আমি সম্ভবত
তখন দ্বিতীয়
ও তৃতীয়
শ্রেণীতে পড়ি,
লন্ডন থেকে
আমার এক
মামা একটি
বই উপহার
দিয়েছিলেন। বইটি
ছিল ছবির
মাধ্যমে বিভিন্ন
বাদ্যযন্ত্রের নাম
শেখা। বলার
অপেক্ষা রাখে
না বাদ্যযন্ত্রগুলো
সবই পাশ্চাত্যের।
সেখানে প্রথম
আমি মিউজিক্যাল
ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে
হার্পের নাম
জানি। হার্পের
সঙ্গে পরিচয়
ওইটুকুই এবং
শুধু ছবিতেই।
তারপর ইউরোপ
ভ্রমণে গিয়ে
পোল্যান্ডের শহরগুলোয়
দেখেছি বিশেষ
বিশেষ স্থানে,
যেখানে পর্যটকদের
আনাগোনা বেশি,
সেখানে পথের
ধারে মেয়েরা
হার্প বাজাচ্ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন
দেশের বিভিন্ন
শহরে ঘুরতে
ঘুরতে এ
রকম অনেক
মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের
সঙ্গে আমার
পরিচয় হয়েছে
এবং বোধ
করি সবার
ক্ষেত্রেই সে
রকমটি ঘটে।
বাদ্যযন্ত্র হিসেবে
হার্পের গঠন,
বাজানোর পদ্ধতি
এবং বেশ
দূর থেকেই
শব্দের অনুরণন
আমাকে আকর্ষণ
করেছিল। যে
মেয়েটি বাজাচ্ছিল,
তার সঙ্গে
খানিকটা কথাও
হয়েছিল হার্প
নিয়ে, তা
খুবই প্রাথমিক
পর্যায়ের। নিজের
সীমিত জ্ঞান
আর একবিংশ
শতাব্দীতে হাতের
নাগালে তথ্য
পাওয়ার সুবিধার
ওপর ভিত্তি
করেই হার্প
নিয়ে লিখতে
বসা।
ভারতীয় উপমহাদেশে
খননকার্য ও
প্রাচীন সাহিত্য
থেকে অতি
উন্নতমানের এক
সাংগীতিক সভ্যতার
পরিচয় পাওয়া
যায় এবং
সেই সূত্রে
বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রেরও
পরিচয় মেলে।
সিন্ধু সভ্যতায়
বেণু, বীণা
ও মৃদঙ্গের
ব্যবহার ছিল
বলে জানা
যায়। বৈদিক
যুগে দুন্দুভি,
ভূমি-দুন্দুভি,
বেণু, বীণা
প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের
ব্যবহার প্রচলিত
ছিল।
বিশ্বজুড়ে বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে হার্প দীর্ঘকাল ধরে বিদ্বানদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। হার্পের প্রাচীনতম যে চিত্রটি পাওয়া যায়, সেটি সুমেরীয় সভ্যতায় প্রায় খ্রিস্টপুর্ব তিন হাজার বছর আগের। খ্রিস্টপুর্ব ২০০০ অব্দে মিসরে পিরামিডগুলো যে সময়ে নির্মিত হয়েছিল, একই সময়ে পাথরের গায়ে হার্পের চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে একই সময়ের সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হার্পের ব্যবহারের কথা জানা যায় না। খ্রিস্টপুর্ব দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রস্তর ভাস্কররা উত্তর এবং মধ্য ভারতজুড়ে বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলোয় বেস-রিলিফের মধ্যে বীণা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন বলে প্রমাণ মেলে।
কোনো কোনো
গবেষক অবশ্য
আফ্রিকার জঙ্গলে
আর তিব্বতের
মন্দিরে হার্পের
ব্যবহারের কথা
বলেছেন। দ্বাদশ
শতাব্দীর বৌদ্ধ
ধর্মাবলম্বীরা এশিয়ার
সমভূমিজুড়ে হার্পের
ব্যবহার ছড়িয়ে
দেন। হার্পাররা
নবম শতকের
আয়ারল্যান্ডের অধিপতিদের
বিনোদন দিয়েছিলেন
এবং কয়েক
শতাব্দী ধরে
তারা ইউরোপীয়
সমাজের কেন্দ্রবিন্দুতে
ছিল।
প্রাচীন গান্ধার
(বর্তমান আফগানিস্তানের)
রাজ্যের বাটকারা
থেকে গঙ্গা
অববাহিকার মাথুরা,
সাঁচি, ভারহুত,
বোধগয়া, অজন্তা
ও ইলোরা
গুহাগুলোর মতো
দক্ষিণে, ভজা
(বোম্বের কাছে)
এবং নাগার্জুন
হায়দরাবাদের পূর্বদিকে
কৃষ্ণা নদীর
ওপর কোন্ডা
ও অমরাবতী
অঞ্চলগুলোয় হার্প
ব্যবহারের কথা
জানা যায়।
গুপ্তযুগে টেরাকোটায়
এবং স্বর্ণের
মুদ্রায় হার্পের
ছবি অংকিত
ছিল। সম্রাট
সমুদ্র গুপ্তের
হার্প বাজানোর
কথাও ইতিহাসে
লিপিবদ্ধ আছে।
গঠনগত দিক
থেকে হার্পের
দুটি প্রাথমিক
আকার রয়েছে—খিলানযুক্ত
বা কোণযুক্ত।
প্রাচীনতম সুমেরীয়
ও মিসরীয়
হার্পগুলোর মতো
ভারতীয় হার্পগুলো
সবই খিলানযুক্ত
বা ধনুকের
মতো বাঁকা।
বাদ্যযন্ত্রটি কীভাবে
আবিষ্কার হলো?
