১৯৭২ সালের ৫
আগস্ট উগান্ডার
নাগরিকদের উদ্দেশে
প্রেসিডেন্ট ইদি
আমিন যে
ভাষণটি দিয়েছিলেন
সেখানে উগান্ডায়
অবস্থানরত এশীয়দের
ব্যাপারে তার
বহুচর্চিত ও
বিবৃত যুক্তিই
পুনর্ব্যক্ত করেন।
এশীয়দের বিরুদ্ধে
তার সবচেয়ে
সাধারণ যেসব
অভিযোগ এবং
যেগুলো তিনি
উগান্ডা থেকে
এশীয়দের বহিষ্কারাদেশের
ডিক্রিতেও উল্লেখ
করেছিলেন সেগুলো
এমন:
‘এশীয়রা
যেই গাভীর
দুধ দহন
করে সেই
গাভীকে কখনই
খেতে দেয়
না। এশীয়রা
আফ্রিকানদের থেকে
আলাদা থেকেছে,
এশীয়রা বন্ধু
ভাব রাখেনি।
তারা কখনই
আফ্রিকানদের সঙ্গে
মিশে যায়নি।
এশীয়রা উগান্ডায়
এসেছিল রেললাইন
বানাতে। এখন
রেললাইন নির্মাণ
শেষ। তাদের
অবশ্যই চলে
যেতে হবে।’
অনেক এশীয়র
কাছেই আফ্রিকায়
এশীয় হওয়া
মানে এমন
লোক যার
সবকিছুই ভুল।
এই রাষ্ট্রীয়
চরিত্র কিন্তু
পূর্ব আফ্রিকার
স্বাধীনতার পরও
বদলায়নি। রাজনীতিতে
এশীয়রা যখন
ইউরোপীয়দের সহযোগিতা
করে তখন
এর মানে
দাঁড়ায় তারা
আফ্রিকানদের আশা
আকাঙ্ক্ষার বাধা
হয়ে দাঁড়াচ্ছে;
আবার যখন
তারা আফ্রিকানদের
পাশে দাঁড়ায়
এবং বারবারই
তারা সেটি
করেছে, তখন
স্বাধীনতা প্রাপ্তির
সময় তাদের
বলা হতো
সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদী;
আবার যখন
সংঘাত থেকে
তারা নিজেদের
দূরে রেখেছে
তখন বলা
হয়েছে এদের
পক্ষাবলম্বনের মতো
বুকের পাটা
নেই।
পূর্ব আফ্রিকার
স্বাধীনতার পর
যেসব এশীয়
স্থানীয় নাগরিকত্ব
নিতে চাইল
না তাদের
বিশ্বাসঘাতক বলে
অভিযুক্ত করা
হলো; আর
যাদের তখনো
সুবিধাবাদী বলে
সন্দেহ করা
হচ্ছিল তাদের
বিরুদ্ধে বর্ণবাদের
মোড়কে নানাভাবে
বৈষম্য বহাল
থাকল।
১৮৯৪ থেকে
১৯৭২ সালের
মধ্যে উগান্ডায়
এশীয় নৃগোষ্ঠীর
সংখ্যালঘুরা অর্থনৈতিকভাবে
সফল, কিন্তু
তারা সামাজিকভাবে
একঘরে এবং
রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন
হয়ে গেল।
রাষ্ট্রের এ
আচরণ এশীয়
উগান্ডানদের একটি
অব্যাহত অরক্ষিত
জনসমাজে পরিণত
করল। তাদের
অর্থনৈতিক অর্জনগুলো
ছিল একটি
অস্থির রাজনৈতিক
ভিত্তির ওপর
দাঁড়িয়ে, কারণ
সেটি নির্ভর
করে ছিল
ঔপনিবেশিককালে তত্কালীন
ব্রিটিশ আমলাতান্ত্রিক
শাসনের সম্পূর্ণ
রাজনৈতিক সদিচ্ছার
ওপর; আর
স্বাধীনতার পর
তারা নির্ভরশীল
হয়ে পড়ে
উগান্ডা রাষ্ট্রের
ওপর। উগান্ডার
স্বাধীনতা এবং
মূল আফ্রিকানদের
হাতে ক্ষমতা
হস্তান্তরের পর
এশীয় ও
আফ্রিকানদের মধ্যকার
