২০১৩ সালে দারুণ আনন্দের একটি খবর আসে। মিরপুরে ঢাকা চিড়িয়াখানায় ‘প্রিয়া’র জন্ম হয়েছে। এ প্রিয়াকে নিয়ে রাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ ঘটেনি, কারণ এটি আমাদের প্রথম জিরাফ শিশু।
তখন কিন্তু নামটা ঢাকা চিড়িয়াখানাই ছিল, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে নতুন নামায়ন করা হয়—বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা।
২০১৭ সালের মে মাসে আরো বড় সুখবর—
একটি মা জিরাফ ৪০ কিলোগ্রাম ওজনের একটি মেয়েশিশু জিরাফ প্রসব করেছে। এর নাম রাখা হয়েছে প্রভা (এ নামে সেলিব্রিটিও বাংলাদেশে আছে)।
আরো একটি সন্তানসম্ভবা মা জিরাফ প্রভার জন্মের ১৫ ঘণ্টা পর একটি ছেলেশিশু জিরাফ জন্ম দিয়েছে। এর ওজন ৬০ কিলোগ্রাম। ছেলেদের ওজন একটু বেশিই হয়ে থাকে।
সংবাদপত্রে লেখা হয় বহুসংখ্যক মানুষ জিরাফের সন্তান হওয়ার ঘটনাটি প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে পর্যবেক্ষণ করেন।
আমার স্বজন এক সন্তানসম্ভবা তরুণী এতে চটে যায়, না এটা ঠিক হয়নি। মানুষ কেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। জিরাফ কি মানুষের সন্তান হওয়া দেখতে আসে নাকি? মা জিরাফটাকে বড় পর্দার আড়ালে নিয়ে কি ডেলিভারির কাজটা করানো যেত না?
পরদিন খবরের কাগজে ছবি ছাপা হয়। সস্নেহে মা জিরাফ তার শিশুর দিকে তাকিয়ে আছে।
সেই ক্ষুব্ধ মা তার স্বামীকে বলে তখনি তাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে হবে, সে শিশু জিরাফ দেখবে।
বাংলা ভাষার একজন খ্যাতিমান গল্পকার শাহেদ আলীর কথা তেমন কাউকে বলতে শুনি না। তার একই সমতলে নামের একটি গল্পে সদ্য শাবক প্রসব করা গরুর সঙ্গে গল্পের নায়িকা কী অসাধারণ মমত্ব দিয়ে নিজের জীবনকে মিলিয়ে নেয়। এখানেও আমার তাই মনে হয়েছে—অনাগত সন্তানের মা আর মা-জিরাফ তো একই সমতলে।
মাত্র কয়েকদিন আগে ২৫ জুন ২০১৯ ঢাকা ট্রিবিউন-এ ছাপা একটি সংবাদ মন খারাপ করে দেয়। টানা ৫৭ দিন ধরে ‘হীরা’ নামের সিংহটি মুখে কোনো খাবার তুলছে না। ২৫ এপ্রিল শেষবারের মতো মুখে খাবার নিয়েছে, তারপর আর এক কামড় খাবারও না। পশু চিকিৎসক বলেছেন, তিনি তার জীবনে এমন রোগী পাননি। সর্বোচ্চ ১৪ দিন পর্যন্ত না খাওয়া পশু দেখেছেন, কিন্তু ৫৭ দিন তো অবিশ্বাস্য। অনেক চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, হীরা ‘অ্যাসিড রিফ্লেক্স’-এ ভুগছে। তবে তিনি আশাবাদী হীরা রোগমুক্ত হবে।
হীরার জন্ম বাংলাদেশেরই সাফারি পার্কে। কিন্তু এখনো এটি বেঁচে আছে কিনা জানি না।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিউ এজ বেশ কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরে জানাল আমাদের জাতীয় চিড়িয়াখানা পশুর প্রতি ইনসেপিটেবল— মানে অতিথিপরায়ণ নয়।
চিড়িয়াখানার উদ্ভব