ইতিহাসবিদরা একটি
ধারণা অবশ্য
দিয়েছেন সে
সম্পর্কে—১০
হাজার বছর
আগে শিকার
করার জন্য
ধনুক হিসেবে
হার্পের ব্যবহার
শুরু হয়েছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০০
অব্দের দিকে
কৌণিক হার্প
হাজির হয়েছিল।
এটি ব্যবহার
শুরু হয়
ইরানে এবং
ধীরে ধীরে
মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে
পড়েছিল বা
আফ্রিকা ও
এশিয়া উভয়
দেশেই স্বাধীনভাবে
বিকশিত হয়েছিল।
আজ বিশ্বব্যাপী
হার্প বাজানো
হয়, কিন্ত
মূল ঐতিহ্য
থেকে তা
হয়তো অনেক
দূরে। তাই
একটু বলতে
চাই সময়ের
ভিন্নতায় যুগে
যুগে বিভিন্ন
দেশে হার্পের
ব্যবহার কেমন
ছিল—
আফ্রিকা
আফ্রিকায়
গ্রামের ইতিহাস
ভাগ করে
নেয়ার এবং
পারিবারিক রীতিনীতি
মেনে চলার
জন্য বা
পচা মাছের
বিষয়ে অভিযোগ
করার জন্য
সংগীত ব্যবহারের
এক শতাব্দী
প্রাচীন ঐতিহ্য
এখনো অব্যাহত।
আফ্রিকান যন্ত্রগুলো
মানুষের মতোই
বৈচিত্র্যময়। গবেষকরা
উগান্ডা থেকে
নয়টি এবং
আফ্রিকাজুড়ে দেড়শতাধিক
স্বতন্ত্র হার্পের
মতো বাদ্যযন্ত্র
শনাক্ত করেছেন।
আয়ারল্যান্ড
আয়ারল্যান্ডে
এক হাজার
বছরেরও বেশি
সময় হার্প
ব্যবহারের ইতিহাস
রয়েছে। নবম
শতাব্দীতে যেসব
হার্পিস্ট বিনোদন
দিতেন, তারা
সমাজে উচ্চপদে
অধিষ্ঠিত ছিলেন।
১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে
হার্পভক্ত হেনরি
অষ্টম আইরিশ
মুদ্রায় এর
প্রতীক অংকন
করিয়েছিলেন। অষ্টাদশ
শতাব্দীর শেষ
দিকে আইরিশ
হার্পের জনপ্রিয়তা
কমতে থাকে।
এর সীমিত
পরিসর ফ্রেঞ্চ
পেডাল হার্পের
সঙ্গে প্রতিযোগিতা
করতে অক্ষম
ছিল।
উনিশ শতকের
হার্প প্রস্তুতকারক
জন ইগান
আইরিশ হার্পের
উপাদানগুলো এবং
পেডাল হার্প
একত্রিত করে
একটি বহনযোগ্য
মডেল তৈরি
করেছিলেন।
ইউরোপ
ইউরোপিয়ানরা
মনে করে
যেকোনো বীণা
বহু শতাব্দী
ধরে ফেরেশতা
ও স্বর্গের
সঙ্গে জড়িত।
অ্যাঞ্জেলিক হার্পিস্টদের
চিত্র মধ্যযুগীয়
ইউরোপের পাণ্ডুলিপি
রয়েছে। রেনেসাঁ
ইউরোপে, হার্পিস্টরা
রয়্যালটি উপভোগ
করতেন। স্পেনীয়
হার্পিস্টরা রাজকীয়
চ্যাপেল (ভবন)
গুলোয় এবং
ইউরোপীয় রাজধানীগুলোয়
পরিবেশনা করতেন।
১৭৭০-এর
দশকে প্যারিসে
বিপুল জনপ্রিয়
ছিল হার্পিস্টরা।
সে সময়
একজন হার্পিস্ট
মেরি অ্যানটোনেট
সিংহাসনে আরোহণ
করেছিলেন। পরিবেশ,
পরিস্থিতি, পরীক্ষা,
নতুনত্ব এবং
সংগীতের ভালোবাসা
অর্কেস্ট্রাল হার্প
বিকাশের দিকে
পরিচালিত করে
বিশ্বকে। ১৯
শতকের শেষ
দিকে পেডাল
হার্প সেলুন
পেরিয়ে ইউরোপের
দুর্দান্ত কনসার্ট
হলগুলোয় চলে
যায় লাতিন
আমেরিকায়।
স্পেনীয় বিজয়ীরা
যেহেতু ষোল
ও সতের
শতকে দক্ষিণ
আমেরিকা আক্রমণ
করেছিল, তারা
খ্রিস্টানিটি এবং
সভ্যতাকে নতুন
বিশ্বে নিয়ে
এসেছিল। অন্য
সবকিছুর সঙ্গে
তারা অস্ত্র,
সৈনিক এবং
পুরোহিত, বাইবেল,
সংগীত ও
হার্প নিয়ে
এসেছিল। স্থানীয়রা
প্রথমে জড়ো
হয়, দ্বিতীয়টিকে
জড়িয়ে ধরে
এবং তৃতীয়টির
প্রেমে পড়ে।
এক শতাব্দীর
মধ্যে হার্প
জনপ্রিয় হয়
এবং দক্ষিণ
ও মধ্য
আমেরিকাজুড়ে একটি
লোকজ উপকরণে
রূপান্তর হয়।
বিংশ শতাব্দীর
মাঝামাঝি টেলিভিশন,
রেকর্ডিং প্রযুক্তি
এবং দীর্ঘ-প্লে
অ্যালবামগুলো বিশ্বকে
প্যারাগুয়েন হার্পের
সঙ্গে পরিচয়
করিয়ে দেয়।
আজ লাতিন
হার্প হলো
প্যারাগুয়ের জাতীয়
উপকরণ এবং
লাতিন আমেরিকার
গর্ব।
আমেরিকা
প্যাট্রিক
জে হেলি
আমেরিকার হার্প
ও হার্পিস্টদের
ভবিষ্যৎ নিয়ে
চিন্তিত হন।
কারণ অর্কেস্ট্রারা
প্রায়ই বাদ্যযন্ত্র
হিসেবে প্রচলিত
ইউরোপীয় হার্প
বাদ দেয়,
কারণ এটি
বড় কনসার্ট
হলগুলোয় শোনা
যায় না।
হেলি এবং
তার অংশীদার
জর্জ লিয়ন
১৮৮৯ সালে
প্রথম পেডাল
হার্পের পরিচয়
করিয়ে দেয়
আমেরিকায়। এটি
একটি বৃহত্তর,
সাহসী শব্দ
তৈরি করেছে,
যা সংগীতজ্ঞ
ও সুরকারদের
পক্ষে বিপুল
সমর্থন পায়।
আধুনিক হার্প
আধুনিক
সংগীত নির্মাতাদের
সঙ্গে হার্পকে
সামঞ্জস্যপূর্ণ করার
জন্য ছোট,
হালকা, সস্তা
এমনকি বিদ্যুতায়িত
হয়ে উঠেছে
এখনকার আধুনিক
হার্প। উইলিয়াম
এবং পামেলা
রেসের হার্পসিকেল
চার পাউন্ড
ওজনের, একটি
এয়ারলাইনের ওভারহেডে
ফিট করে
এবং মূল্য
মাত্র ৩৯৯
ডলার। পপ
বীণাবাদক দেবোরাহ
হেনসন-কনান্ট
তার কাঁধে
এমন একটি
হার্পের স্বপ্ন
দেখেছিলেন, যা
রক কনসার্টের
দর্শকদেরও বিমোহিত
করতে সক্ষম।
তিনি ফরাসি
বীণা প্রস্তুতকারক
কামাককে দিয়ে
তৈরি করেছেন
১১ পাউন্ড,
কার্বন ফাইবার,
৩২-স্ট্রিং
বৈদ্যুতিক লিভারের
হার্প। কামাক
ডিএইচসি ডিজাইন
করেছেন বিশ্বের
অন্যতম দ্রুত
হার্প মডেল।
এটা বলতেই
হয় একবিংশ
শতাব্দীতে এসে
যেকোনো বাদ্যযন্ত্রই
তার স্বকীয়তা
ও ঐতিহ্য
হারাচ্ছে, এ
কথা অনস্বীকার্য।
এলিজা বিনতে এলাহী: পর্যটক ও শিক্ষক