দ্বন্দ্বটি প্রকাশ্যে
চলে এল
এবং একটি
ঘোষিত সংঘাতে
পরিণত হলো।
অধিকন্তু, এ
দ্বান্দ্বিক রাষ্ট্রের
প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক
ও সামাজিক
স্বার্থগুলোর ক্ষেত্রে
এশীয়দের ওপর
দ্ব্যর্থহীনভাবে আফ্রিকান
নাগরিকদের গুরুত্ব
দিত।
সংঘাতের এ
সুস্পষ্ট চেহারাটি
মূলত দুটি
বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব
করত, যা
ছিল উগান্ডায়
এশীয় ও
আফ্রিকানদের নাগরিকদের
নিত্যদিনের কর্মসূচি:
প্রথমটি হলো
উগান্ডার নাগরিকত্ব।
আর দ্বিতীয়টি
অর্থনৈতিক ও
রাজনৈতিক নীতি
‘উগান্ডাকরণ
বনাম আফ্রিকাকরণ’
সম্পর্কিত বিষয়।
উগান্ডার নাগরিকত্ব
উগান্ডার
নাগরিকত্ব ইস্যুটি
যেমন উগান্ডায়
নিজেদের নাগরিক
অবস্থান নিয়ে
উদ্বিগ্ন এশীয়দের
দোদুল্যমানতাকে সামনে
হাজির করে,
তেমনি আফ্রিকানদের
মধ্যে নাগরিকত্ব
নিয়ে যে
ভিন্ন প্রতীতি
বিরাজ করছিল
সেটিও প্রকাশ্য
হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার পর
নিজেদের দ্ব্যর্থবোধক
নাগরিকত্ব সমস্যা
সমাধানে এশীয়দের
হাতে তিনটি
বিকল্প ছিল:
তারা ব্রিটিশ
হয়ে যেতে
পারে, উগান্ডার
নাগরিকত্ব নিতে
পারে অথবা
ভারতে ফিরে
যেতে পারে।
তাদের বেশির
ভাগই ব্রিটিশ
নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন।
অবশ্য যাদের
জন্ম উগান্ডায়ই
এবং জন্মসূত্রে
উগান্ডার নাগরিক,
উগান্ডাই তাদের
দেশ, তাদের
ঘর। যেসব
এশীয় উগান্ডার
নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন
তাদের কাছে
এর অর্থ
ছিল স্থায়ীভাবে
নবগঠিত উগান্ডা
রাষ্ট্রের সঙ্গে
বাঁধা পড়ে
যাওয়া। এটি
ছিল তাদের
পূর্ববর্তী অবস্থান
এবং রাষ্ট্রের
প্রতি আনুগত্যের
অসংগতিপূর্ণ অবস্থার
অবসান। তবে
এ উগান্ডান
এশীয়দের সিদ্ধান্ত
শেষাবধি যা-ই
হোক না
কেন, স্থানীয়
আফ্রিকান সংখ্যাগুরুর
সঙ্গে তাদের
সম্পর্কের একটি
গভীর অর্থনৈতিক
ও রাজনৈতিক
গুরুত্ব ছিল।
ঐতিহাসিক টুয়াডল
(১৯৭৫) এ
সম্পর্ককে ‘একটি
কূটাভাসপূর্ণ অবস্থা
বলে বর্ণনা
করেছেন, যেখানে
বহু উগান্ডান
এশীয়র মন
পড়ে ছিল
ভারতে, তার
ধন ব্রিটেনে,
যখন সে
তার শরীর
বয়ে বেড়াচ্ছে
পূর্ব আফ্রিকায়।’
নাগরিকত্ব ও
আনুগত্যের প্রশ্নটি
উগান্ডার স্বাধীনতার
সঙ্গে সঙ্গে
একটি সমস্যা
হিসেবে হাজির
হয় এবং
১৯৬৭ সালে
স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধান
ও ইদি
