আমার হার্প বাজতেই থাকবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যাদের পরিচিতি আছে, হার্প দেখেননি কিংবা ইচ্ছেতে হোক কি অনিচ্ছায় হার্পবাদন শোনেননি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

প্রায় ৩০ বছর আগে আমার চার বছরের বিলেত জীবনে হার্প নামের প্রায় ম্যান-সাইজ (উইমেন সাইজও বলা যায়) পেডাল হার্পের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ভূগর্ভস্থ টিউব স্টেশনে। সামনে হ্যাট ফেলে বহুসংখ্যক তারের এই যন্ত্রে দুই হাতের আঙুল চালিয়ে একজন শিল্পী (কিংবা ভিক্ষুক) সুর ছড়িয়ে যাচ্ছেন। এক-দুই দণ্ডের জন্য থেমে কেউ বিলেতি সিকি কিংবা আধুলি টুপির ভেতর ছুড়ে দিয়ে দ্রুত ট্রেনে উঠে পড়ছেন। আমার মতো আদেখলেপনা নিয়ে এক-দুজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে যতটা শুনছেন তার চেয়ে বেশি দেখছেন।

যন্ত্রের কাঠামো দেখে এটা অন্তত বুঝলাম এ বাদ্যযন্ত্রটি ভাঁজ করা যায় না, সহজে বহন করারও কথা নয়। শিল্পী হোন কি ভিক্ষুক টানাটানিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। অল্পদিনের মধ্যই ছোট ও সহজে বহনযোগ্য হার্পেরও দেখা পাই।

সাউথ কেনসিংটন টিউব স্টেশনে হার্পিস্ট পিটার মার্ফি অনেক দিন ধরে বাজাচ্ছেন। এমন জায়গায় দীর্ঘদিন অবস্থান তাকে যেমন সবার সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে, তিনিও পরিচিত হয়েছেন অনেকের সঙ্গে। কিন্তু দিনের পর দিন তিনি বাজিয়ে যাচ্ছেন একই সুর—টাইটানিক সিনেমার বিখ্যাত থিমসং ‘মাই হার্ট উইল গো অন’। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট অভিনীত টাইটানিকের এ গানটি গেয়েছেন সেলিন ডিওন, ১৮ মিলিয়ন রেকর্ড বিক্রি হয়েছে গানটির আর চোরাই সংস্করণে ও অবৈধ ডাউনলোডে যে কত মিলিয়ন নেমেছে তার হিসাব নেই।

৬২ বছর বয়স্ক পিটার মার্ফিকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করে বের করে দেয়ার চেষ্টা চলছে, কারণ দিনরাত তার একই সুরে সবাই ক্লান্ত বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। কারো ভাষ্য পিটার মার্ফি এ সুর ছাড়া অন্য কিছু বাজাতে জানেন না কিন্তু তা সঠিক নয়। তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি অভিজাত বিলেতি পত্রিকায় সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনেকের চোখে পড়েছে। ৪২ বছর বয়সে অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরি ছেড়ে তিনি হার্প বাজাতে শুরু করেন। তিনি একসময় হোটেল রিত্জ, লিডস ক্যাসল ও কাফে দ্য প্যারিস, এমনকি বাকিংহাম প্যালেসেও বাজিয়েছেন। পিটার মার্ফি মনে করেন এই স্টেশনই তার জীবিকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। অন্যদিকে কাউন্সিলের বক্তব্য তাকে ঘিরে যে জটলা তা সরাতে ১ হাজার ২০০ আবেদন জমা পড়েছে। কেনসিংটন ও চেলসি কাউন্সিল বলছে তারা সৃজনশীলতা সীমিত করে চাইছে না, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য স্টেশনের অভ্যন্তরীণ পরিসর বাড়াচ্ছে। অন্য একজন পথশিল্পী টেরি ফক্স বলছেন, পিটার অসাধারণ। তিনি অনেক বেশি টাইটানিক থিম সং বাজান, কিন্তু তা পরিবেশে প্রশান্তি রেখেছে। ছবি দেখে আঁচ করেছি তার হার্পটির আকার প্রথম দেখা ৬ ফুট বা তার বেশি উচ্চতার পেডাল হার্প নয়। এখন অনেক আকার ও ধরনের হার্প শিল্পীদের সামনে। তারা তাদের পছন্দমতো নিয়ে বাজাচ্ছেন। পিটার মার্ফির নিরুদ্বেগ অবয়ব দেখে দ্য গার্ডিয়ান তাকে নিয়ে যে সংবাদ ছেপেছে, তার শিরোনাম দিয়েছে ‘মাই হার্প উইল গো অন’।

জেমস হোমার ও উইল জেনিংসের লেখা টাইটানিকের সেই গানটির কয়েকটি স্তবক উদ্ধৃত করছি:

You’re here, there’s nothing I fear

And I know that my heart will go on

we’ll stay forever this way

You are safe in my heart and

My heart will go on and on.

একইভাবে হার্প থাকবে, হার্পের সুরও বাজতে থাকবে বছরের পর পর। কত পুরনো হার্পের ইতিহাস? আট হাজার বছর আগের দেয়ালচিত্রে হার্পসদৃশ একটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, পাঁচ হাজার বছর আগের মিসরে ফ্যারোর আমলে হার্পই ছিল তার বহু নজির আছে, তবে নামটা এসেছে অনেক পরে ত্রয়োদশ শতকে।

দান্তে, শেকসপিয়ার, শেলি, কোলরিজ, বিংশ শতাব্দীর উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস সবার লেখাতে হার্প ফিরে ফিরে এসেছে। শেলি বলেছেন, এ সুর বেহেশতি মেলোডি, ক্রিস্টিনা রোসেটির কাছে ‘সো সুইট অ্যান্ড স্ট্রেঞ্জ’; দান্তে দেখিয়েছেন অন্তরের অতিকায় হার্প থেকেই ভালোবাসা উৎসারিত হয়।

হার্প গবেষকদের কেউ কেউ একে পৃথিবীর প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্র আখ্যা দিয়েছেন। এর ব্যবহারের বয়স আনুমানিক ৫ হাজার বছর নির্ধারণ করেছিলেন। তবে এর উদ্ভব এবং বিকাশ যে ইউরোপের বাইরে নয়, এ দাবিটা বেশ পুরনো। কেউ কেউ গণিতের বিখ্যাত পিথাগোরাসকে এর উদ্ভাবক দাবি করেছেন এবং তার আবিষ্কার প্রাচীন ভারতীয় যন্ত্রের অনুরূপ বলে মন্তব্য করেছেন। কেউ জোর দিয়ে বলেছেন হার্প মিসরীয় সভ্যতার দান। সেক্ষেত্রে তা আফ্রিকান ইলেকট্রিক্যাল মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট সনাতন বাদ্যযন্ত্রের ওপর বড় আঘাত হানলেও এখনো লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়া এবং ইউরোপেও হার্প উৎসব ও উদযাপন অব্যাহত রয়েছে। ২০১৩ সালে প্যারাগুয়ে ফেস্টিভ্যালের কনসার্টে সর্বাধিক ৪২০ জন হার্পবাদক একসঙ্গে অংশগ্রহণ করে একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন।

হার্পের জনপ্রিয়তার একটি নজির প্রচীন মিসরে স্পষ্ট। অনেক কবরের দেয়ালে হার্পসদৃশ বাদ্যযন্ত্র খোদাই করা আছে। এশিয়ায় পারস্যে মধ্যযুগে হার্পের কদর ছিল, অমল দাসগুপ্ত ‘সঙ্গীত মনীষা’-তে উল্লেখ করেছেন: প্রসিদ্ধ আমীর খসরু তার ‘মীরাহ-ই-ইস্কান্দার’ কবিতায় হার্প এবং এর সুর-ঝংকারকে স্বর্গের সৃষ্টি বলে বর্ণনা করেছেন। ফার্সি ভাষায় হার্পকে ‘চাঙ্ক’ ও আরবিতে ‘জাঙ্ক’ বলা হতো।

ভারতীয় স্বরমণ্ডল ও হার্প কাছাকাছি চরিত্রের বাদ্যযন্ত্র। পণ্ডিত যশরাজ, বড়ে গোলাম আলী খান, সালামত আলী খান, কিশোরী আমোনকার, রশীদ খান প্রমুখ ২১-৩৬ তারের হার্প-অনুরূপ যন্ত্রটি ব্যবহার করেছেন।

