হার্প আদতে
কী?
‘হার্প
মূলত একাধিক
তারসংবলিত ত্রিভুজাকৃতির
একটি বাদ্যযন্ত্র।
হাত দিয়ে
বাজাতে হয়।’
যেকোনো ইংরেজি
অভিধান খুললেই
হার্পের এ
শব্দার্থ বা
সংজ্ঞা নজরে
আসবে ঠিক।
কিন্তু এখানে
সাংগীতিক ইতিহাসের
এই গুরুত্বপূর্ণ
তথ্যটুকু নেই
যে হার্পই
হলো পৃথিবীর
আদিতম বাদ্যযন্ত্র।
আনুমানিক ৩০০০
খ্রিস্টপূর্ব সময়ে
মেসোপটেমিয়া ও
ইরানে হার্প
বাজানো হতো,
এমন প্রত্নতাত্ত্বিক
প্রমাণ পাওয়া
যায়। ওই
সময় যে
হার্পের দেখা
মেলে, তা
শিকারের কাজে
ব্যবহূত ধনুক
থেকে তৈরি
বলে ধারণা
করা হয়।
ওই হার্পের
অবয়ব ছিল
একটি মাত্র
কাঠের টুকরোয়
গড়া। এর
প্রায় হাজার
বছর পর
ব্যবহূত যে
নতুন প্রকৃতির
হার্পের নিদর্শন
আমাদের সামনে
হাজির হয়েছে,
তাতে একটি
মৌলিক পরিবর্তন
দেখা যায়।
তা হলো,
সেখানে একটির
বদলে দুটি
কাঠের টুকরো
একটি বিশেষ
কোণে জুড়ে
দিয়ে হার্পটি
তৈরি হয়েছে।
একেই বলা
হলো ‘কৌণিক’
বা ‘অ্যাঙ্গুলার’
হার্প। এরপর
হার্পের ক্ষেত্রে
বড় পরিবর্তনটি
আসে আনুমানিক
৮০০ খ্রিস্টাব্দের
দিকে। হার্পের
কাষ্ঠনির্মিত দুই
অংশের সঙ্গে
একটি নিরেট
স্ট্যান্ড বা
পিলার জুড়ে
দিয়ে এর
কাঠামোকে আরো
শক্তপোক্ত করা
শুরু হলো
তখন থেকেই।
নানা দেশ,
নানা রূপ
প্রাচীন পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় বা সভ্যতায় হার্পের ব্যবহার দেখা গেছে। তবে সভ্যতাভেদে তা মূল কাঠামো ঠিক রেখেও খানিক অন্য রকম রূপ নিয়েছে সংগত কারণেই। ধনুকের মতো বক্র বা ‘আর্চড’ হার্প মুখ্যত পাওয়া গেছে মেসোপটেমিয়া, ইরান ও মিসর এলাকায়। এর মাঝে মেসোপটেমিয়া এলাকায় আর্চড হার্প ব্যবহার উঠে গিয়ে প্রচলন ঘটেছিল অ্যাঙ্গুলার হার্পের। কিন্তু মিসরে আর্চড হার্পের ব্যবহার তখনো চালু ছিল। ওই সময় মেসোপটেমিয়ার টেরাকোটা চিত্রে অ্যাঙ্গুলার আবার আকৃতিগত দিক থেকে দুই কিসিমের হার্পের দেখা মেলে। একটি হলো উল্লম্ব এবং আরেকটি আনুভূমিক। বাজানোর কৌশল ও যান্ত্রিক গঠনের দিক থেকে দুটির মধ্যে তফাত বিস্তর। উল্লম্ব হার্পের তারের সংখ্যা বেশি, ২০টির মতো। আর আনুভূমিকে এর প্রায় অর্ধেক, ১০-১২টির বেশি নয়। মিসরে ব্যবহূত আনুভূমিক কাঠামোর হার্পের তারের সংখ্যা ছিল এর চেয়েও কম, মাত্র পাঁচ-ছয়টি। উল্লম্ব হার্প আঙুলের আঘাতে বাজানো হলেও আনুভূমিক হার্পগুলো মেজরাব (তারে আঘাত করার সহযোগী কাঠ বা পাথরের মসৃণ টুকরো) দিয়ে বাজানো হতো। সময়ের বিবর্তনে মেসোপটেমিয়া বা ইরান থেকে ধনুকসম হার্প উধাও হয়ে গেলেও তা ভারতীয় উপমহাদেশ ও মিসরে টিকে যায়। আর্চড হার্পের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারের সম্পর্ক আছে বলে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন। প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলায়ও হার্পের দেখা মেলে। গৌতম বুদ্ধর জীবন নিয়ে আঁকা একাধিক ছবিতে দেখা মেলে হার্প বা হার্পবাদকের।
মঙ্গোলীয়রা কী
করে হার্পকে
আত্মস্থ করে
নিল সে
আরেক কাহিনী।
পারস্য ও
ইরাকে আক্রমণ
করার পর
মোঙ্গল সেনারা
তুমুল ধ্বংসযজ্ঞ
চালালেও সেখানকার
সংস্কৃতিকে আত্মস্থ
করে নিয়েছিল।
মোঙ্গলরাও এরপর
হার্পের সুরে
মজেছে। মোঙ্গল
শাসনামলে পারস্য
থেকে ফেরদৌসীর
মহাকাব্য ‘শাহনামা’
ও নিজামির
‘খামসা’
কাব্যগ্রন্থের যে
চিত্রিত সংস্করণ
প্রকাশ পায়,
তাতেও একাধিক
চিত্রে হার্পের
উপস্থিতি লক্ষণীয়।
এমনকি নিজামির
‘খামসা’য়
অন্তর্ভুক্ত একটি
কাহিনীকাব্য ‘সাত
তসবির’-এর
মূল চরিত্র
বাহরাম গোরের
প্রেমিকা আজদাহ
হার্প বাজাতেন—এমস
বর্ণনাও মেলে।
‘সাত
তসবির’-এর
অন্যান্য অংশেও
একাধিক রাজানুগ্রহে
পালিত হার্পবাদকের
উল্লেখ রয়েছে।
ইরান-ইরাক
পার হয়ে
সাম্প্রতিক অতীতের
সোভিয়েত প্রাচ্য
বা মধ্য
এশিয়ার নানা
অঞ্চলেও হার্প
পৌঁছে গিয়েছিল।
প্রথমে গোলাকৃতির
কোণসমৃদ্ধ হার্পের
প্রচলন ঘটলেও
পরে সেখানে
তীক্ষ
কোণসংবলিত হার্প
জনপ্রিয় হয়।
ষোড়শ শতাব্দীর
বুখারা শহরের
সংগীতজ্ঞ দরবেশ
আলী চাঙ্গি
(১৫৫০-১৬২০)
তার ‘সংগীতশাস্ত্র’
শীর্ষক গ্রন্থে
লিখেছিলেন, ‘হার্প
হলো সব
বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে
কুলবধূ’।
চাঙ্গির চেয়ে
বয়সে খানিক
ছোট তুরস্কের
লেখক এলিয়া
চেলবি (১৬১১-১৬৬৯)
তার লেখায়
হার্পের উল্লেখ
করেছিলেন। তা
থেকে বোঝা
যায়, তখন
তুরস্কেও হার্প
বাজানো হতো।
চেলবি আরো
লিখেছিলেন: ‘হার্প
যন্ত্রটি উদ্ভাবন
করেছিলেন পিথাগোরাস,
সলোমনকে প্রবোধ
দেয়ার উদ্দেশ্যে।
এতে ৪০টি
তার আছে
এবং এর
সুর বিস্ময়কর।
তবে এ
যন্ত্র খুব
কম লোকই
বাজাতে পারে,
কারণ এটি
বাজানো খুব
কঠিন। [এখানে]
মাত্র ১০
জন নির্মাতা
রয়েছে দুটি
দোকানে, যারা
হার্প নির্মাণ
করে এবং
বাজিয়েও রয়েছে
১০ জন।’
সিল্করোডে বাণিজ্য
বিস্তারের সূত্র
ধরেই চীন
ও পূর্ব
