স্ত্রী সন্তান
প্রসব করছেন।
তার পাশে
হার্প বাজাচ্ছেন
তার বিশ্বখ্যাত
স্বামী। এক
কন্যাশিশুর আগমন
ঘটল। কন্যার
নাম মিশেল।
বাবা বললেন,
এটাই ছিল
তার শিল্পী
জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ
পাওয়া। লাতিন
আমেরিকার জীবন্ত
কিংবদন্তি হার্পবাদক
আলফ্রেডো রোলান্ডো
ওর্টিজ। তিনি
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
কয়েকজন হার্পবাদকের
অন্যতম। দরিদ্র
পরিবার থেকে
উঠে আসা
বিশ্বসেরা এ
শিল্পী ২০১৬
সালে তার
জীবনের ৭০তম
বছরে নিজের
জীবন কাহিনী
বলেছেন, সাক্ষাত্কারভিত্তিক
সেই কথন
কিছুটা পুনর্বিন্যাস
করে ভাষান্তর
করা হলো:
আমার জন্ম
কিউবায় (১০
ডিসেম্বর ১৯৪৬)।
ছোটবেলায় আমার
দেখা প্রথম
হার্প হলো
সিনেমায় দেখা
পেডাল হার্প (পাদান
যুক্ত, পিচ
বদলাতে পায়ের
ব্যবহার হয়,
লম্বা ৬
ফুটের বেশি,
ওজন ৮০
পাউন্ড)।
আমার ১১তম
জন্মদিনের পরপরই
আমরা জাহাজে
চড়ে ভেনেজুয়েলার
লা গুয়াটিয়া
বন্দর থেকে
রাজধানী শহর
কারাকাস পর্যন্ত
বাড়িতে সফর
আমার জীবনটাকেই
বদলে দিল।
গাড়ির চালক
রেডিও চালাল
আর আমরা
শুনলাম অত্যন্ত
মিষ্টি একটি
সুর। এ
সুর অন্য
সুরের চেয়ে
ভিন্ন। কিন্তু
কেমন করে
ভিন্ন তা
বুঝলাম আর
কয়েক দিন
পর। টেলিভিশনের
একটি শোতে
সেই একই
সুর শুনলাম
এবং ভেনেজুয়েলার
হার্প সেই
প্রথম দেখলাম।
আমি এখানে
এসে রেডিওতে
প্রায়ই হার্পের
বাদন শুনছি।
স্কুলে যেকোনো
ধরনের ট্যালেন্ট
শো কিংবা
কোনো উৎসব
উদযাপনে ছেলেমেয়েদের
হার্প বাজানো
ছিল নিত্যকার
ঘটনা।
টেলিভিশনে আমি
প্যারাগুয়ের অনেক
দলকে হার্প
বাজাতে দেখেছি,
এর সঙ্গে
থাকত একটি
বা দুটি
গিটারের সঙ্গও।
আলবার্তো রোমেরো
নামের একজন
হার্পবাদক ছিলেন।
একজন নারী
গায়ক আর
একজন গিটারবাদক
তাদের সঙ্গে
থাকতেন। ১৯৫৮-এর
প্রথমদিকে আমি
ভেনেজুয়েলায় পৌঁছি।
১৯৬১ সালের
ডিসেম্বরে ক্রিসমাসের
ছুটির আগে
আমার স্কুলের
বন্ধু ফার্নান্দো
গুয়েরেরো স্কুলের
শোতে যন্ত্র
বাজিয়ে শোনাল।
আমার কোনো
ধারণাই ছিল
না যে
এটা একটা
হার্প। আমাকে
এটা শোনানোর
জন্য তাকে
অনুরোধ করি।
ফার্নান্দো বলল,
দেখ কয়েক
মাস ধরে
শিখছি। সে
যতটুকু জানে
আমাকে দেখিয়ে
দিতে পারলে
সে খুশিই
হবে—কিন্তু
সভার আগে
তো আমার
একটা হার্প
থাকতে হবে।
বাড়ি ফিরেই আমার বাবা-মাকে হার্প কিনে দিতে বললাম। বয়স তখন আমার ১৫, আমি নিজেরটাই ভেবেছি, আমাদের বাড়ির বাস্তবতা আমাকে স্পর্শ করেনি। কিউবার সংকট তখন চরমে। বন্ধুজন ও আত্মীয়রা তাদের যা কিছু ছিল সব ফেলে দেশ ছাড়ছে। কয়েকটা কাপড় ছাড়া তাদের আর কিছুই আনার সুযোগ নেই। দুই বেডরুম এবং এক বাথরুমের অ্যাপার্টমেন্টে আমার মা-বাবা, আমার দুই বোন আর আমি বাস করি। আমরা ভেনেজুয়েলা পৌঁছনোর কয়েক মাস আগে আমার ছোট বোনটির জন্ম হয়েছে। ৮-১০ জন কিউবার শরণার্থী এ বাড়ির মেঝেতে ঘুমান। কোনো তোশক নেই। এভাবেই শুতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমি চাচ্ছি একটি হার্প। আমার মা আমাকে মনে করিয়ে দিলেন আগের সপ্তাহে আমার পিগি-ব্যাংক থেকে খুচরা পয়সা একত্র করে আমার ছোটবোনের জন্য দুধ কিনতে হয়েছে।
বিস্ময়কর ব্যাপার
হচ্ছে, এক
কিউবার শরণার্থীর
মুখে আমার
এ হার্প
কিনতে চাওয়া
এবং কিনতে
না পারার
কাহিনী তার
পরিচিত ভেনেজুয়েলার
এক নাগরিক
শুনেছেন। তার
বাড়িতে ডেকোরেশন
পিস হিসেবে
একটি ভেনেজুয়েলার
হার্প আছে,
কেউ বাজায়
না—চাইলে
শেখার জন্য
আমি এটা
ধার নিতে
পারি। (এমনই
হয় শ্রেষ্ঠ
মানুষদের পেছনে
আকস্মিকভাবে এমন
অলৌকিক সাহায্য
চলে আসে)
ফার্নান্দো আমাকে
বাজিয়ে শেখাতে
শুরু করল,
সে নিজেও
তো নতুন
শিক্ষার্থী। আমি
তাকিয়ে থাকতাম,
সে যা
করে তা
অনুসরণ করতাম।
হার্পের তারগুলোয়
ভিন্ন ভিন্ন
রঙ দিয়ে
চিহ্নিত করা
ছিল না।
থাকলে শেখাটা
কম কষ্টের
হতো।
কয়েক মাস
পর আমাদের
বাড়ির পাশের
একটি বিনোদন
পার্কে একটি
প্যারাগুয়েন অর্কেস্ট্রা
দল বেড়াতে
এল; দর্শনীবিহীন
উপভোগের সুযোগ
পেলাম। আমি
ভেতরে গিয়ে
প্যারাগুয়েন হার্প কের
সঙ্গে কথা
বললাম। আমি
যে ভেনেজুয়েলার
হার্প ভালোবাসি
এবং কেমন
করে বন্ধুর
কাছ থেকে
শিখছি তা
বললাম, আমার
প্যারাগুয়ের গান
বাজানোর আগ্রহের
কথাও বললাম।
তিনি আমাকে
একটি নাম
ও একটি
ফোন নম্বর
দিয়ে বললেন
এ মানুষটি
আমাকে একজন
প্যারাগুয়ের শিক্ষক
পেতে সাহায্য
করতে পারেন।
আমি তাকে
ফোন করলাম।
তিনি বললেন
কয়েক দিন
আগে প্যারাগুয়ের
একজন হার্পবাদক
ভেনেজুয়েলায় এসেছেন,
তিনি তাকে
আমাদের বাসায়
নিয়ে আসবেন।
আমি যাকে
ফোন করেছিলাম,
কয়েক দিন
পর আমাদের
পরিবার ও
কিউবার শরণার্থীরা
তাকে নিয়ে
অসাধারণ একটি
সংগীত রজনী
উপভোগ করলাম।
সঙ্গে ছিলেন
তার হার্পবাদক
বন্ধু। সে
রাতেই আমি
জানলাম আমার
ফোনে সাড়া
দিয়ে সংগীত
শিক্ষক নিয়ে
আমাদের বাড়িতে
আসা সেই
মানুষটি হচ্ছেন
ভেনেজুয়েলায় নিযুক্ত
প্যারাগুয়ের রাষ্ট্রদূত।
তার নাম
মার্সিয়াল ভ্যালিন্তে।
প্যারাগুয়ের সংগীতের
দারুণ ভক্ত
ও সমঝদার
তিনি। আর
হার্প নিয়ে
আমার যে
বাতিক তা
তাকে আকৃষ্ট
করে। শেষ
রাতে তিনি
বলেন, প্যারাগুয়ের
একজন হার্পবাদককে
তিনি চেনেন।
তিনি আমার
শিক্ষক হতে
পারেন। তার