আর গ্রিক পুরাণের আর্ফিয়ুসের ‘লায়ার’কে অনেকে মনে করেন হার্পের পূর্বসূরি।

হার্পের বিভিন্ন তার শনাক্ত করার জন্য হার্পের তারে তিন রঙের ব্যবহার শুরু হয় উনবিংশ শতকে—লাল, নীল বা কালো এবং বাকিগুলো বর্ণহীন।

‘আর্থ হার্প’ উইলিয়াম ক্লোজের তৈরি বৃহত্তম হার্প, উচ্চতা চারতলা ভবনের সমান। তারগুলো আশপাশে ভবনের সঙ্গে বাঁধা। নির্মাতা নিজেই এটা বাজিয়ে থাকেন। তিনি আশা করছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হার্প হিসেবে তার হার্প গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ঠাঁই করে নিতে পারবে।

স্কটিশ ও আইরিশ হার্প


স্কটিশ আইল অব স্কাই-তে পাওয়া তারের যন্ত্র লায়ার খ্রিস্টজন্মের ৩০০ বছর আগেকার। তবে ত্রিকোণাকৃতি ফ্রেমের সবচেয়ে পুরনো আবিষ্কৃত পিকটিশ হার্প অস্টম শতকের বলে নিশ্চিত হয়েছে। ঘোড়ার লেজের চুল দিয়ে এ হার্পের তার বাঁধা হতো। এ হার্প অ্যাংলো-স্যাক্সনদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে, এখান থেকেই আয়ারল্যান্ডে যায় বলে স্কটিশদের দাবি। একাদশ শতক পূর্ববর্তী ইউরোপে ১৩ ধরনের হার্পের বিবরণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১২ ধরনের হার্প তৈরি হতো স্কটল্যান্ডে। কাজেই স্কটিশ দাবি অযৌক্তিক মনে হয় না। তাছাড়া হার্প শব্দটিও সেখানেও ব্যবহূত হতো না। প্রাচীন হার্প ‘ক্রুট’ নামে পরিচিত ছিল। একাদশ শতকের শেষ ভাগের আগে প্রকৃত তিনকোণা হার্প আয়ারল্যান্ডে দেখা যায়নি।

‘ডেভিড হার্প বাজাচ্ছেন’-এ নামের যত পেইন্টিং ইউরোপের জাদুঘরে আছে (রুবেন্স ও রেমব্রান্টও এঁকেছেন), তার হাতে শিল্পীরা যে যন্ত্রটি তুলে দিয়েছেন তা হার্প নয়, হার্পের পূর্বসূরি লায়ার।

দশম শতক পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে যত হার্প পাওয়া গেছে, তার সবই লায়ার। হার্প এ পূর্বসূরির কাঠামোকে অবলম্বন করেই গড়ে ওঠে। আইরিশ হার্পের ইতিহাস প্রায় এক হাজার বছরের। কিন্তু ইংরেজদের বিজয়ের পর আইরিশ সংস্কৃতির জীবনে দুর্ভাগ্য নেমে আসে। আঘাত আসে হার্পের ওপর।

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছে হার্প—ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে জেগে উঠেছে বটে, তবে সুরের রাজ্য এখন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির দখলে চলে গেছে। সুতরাং ইলেকট্রিক হার্প বাজার নিয়ে নিয়েছে। সনাতন হার্প এখন জাদুঘরমুখী।