এশিয়ায় হার্পের
প্রচলন ঘটেছিল।
হান শাসনামলে
চীন দেশে
বণিকরা অ্যাঙ্গুলার
হার্প নিয়ে
এসেছিলেন। কিন্তু
হান শাসনামল
গত হওয়ার
পর হার্পও
চীন থেকে
উধাও হয়ে
যায়। কিন্তু
চীন থেকেই
তা জাপানে
পৌঁছে গিয়েছিল
এবং এখনো
তা জাপানে
দারুণভাবে বিরাজমান।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায়
এখন ইলেকট্রিক
হার্পও জাপানের
বাদ্যযন্ত্র নির্মাতারা
তৈরি করছেন।
আধুনিক কালে
হার্প
আধুনিক
কালে হার্প
ব্যবহারে ইউরোপীয়
সংগীত সবচেয়ে
বেশি দক্ষতা
দেখিয়েছে বলে
ধারণা করা
হয়। বিশেষ
করে আয়ারল্যান্ডের
হার্প বাজনার
খ্যাতি ওই
সময় অন্য
রকম উচ্চতা
পেয়েছিল। ১৭
ও ১৮
শতকে ইউরোপে
হার্পের একটা
ভিন্ন পরিচিতি
গড়ে উঠেছিল
‘অন্ধের
বাদ্যযন্ত্র’ বলে।
এমন পরিচয়ের
মূল উৎস
সম্ভবত ছিলেন
কিংবদন্তিতুল্য আইরিশ
অন্ধ হার্পবাদক
টুর্লো ও’ক্যারোলান
(১৬৭০-১৭৩০)।
তার জনপ্রিয়তা
সেকালে ছিল
তুঙ্গে। এছাড়া
ইউরোপের ছোট-বড়
নানা শহরের
রাস্তায় দেখা
মিলত মুখ্যত
পুরুষ অন্ধ
অসহায় হার্প
বাজিয়েদের, যারা
কিনা হার্পে
সুর তুলে
পথচারীদের মনোরঞ্জন
করে কিছু
পয়সা রোজগারের
চেষ্টা করতেন।
তখন স্মলপক্সের
দৌরাত্ম্যে অনেক
মানুষই দৃষ্টিশক্তি
হারিয়েছিলেন। তাদের
জীবিকার ক্ষেত্রে
তাই বড়
সহায় হয়ে
উঠেছিল হার্প
বাজনা। আইরিশ
একাধিক অন্ধ
হার্পবাদক ওই
সময় আমেরিকা
ও কানাডার
নানা শহরে
গিয়ে হার্প
বাজিয়ে জনতার
মনোরঞ্জন করে
জীবিকা গড়ে
নিয়েছিলেন, ইতিহাসে
এমন নজির
দুর্লভ নয়।
যদিও ১৮
শতকের গোড়ায়
টুর্লোর মৃত্যুর
পর হার্পের
প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা
অন্যদিকে নিভু
নিভু হয়ে
যাচ্ছিল। পরে
ওই শতকের
শেষার্ধে উত্তর
আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট
শহরে হার্প
সোসাইটি গড়ে
তোলা হয়।
তাদের তরফ
থেকে হার্প
ফেস্টিভ্যালের আয়োজন
করা হয়েছিল
১৭৯২ সালের
১১ থেকে
১৩ জুলাই
অবধি। বলা
যায়, ওই
আয়োজন আইরিশ
হার্পের ঐতিহ্যকে
নতুনভাবে একটা
ঝাঁকুনি দিল।
তারপর তো
হার্পের জয়জয়কার
ইউরোপীয় সংগীতের
নানা ক্ষেত্রজুড়েই।
[র্যাচেল
পিককের ‘HARP OF
WILD AND DREAM LIKE STRAIN’ ও
বো লয়্যারগ্রিনের
‘Angular Harps Through the Ages’ গবেষণাপত্র
দুটি থেকে
তথ্য নিয়ে
নিবন্ধটি রচিত]
শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক





