ব্রিটিশ গ্রন্থাগারের সংগ্রহশালায় উনিশ শতকের বর্মি পাণ্ডুলিপির সচিত্র একটি ডিজিটাল সংস্করণ সংরক্ষিত আছে। ওই পাণ্ডুলিপিতে বর্মি হার্প কিংবা সাউং চিত্রায়িত হয়েছে অসংখ্যবার। নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক জাতক কাহিনীতে ভোগ-বিলাসের জীবন বোঝাতে সাউংয়ের ব্যবহার দেখানো হয়েছে। জাতক উপকথার মূল উপজীব্য বিষয় ছিল বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনী।

মান্ধাতু জাতক মূলত মান্ধাতা নামক একজন পরাক্রমশালী রাজার গল্প, যিনি চাইলেই সবকিছু ভোগ করতে পারার ক্ষমতা রাখতেন। স্বর্গীয় একটি রাজ্য শাসন করেও যিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। নিচের ছবিটি মান্ধাতু জাতকের সচিত্র পাণ্ডুলিপির একাংশের বিস্তারিত। চিত্রটি মান্ধাতা রাজার বৈঠকখানার, যেখানে পাঠক দেখতে পাবেন কয়েকজন সুন্দরী সংগীতজ্ঞকে, যারা কৌতূহলবশত তাকিয়ে দেখছেন প্রাসাদে কারা প্রবেশ করছেন।

সাউং একটি অনন্য বাদ্যযন্ত্র, যার হাজার বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। বাদ্যযন্ত্রটি মনোমুগ্ধকর ও সুরেলা আওয়াজের পাশাপাশি আনুভূমিক নৌকা আকৃতি ও দীর্ঘ স্ট্রিংয়ের জন্য পরিচিত। স্ট্রিংয়ের প্রান্তগুলো সিল্ক থেকে তৈরি হতো এবং লাল সুতির ট্যাসেল দিয়ে সজ্জিত থাকত। বীণাকে কোলের ওপর রেখে এক হাতে স্ট্রিং বাজানো হতো এবং অন্য হাতে ড্যাম্পিং ও স্ট্যাক্যাটোর নোট বাজানো হতো। সাউং সাধারণত একজন গায়ককে সঙ্গ দেয়, যিনি একই সঙ্গে বেল (Si) ও ক্ল্যাপারের (Wa) মাধ্যমে টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করেন।


সাউংয়ের প্রথম দিকের বর্ণনাটি অষ্টম শতাব্দীর শ্রী কসেত্রার বাবাওয়াকির মন্দিরের মূর্তি থেকে পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, এখন নৃত্যশিল্পী নৃত্য পরিবেশন করছেন, একজন বীণা বাজাচ্ছেন এবং একজন তাল দিচ্ছেন। নবম শতকের ট্যাং উপকথায় ৩৫ জন সংগীত ও নৃত্যশিল্পীর সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধি দলের বর্ণনা পাওয়া যায়, যারা তাদের পরিবেশনায় বৈঠকখানার সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন।

বাদক দলটি দুটি হার্পের মাধ্যমে বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে ১২টি গান পরিবেশন করেছিলেন। হার্পগুলোতে কীলক ব্যবহার করা হয়েছিল তারের পরিবর্তে। মোন ও কারেন জনপদে এখনো পেগ-টিউনড বা কীলকের হার্প ব্যবহূত হয়। পরে দশম শতাব্দীতে ট্যাং উপাখ্যানে নিশ্চিত করা হয়েছিল, এ দুই জনপদের সংগীত সমগোত্রীয়।

জাতকের অন্য একটি উপকথায় তেলাপাত্তা জাতকে বোধিসত্তকে দেখানো হয়েছে একজন রাজকুমার হিসেবে। উপকথায় বোধিসত্তকে একটি ভয়ংকর ও মায়াবী জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতে হয়েছিল। সেই জঙ্গলে ভয়ংকর ডাইনিদের বাস ছিল। তার পাঁচ ভাইও তার সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়েছিল। পথিমধ্যে সব ভাইকে ডাইনিরা তাদের মায়ায় আকৃষ্ট করে খেয়ে ফেলেছিল।


পাণ্ডুলিপির চিত্রায়নে আরো দেখা যায়, বোধিসত্ত ডাইনিদের জাদুকরি সংগীত আয়োজনে উপস্থিত হন। সেখানে উপস্থিত হওয়ার আগে তিনি এক ভাইকে ডাইনিদের রুপের মায়ায় হারিয়েছেন। তার আরেক ভাই যিনি সংগীত ভালোবাসতেন তিনিও ডাইনিদের জাদুকরি সংগীতের মায়ার ফাঁদে পড়ে তাদের পরবর্তী শিকারে পরিণত হতে চলেছেন। সেখানে হার্পের পাশাপাশি ছিল একটি বাঁশি ও একজন গায়ক।

তেমিয়া জাতক বুদ্ধের শেষ ১০ জীবনের অন্যতম একটি। তিনি বেনারসের রাজার কাঙ্ক্ষিত পুত্রসন্তান ছিলেন। তবে তিনি রাজা হওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেছিলেনম যখন জানতে পেরেছিলেন ভবিষ্যৎ রাজা হিসেবে তার রাজত্বে কঠিন শাস্তির বিধান থাকবে। এর পর থেকে সবসময় তিনি ভাবলেশহীন হয়ে বসে থাকতেন এবং কথা বলতেন না।

রাজা তাকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন ধরনের পিঠা দিয়ে লোভ দেখানো কিংবা সাপ এমনকি উন্মত্ত হাতি দিয়ে ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। তেমিয়ার বয়স যখন ১৬ বছর তখন তাকে রূপবতী নারী, সংগীত ও নৃত্যের সঙ্গ প্রদান করা হয়েছিল শেষ পরীক্ষা হিসেবে। নারী, সংগীত ও নৃত্য কিছুটা হলেও মোহ তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন শাসন না করার পক্ষে।

কুল্লা পালোভানা জাতক উপাখ্যানেও এক রকম গল্পের ধারাবাহিকতা দেখতে পাওয়া যায়। বোধিসত্ত এখানেও কাঙ্ক্ষিত একজন রাজপুত্র হিসেবে জন্মলাভ করেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বোধিসত্ত নারীদের সংসর্গ পছন্দ করতেন না। তিনি বৈঠকখানার পুরুষ সদস্যদের সঙ্গেই সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। ভোগ-বিলাসিতা, শাসন কার্যক্রমের প্রতি বোধিসত্তের অনীহা রাজাকে চিন্তিত করে তুলেছিল।

পরবর্তী সময়ে একজন অল্প বয়স্কা নৃত্যশিল্পী যিনি সংগীতেও দক্ষ ছিলেন তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় নারীর প্রতি বধিসত্তের আকর্ষণ তৈরির। বিনিময়ে সে রানী হবে এমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। পরে সেই নারী ভোর হলে রাজকুমার যেখানে ধ্যান করতেন তার পাশে সংগীত চর্চা করতেন। ধীরে ধীরে বোধিসত্ত সেই নারীর প্রেমে পড়েন এবং তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

দুর্ভাগ্যক্রমে বোধিসত্ত এই নারীর প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েন যে তিনি মাতাল হয়ে হিংসাত্মক আচরণ করে পুরো শহর ঘুরে বেড়ান। এই খারাপ আচরণের কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে বনবাসে পাঠানো হয়।

 

স্ক্রল.ইন থেকে অনূদিত