে তাইওয়ানকে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের আহ্বান জানায়। হোয়াইট হাউজ অবশ্য তাইপের চেয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গেই কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি আগ্রহী।

ফক্সকন উভয়ের সঙ্গেই ব্যবসা করতে চায়, কিন্তু কৌশলগত প্রতিযোগিতায় কেবল একজনই বিজয়ী হতে পারে। ফক্সকন যেহেতু প্রচুর কর্মী নিয়োগ করে তাই চীনসহ বেশির ভাগ দেশই তাদের কর্মীদের সমর্থন করতে চায় বলে মনে করেন লিউ। কিন্তু পশ্চিমা দেশ ও এর মিত্রদের চাওয়া হলো কোম্পানিগুলোকে চীনের প্রভাব থেকে ঝুঁকিমুক্ত” করা। চীনের ওপর বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা রোধ করার জন্য এটি এক দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ, যদিও তা এখনো কার্যকর হয়নি।

উল্লেখ্য, ফক্সকন বৈশ্বিক চাহিদার ৬০ শতাংশ আইফোন তৈরি করে। চীনের কারখানাগুলোয় ক্যামেরা মডিউল, সংযোজক, এমনকি ফোনের কেসিংয়ের পেছনের অংশসহ ডিভাইসের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু অংশ তৈরি হয়।