ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের ফলে নিয়ন গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সংকট দানা বাঁধছে। আড়াই বছর ধরে চলা করোনা মহামারীর কারণে এমনিতেই সেমিকন্ডাক্টর খাতে সংকট চলছিল। যার প্রভাব পড়েছে স্মার্টফোন, ব্যক্তিগত কম্পিউটার (পিসি), গাড়ি থেকে শুরু করে গৃহস্থালি ইলেকট্রনিকসে। খবর সিএনবিসি।

লিথোগ্রাফি হিসেবে পরিচিত চিপ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লেজারের জন্য নিয়ন প্রয়োজনীয়। ছোট্ট সিলিকনে প্রয়োজনীয় প্যাটার্ন খোদাইয়ে নিয়ন ব্যবহার করে স্যামসাং, ইন্টেল ও টিএসএমসির মতো সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট। বোস্টনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির সেমিকন্ডাক্টর বিশ্লেষক পিটার হ্যানবুরি জানান, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন সরবরাহ করে ইউক্রেনের হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি। কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে মারিওপোলভিত্তিক ইঙ্গাস এবং ওডেসাভিত্তিক ক্রাইঅয়েন ও আইসব্লিক। রুশ আগ্রাসনের পর থেকেই কারখানা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে ইঙ্গাস ও ক্রাইঅয়েন। সংঘাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তার প্রভাব পড়বে সরবরাহ চেইনে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেকচেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর সেমিকন্ডাক্টর খাতে বৈশ্বিক নিয়ন গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ ৫৪০ টনে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেন বিশ্বের অর্ধেক নিয়নের সরবরাহকারী দেশ হওয়ায় সংঘাত প্রলম্বিত হলে ২০২২ সালে নিয়ন ব্যবহার ২৭০ টনে দাঁড়াতে পারে।

চলমান বৈশ্বিক চিপস্বল্পতার কারণে এমনিতেই সরবরাহ চেইনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নতুন গাড়ি থেকে শুরু করে প্লেস্টেশন ৫-এর মতো গেম কনসোলের সরবরাহ পিছিয়ে যাচ্ছে। এখন বৈশ্বিক নিয়ন গ্যাসস্বল্পতা এ সংকট আরো বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহদাকার ইস্পাত উৎপাদনের উপজাত হিসেবে নিয়ন গ্যাস পাওয়া যায়। হ্যানবুরি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে চিপ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়নের ৯০ শতাংশ উৎপাদন হয় রাশিয়ায়। সেখান থেকে ইউক্রেনভিত্তিক কোম্পানিগুলোয় পরিশোধন করা হয়।

গার্টনারের বিশ্লেষক অ্যালান প্রিস্টলি সিএনবিসিকে জানান, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পা দিলেও চিপ শিল্পে এখনো বড় কোনো সংকট দেখা দেয়নি। বেশির ভাগ চিপ নির্মাতা কোম্পানির হাতে কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় নিয়ন গ্যাস মজুদ রয়েছে। কিন্তু সংকট প্রলম্বিত হলে নিশ্চিতভাবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।

ইন্টেলের এক মুখপাত্র সিএনবিসিকে জানান, পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত সরবরাহ চেইনে কেমন প্রভাব রাখবে তা খতিয়ে দেখছে ইন্টেল। তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট টিএসএমসি এ ইস্যুতে মন্তব্যে অপারগতা প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক মেমোরি চিপ ও প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাংয়ের কাছ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি সিএনবিসি।

একটি শিল্প উপকরণের জন্য কোনো বিশেষ একটি অঞ্চলে নির্ভরশীলতার বৈশ্বিক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক থাকার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রাইমিয়া দখলের সময়ও এ নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে। এখন গ্যাস সরবরাহকারী থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতাদের কাছে তিন থেকে ১২ মাসের নিয়ন গ্যাস মজুদ থাকে বলে জানান হ্যানবুরি।

ইউক্রেনের নিয়নের ওপর নির্ভরশীলতা ২০ শতাংশের মতো কমিয়ে এনেছে ডাচ কোম্পানি এএসএমএল। তারা চিপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ জটিল লিথোগ্রাফি মেশিন সরবরাহ করে। ওই লিথোগ্রাফি মেশিনে লেজারের জন্য নিয়ন গ্যাস প্রয়োজনীয়।