তবু শিল্পীর প্রত্যাশা ‘মাই হার্প উইল গো অন অ্যান্ড অন’।

হার্প সম্পর্কে সাধারণ তথ্য

হার্প সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীনতম সংগীতযন্ত্র। কোনো কোনো হার্প একক কাষ্ঠখণ্ড থেকে তৈরি, কোনো কোনোটিতে দুই হাজার টুকরার সমন্বয় করা হয়েছে। হার্পের তিনটি প্রধান অংশ কাঁধ, সাউন্ড বক্স ও তার। হার্প ২-৬ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। ষোল শতকে ইংরেজদের আয়ারল্যান্ড শাসনের সময় হার্পবাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বহু সংখ্যক হার্প পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল এবং হার্পবাদকদের কাউকে কাউকে হত্যাও করা হয়েছিল। উনিশ শতকে আইরিশ লোকশিল্পীরা হার্পকে পুনরুজ্জীবিত ও জনপ্রিয় করে তোলে। বার শতকে আয়ারল্যান্ড হার্পকে তাদের জাতীয় প্রতীক ঘোষণা করে। বিভিন্ন সাংগীতিক ধরন ও শৈলীতে হার্পের ব্যবহার রয়েছে। ক্ল্যাসিক্যাল অর্কেস্ট্রা, কেলটিক আফ্রিকান, রক, ব্লু গ্রাম, কান্ট্রিসং, ফোক, জাজ ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় ধরনের হার্পের ব্যবহার আফ্রিকায়। ব্লুজ হার্প, জ্যুস হার্প আসলে হার্প নয়, এসব যন্ত্রের জন্য হার্প নামটি কেবল গ্রহণ করা হয়েছে। হার্পে তারের সংখ্যা ১-১০০ হতে পারে। ইতিহাসের সেরা কয়েক জন হার্পবাদক হচ্ছেন কিং ডেভিড, তুরলোগ ও’ক্যারোলিন, ফ্রাঁসোয়া জোসেফ ল্যাদেরম্যান, ইলিয়াস আলভারাম, আলফোসে হেসেলম্যান, হেনরিয়েত্তে রেনি, কার্লোস সালজেদো, হার্জো মাক্স।

হার্প নিষিদ্ধ হলো, ফাঁসিতে ঝোলানো হলো হার্পবাদকদের

আইরিশদের জাতীয় অহংকার ও জাতীয়তাবোধের প্রতীক হার্পকে মোকাবেলা করতে হলো দখলদার ইংরেজদের। দ্বাদশ শতকে অ্যাংলো নরম্যান আক্রমণ পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করে দিল। আইরিশ রাজদরবারে যেসব দক্ষ বিশ্বমানের হার্পবাদক ছিলেন, তাদের স্থানচ্যুত করে সেখানে ইংরেজদের ঢুকানো হলো। কর্মচ্যুত হার্পবাদকরা শিল্পের আকর্ষণে ও জীবিকার টানে একই ধরনের কাজের সন্ধানে এক দরবার থেকে অন্য দরবারে আসা-যাওয়া করতে লাগলেন। তাদের প্রতিহত করতে ইংরেজরা এ শিল্পীদের আখ্যা দিল গুপ্তচর। রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় ১৬০৩ সালের ডিক্রি অনুযায়ী হার্পবাদকদের ফাঁসিতে ঝোলানো এবং হার্প আগুনে পোড়ানোর অনুমোদন দেয়া হলো। এদিকে বৈপরীত্য হচ্ছে ইংরেজরা হার্পবাদন পছন্দ করত এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে হার্পবাদক নিয়োগও দিত। রানী এলিজাবেথেরও একজন ব্যক্তিগত হার্পবাদক ছিল। রানীর পর ক্রমওয়েল ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের প্রতি আরো নির্মম হয়ে ওঠেন এবং তাদের প্রায় শেষ করে দেন। উনবিংশ শতকের শুরু পর্যন্ত পৌঁছতেই আইরিশ হার্পবাদকরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন। স্কটল্যান্ড আক্রান্ত হলে স্কটিশ হার্পবাদকরা উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে গা ঢাকা দেন। তবে ১৭৪৫-এর কুলোডন যুদ্ধের সময় তাদেরও প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। ১৭৮১ সালে এক কোপেনহেগেনবাসী জেমস ডানগান প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসা হার্প শিল্পীদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। প্রথম বছর ছয়জন, দ্বিতীয় বছর আটজন এবং তৃতীয় বছর ১০ জন হার্পবাদক যোগদান করেন। এডওয়ার্ড বান্টিং নামের একজন অর্গান বাদককে দিয়ে সবার সুর লিখিয়ে নেয়া হয়। একালে যদিও নারী হার্পবাদকের সংখ্যা বেশি, কিন্তু তখনকার কেবল রোজ মুনি ছাড়া বিখ্যাত আর কারো কথা শোনা যায় না। গবেষকদের ব্যাখ্যা হচ্ছে নারীবাদক অনেক থাকলেও তারা পেশাজীবী হার্পবাদক হয়ে ওঠেননি, তাছাড়া তখনকার সমাজ নারীদের অর্থ দেয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। ফলে তাদের নাম প্রচারিত হয়নি। আরো একটি লক্ষণীয় বিষয়, আইরিশ হার্পবাদকের বেশ কয়েক জন ছিলেন অন্ধ। বেলফাস্টের ১০ জন সেরা বাদকের ছয়জনই অন্ধ ছিলেন, এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি। তবে গুটি বসন্তের প্রকোপ ছিল, স্কারলেট ফিভার ও হামও প্রায়ই মহামারীর আকারে দেখা দিত।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাদের সামাজিক মর্যাদা। বলা হয়ে থাকে রাজা ও বিচারকের পরই ছিল হার্পবাদকের অবস্থান। তবে সংগীত ও বাদন শিল্পীদের মধ্যে তারা যে সর্বোচ্চ আসনে ছিলেন এটা মেনে নেয়া হয়। ইংরেজদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নির্মম বলি হয়েছেন আইরিশ হার্পবাদকরা। ইংরেজদের জন্য এটা ছিল আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করার একটি ধূর্ত ও অমানবিক ফন্দি। তবে কেবল হার্পবাদকরাই নিহত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন এমন নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে হেনস্তা করে ইংরেজরা তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। তখন আইরিশ ভাষায় কথা বলাও নিষিদ্ধ করে শিক্ষিত হতে, এমনকি তাদের বিয়েতে বাধার সৃষ্টি করে। ১৬৫০-৬০ নাম ক্রমওয়েলের রাজত্বের এ সময়টি হার্পবাদকরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হন। তার পরও আশার কথা আইরিশ ও স্কটিশ লোকসংস্কৃতির এ বিশেষ বাদনযন্ত্রটিকে তাদের শিল্পীরা পুনরুজ্জীবিত করতে পেরেছেন। হার্প নামের প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র এবং ইংরেজদের চেয়ে অধিকতর সভ্য আইরিশদের হাজার বছরের ইতিহাসে গৌরব ও বেদনা অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে। ১৫৩৪ সালে অষ্টম হেনরির শাসনামলে আইরিশ মুদ্রায় হার্প খোদিত করা হয়। কিন্তু সপ্তদশ শতকের ইংরেজ প্রভুরা টিউনিং দ্য হার্প মানে বদলে দেয়। এটার মানে তখন দাঁড়ায় নিয়ন্ত্রণের ফাঁকফোকর মেরামত করা, এটি হয়ে ওঠে উপনিবেশবাদী শব্দালঙ্কার। যে জাতির ওপর টিউনিং দ্য ফর্ক প্রয়োগ করবে তাদের কঠোর নিপীড়নের শিকার হতে হবে।

