চিড়িয়াখানা ধারণাটির সঙ্গে মানুষ এখন কমবেশি পরিচিত। বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় ঘুরতে এলে মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় এক পাক ঘুরে যান। ঈদের ছুটিতে তো ঢাকাবাসীই শিশুদের নিয়ে চিড়িয়াখানায় হামলে পড়ে। অনেক প্রভাবশালী মানুষ আইনে অনুমোদিত নয় এমন পশু খাঁচায় রেখে নিজের বাগানবাড়িতে মিনি চিড়িয়াখানা তৈরি করেছে—এ খবর বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এসেছে।

প্রয়াত পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের ব্যক্তিগত পশু সংগ্রহশালায় ছিল বাঘ, জিরাফ, তোতা এবং অবশ্যই তার পোষা শিম্পাঞ্জি। কলম্বিয়ার মাদক সম্রাট লর্ড এসকোবারের বিরাট এক ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ছিল; এতে হাতি, মহিষ, উট। এসকোবারের সংগ্রহে থাকা আফ্রিকার জলহস্তী পালিয়ে গিয়েছিল কলম্বিয়ার জঙ্গলে। এসকোবারের মৃত্যুর পর তার সংগ্রহশালার পশুগুলো দুনিয়ার বিভিন্ন চিড়িয়াখানার কাছে বিক্রি করা হয় অথবা দান করে দেয়া হয়।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতে, ইংরেজিতে ‘জু’ বা বাংলায় চিড়িয়াখানা হচ্ছে এমন এক স্থান, যেখানে বিভিন্ন পশু মানুষকে প্রদর্শনের জন্য আটকে রাখা হয়। জু হচ্ছে জুলজিক্যাল পার্কের সংক্ষিপ্ত রূপ। চিড়িয়াখানায় দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের পশুপাখি হাজির করা হয়। এক কথায়, চিড়িয়াখানা প্রদর্শন, বিনোদন ও গবেষণার জন্য জীবন্ত প্রাণী রাখার সরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যান।

মানুষ বন্যপ্রাণীকে খাঁচায় আবদ্ধ করছে কয়েক হাজার বছর আগে থেকে। তবে এ সংগ্রহশালা আধুনিক চিড়িয়াখানার মতো নয়। প্রাথমিককালে এসব সংগ্রহশালা ছিল ধনীদের বিনোদন আর ক্ষমতা দেখানোর উপায়। এসব ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাকে বলা হয় মিনাজেরি।

প্রাচীন মিসরের শহর হিয়েরাকোনপোলিসে খুঁজে পাওয়া এ অদ্ভুত কবরস্থান সেখানে খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে তিন হাজার বছর আগের একটি চিড়িয়াখানার অস্তিত্বের বার্তা দেয়। ২০০৯ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সেখানে ১০টি কুকুর, একটি শিশু জলহস্তী, হার্টবিস্ট নামের একটি আফ্রিকান অ্যান্টিলোপ, একটি গরু, বাছুর ও একটি হাতির কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এখন পর্যন্ত এখান থেকে ১১২টি প্রাণীর কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে—আছে দুটি হাতি, তিনটি জলহস্তী, ১১টি বেবুন ও ছয়টি বনবিড়াল।

নীল নদের তীরে লক্সরের দক্ষিণে হিয়েরাকোনপোলিসের পত্তন হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার অব্দে। যেসব প্রাণীর নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে, সেগুলো সমাধিস্থ হয়েছিল আরো ৫০০ বছর পর এবং তখন হিয়েরাকোনপোলিস ছিল মিসরের সবচেয়ে বড় নগরকেন্দ্র। শহরের অভিজাতদের সমাধিস্থলে অনেক প্রাণীর অবশেষ পাওয়া গেছে। এছাড়া সম্প্রতি পাওয়া আরো অনেক প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, শহরের অভিজাতরা তখন বিভিন্ন প্রাণী আবদ্ধ পরিবেশে পালন করতেন। বেবুন, বন বিড়াল ও জলহস্তীর হাড়ে চির পাওয়া গেছে, যা কেবল সংরক্ষিত পরিবেশে ও চিকিৎসাতেই সেরে উঠতে পারে। হাতির পেটে এমন উদ্ভিদের নমুনা পাওয়া গেছে, যেগুলো সে সময় ছিল গৃহে রোপিত।&dquote;&dquote;

গবেষকদের মতে, মিসরের এসব নিদর্শন সেখানে মিনাজেরি থাকার লক্ষণ প্রকাশ করে। মিনাজেরি হলো আবদ্ধ পরিবেশে বন্য পশুর প্রদর্শন। গবেষকরা মনে করেন, মিনাজেরি ছিল অভিজাতদের ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায়। মালিকের মৃত্যুর সময় এসব পশুও উৎসর্গ করা হতো।

