বিশ্বের অনেক দেশে মন্দার আশঙ্কার মধ্যে চিপ বিক্রি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কমতে পারে। বেশ কয়েকটি দেশ সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ায় শিল্পোৎপাদন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ওয়ার্ল্ড সেমিকন্ডাক্টর ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকসের (ডব্লিউএসটিএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর সেমিকন্ডাক্টর খাতের প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে এ খাতের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৯ সালের পর যা সর্বনিম্ন।

ডব্লিউএসটিএস বলছে, প্রবৃদ্ধি কমলেও সেমিকন্ডাক্টর বাজার চলতি বছর ৬০ হাজার কোটি ডলার ছাড়াবে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে আগামী বছর বিক্রি ১২ শতাংশ হ্রাসের শঙ্কায় প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয় চিপ বিক্রি। ভোক্তা পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করে খাতটি। স্মার্টফোন, পিসি, বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য, গেমিং কনসোল, গাড়িসহ প্রায় সব ধরনের প্রযুক্তিপণ্যে চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কিন্তু বাজারে যদি এসব পণ্যের চাহিদা না থাকে তাহলে স্বভাবতই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চিপ কেনা কমিয়ে দেবে।

শীর্ষস্থানীয় মেমোরি চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজিসের এক পূর্বাভাসে বলা হয়, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে স্মার্টফোন বিক্রি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কম হতে যাচ্ছে। ভোক্তা চাহিদা কমার ফলে দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় সব স্মার্টফোন বিক্রেতা কোম্পানিরই বিক্রি কমবে। মাইক্রনের সিইও সঞ্জয় মেহরোত্রা বলেন, চলতি বছর স্মার্টফোন বিক্রি গত বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ কমতে পারে। যদিও চলতি বছর বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল, স্মার্টফোন বিক্রি আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ বাড়বে। মাইক্রনের পূর্বাভাস, চলতি বছর পিসি বিক্রি গত বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ কমতে পারে।

কিছু পিসি ও স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানি এরই মধ্যে গ্রাহক চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে তাদের মজুদ সমন্বয় করছে বলে জানান মেহরোত্রা। সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে মাইক্রন সিইও আরো বলেন, সংখ্যার অংকে দ্বিতীয়ার্ধে স্মার্টফোন বিক্রি কমতে পারে ১৩ কোটি ইউনিট।

মহামারীর দুই বছরে স্মার্টফোন ও পিসির চাহিদা চাঙ্গা থাকার পর সম্প্রতি শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। মাইক্রনের পূর্বাভাসে এর ইঙ্গিত স্পষ্ট। ঘরে থেকে কাজ ও ক্লাসের কারণে মহামারীর দুই বছরে স্মার্টফোন ও পিসির চাহিদা রেকর্ড সর্বোচ্চে দাঁড়িয়েছিল। অ্যাপল, মটোরোলা, আসুসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে মেমোরি চিপ সরবরাহ করে আসছে মাইক্রন। সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়াদেশ হ্রাসে মাইক্রনের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দ্বিতীয়ার্ধে স্মার্টফোন ও পিসি বিক্রি কমবে।

ডব্লিউএসটিএস বলছে, প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে জাপানে ২০২৩ সালে সেমিকন্ডাক্টর খাতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে, আমেরিকা অঞ্চলে ৪ দশমিক ৮ ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইউরোপে সেমিকন্ডাক্টর খাত সম্প্রসারিত হবে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার দাঁড়াবে ৬৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

গত মাসে চলতি বছরের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আগামী বছর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক পূর্বাভাসে বলা হয়, পরবর্তী ২৪ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মন্দায় পড়ার সম্ভাবনা ১০০ ভাগ।

চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মেমোরি চিপের চাহিদা কমার আশঙ্কা করছে এসকে হাইনিক্স। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ২০১৮-পরবর্তী সর্বোচ্চ মুনাফার পর এ পূর্বাভাস দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক কোম্পানিটির। এক বিবৃতিতে এসকে হাইনিক্স জানায়, দ্বিতীয়ার্ধে পূর্বাভাসের চেয়ে কম পিসি ও স্মার্টফোন বিক্রি হবে। এতে মেমোরি চিপের চাহিদাও কমবে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মেমোরি চিপ নির্মাতা কোম্পানিটি আরো জানায়, ডাটা সেন্টার গ্রাহকদের জন্য সার্ভার মেমোরি চিপের চাহিদাও কমবে।

ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, প্রধান অর্থনীতিগুলোয় মন্দা ভাব এবং চীনে নিয়মিত বিরতিতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি ও লকডাউনের ফলে স্মার্টফোন বিক্রি কমেছে। এতে দ্বিতীয়ার্ধে মেমোরি চিপের চাহিদা কমবে বলে মনে করে এসকে হাইনিক্স। গতকাল প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের উপাত্তে এসকে হাইনিক্স জানায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের পরিচালন মুনাফা ৫৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ওন বা ৩২০ কোটি ডলার। সার্ভার গ্রাহকদের উচ্চচাহিদার জেরে তাদের আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ওন।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিভিন্ন ডিভাইস ও সার্ভারে ব্যবহূত ডির্যাম চিপের চাহিদা প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। মাস খানেক আগেও বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল টিএসএমসি। বলা হচ্ছিল, আয়ের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্টটি। কিন্তু তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবেশের পর চিত্রপট পুরো পাল্টে গিয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা গিয়েছে, চিপ ক্রয়াদেশ কমিয়েছে অ্যাপল, এএমডি ও এনভিডিয়ার মতো টিএসএমসির শীর্ষ গ্রাহক। এতে চলতি বছরের আয়ের প্রাক্কলন সংশোধন করতে হচ্ছে তাদের।

মহামারীর প্রভাব কমলেও বিশ্বে নতুন বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে। বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়ছে মূল্যস্ফীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইলেকট্রনিক ভোক্তাবাজারে বিক্রিতে শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে রয়েছে টিভি, সেলফোন ও পিসি।