মেসোপটেমিয়া, মিসরীয়, ভারতীয়, চাইনিজ, গ্রিক, রোমান, পার্সিয়ান কিংবা আরব—সব সভ্যতায় ধনী শ্রেণীর নিজস্ব গৌরব প্রচারের একটি মাধ্যম ছিল মিনাজেরিস- সৃষ্টি। সেখানে সিংহ, বাঘ, চিতা, ভালুকসহ বিচিত্র সব প্রাণী থাকবে। মিসরীয় রানীর ছিল রাইনোসেরোস, জিরাফ এবং গ্রে হাউন্ড কুকুর। চীনের সম্রাটের ছিল হাতি, ইয়াক, পান্ডা, সারস। ইন্দো-ইউরোপীয় হিট্টিটি বাদশাহদের ছিল বাঘ, সিংহ, নেকড়ে, ভালুক ও চিতা। লাতিন আমেরিকান রাজার ছিল জাগুয়ার ঈগল ও সাপ। পরবর্তী সময়ে এ মিনাজেরিস চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত হয়। ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের রানী ইসাবেলাকে দিয়েছেন ৬০টি তোতা পাখি ও একটি ম্যাকাও। ষোড়শ শতকে এ গোলার্ধের ইগুয়ানা, বাইসন, লামা, টার্কি, বেজি, গিনিপিগ ইউরোপে আদৃত হয়ে উঠেছে।
চিড়িয়াখানার এ পূর্বসূরি মিনাজেরিস প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগে সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক চিড়িয়াখানার গোড়াপত্তন ঊনবিংশ শতকে লন্ডন জু থেকেই।
মিসরের হিরাকোনপলিস খননের পর নির্দিষ্ট স্থানে যেসব জীবের সন্ধান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ছিল হিপ্পোপোটমাস, হাতি, বেবুন ও বুনো বিড়াল। বিশ্বাস করা কারণ আছে যে, এটা ছিল সাড়ে তিন হাজার বছর আগের একটি মিনাজেরিস। সম্রাট নিরোর সময় ৪০০ বাঘ, হাতি ও ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই করেছে। ১২৩৫ সাল তৃতীয় হেনরির বিয়েতে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডিরিক তিনটি চিতাবাঘ উপহার দিয়েছেন।
***
পশুপাখি চিড়িয়াখানা, জুলজিক্যাল গার্ডেন এসব শুনলেই আমার এডওয়ার্ড লিয়ার এবং সুকুমার রায়ের আবিষ্কার করা অদ্ভুত অদ্ভুত জন্তুগুলোর চেহারা মনে পড়ে। চিড়িয়াখানা বলতেই আমার মতো প্রায় সবারই শৈশব জেগে ওঠে। আমার শৈশবের চিড়িয়াখানাটির অবস্থান মোটেও মিরপুরে নয়। তা ছিল একেবারে ঢাকার কেন্দ্রে হাইকোর্টঘেরা রমনায়। তখন রমনা পার্কে ঘোড়দৌড় হতো। চিড়িয়াখানার সীমান্তে দাঁড়িয়ে বাদাম ছিলে হাতে নিয়ে হরিণকে খেতে দিয়েছি। বাদাম হরিণের প্রিয় খাবার হওয়ার কথা নয়, তবুও আমার হাতে মুখ ও জিহ্বা লাগিয়ে তুলে নিয়েছে। হরিণের মুখের সেই স্পর্শটা এখনো অনুভব করি।
১৯৫০-এর ২৬ ডিসেম্বর হাইকোর্টসংলগ্ন এ চিড়িয়াখানার উদ্বোধন হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এখানেই ছিল। এর মধ্যে চিড়িয়াখানার জন্তুগুলোকে মিরপুরে অধিগ্রহণ করা জুলজিক্যাল গার্ডেনে স্থানান্তরের কাজ চলতে থাকে। বড় আঙ্গিকে ১৮৬ একর জমিতে ঢাকা চিড়িয়াখানার শুরু ২৩ জুন ১৯৭৪ সালে।
উদ্বোধনের পর দুদিনও পেরোতে দিইনি, হাজির হই অসমাপ্ত নতুন চিড়িয়াখানায়। ঢাকা এক সময় বানরের শহর ছিল। পুরান ঢাকায়, লালবাগ এলাকায়, বিড়িখালের পেছনে গণকটুলি এলাকায় দেয়ালের ওপর, বাড়ির কার্নিশে কুড়ি-পঁচিশটা বানর তো হামেশাই দেখা যেত। আমি অন্তত ১০০ বানর লাইন ধরে দেয়াল ও কার্নিশের ওপর বসে থাকতে দেখেছি। ধরে এনে ঢুকিয়ে দিলেই হয়, সেজন্য নতুন চিড়িয়াখানায় বেশ কয়েকটি বানরের আবাসন হয়েছিল। মিরপুরের এ চিড়িয়াখানাটি নামায়নে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত হলেও কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নতি হয়নি। এখন ১৯১ প্রজাতির প্রাণীর আবাস এখানে।
