ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন উগান্ডার প্রায় সব শহরে সুন্দর গলফ কোর্স তৈরি করেছিল। ইদি আমিন গলফকে ‘সাম্রাজ্যবাদীদের খেলা’ হিসেবে ঘৃণা করার পরও কীভাবে সেগুলো টিকে গিয়েছিল, সেটা বিস্ময় জাগায়। আমার উত্তরসূরি এইচ কে সিংয়ের কাছ থেকে অন্য কূটনীতিকরা আমার গলফপ্রীতি সম্পর্কে জেনেছিলেন। কাম্পালায় পৌঁছার পর আমার সৌজন্যে সহকর্মীরা প্রথম যে পার্টি আয়োজন করেছিলেন সেখানে হাজির হয়ে দেখলাম চারপাশে অনেক গলফ পাগলের উপস্থিতি। তারা আমাকে জানালেন এখানে বিনোদনের উৎস দুটো—গলফ আর ইদি আমিনের ভাঁড়ামির কাহিনী।

ইদির বলা কাহিনীগুলো কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি নানা রকম অদ্ভুত গল্প শোনাতেন। যেমন নীলনদে সাঁতার কাটার সময় কুমিরের দাঁত থেকে বেঁচে ফেরার গল্প। কুমিরটা নাকি দুই কিলোমিটার টেনে নিয়ে গিয়েছিল, ‘আমি এত শক্তিশালী ছিলাম যে কুমিরটার নাকে ঘুষি দিতেই সেটা এর মুখ খুলে দেয় এবং আমি এর ধারালো দাঁতের কোনো আঘাত ছাড়াই লড়াইয়ে জিতে যাই।’ আরেকটা গল্প ইদি প্রায়ই শোনাতেন—কীভাবে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার কোম্পানির আরো দুই সৈনিকসহ বেঁচে গিয়েছিলেন, যেখানে আর সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কুমির ইদিকে দুই কিলোমিটার টেনে নিয়ে গিয়েছিল—দৃশ্যটা অবশ্য কেউই দেখেনি। এবং সবাই এটাও জানতেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইদি বার্মা ফ্রন্টের ধারেকাছেও কখনো ছিলেন না। প্রকৃত সত্য হলো তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন আফ্রিকায় এবং তাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং সহকারী পাচকের পদে। তিনি এসব ডাহা মিথ্যা কথা হরহামেশাই বলতেন এবং সম্ভবত একসময় নিজেও সেগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। আর প্রতিবারই এসব মিথ্যা গল্প বলার সময় তিনি কাহিনীতে নতুন নতুন মসলা যোগ করতেন।

একবার প্যারাডাইস আইল্যান্ডে ইদি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাহিনী আমাকে আরো বিশদভাবে শুনিয়েছিলেন। নানা রকম রঙচঙ দিয়ে তিনি কীভাবে বার্মার ঘন জঙ্গলে মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়েছিলেন সে গল্প শোনান। ‘আমরা জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়ছিলাম। একটা গুলি ঠিক আমার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেল।’ এটুকু বলে তিনি তার মাথার একটা জায়গার দিকে নির্দেশ করলেন, ‘এখান দিয়েই গুলিটা বেরিয়ে গিয়েছিল। আপনি এটা বিশ্বাস করতে পারেন? একটা গুলি আমার মাথা ভেদ করে গিয়েছে, কিন্তু তারপরও আমি এখনো বেঁচে আছি।’

আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ইয়োর এক্সিলেন্সি, আমি কিন্তু কোনো ক্ষত বা দাগ দেখতে পাচ্ছি না।’

আমার দিকে তিনি একবার কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে অন্যদিকে হেঁটে গেলেন। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে এক ভয়ানক ভাবনা খেলে গেল—ইদি হয়তো আমার জন্য এবার আরেকটা ‘গাড়ি দুর্ঘটনা’র পরিকল্পনা করবেন, যেভাবে তিনি তার শত্রুদের মাঝেমধ্যেই হত্যা করেন।

কূটনীতিকরা অনুমান করছিলেন যে ইদি নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন। যেমনটা করেছেন মধ্য আফ্রিকার শাসক সালাউদ্দিন আহমেদ বোকাসা। দ্য ভয়েজ অব উগান্ডা (কূটনীতিকরা বলেন ভয়েজ অব ইদি আমিন) সেনইয়োনজো নামের একজনের চিঠি প্রকাশ করেছে, এ চিঠিতে লেখা হয়েছে—

আফ্রিকার নতুন সাম্রাজ্য সম্পর্কে আমাদের জনপ্রিয় পত্রিকায় কিছু কথা বলতে চাই। মধ্য অফ্রিকার সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সম্মানিত ও প্রিয় নেতা সম্রাট সালাউদ্দিন আহমেদ বোকাসা। তিনি এমন সময় মঞ্চে এসেছেন যখন সবাই এমন কিছুর প্রত্যাশা করছিল।

চিঠিতে উপসংহার টানা হয় এভাবে—

এখানে উগান্ডায় মার্শাল এমন একজন নেতা, যাকে সবাই সম্মান করেন। তাই আমার পর্যবেক্ষণ থেকে ডিফেন্স কাউন্সিল ও উগান্ডাবাসীর কাছে অনুরোধ জানাই, আমাদের প্রিয় প্রেসিডেন্টকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করার এবং আমাদের দেশকে সাম্রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করার। উগান্ডা দীর্ঘজীবী হোক!