আমিনের ক্ষমতায়
আরোহণের সঙ্গে
সঙ্গে চরম
মাত্রা পায়।
যাই হোক,
নাগরিকত্বের এ
শ্রেণীকরণ আফ্রিকান
উগান্ডানদের মধ্যেও
স্পষ্ট ছিল।
ঐতিহাসিক মাজরুইয়ের
(১৯৭৫) মতে,
আফ্রিকানদের কাছে
নাগরিকত্বের ধারণাটি
ছিল জ্ঞাতি
ধারণার সঙ্গে
অবিচ্ছেদ্য। খোদ
রাষ্ট্রই তখন
রাজনৈতিক গোত্রবাদের
নীতি গ্রহণ
করে। একই
পূর্বপুরুষ থেকে
উৎসারিত জ্ঞাতি-গোষ্ঠী
বা উত্তরাধিকারীর
সঙ্গে নাগরিকত্বের
ধারণা জুড়ে
দেয়া হয়।
রক্তের এ
বিশুদ্ধতার ধারণাই
তাদের আধুনিক
ইতিহাসের গতিপথ
নির্ধারণ করে
দিয়েছে। অতএব,
এ ‘রাষ্ট্র
ব্যবস্থাটি জাতিরাষ্ট্র’।
এ ধরনের
আফ্রিকার নাগরিকত্ব
অর্জন করার
একমাত্র কার্যকর
পথ ছিল
আন্তঃজৈবিক মিথস্ক্রিয়া
এবং সাংস্কৃতিক
আত্মীকরণ।
উগান্ডার এশীয়রা
কিন্তু কোনোটাই
করেননি। তারা
শুধু যে
কঠোর সামাজিক
ও যৌন
চর্চায় সুস্পষ্ট
স্বাতন্ত্র্য বজায়
রাখত তাই
নয়, রীতিমতো
দৃষ্টিকটু এবং
অসম অর্থনৈতিক
ভূমিকার সব
শর্ত পূরণ
করেছিল। এশীয়দের
প্রতি ইদি
আমিনের প্রতিক্রিয়া
ছিল তাদের
সামাজিক, সাংস্কৃতিক,
অর্থনৈতিক অবস্থান
এবং সামাজিক
আচরণের ভিত্তিতে,
সেই সঙ্গে
তার জ্ঞাতিবাদের
আফ্রিকান ধারণা
এবং ওই
সময় তার
রাজনৈতিক ও
অর্থনৈতিক প্রয়োজনও
এখানে ভূমিকা
রেখেছে।
এশীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি
এবং আচরণ
‘এমন
একটা প্রতীতি
নির্মাণে সহায়তা
করে যে
এশীয়রা “যাত্রাপথে
ধনী হয়ে
যাওয়া অভিবাসী”,
যেই লোকদের
অন্তরে আসলে
পূর্ব আফ্রিকার
কোনো স্বার্থচিন্তা
নেই।’
মাজরুই এখানে যুক্তি দিচ্ছেন যে আমিনের জ্ঞাতিবাদের ধারণাটি মূলত প্যান-জার্মানবাদ এবং প্যান-স্লাভবাদের মতো ইউরোপীয় সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার মতে, এ ধরনের আন্দোলন রক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে জ্ঞাতিবাদের তত্ত্বকে ধারণ করে। একইভাবে জেনারেল ইদি আমিন কালো উগান্ডানদের নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছিলেন, যা অন্তত আংশিকভাবে এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে কালো মানুষেরা এক দিক থেকে, রূপকালংকারের চেয়েও বেশি কিছু, যাদের জেনারেল নিজেও ‘আমার ভাই ও বোনেরা’ বলে সম্বোধন করতেন।
নাগরিকত্বের এ
আফ্রিকান ধারণার
সঙ্গে উগান্ডার
এশীয়দের অর্থনীতি,
রাজনীতি ও
সংস্কৃতি মিলিয়ে
জেনারেল ইদি
আমিন দাদার
বর্ণিত স্বরূপটির
চেয়ে প্রবলভাবে
প্রকাশিত কোনো
রূপ নেয়ার
উপায় ছিল
না। ক্ষমতা
দখলের পরপর
ইদি আমিন
নিজেকে ‘ইদি
আমিন দাদা’
অর্থাৎ পিতা
বলে অভিহিত
করতে শুরু
করেন। আমিন
উগান্ডাবাসীর সামনে
নিজের একটি
‘পিতার
ভাবমূর্তি’ উপস্থাপন
করতে পছন্দ
করতেন। পাশাপাশি
আন্তঃবিবাহকে জাতীয়
ঐক্যনীতির অংশ
বলে মনে
করতেন তিনি।
উগান্ডার চার
বৃহৎ গোষ্ঠী
থেকে চার
নারীকে বিয়ে
করার মধ্য
দিয়ে ইদি
আমিনের বিশ্বাস
ও নীতির
চর্চার সরাসরি
প্রমাণ মেলে।
উগান্ডার এশীয়দের
বিরুদ্ধে আমিনের
অভিযোগ যদিও
তাদের অনৈতিক
অর্থনৈতিক শোষণমূলক/নিয়ন্ত্রণমূলক
অবস্থান এবং
সেই সঙ্গে
তাদের সামাজিক
স্বাতন্ত্র্য ধরে
রাখার প্রবণতার
ভিত্তিতে, কিন্তু
একমাত্র এ
বিষয়গুলোই তার
রাজনীতির গতিপ্রকৃতি
নির্ধারণ করে
দিয়েছে এমন
নয়। আফ্রিকার
জ্ঞাতি/গোষ্ঠীবাদ
বলতে বোঝায়
একটি গোষ্ঠীগত
পারস্পরিক দায়বদ্ধতা,
গুরুজন ও
দুর্বলদের প্রতি
দায়িত্ব, সহযোগিতা,
আতিথেয়তা এবং
সংহতি—যে
মূল্যবোধগুলোর ওপর
আফ্রিকার সমাজ
দাঁড়িয়ে আছে।
এ বৈশিষ্ট্যগুলো
সোয়াহিলি ‘উজামা’
ধারণার মধ্যেও
রয়েছে। ঐতিহাসিক
মাজরুই (১৯৭৫)
যেমনটি বলেছেন,
তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট
জুলিয়ান নায়েরের
সোয়াহিলি শব্দ
উজামাকে ইংরেজি
সোশ্যালিজমের (সমাজতন্ত্র)
সমার্থক হিসেবে
বর্ণনা করতেন।
নায়েরের যেখানে
উজামার মূলে
খুঁজে পাচ্ছেন
সমাজতন্ত্র, সেখানে
ইদি আমিন
উজামাকে দেখছেন
নাগরিকত্বের মূলে।
নায়েরের যেখানে
গোষ্ঠী সংহতি
থেকে সমাজতান্ত্রিক
সংঘের দিকে
যাচ্ছে, ইদি
আমিন গোষ্ঠী
বন্ধন থেকে
জাতিরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের
ধারণার দিকে
হাঁটছেন। যাই
হোক আমিন
কিন্তু নিজেকে
উগান্ডার বাদামি
মানুষদের আপন
ভাবতে পারেননি।
এশীয়রাই যে
শুধু আফ্রিকানদের
সংস্পর্শ প্রত্যাখ্যান
করেছে তাই
নয়, আফ্রিকার
সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও
এ দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যকার
বিভেদরেখাকে গভীরতর
করেছে। শ্রেণীবিভেদ,
সামাজিক অবিশ্বাস
এবং অর্থনৈতিক
প্রতিযোগিতা সাংস্কৃতিক
বিরোধ বিসম্বাদকে
বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঐতিহাসিক ওকায়া
লাকিদির (১৯৭৫)
ভাষায়: এক্ষেত্রে
একটা বাস্তবতা
হলো বেশির
ভাগ কালো
আফ্রিকান এশীয়দের
ব্যাপারে এতটা
নিচু ধারণা
পোষণ করতেন
যে তারাও
তাদের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে
চাইতেন না।
১৯৭২ সালের
আগস্ট ডিক্রির
মাধ্যমে উগান্ডার
এশীয়দের উগান্ডার
আধুনিক আত্মপরিচয়
থেকে সমূলে
বিচ্ছিন্ন করা
হয়। ঐতিহাসিক
মুটিবোয়া যেমনটি
বলেছেন (১৯৯২),
(এশীয়দের তাড়িয়ে
দেয়ার) এ
সিদ্ধান্তকে উগান্ডার
আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো
ব্যাপকভাবে সাধুবাদ
জানিয়েছিল।
তার মতে,
একমাত্র ব্যতিক্রম
কণ্ঠস্বর পাওয়া
গিয়েছিল ম্যাকারেরে
ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস
গিল্ডের পক্ষ
থেকে। যদিও
তারা ব্রিটিশ
পাসপোর্টধারী এশীয়দের
বহিষ্কারে আমিনের
সিদ্ধান্তকে স্বাগত
জানিয়েছিল। উগান্ডার
নাগরিক যারা
সেই এশীয়দের
ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
পুনর্বিবেচনা করার
আহ্বান জানিয়েছিল
তারা।
যাই হোক,
ইদি আমিন
দাদার আফ্রিকান
উজামার ব্যাখ্যায়
উগান্ডার এশীয়দের
স্থান ছিল
না। ঐতিহাসিক
ফিনের বর্ণনা
অনুযায়ী, এর
ফলে উগান্ডান
দায়বদ্ধতার জগৎ
থেকে এশীয়
উগান্ডানরা উগান্ডা
রাষ্ট্র কর্তৃক
বহিষ্কৃত হন।
রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের
পর এভাবে
ইদি আমিন
উগান্ডা প্রজাতন্ত্রের
রাষ্ট্রপতি হিসেবে
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়
পরিচালিত গোষ্ঠীগত
সহিংসতার মাধ্যমে
‘আইনগতভাবে’
এশীয় সমাজের
সঙ্গে সব
ধরনের সম্পর্কের
অবসান ঘটান।
উগান্ডাকরণ বনাম
আফ্রিকাকরণ
অর্থনীতির
উগান্ডাকরণ ও
উগান্ডার প্রতিষ্ঠানিকীকরণ
বলতে বোঝাত,
এমন একটি
রাজনৈতিক ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠা করা,
যা হবে
নাগরিক অধিকার
এবং উগান্ডার
সীমানার মধ্যে
নাগরিকদের নাগরিকত্বের
স্বরূপ নির্ধারণ।
নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়
বা মহাদেশীয়
পরিচয় নির্বিশেষে
সব উগান্ডা
সম-অধিকার
ভোগ করবে
এবং রাষ্ট্রের
প্রতি সমান
নাগরিক দায়িত্ব
পালন করবে।
১৯৬২ সালের
সংবিধানের ভিত্তিতে
আঞ্চলিক নাগরিকত্বের
ধারণা আনা
হয়।
অবশ্য উগান্ডার
স্বাধীনতা আন্দোলনের
নেতা অবোতের
শাসনামলেই উগান্ডার
অর্থনীতি ও
রাজনৈতিক কাঠামোর
আফ্রিকাকরণে যেসব
অর্থনৈতিক ও
রাজনৈতিক নীতি
গ্রহণ করা
হয়েছিল সেগুলোই
শেষ অবধি
উগান্ডার মূল
আফ্রিকান এবং
এশীয় বংশোদ্ভূতদের
মধ্যকার ঔপনিবেশকালের
জটিল বহুস্তরীয়
গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মুখোমুখি
দাঁড় করিয়ে
দেয়। সুতরাং
আফ্রিকাকরণ ছিল
মূলত গোষ্ঠী
রাজনীতির একটি
মৌলবাদীকরণ।
উগান্ডার অর্থনীতি
ও রাজনীতির
আফ্রিকাকরণের মানে
হলো আফ্রিকা
মহাদেশের আদিবাসী
ও জাতিসত্তার
ভিত্তিতে আফ্রিকান
ও অ-আফ্রিকানদের
মধ্যে একটি
সচেতন বৈষম্যমূলক
নীতি। ইদি
আমিনের ক্ষমতা
দখলের মাধ্যমে,
জ্ঞাতিবাদের ওপর
তার জোর
দেয়া এবং
নিদেনপক্ষে নাগরিকত্বের
একটি বর্ণবাদী
সংজ্ঞা নির্ধারণের
ফলে প্রাতিষ্ঠানিক
বৈষম্য আইনি
বৈধতা পেয়ে
যায়। বৈষম্যের
এ বৈধতা
নিয়মিত সহিংসতাকে
উসকে দেয়।
আমিনের ক্ষমতারোহণের
সঙ্গে সঙ্গে
গোষ্ঠীবাদী রাজনীতি
প্রতিষ্ঠিত হয়,
এটিই হয়ে
ওঠে উগান্ডান
মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্রের
শাসন পদ্ধতি।
ঐতিহাসিক মাজরুইয়ের
(১৯৭৫) মতে,
গোষ্ঠীবাদী শাসনতন্ত্র
হচ্ছে এমন
একটি সরকার
ব্যবস্থা, যা
গোষ্ঠীগত স্বাতন্ত্র্য
অথবা শ্রমের
গোষ্ঠীগত বিভাজন
বা গোষ্ঠীগত
জনমিতির ভারসাম্যের
ভিত্তিতে গঠিত।
এ নাগরিকত্ব
ধারণায় উগান্ডার
এশীয়দের কোনো
স্থান ছিল
না। তাদের
দেশ ছাড়তে
হয়েছিল।
তবে এ
গোষ্ঠীবাদী শাসন
ব্যবস্থার ধরন-ধারণটি
আফ্রিকানদের প্রতি
কম নিষ্ঠুর
বা কম
রক্তপিপাসু ছিল,
এমনটা ধারণা
করাও কিন্তু
ভুল প্রমাণিত
হয়েছে। ইদি
আমিন তার
শাসনের শুরুটাই
করেছিলেন নিজ
বাহিনীতে হত্যার
মধ্য দিয়ে।
আমিন এবং
তার পশ্চিম
নীল নদের
সেনারা বাহিনীর
মধ্যে বিরোধীদের
সমর্থকদের তন্নতন্ন
করে খুঁজতে
শুরু করে।
এরা ছিল
আচোলি এবং
লাঙ্গি উপজাতির
লোক। আমিন
উগান্ডানদের দেয়া
প্রতিশ্রুত ভালো
অর্থনীতি দিতে
পারেননি। ফলে
তার দরকার
ছিল হাতের
কাছে কোনো
পুঁজির উৎস।
আর এক্ষেত্রে
এশীয়রাই ছিল
সহজ লক্ষ্য।
যাই হোক,
বাহিনীর মধ্যে
ব্যাপক হত্যা
বা এশীয়দের
বহিষ্কারই ইদি
আমিনের শাসন
পদ্ধতির নিষ্ঠুরতার
একমাত্র চিত্র
নয়। যখন
তিনি উগান্ডার
ব্রিটিশ মালিকানাধীন
সম্পদগুলো অধিগ্রহণ
শুরু করেন,
তখন এশীয়দের
বহিষ্কার ছিল
তার অর্থনৈতিক
যুদ্ধের শুরু
মাত্র। সুতরাং
এশীয়দের বহিষ্কার
ছিল আমিনের
নিষ্ঠুর শাসনের
একটি উপসর্গ
মাত্র। তার
শাসনামলের কোনো
আইনি সীমা
ছিল না।
সেটি ছিল
মূলত স্বসংজ্ঞায়িত
শত্রু-মিত্র
ধারণার ওপর
প্রতিষ্ঠিত। এবং
তার এ
ধারণাগুলো ক্রমাগত
ও খেয়ালখুশিমতো