এখানে বাঘা ভাইয়ের কথা একটু বলতেই হয়। সত্তরের দশকে তাকে নিয়ে ফিচার ছাপা হয়েছে। ঢাকা চিড়িয়াখানার বাঘ বেষ্টনীর সম্ভবত কিপার ছিলেন তিনি। অসাধারণ সখ্য ছিল তার বাঘের সঙ্গে। অনেক সময় নিজ হাতে বাঘকে খাওয়াতেন। ইন্দিরা রোডে এখনকার তেজগাঁও কলেজের গাঘেঁষা গলিটাতে তার নিজের বাড়ি। তার ছোট ছেলে পরবর্তী সময়ের প্রকৌশলী টুটুল আমার বন্ধু। আমি বাঘা ভাইয়ের স্নেহভাজন একজন হিসেবে তার মুখে ইন্দিরা রোডের ইতিহাস, মনিপুর ফার্মের কথা এবং বাঘের গল্প শুনেছি।
আরো একজনের কথা বলতেই হবে—ডক্টর রেজা খান। তিনি দুবাইয়ে নির্মীয়মাণ আধুনিক জুলজিক্যাল গার্ডেনের বড় কর্তা ও পরামর্শক ছিলেন। তিনি তার প্রতিষ্ঠানটি ২০০৭-০৮-এ ঘুরিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। একাধিকবার দুবাই যাওয়ার পরও হাতে সময়-সুযোগ না থাকায় দেখা হয়নি, শেখা হয়নি। এখন আফসোস হয়।
একটু খা খা অনুভব করি লন্ডনের রিজেন্ট পার্কে বিশ্বসেরা লন্ডন জু যতটা না নিজের জন্য, তার চেয়ে বেশি সন্তানকে সন্তুষ্ট করতে আমরা সপরিবার গিয়েছি। গোটা দিনই কাটিয়ে দিয়েছি এবং বুঝতে পেরেছি এটি ভালো করে দেখতে হলে এক-দুদিন যথেষ্ট নয়।
সেই লন্ডন জুর কথা বলি, তথ্যগুলো হালের—
লন্ডন জু
এখনো সার্বিক বিবেচনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম চিড়িয়াখানা রিজেন্ট পার্কের লন্ডন জু।
স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফল ও স্যার হাফফ্রে ডেভি ১৮২৬ সালে জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন প্রতিষ্ঠা করেন এবং তারাই গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহারের জন্য জায়গাটি নেন। গবেষণাগার মানে পশুপাখির গবেষণার জন্য সীমিত আকারে চিড়িয়াখানা স্থাপনও। ১৮২৬-এর এপ্রিলে এটি জুলজিক্যাল সোসাইটির সদস্যদের জন্য খুলে দেয়া হয়। রাজা ষষ্ঠ জর্জের আমলে সোসাইটি রাজসনদ (রয়্যাল চার্টার) লাভ করে। ১৮৪৭-এ এটি চিড়িয়াখানা হিসেবে জনগণের জন্য খুলে দেয়া হয়। এখন এতে ৬৯৮ প্রজাতির ২০ হাজার ১৬৬টি প্রাণী রয়েছে। কর্মব্যস্ত লন্ডন শহরের কেন্দ্রে চিড়িয়াখানাসহ রিজেন্ট পার্ক একটি মনোরম মরূদ্যানের মতো। জনগণের জন্য খুলে দেয়ার কারণই ছিল সোসাইটির জন্য কিছু উপার্জনের পথ করা।
১৮৬৫ সালে এখানে আনা হলো আফ্রিকান বুল এলিফ্যান্ট। এর নাম দেয়া হলো ‘জাম্বো’।
১১ ফুট লম্বা। শেষ পর্যন্ত এ জাম্বো শব্দটি সব ধরনের ইংরেজি অভিধানে ঢুকল, যার মানে খুব বড়। বোয়িং ৭৪৭-এর নাম হলো জাম্বো জেট। লন্ডন জুর প্রবেশপথে এ চিড়িয়াখানার একদা সেলিব্রিটি বাসিন্দা একটি গরিলার সম্মানে তার একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা। ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর গাই ফক্স রাতে গরিলাটিকে এখানে আনা হয়। গরিলার নাম হয়ে যায় গাই। এই গরিলা ৩০ বছর ধরে বহু দর্শককে স্বাগত জানিয়েছে। ১৯১৪ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত এ রিজেন্ট পার্কে অবস্থান করেছে উইনি নামের একটি শান্ত ভালুক। লেখক এ মিলনের শিশুপুত্রের দারুণ প্রিয় ছিল এ ভালুকটি। তার হাতে এ ভালুকের প্রেরণায় তৈরি হলো পরবর্তী কালের বিখ্যাত শিশুতোষ চরিত্র ‘উইনি দ্য পু’।
লন্ডনের রয়্যাল জুলজিক্যাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন চার্লস ডারউইন। চিড়িয়াখানায় তখন প্রথম ওরাঙ্গওটাং আনা হয়। ডারউইন তখন দি অরিজিন অব স্পিসিস লিখছেন। তিনি নিয়মিত এসে এই মেয়ে ওরাঙ্গওটাংকে দেখতেন। এর আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন এ মানুষসদৃশ প্রাণীটি জু কিপারের কথা শোনে, তার আদেশ বোঝে ও মান্য করে। যখন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বিস্মিত হয়, যখন তাকে খাবার থেকে বঞ্চিত করা হয়, হাতের কাছে যা পায়, তা ছুড়ে ক্রোধ প্রকাশ করে। এই ওরাঙ্গওটাংয়ের নাম জেনি। জেনি দি অরিজিন অব স্পিসিস লেখার সময় ডারউইনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। জেনি ‘ডারউইনস গার্ল’ হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠে।
লন্ডন জুতে প্রথম পোলার বিয়ার আসে ১৯৪৯ সালে। এর নাম রাখা হয় ব্রুমাস। পোলার বিয়ারের কথা শুনে সে বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা এক লাফে ৩০ লাখে উঠে যায়। ব্রুমাসকে নিয়ে তৈরি পোস্ট কার্ড, খেলনা খুব ভালো বাজার পায়। এ তরুণ পোলার বিয়ারকে নিয়ে গল্প ও কল্পোপন্যাসও লিখিত হয়। কিন্তু বড্ড দেরিতে বোঝা যায় এটা মোটেও তরুণ নয় বরং তরুণী। ১৯৬৫ সালে লন্ডন জু থেকে পালিয়ে যাওয়া ইগল গোল্ডি সংবাদের শিরোনাম হয় এবং একে শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাগান থেকে কৌশলে উদ্ধার করে আবার চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসা হয়।
পৃথিবীতে বিলুপ্ত হওয়া কোনো কোনো প্রাণীর খোঁজ পাওয়া যাবে লন্ডন জুতে—একটি তাসমিনিয়ান টাইগার, অন্যটি কোয়াগা।
১৯৬২ সালে অ্যারাবিয়ান অরিক্স দীর্ঘ শিং গরুসদৃশ প্রাণী আরিজোনার ফিনিক্স জুকে ধার দেয়া হয় আর এটাই পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক প্রজনন কর্মসূচি। বর্তমানে ১৩০ প্রজাতির ব্রিডিং কর্মসূচিতে লন্ডন জু অংশগ্রহণ করে থাকে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লন্ডন জু অনেকবার বোমা বর্ষণের শিকার হয়েছে এবং যথেষ্ট কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও বোমার কারণে কোনো প্রাণী মারা যায়নি। অবশ্য বোমাবর্ষণের সময় একটি জেব্রা, একটি মাদি গাধা ও এর সন্তান চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে গেছে। যুদ্ধ চলাকালে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি থেকে গা বাঁচানোর জন্য কেউ চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়তে চাইলে তাকে বিনা পয়সায় সে সুযোগ দেয়া হয়েছে। সে সময় এটা সত্য যে বিষাক্ত প্রাণীগুলো হত্যা করা হয়েছে।
মানুষ ও পশু
অরণ্যের হাতিকে দিনে কমপক্ষে ৩০ মাইল হাঁটাহাঁটি করতে হয়। ভালুককে খাবারের খোঁজে দিনে ১০০ মাইল দৌড়াতে হয়। বাঘ ও সিংহ ভীষণ দ্রুতগতিতে দৌড়ায়, গাছে চড়ে, তার পরও কখনো কখনো অথর্ব হয়ে পড়ে—এ প্রাণীগুলোকে কখনো বড় খাঁচায়, কখনো লৌহ বেষ্টনীতে আটকে কার্যত তাদের জীবনীশক্তি শেষ করে দেয়া হয়। বন্দিজীবনে আরণ্যক জীবনের রুটিন ও কর্মকাণ্ড সব পাল্টে যায়। এর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকে না, স্বাভাবিক যৌন ও প্রজনন জীবন উপেক্ষিত হয়। প্রাণী সম্পর্কে মানুষের (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বল্প শিক্ষিত চিড়িয়াখানা কর্মচারীর) জ্ঞান হয়ে ওঠে তাদের জীবনের অবলম্বন। চিড়িয়াখানায় কৃত্রিম পরিবেশে শুরুতেই প্রাণীগুলো জুকোসিস রোগে (হতাশা, একঘেয়েমি, বন্দিদশার অনুভূতি) ভুগতে থাকে।
পৃথিবীর প্রায় সব চিড়িয়াখানার লক্ষ্যই অধিকতর আয়, এখানে সার্কাসের মালিকের সঙ্গে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মৌলিক তফাত কমই। যে প্রাণী দর্শক আকর্ষণ করতে পারে না, তার গুরুত্ব কম। এমনকি দর্শক আকর্ষণ করা সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাণীটির যখন বার্ধক্য এসে যায়, তার তখন প্রাপ্য অনাদর উপেক্ষা এবং কখনো কখনো কিপারদের হাতেই নির্মম মৃত্যু। বিপর্যয়ের সময় মানুষ নিজের কথাই ভাবে। হ্যারিকেন ক্যাটরিনা আঘাত করার পর নিউ অরলিয়েন্সের কমপক্ষে ১০ হাজার প্রাণীর অকালমৃত্যু ঘটে।
দুটি মৃত্যু
কোপেনহেগেন, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। চিড়িয়াখানার কিপার তার দুই আঙুলের ফাঁকে এক টুকরা রুটি রেখে দুই বছর বয়সী জিরাফ মারিয়াসকে ইশারায় ডাকল। খাবার দেখে আনন্দিত মারিয়াস তার লম্বা জিহ্বা বাড়িয়ে রুটির টুকরো নিয়ে মুখের ভেতর টেনে আনল, ঠিক তখনই এর মাথায় গুলিটা লাগে। তারপর চিড়িয়াখানায় আসা বহুসংখ্যক শিশুসহ দর্শনার্থীদের সামনে মারিয়াসের হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকা দেহটি কেটে টুকরো টুকরো করে সিংহকে খাওয়ানো হলো। খবরটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম লুফে নিল, মারিয়াস পরিণত হলো মরণোত্তর সেলিব্রিটিতে। চিড়িয়াখানার মুখপাত্র নির্বিকারভাবে পৃথিবীকে জানিয়ে দিল—এ জিরাফের জিন তাদের প্রজন্ম কর্মসূচি থেকে রহিত করার জন্য মারিয়াসকে হত্যা করা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
প্রাণীর অধিকার আদায়ে যারা তত্পর, তারা বললেন, এটি বর্বরোচিত ঘটনা। এ পর্যন্ত কোপেনহেগেন চিড়িয়াখানা দুঃখও প্রকাশ করেনি।
সিনসিনাতি, ওয়াহিত অঙ্গরাজ্য, ২৮ মে ২০১৬। তিন বছর বয়সী এক চঞ্চল বালক বেষ্টনীর বেড়া বেয়ে বেশ উপরে উঠে একটি দেয়ালের ওপর হামাগুড়ি দিতে গিয়ে ভেতরের দিকে স্যাঁতসেঁতে জায়গায় পড়ে গেল। জায়গাটা গরিলাদের বেষ্টনীর ভেতরে। ঝপাৎ করে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে কী হয়েছে দেখার জন্য ১৭ বছর বয়সী হারাম্বে ছুটে এল। হারাম্বে ৪৫০ পাউন্ড ওজনের ওয়েস্টার্ন লো-ল্যান্ড গরিলা। অন্য গরিলাও উঁকি দিতে শুরু করল। আপাতদৃষ্টিতে