নাম আলবার্তো
রোমারো। আমি
তো এ
আলবার্তো রোমারোকে
টেলিভেশনে দেখেছি।
আমি তার
লঙ্গ প্লে
রেকর্ড কিনেছি।
দেখা গেল
আমরা যে
বাড়িতে থাকছি,
এখানে থেকে
মাত্র কয়েক
ব্লক দূরে
তিনি থাকেন।
আমি তার
সঙ্গে দেখা
করতে গেলাম।
তিনি আমাকে
তার হার্প
দেখালেন, এটা
ভেনেজুয়েলান যন্ত্র
থেকে অনেকটাই
ভিন্ন ধরনের।
তিনি আমাকে
অনেকক্ষণ ধরে
শোনালেন। আগামী
সপ্তাহে একই
দিনে একই
সময়ে আবার
আসতে বললেন।
কিন্তু আমার
তখন এমন
বিব্রতকর অবস্থা
যে আমি
তাকে কী
বলব বুঝে
উঠতে পারছিলাম
না। তাকে
আমার একটা
চকোলেট কিনে
দেয়ার টাকাও
নেই, এক
একটা লেসনের
জন্য টাকা
দেব কেমন
করে। আমি
কোনোভাবে আমাদের
আর্থিক দুরবস্থার
কথা তাকে
বোঝাতে সফল
হলাম। তিনি
লালচে হয়ে
উঠলেন এবং
তাকে বিচলিত
দেখাল। তিনি
বললেন, টাকার
কথা কে
বলেছে? তুমি
আগামী সপ্তাহে
এসো।
এটাই তার
আদেশ, অনুরোধ
না। ১৯৬৩-এর
ডিসেম্বরে চিকিৎসাবিজ্ঞান
নিয়ে পড়াশোনার
জন্য কলম্বিয়া
যাওয়ার আগ
পর্যন্ত তিনিই
ছিলেন আমার
শিক্ষক। তিনি
একটি লেসনের
জন্যও আমার
কাছ থেকে
টাকা নেননি।
১৯৬৪-এর জানুয়ারিতে আমি কলম্বিয়ার মেডেলিনে মেডিকেল কলেজের ক্লাস শুরু করলাম। কয়েক দিন পর আমাকে হার্প বাজাতে দেখেছেন এমন একজন টাকার বিনিময়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বাজাতে বললেন। এটাই ছিল আমার প্রথম পেশাদার কাজ। অনুষ্ঠানে আসা একজন অতিথি আবার আমার বাদনের রেকর্ড কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম এটাই আমার প্রথম কাজ, আমি কখনো কোনো কিছু রেকর্ড করিনি।
তিনি আমাকে
তার বিজনেস
কার্ড দিলেন
এবং পরের
সপ্তাহে আমাকে
তার কোম্পানিতে
যেতে বললেন।
আমি অবাক
হয়ে দেখি
তিনি আসলে
তখনকার কলম্বিয়ার
সবচেয়ে বড়
ও গুরুত্বপূর্ণ
রেকর্ড কোম্পানি
কোডিসকোসের একজন
শীর্ষ নির্বাহী
কর্মকর্তা। আমি
সেখানে গেলাম
এবং কয়েক
জন নির্বাহীকে
আমাকে বাজিয়ে
শোনাতে হলো।
একটি সম্পূর্ণ
লং প্লে
রেকর্ডের জন্য
আমাকে একটি
ফ্লাট ও
নগদ ২০০
ডলার সাধা
হলো। এ
টাকায় আমি
মেডিকেলের বই
কিনতে পারব
এবং আমার
অনেক খরচ
মেটাতে পারব।
তখনই আমার
বাবা-মাকে
চিঠি লিখলাম—আমাকে
মেডিকেল পড়ানোর
মতো এমন
ব্যয়বহুল উদ্যোগ
গ্রহণের জন্য
তাদের ধন্যবাদ
দিলাম আর
বললাম এখন
থেকে মিউজিকের
টাকা দিয়ে
আমি পড়াশোনা
চালিয়ে যেতে
পারব। আমার
বয়স তখন
১৭ বছর,
মেডিকেল কলেজের
সবচেয়ে কমবয়সী
ছাত্র। আমার
রেকর্ড বেশ
বাজার পেল।
আমাকে এবার
একটি এক্সক্লুসিভ
অফার দেয়া
হলো, যা
কেবল বড়
শিল্পীরাই পেয়ে
থাকেন। ১৯-৮০