পরিবর্তিত হয়েছে
এবং সম্ভবত
শেষে তা
একটা বাতিকের
পর্যায়ে চলে
যায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে
এশীয়দের সামাজিক
নিয়তি পরিষ্কারভাবে
গোষ্ঠীগত শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক
সমাজের মধ্যকার
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের
এক অস্বাভাবিক
অবস্থানের দৃষ্টান্তে
পরিণত হয়।
তাদের সামাজিক
পারিপার্শ্বের সঙ্গে
তাদের সমস্যাজনক
সম্পর্কের সমন্বিত
একটি অভ্যন্তরীণ
কাঠামো তাদের
একটি স্থায়ী
অরক্ষিত অবস্থানের
দিকে ঠেলে
দেয়। অর্থনৈতিক
সাফল্য সত্ত্বেও
তাদের রাজনৈতিক
দুর্বলতা এমন
এক পরিস্থিতি
তৈরি করে
যেখানে একটি
‘সাধারণ
সমাধানের’ নীতি
তাদের বিরুদ্ধে
বাস্তবায়ন করা
যেত তাদের
প্রতিক্রিয়া আমলে
না নিয়েই।
এশীয়দের বহিষ্কার
ছিল একটি
রাষ্ট্রের তার
নিরীহ নাগরিকদের
প্রতি বৈধ
ও সরকারি
দস্যুতার সমতুল্য।
এ স্বৈরতান্ত্রিক
সরকারের এশীয়
বিরোধী নীতি,
যা গণহারে
বহিষ্কার পর্যন্ত
গড়ায়, সেখানে
তার সংশ্লিষ্টতা
ও পূর্ণ
দায়, সিদ্ধান্ত
বাস্তবায়নে ত্বরা
ও ব্যাপকতা,
এ পদক্ষেপের
পক্ষে তত্কালীন
সামাজিক ও
সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতাকেই
প্রকাশ করে।
নিশ্চিহ্ন করার
পদক্ষেপে এশীয়দের
লক্ষ্য হিসেবে
বেছে নেয়া
হয়েছিল তাদের
সামাজিক দুর্বলতা
এবং একজন
স্বৈরশাসকের রাজনৈতিক
প্রয়োজনে যথেচ্ছ
ব্যবহারের জন্য
প্রস্তুত একটি
বাহিনী ছিল
বলে। বাস্তবিক
পক্ষে ভারত
বা ব্রিটেন
কেউই ওই
সময় তাদের
সাবেক নাগরিকদের
রক্ষা করার
অবস্থায় ছিল
না। এ
পরিস্থিতিতে তাদের
অরক্ষিত অবস্থা
আরো নাজুক
হয় এবং
অসহায়ত্ব বহুগুণে
বেড়ে যায়।
আমিনের দৃষ্টিতে,
এশীয়দের বহিষ্কারে
কয়েকটি রাজনৈতিক
কাজ সম্পন্ন
হয়েছে: এর
মধ্যে ব্রিটিশদের
শায়েস্তা করার
ইচ্ছা একটি।
এর তাত্ক্ষণিক
লাভটা কিন্তু
ছিল ব্যাপক।
যদিও উগান্ডার
অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যাই হোক
১৯৭২ সালের
অক্টোবরে উগান্ডা
একপ্রকার এশীয়
মুক্ত হয়ে
যায়।
এশীয়দের বিরুদ্ধে আমিন যে অপরাধটা করেছেন সেটি উগান্ডার এশীয় এবং সমানভাবে আফ্রিকানদের প্রতি তার সীমাহীন ও বিধ্বংসী নীতির একটি অংশ মাত্র। ১৯৭৮ সালে তার ক্ষমতাচ্যুতির আগে পর্যন্ত এ পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকেই গেছে।