এটাই মনে হলো হারাম্বে শিশুটিকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে এবং তার দুই পায়ের ফাঁকে তাকে এমনভাবে আলতো করে আটকে রেখেছে যেন অন্য কোনো গরিলা এসে তাকে আক্রমণ করতে না পারে। তার আচরণে বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ ছিল যে, হারাম্বে শিশুটির কোনো ক্ষতি করতে চায়নি। কিন্তু চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল হারাম্বেকে হত্যা করতে হবে। কিপার খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করল, কাত হয়ে পড়ে গেল হারাম্বে।
আশপাশের লোকজন শিশুটির অমনোযোগী মাকে দোষারোপ করল। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে গালমন্দ করল। কোনো সংগত কারণ ছাড়াই তারা গরিলা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এতে কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া মেলেনি। ২০১৩ সালের হিসাব—চিড়িয়াখানা দুই লাখ চাকরি সৃষ্টি করেছে, বছরে ১৬ কোটির বেশি মানুষকে চিড়িয়াখানায় টেনে আনছে এবং অর্থনীতিতে ২০ বিলিয়ন ডলার জোগান দিচ্ছে। এসব আর্থিক যুক্তি সামনে আনার মানে জিরাফ কিংবা গরিলার যা হয় হোক, আমাদের চিড়িয়াখানা তো চালু রাখতে হবে।
চিড়িয়াখানা সম্পর্কে অ্যানিমেল অ্যাক্টিভিস্টরা, যারা নিজের ও প্রাণীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তারা মনে করেন চিড়িয়াখানা প্রাণীর স্বাধীনতাই কেবল হরণ করে না, জীবনও বিপন্ন করে তোলে।
০১. ফ্রিডম ফর অ্যানিমেল ছদ্মবেশী গোয়েন্দা পাঠিয়ে ভিডিও করে এনেছে যে ইংল্যান্ডের ব্ল্যাকহল টুইডল ফার্ম জুতে অসুস্থ প্রাণীকে কোনো রকম চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। মৃত প্রাণীকে সত্কার না করে মেঝেতেই পচতে দেয়া হয়েছে। তারাই শেষ পর্যন্ত অসুস্থ খরগোশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে একটিমাত্র নিঃসঙ্গ বানরকে সঠিক খাবার না দিয়ে মানুষের জাংকফুড খাওয়ানো হচ্ছিল।
সাফারি পার্ক কি সনাতন চিড়িয়াখানার চেয়ে ভালো? একটি সাফারি পার্ক পরিদর্শনের পর সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— এটি অত্যন্ত জনাকীর্ণ। সিংহের মতো প্রাণীর আয়েশ করে খাওয়ার এবং নিরাপদে ঘুমানোর মতো কোনো জায়গা নেই। সিংহকে ১৮ ঘণ্টা খাঁচায় রেখে কেবল ৬ ঘণ্টার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। যে সিংহ তাদের প্রদর্শিত হয় তার গায়ে নতুন-পুরনো অনেক জখম ছিল।
ব্রিটেনের চিড়িয়াখানাগুলোয় মাত্র ১৬ ভাগ হাতি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে; ৭৫ ভাগই স্থূল ও ভারী। বাকিগুলোর কোনো না কোনো ধরনের পঙ্গুত্ব রয়েছে। এ সমীক্ষাটি সরকারি তহবিল থেকে করানো, কাজেই প্রতিবেদনের যথার্থতার দিকে ইঙ্গিত করার সুযোগ নেই।
২. চিড়িয়াখানা বড় আরণ্যক প্রাণীকে পর্যাপ্ত জায়গা দিতে পারে না। অরণ্যে বাঘ যে জায়গা ছোটাছুটির জন্য পেয়ে থাকে, চিড়িয়াখানায় পায় তার ১৮ হাজার ভাগের ১ ভাগ, আর পোলার বিয়ার মেরু ভালুক পায় ১০ লাখ ভাগের ১ ভাগ।
৩. ব্রিটেনের চিড়িয়াখানার ৫৪ ভাগ হাতি দিনের বেলায় মানসিক অসুস্থতায় ভোগে, রাতে তা বেড়ে ৬১ ভাগে পৌঁছে। সিংহের বেলায় সবই অসুস্থ হয়ে পড়ে।
৪. চিড়িয়াখানায় প্রাণীর অকাল মৃত্যু হয়। চিড়িয়াখানার আফ্রিকান হাতির চেয়ে বনের হাতি ৩ গুণ বেশি সময় বেঁচে থাকে। এমনকি সারাক্ষণ গাছ ও কাঠটানা এশীয় হাতিও চিড়িয়াখানার হাতির চেয়ে বেশি সময় বাঁচে। চিড়িয়াখানায় ৪০ ভাগ সিংহশিশু এক মাস বয়সে না পৌঁছতে মারা যায় আর অরণ্যের শাবকের ৩০ ভাগ মারা যায় ছয় মাসে পৌঁছলে, এর এক-তৃতীয়াংশ আবার নিহত হয় শিকারির হাতে।
৫. চিড়িয়াখানায় বাড়তি অজুহাতে প্রাণী হত্যা করা হয়। যেকোনো মুহূর্তে ইউরোপীয় চিড়িয়াখানায় বাড়তি প্রাণীর সংখ্যা কমপক্ষে ৭ হাজার ৫০০। আবার কারো মতে তা দুই লাখের কাছাকাছি। পৃথক বেষ্টনী ও খাবারের ব্যবস্থা করতে না পারায় এগুলো হত্যা করা হয়। থাইল্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ পার্কে বহুসংখ্যক নেকড়ের মরদেহ পাওয়া গেছে। ডার্টমুর চিড়িয়াখানা ডিপফ্রিজে বহুসংখ্যক মৃত প্রাণী ট্যাক্সিডার্মি (ভেতরে খড় ঢুকিয়ে ডামি প্রাণী বানানোর ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া) করার জন্য রেখে দেয়া হয়েছে। ২০১০ সালে জার্মানির চিড়িয়াখানায় তিনটি বাঘ শাবককে হত্যা করা হয়েছে, কারণ এগুলো বিশুদ্ধ রক্তের নয়, হাইব্রিড। (হিটলারের কথা স্মরণ করুন।)
২০১৪ সালে কোপেনহেগেন জুতে মারিয়াস নামের একটি জিরাফ হত্যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে বেরিয়ে আসে প্রাণী হত্যা সেখানকার নিত্যঘটনা।
চিড়িয়াখানাগুলো সার্কাস পার্টির সঙ্গে আঁতাত করে তাদের চাহিদার প্রাণী ভাড়া দেয়, বিক্রি করে। জাপানের ভ্রাম্যমাণ সার্কাস পার্টি ওয়েস্ট মিডল্যানসাফারি পার্ক থেকে বাঘ নিয়েছে। প্রাণী স্বাস্থ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ট্রিকস প্রশিক্ষণ দেয়া হাতির এক পায়ের ওপর দাঁড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিবহুল। সংরক্ষণের কথা কাগজে কলমে বলা হলেও অধিকাংশ চিড়িয়াখানায় প্রজাতি সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। লন্ডন জু নতুন গরিলা বেষ্টনী তৈরি জন্য ৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে, অন্যদিকে বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের জন্য তাদের অর্থ নেই।
সব মিলিয়ে অরণ্যচারী প্রাণীর ভয়ংকর বিপজ্জনক আবাসনের নাম চিড়িয়াখানা, একটু রঙ মিশিয়ে বললে জুলজিক্যাল গার্ডেন, হালের অধিকতর মিষ্টি শব্দে বর্ণনা করতে হলে কনজারভেশন পার্ক, ইকো পার্ক।
জর্জ মনবিয়রের বই নো ম্যানস ল্যান্ড: এন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নি থ্রু কেনিয়া অ্যান্ড তানজানিয়া মুগ্ধ বিস্ময়ে পাঠ করার পর নতুন করে বুঝতে পেরেছি মানুষের চেয়ে হিংস্র ও স্বার্থান্ধ কোনো প্রাণী নেই। মানুষের হাতে নির্মমভাবে নিঃশেষ হয়েছে অরণ্য ও প্রাণী। এমনকি কেনিয়ার মাসাইমারা সাফারি পার্কও মানুষের নিষ্ঠুরতার বড় উদাহরণ।