পর্যন্ত আমার
২৮টি অ্যালবাম
প্রকাশিত হলো,
তাতে সব
ধরনের সুর—লোকগান
নাচের গান,
আন্দেজ পর্বতমালার
গান, সমতল
অঞ্চলের গান,
দুটো অ্যালবাম
প্যারাগুয়ের গান
নিয়ে এবং
রক অ্যান্ড
রোল পর্যন্ত।
সত্যিই রক
অ্যান্ড রোলে
হার্প বাজানো
পৃথিবীর প্রথম
শিল্পী আমিই।
অ্যালবামগুলোর মধ্যে
রয়েছে ‘দিস
বুটস আর
মেড ফর
ওয়াকিং’ ‘দ্য হাঙ্কিপাঙ্কি’,
‘ইয়েলো
সাবমেরিন’ ইত্যাদি।
আমি কলম্বিয়ার
সবচেয়ে বিখ্যাত
রক ব্যান্ড
‘লস
টিনএজার’-এ
সংগীত করেছি।
১৯৭০-এ
আমি মেডিকেল
কলেজ থেকে
পাস করে
বেরোই। ১৯৭৫-এ
ক্যালিফোর্নিয়া আসার
আগ পর্যন্ত
আমি কলম্বিয়ায়
ডাক্তার ও
হার্পবাদক হিসেবে
কাজ করেছি।
কলম্বিয়ায় আমি
মিউজিক থেরাপি
পাঠ দিতে
শুরু করেছিলাম।
আমি ক্যালিফোর্নিয়ায়
একদিকে হার্পবাদনের
নিয়মিত অনুষ্ঠান
করছি, অন্যদিকে
মেডিকেল কলেজে
পড়াচ্ছি। ১৯৭৮-এ
আমার স্ত্রী
যখন আমাদের
প্রথম কন্যা
নিয়ে গর্ভবতী,
আমি তখন
সপ্তাহে সাতদিনই
পারফর্ম করছি
আর কোস্টা
মেসার কেয়ারভিউ
স্টেট হসপিটালে
সপ্তাহে পাঁচদিন
ডিউটি করছি।
এমন ব্যস্ততায়
পরিবারের জন্য
আমার কোনো
সময় ছিল
না। আমি
সিদ্ধান্ত নিলাম
বাকি জীবন
কাটাব পরিবার
আর হার্প
নিয়ে।
১৯৭৫-এ
প্রথম সলো
রেকর্ডিং করলাম,
তারপর সবই
সলো। আমাদের
হার্প ঐহিত্য
আসলে লোকঐতিহ্য।
কান দিয়ে
শুনতে হবে,
অনুকরণ করতে
হবে অথবা
বন্ধুসুলভ একজন
শিক্ষকের নির্দেশনা
নিতে হবে।
১৯৬১-৬৩
সালে যখন
আমি হার্প
শিখতে শুরু
করি কারাকাসে,
তখন হার্প
শেখার প্রাতিষ্ঠানিক
কোনো স্কুল
ছিল না।
যেখানে হার্প
লাতিন আমেরিকার
ঐতিহ্যগত লোকসংস্কৃতির
বাদ্যযন্ত্র, সেখানে
প্যারাগুয়ে, মেক্সিকো
বা অন্য
কোনো দেশে
এর জন্য
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো
আয়োজন নেই।
মেডিকেল কলেজে
ভর্তি হয়ে
আমি হার্পিস্টদের
সঙ্গে যোগাযোগ
করতে শুরু
করি, যাদের
সবই মেডিকেল
কলেজের ছাত্র।
প্রথমে গিটারিস্ট
এক বন্ধুকে
নিয়ে বাজাতে
শুরু করি
কিন্তু শিগগিরই
দুজনের শিডিউল
মিলাতে না
পারায় আমি
একাই বাজাতে
শুরু করি।
সেই ধারাটিই
অব্যাহত আছে।
আলফ্রেডো ওর্টিজ
হচ্ছেন লাতিন
আমেরিকার প্রথম
সলো হার্পিস্ট,
যার বাদন
অ্যালবাম হয়ে
প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি একেবারে
শুরু থেকে
সুর সৃষ্টির
দিকে মনোযোগ
দিয়েছেন। তাকেই
মনে করা
হয় হার্প
সুরের প্রধান
স্রষ্টাদের অন্যতম।
এতদিনে তিনি
হার্প সংগীতের
জন্য অন্যতম
প্রধান একটি
প্রতিষ্ঠানে পরিণত
হয়েছেন।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