কিছুদিন পরে পশ্চিম জার্মানির (তত্কালীন) রাষ্ট্রদূতের দেয়া ককটেল পার্টিতে আমরা এক বিশেষ বেতার ঘোষণা শুনতে পাই যে আজীবনের প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন নিজেকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্রাট’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এ হাস্যকর উপাধির কথা শুনে আমরা মজা পেয়েছিলাম কিন্তু একই সঙ্গে বিস্মিতও হয়েছিলাম। কারণ এটা কি নিছকই একটা নতুন উপাধি, নাকি সত্যি সত্যিই ইদি তাকে উগান্ডার সম্রাট হিসেবে পরিচয় দেবেন? পার্টিতে পরে আসা একজন আমাদের জানালেন যে ডিফেন্স কাউন্সিল ইদি আমিনকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিজেতা বা ‘কনকোয়েরার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ খেতাব দিয়েছে।

শুরুর দিকে আমি গলফ ক্লাবে যেতাম বিকালের দিকে। বেশির ভাগ সময় খেলতাম সোমালিয়ার রাষ্ট্রদূত হাশি আবদুল্লাহ ও ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিসের আবাসিক প্রতিনিধি এ কোমোরস্কির সঙ্গে। এক বিকালে আমার সঙ্গে পরিচয় হলো এক মধ্যবয়সী উগান্ডানের। তার সঙ্গে খেলাটা দারুণভাবে শুরু হলো। আবহাওয়াটাও দারুণ ছিল। আমরা একটা টিলায় গলফের প্রথম হোলের দিকে এগোচ্ছিলাম। আমি আমার পরিচয় দিলাম। তিনি এগিয়ে এসে আন্তরিকভাবে করমর্দন করে বললেন, ‘আমি আলী তোয়েলি।’

আমি ঢোঁক গিলে বললাম, ‘আলী তোয়েলি?’

তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি আলী তোয়েলি, পাবলিক সেফটি ইউনিটের পরিচালক।’

মনে মনে ঈশ্বরের নাম নিলাম। আমি গলফ খেলছিলাম এমন একজন মানুষের সঙ্গে, যার একমাত্র কাজ মানুষ হত্যা করা। আমি দরদর করে ঘামতে শুরু করলাম এটা ভেবে যে আমি গলফ খেলছি ইদি আমিনের ডেথ স্কোয়াডের প্রধানের সঙ্গে। আমি এমন ঝাঁকুনি খেয়েছিলাম যে খেলার প্রতি আমার সব মনোযোগ চলে গেল। আমার গলফ শটগুলো সব এদিক-ওদিক চলে গেল। আমি কেবল অপেক্ষা করছিলাম কখন খেলা শেষ হবে।

আমি তার সঙ্গে কথা না বলার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু তিনি আমাকে একাকী থাকতে দিতে নারাজ। তিনি আমাকে আলাপে টেনে আনার চেষ্টা করছিলেন। তিনি যেসব চমত্কার কাজ করছিলেন সেগুলোর সম্পর্কে আমাকে শোনাতে চাচ্ছিলেন।

শোনা যায়, হত্যার অনেক স্যাডিস্টিক, নৃশংস পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন এই তোয়েলি। এর মধ্যে আছে ভারী হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা। তিনি এ অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তাদের গোলাবারুদের ঘাটতি ছিল। এ পদ্ধতিতে এক বন্দিকে দিয়ে আরেক বন্দিকে হত্যা করানো হতে তাকে মুক্তির লোভ দেখিয়ে। এরপর আবার নতুন আরেক বন্দিকে এনে সেই আগেরজনকে হত্যা করানো হতো।

ইদি আমিনের পাবলিক সেফটি ইউনিট ছিল কুখ্যাত। শোনা যায় অনেক সময় মৃতদের আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা নিত প্রিয়জনের লাশটা কোথায় পড়ে আছে সেটা জানানোর জন্য।

আমার ড্রাইভার ফ্রান্সিস মাসোকে পাবলিক সেফটি ইউনিটের দপ্তরের কাছেই থাকত। সে আমাকে জানিয়েছিল মাঝে মাঝেই সেখানে নির্যাতিতদের আর্তনাদ শোনা যায়। সে সময় অনেক হত্যাকাণ্ড হতো প্রকাশ্যে এবং লোকজনের ভিড় জমত এমন ঘটনা দেখার জন্য। সম্ভবত এটা করা হতো ইদি আমিনের বিরোধীদের সতর্কবার্তা দেয়ার জন্য।

আমি একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম—কীভাবে তোয়েলিকে পাশ কাটাব। তার মতো মানুষ কোনো কারণে রেগে গেলে সেটা খুব বিপজ্জনক হবে। ক্লাব বিল্ডিংয়ের কাছে নবম হোলে পৌঁছার পর তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বললাম যে আমার একটা জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আমি যখন চলে যাচ্ছিলাম তখন তোয়েলি হাত নেড়ে বলে উঠলেন, ‘আমরা আবার একসঙ্গে খেলব। আমাকে আপনার পার্সোনাল ফোন নম্বরটা দিয়ে যান।’ আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম এবং ভান করলাম যেন তার কথা শুনতে পাইনি।