হার্পের জন্য রচিত শ্রেষ্ঠ সংগীত

মোৎসার্ট একটি রচনা করেছেন তাই হয়ে উঠেছে মাস্টারপিস। এর নাম কনসার্টো ফর হার্প ফ্লুট অ্যান্ড অর্কেস্ট্রা। হ্যান্ডেল লিখেছেন কনসার্টো ফর হার্প অ্যান্ড অর্কেস্ট্রা। ডি ফেলার রচনা স্প্যানিশ ড্যান্স অন দ্য হার্প, জন ইমাস লিখেছেন ওয়াচিং দ্য হুইট জোনিজেডির হার্প সলো ফ্রম লুসিয়া দি ল্যামারমুর।

সম্মানের আসনে হার্প

হার্পকে ইউরোপে অত্যন্ত উঁচু দরের বাদ্যযন্ত্রের সম্মান দেয়া হতো। আয়ারল্যান্ডে রাজা ও বিচারকের পরই ছিল হার্পবাদকের স্থান। ব্রিটেনের মানুষ কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ ও সংগীতযন্ত্রী হার্পিস্টকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখত। হার্প তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। রাজপরিবারের জন্য সংগীত শিক্ষা ও স্পেনসার্ডদের জন্য এবং গণমান্য সম্প্রদায়ের জন্য। দাসগোত্রভুক্ত শিল্পীদের হার্প ধরতে দেয়া হতো না (সংগীত মনীষা)। চার্চ ও এলিট সমাজের হাত থেকে হার্প মুক্ত হয়েছে বড়জোর ২০০ বছর আগে।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা