প্রেমিকা যদি প্রেমজীবনের একটি পর্যায়ে কোনো ভিআইপির স্ত্রী হয়ে যায় নিজের ব্যর্থতার যাতনা বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু সেই ভিআইপি যদি হন দেশের এক নম্বর ব্যক্তি, যদি তিনি হন হিটলার-পরবর্তী পৃথিবীর অন্যতম একনায়ক ইদি আমিন দাদা, তাহলে হিসাবটা করতে হবে ভিন্নভাবে। প্রেমিককে ব্যর্থতার যাতনা সইতে হবে অতি অল্পকাল। তারপর সব শেষ। প্রেমিকের অনুভব করার শক্তি বিনষ্ট হয়ে যাবে। প্রেমিক নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে চিরদিনের মতো।

ইদি আমিন এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন, তিনি যে নারীকে চাইবেন তাকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা সে নারীর রহিত হয়ে যাবে। আবার এটাও তো মিথ্যে নয় অধিকতর যোগ্য পুরুষের প্রতি নারীও আকৃষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

সারাহ কিউলাবার জন্ম ২ আগস্ট ১৯৫৫ উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা শহরে। বাবা হাজি কামাদি, মা আইশা নসুবুগা। স্কুল ড্রপ আউট সারাহ নিজের জন্য বেছে নিলেন গো-গো ড্যান্স। নৃত্যশিল্পী হিসেবে উগান্ডা সেনাবাহিনীর রেভল্যুশনারি সুইসাইড মেকানাইজড রেজিমেন্ট ব্যান্ডে যোগ দেন। অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তার নামের আগে নতুন পরিচয় যোগ হয় ‘সুইসাইড সারাহ’। দ্য ক্রেইন নামের একটি ব্যান্ডে এসে যোগ দেন বেস গিটারিস্ট জেসি গিত্তা ক্যাসিরিডু। আগে থেকেই ছিলেন নৃত্যশিল্পী সারাহ। দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সারাহর ওপর নজর পড়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইদি আমিনের। জেসির সঙ্গে সম্পর্ক সূত্রে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৪ সন্তানটি জন্মগ্রহণ করে। ইদি আমিন টেলিভিশনে আরো একটি সন্তানের বাবা হওয়ার খবর জানান। ১৯৭৫ সালে বিশাল জাঁকজমকের সঙ্গে ইদি আমিন ও সারাহর বিয়ে হয়, বেস্ট ম্যান হিসেবে সেদিন বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ইয়াসির আরাফাত। বিয়েতে ইদি আমিন খরচ করেছেন কমপক্ষে ২০ লাখ ডলার। তার আগে সারাহর গর্ভজাত সন্তানটির প্রকৃত পিতা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

বলা হয়ে থাকে সারাহ ইদি আমিনের সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী। বিভিন্ন রাজকীয় অনুষ্ঠানে সারাহ ইদি আমিনের পাশে থাকতেন। ক্ষমতাচ্যুত ইদি আমিন যখন কাম্পালা থেকে লিবিয়া পালালেন সারাহ তার সঙ্গে ছিলেন। সেখান থেকে সৌদি আরব। ১৯৮২ সালে সারাহ ইদি আমিনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তার চার সন্তানের মধ্যে কেবল ফয়সাল ওয়ানগিতাকে নিয়ে জার্মানি এসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিলেন এবং পোশাকের মডেল হিসেবে কিছুকাল কাজ করেন। তারপর লন্ডনে চলে আসেন এবং ওয়েস্ট হাম কাউন্সিলে একটি রেস্তোরাঁ চালান, পরে লন্ডনের টটেনহামে একটি হেয়ার ড্রেসার শপ খোলেন। ইদি আমিনের মৃত্যুর পর তিনি তাকে সত্যিকারের ‘আফ্রিকান হিরো’ আখ্যা দেন। আরো বলেন তিনি দানব ছিলেন না, ছিলেন একজন সাধারণ হাসিখুশি দয়ালু, এক মজার মানুষ এবং বিস্ময়কর একজন পিতা।

সারাহ কিউলাবা ১১ জুন ২০১৫ ক্যান্সারে ভুগে লন্ডনের রয়্যাল ফ্রি হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি কখনো তার প্রথম সন্তানের বাবা ও তার প্রেমিক জেসিকে নিয়ে মুখ খোলেননি।

জেসিকে শেষবার দেখা যায় ৪ আগস্ট ১৯৭৪। জেসিকে প্রথমে নেয়া হয় ইদি আমিনের স্টেট রিসার্চ ব্যুরোতে। সেখান থেকে তাকে অপহরণ করে একটি গাড়ির বুটে জোর করে ঢোকানো হয়। এরপর তার আর কোনো হদিস মেলেনি।

জেসিকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম মুক্তি পেয়েছে ‘বোয়ানা জগু: দ্য ব্যালাড অব জেসি গিত্তা’। এতে দ্য ক্রেইনের শিল্পী ও কর্মীদের সাক্ষাত্কার নেয়া হয়। তারা বলেন, এ ব্যান্ডে যোগ দিয়েই জেসি ও সারাহ দুজন প্রেমে পড়েন। সারাহ যে জেসির গার্লফ্রেন্ড তা সবার জানা। কিন্তু যখন সারাহর ওপর ইদি আমিনের নজর পড়ে তারা জেসিকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ জেসির পরিণতি যে ভালো হবে না তা তারা জানতেন। এমনকি বিয়ে করে ফেললেও তার রেহাই নেই। জেসি সব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে সারাহকে বিয়ের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু একদিকে ইদি আমিনের মতো খুনি, অন্যদিকে তার পেটের সন্তানের পিতা জেসি—সারাহও কঠিন সংকটে পড়ে গিয়েছিলেন। একজন সহশিল্পী বলেছেন, সারাহ দুজনের সঙ্গেই সময় কাটিয়েছিলেন। ইদি আমিনের কব্জা থেকে বের হওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। উগান্ডার কারো পক্ষেই তখন তা সম্ভব নয়।


সারাহ যখন ইদি আমিনের প্রশংসা করেন প্রশ্ন জাগে তিনি কি আসলে জেসিকে ভালোবাসতেন? নাকি তা কেবলই মোহ ছিল?

১৯৭০ দশকের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত শাসক ইদি আমিন অন্তত ছয়বার বিয়ে করেছেন, আইনসংগত উপায়ে তিনজন স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। প্রথম স্ত্রী মালিয়ামু এবং দ্বিতীয় স্ত্রী কে—উভয়কে ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন। পরের বছর বিয়ে করেন নোরাকে। ২৬ মার্চ ১৯৭৪ তিনি রেডিও উগান্ডাতে ঘোষণা করেন যে তিনি মালিয়ামু, কে ও নোরাকে তালাক দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে তিন অসন্তুষ্ট স্ত্রী বিক্ষোভ করছিলেন বলে তাকে রেডিওতে আসতে হয়।

কে আদরোয়ার কাহিনী উগান্ডা এখনো ভোলেনি। কে ১৯৬০ দশকে কাম্পালার মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। তার ওপর ইদি আমিনের নজর পড়ে যায়। শুধু ভয়ে তিনি ইদিকে বিয়ে করেছেন বললে ইদির আকর্ষণ করার ক্ষমতা, অর্থবিত্তকে খাটো করে দেখা হবে।

রেডিওতে ইদি আমিনের তালাক ঘোষণার পাঁচ মাস পর কে-এর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। একটি গাড়ির বুটে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় তার মরদেহ আবিষ্কৃত হয়। গাড়ির মালিক ডাক্তার পিটার মবালু মুকাসাকেও শনাক্ত করা হয়। কিন্তু মৃতদেহ আবিষ্কারের আগের দিন ডাক্তার মুকাসা আত্মহত্যা করেন বলে জানানো হয়। এ মৃত্যু নিয়ে দুটি গুঞ্জন। প্রথম ও শক্তিশালী গুঞ্জনটি হচ্ছে: ডাক্তারের সঙ্গে ইদির তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, যা গোয়েন্দা সূত্রে প্রেসিডেন্ট জেনেছেন এবং তারই নির্দেশে পরিকল্পিতভাবে দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয় গুঞ্জনটি হচ্ছে ডাক্তারই তাকে গর্ভবতী করেন এবং নিজে গর্ভপাত ঘটানোর সময় রক্তাক্ষরণে কে আদরোয়ার মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ধামাচাপা দিতে ডাক্তার মুকাসা কেটেছিঁড়ে দেহটি ছিন্নভিন্ন করেন। ময়নাতদন্তে তাকে চার মাসের গর্ভবতী বলা হয়।

ইদি আমিনের ছেলে জাফর আমিন বলেন তার দ্বিতীয় মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে ইদি আমিন কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নন, এ কথা কে আদরোয়ার বাবাও ঘোষণা করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে ডাক্তার মুকাসার হাতে যদি কের মৃত্যু ঘটেও থাকে তিনি তাকে নিজের গাড়িতে রাখতে যাবেন কেন?

তালাকের পরপরই ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে ইদি আমিনের প্রথম স্ত্রী মালিয়ামুকে উগান্ডা ও কেনিয়ার সীমান্ত অঞ্চল তরুরুতে চোরাই কাপড়সহ গ্রেফতার করা হয়। তিনি কেনিয়ায় চোরাচালান করছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।

এমনকি এ অভিযোগ সত্য হলেও ইদি আমিনের সম্মতি ছাড়া তার সাবেক স্ত্রীকে গ্রেফতার করা উগান্ডা পুলিশের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মালিয়ামু পরবর্তী সময় উগান্ডা ছেড়ে চলে যান এবং পূর্ব লন্ডনে একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন।

ইদি আমিনের মৃত্যুপূর্ব অসুস্থতার খবর দেন তার স্ত্রী নালোঙ্গো মাদিনা। মৃত্যুর ক’মাস আগে তিনি চুমারুকে বিয়ে করেন। তবে ততদিনে তার গর্ভে ইদি আমিনের চার সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

ইদি আমিনের মৃত্যুর পর নালোঙ্গো মাদিনা স্বামীর লাশ উগান্ডায় নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইউওয়েরি মুসেভেনির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যাত হন।

ইদি আমিনের সন্তানসংখ্যা ৩০ থেকে ৫০-এর মধ্যে। তার বড় ছেলে তাবান আমিন মুসেভেনি সরকারের বিরোধী সংগঠন ওয়েস্ট নাইল ব্যাঙ্ক ফ্রন্টের নেতা ছিলেন। পরে মুসেভেনির সাধারণ ক্ষমায় তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তাকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দপ্তরের উপমহাপরিচালক করা হয়। অন্য এক পুত্র হাজি আলী আমিন নেজেরু টাউন কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পরাজিত হয়েছেন। দ্য লাস্ট কিং অব স্কটল্যান্ড সিনেমায় তার পুত্র জাফর আমিন তার পিতা ইদি আমিনকে উপস্থাপন করেছেন এবং তার সম্পর্কে প্রচলিত কিছু মিথের অসত্যতা তুলে ধরেছেন। সারাহ ও ইদি আমিনের ছেলে ফয়সাল লন্ডনে একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে কারাবাস করেন এবং পরে তাকে উগান্ডায় ডিপোর্ট করা হয়।

পশ্চিমের গণমাধ্যম রটিয়ে দিয়েছিল ইদি আমিন তার এক ছেলেকে হত্যা করে তার মাংস খেয়েছেন। ইদি আমিনের অন্য ছেলে জাফর আমিন বলেন, এটা ডাহা মিথ্যে, তার সেই ভাই এখনো জীবিত এবং ফ্রান্সে বসবাস করছে।

 

ইবনে মোতালিব: লেখক