সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ২ ন্যানোমিটারের প্রসেসর আনতে যাচ্ছে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)। সর্বোত্তম ও সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তির এ চিপ ২০২৫ সালের মধ্যে গণ উৎপাদনে যাবে তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্টটি।

তাইওয়ানের সিনচুতে আয়োজিত একটি সিম্পোজিয়ামে টিএসএমসির সিইও সিসি ওয়েই নিশ্চিত করেন, ২০২৫ সালে পুরোদমে ২ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন শুরু হবে। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে ২ ন্যানোমিটারের প্রসেসর আনতে চাচ্ছে টিএসএমসির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং ও ইন্টেল। অবশ্য ৩ ন্যানোমিটারের চিপ আনার ক্ষেত্রে সবাইকে পেছনে ফেলে দিয়েছে স্যামসাং। চলতি মাসে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এ চিপ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে টিএসএমসির।

তাইওয়ানভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্টটি জানায়, ২ ন্যানোমিটারের প্রসেসরে সর্বাধুনিক গেট-অল-অ্যারাউন্ড (জিএএ) কাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে।

২ ন্যানোমিটারের প্রসেসর উন্মোচনের আগেই বাণিজ্যিকভাবে ৩ ন্যানোমিটারের চিপ আনছে টিএসএমসি। গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে ৩ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন শুরুর পর সম্প্রতি পুরোদমে উৎপাদনে যাচ্ছে তারা। ৩ ন্যানোমিটারের প্রসেসরে ফিনফিল্ড-ইফেক্ট-ট্রানজিস্টর (ফিনফেট) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এ থ্রিডি ট্রানজিস্টর কাঠামোর ফলে কম বিদ্যুতে চিপের কার্যক্রম দ্রুততর করা যায়।

সিনচু সিম্পোজিয়ামে টিএসএমসি সিইও ওয়েই জানান, ৩ ন্যানোমিটারের প্রসেসর উন্নয়নে অনেক জটিলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে টিএসএমসি। কিন্তু পুরোদমে উৎপাদন শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন গ্রাহক আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, অ্যাপলের নতুন ম্যাকবুক সিরিজে টিএসএমসির ৩ ন্যানোমিটারের প্রসেসর ব্যবহার করা হবে।

সিইও ওয়েই জানান, টিএসএমসিতে দুই হাজারেরও বেশি আরঅ্যান্ডডি ডিজাইন বিশেষজ্ঞ রয়েছে। তবে আমরা আমাদের নিজস্ব ডিজাইন বিপণনের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেই। বরং গ্রাহকদের দিকে আমাদের সহযোগিতার হাত প্রশস্ত।

সিম্পোজিয়ামে টিএসএমসি নেতারা আরো জানান, তিনটি নতুন কারখানায় তারা সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শুরু করবেন। তাইপে টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, কারখানা তিনটি তাইওয়ানের কাওসিউং, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা ও জাপানের কুমামতোতে নির্মীয়মান দুটি ফ্যাবের পাশাপাশি তাইওয়ানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কাওসিউংয়ে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন একটি কারখানা নির্মাণ শুরু হবে। তাইওয়ানের সিনচুতে আয়োজিত টিএসএমসির বার্ষিক প্রযুক্তি সিম্পোজিয়ামে এ তথ্য জানান টিএসএমসির ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াই এল ওয়াং। ফ্যাব ২২ হিসেবে পরিচিত কাওসিউং ফ্যাবে ২০২৪ সালের মধ্যে ৭ ও ২৪ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন শুরু করবে টিএসএমসি। অ্যারিজোনা ফ্যাবে ৫ ন্যানোমিটারের চিপ এবং কুমামতোতেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চিপ তৈরি করবে বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা কোম্পানিটি। স্মার্টফোন ও সার্ভারের মতো খাতে চাঙ্গা চাহিদার ওপর ভর করে ২০১৮ থেকে চলতি বছর নাগাদ টিএসএমসির অত্যাধুনিক চিপের সম্মিলিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার (সিএজিআর) ৭০ শতাংশ। চলতি বছরেও ৫ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন চার গুণের বেশি বাড়বে বলে জানান ওয়াং।

চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ৩ ন্যানোমিটারের অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে টিএসএমসির। ভোক্তা চাহিদা আমলে নিয়ে শিগগিরই তাইনান ফ্যাবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এ চিপ উৎপাদন করতে পারে তারা। সবার আগে ৩ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন করে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে স্যামসাং।

সিম্পোজিয়ামে টিএসএমসির সিইও সিসি ওয়েই বলেন, ৩ ন্যানোমিটার চিপের লক্ষণীয় চাহিদায় কোম্পানির প্রকৌশলীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহে অ্যাপল জানায়, তারা ম্যাকবুকের জন্য টিএসএমসির ৩ ন্যানোমিটারের প্রসেস নোড ব্যবহার করবে।

কমার্শিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি মাসে টিএসএমসি পুরোদমে ৩ ন্যানোমিটারের ওয়েফার উৎপাদন শুরু করবে। কয়েক বছর ধরেই কারখানার সংখ্যা বাড়িয়ে যাচ্ছে টিএসএমসি। ২০১৮-২২ নাগাদ প্রতি বছর গড়ে ছয়টি কারখানা স্থাপন করেছে তারা। তবে চিপ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে শীর্ষ নির্মাতা কোম্পানির। চীন, জাপান, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা চিপ নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফিনিক্সে ফ্যাব ২১ নামে সেমিকন্ডাক্টর কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করেছে টিএসএমসি। এতে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। কংগ্রেসে চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট পাসের ফলে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর ভর্তুকি ও কর রেয়াত পাওয়ার পথ প্রশস্ত হওয়ায় তার সুযোগ নিতে চাচ্ছে টিএসএমসির মতো সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট। পেশাজীবীদের সোশ্যাল সাইট লিংকডইনে আগস্টের শুরুতে এক ঘোষণায় টিএসএমসি জানায়, স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে ফ্যাব ২১-এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ করতে পেরেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির চিপ উৎপাদন শুরু করবে টিএসএমসি অ্যারিজোনা। ১৬ মাসের মধ্যে কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করেছে টিএসএমসি। এবার ২০২৪ সালের মধ্যে চিপ উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রে ৫ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদন যখন শুরু হবে তখন তাইওয়ানভিত্তিক কারখানায় ৩ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদনে যাবে টিএসএমসি। ২০২৬ সালের মধ্যে ২ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্টটির। চিপে প্রসেস নোডের সংখ্যা যত কমে ততই বাড়াতে হয় ট্রানজিস্টরের সংখ্যা। যত ট্রানজিস্টর বাড়বে তার ক্ষমতা ও জ্বালানি সক্ষমতা বাড়বে। অন্যভাবে বলতে গেলে অ্যারিজোনায় যখন চিপ উৎপাদন শুরু হবে ততদিনে অগ্রসর কারখানাগুলোর তুলনায় ২ প্রসেস নোড পিছিয়ে থাকবে ফ্যাব ২১। তবে এটা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।