মিসর ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতার নিদর্শনে দেয়াল খোদাইয়ে দেখা যায়, এ সভ্যতাগুলোয় শাসক ও অভিজাতরা মেনাজারি তৈরি করেছিলেন। এমনকি সে সময়ের বিবরণীতে এটাও দেখা যায়, এসব সংগ্রহশালার জন্য জিরাফ, হাতি, ভালুক, ডলফিন এবং বিভিন্ন পাখি সংগ্রহ করতে অভিযান প্রেরণ করা হচ্ছে। সংগ্রহশালার মালিকরা এমনকি পশুদের যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ পরিচারক নিয়োগ করতেন।

প্রাচীন গ্রিসে পাখি, বানর পালন করতেন অভিজাতরা। মন্দিরেও এদের দেখা মিলত। এসব ছিল বিলাস প্রদর্শনের উপায়। আলেকজান্ডারের আগে গ্রিকদের মধ্যে বড় বিড়াল বা হাতি পালনের সাধের কথা জানা যায়নি। এটা তারা শিখেছিল পারস্যের ক্ষমতাবানদের প্রভাবে।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোয় চিড়িয়াখানার অস্তিত্ব দেখা যায়। আলেকজান্ডার তার সামরিক অভিযানের সময় পাওয়া নতুন নতুন প্রাণী গ্রিসে পাঠিয়ে দিতেন। তিনিই গ্রিসে প্রথম চিড়িয়াখানা স্থাপন করেন এবং সেটা করেছিলেন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

টাওয়ার অব লন্ডন ছিল মধ্যযুগের ইউরোপে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাণী সংগ্রহশালা। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা প্রথম জন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এতে সিংহ ও ভালুক ছিল। পরবর্তী শাসকরা এ সংগ্রহশালার জন্য বিভিন্ন জনের কাছ থেকে লেপার্ড, শ্বেত ভালুক ও হাতি উপহার পেয়েছিলেন। ১২৬৪ সালে প্রাণীদের সরিয়ে নেয়া হয় বুলওয়ার্কে এবং সংগ্রহশালার নামকরণ হয় লায়ন টাওয়ার। এ ভবনে সারি সারি খাঁচা ছিল। খাঁচাগুলো দোতলা ছিল; প্রাণীরা সাধারণত দিনের বেলায় উপরের তলায় থাকত, সন্ধ্যায় নিচ তলায়। তবে এ সংগ্রহশালায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। ষোড়শ শতকে রানী প্রথম এলিজাবেথ ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ১৮১৮ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, এ টাওয়ার সংগ্রহশালায় ছিল ৪৩টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১১টি পাখি ও চারটি সরীসৃপ। ১৮৩১ সালে রিজেন্ট পার্কে লন্ডন চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয়, লায়ন টাওয়ারের বেশির ভাগ প্রাণী এ নতুন চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরিত করা হয়। ৬০০ বছর ইংল্যান্ডের রাজাদের মিনাজেরি হিসেবে ব্যবহূত হওয়ার পর এ টাওয়ার ১৮৩৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

আজটেক সম্রাট দ্বিতীয় মন্টেজুমা পশ্চিম গোলার্ধের প্রাথমিক কালের অন্যতম পশু সংগ্রহের মালিক ছিলেন। এটি ছিল বর্তমান মেক্সিকোয়। স্প্যানিশ আক্রমণের সময় ১৫২০ সালে হের্নান কর্টেজ এ সংগ্রহশালা ধ্বংস করে দেন।

দুনিয়া জয়ের অভিযান এবং সাম্রাজ্য তৈরি মেনাজারির গুরুত্ব ও বিস্তৃতি বৃদ্ধি করেছিল। বিদেশী পশুপাখি ছিল সাম্রাজ্যের অলংকার। ১৪৯৩, ১৪৯৪ ও ১৪৯৬ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস রানী ইসাবেলা ও রাজা ফার্দিনান্দকে ৬০টি টিয়া ও ম্যাকাও পাখি উপহার দেন। এর মাধ্যমে ইউরোপের মেনাজারিতে নতুন দুনিয়ার জীবের আগমন ঘটে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ইগুয়ানা, বাইসন, শূকর, টার্কি, কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দিয়ে ইউরোপ ভর্তি হয়ে যায়। দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এ পশুপাখি ইউরোপের মিনাজেরিতে প্রবেশ করেছিল। ১৫১৫ সালে মালাক্কার সুলতান মুজাফফর শাহ ভারতে পর্তুগিজ গভর্নরকে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ একটি গণ্ডার পাঠিয়েছিলেন। গভর্নর আবার সেটি পর্তুগালের রাজা প্রথম ডম ম্যানুয়েলকে উপহার দেন। এসব পশুপাখি ছিল রাজকীয় ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতীক।

আধুনিক ও পাবলিক চিড়িয়াখানার ধারণাটি জনপ্রিয় হয় অষ্টাদশ শতকে। সেটা ছিল ইউরোপের ‘এজ অব এনলাইটমেন্ট’। সমাজ ও সরকার ব্যবস্থায় তখন বিজ্ঞান ও যুক্তির প্রাধান্য। এ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাণিবিজ্ঞানের প্রতিও প্রসারিত হয়। এ সময় মানুষ প্রাণীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করতে চায়। বিজ্ঞানীরা প্রাণীদের আচার-ব্যবহার এবং অ্যানাটমি নিয়ে গবেষণা করতে চাইছিলেন। এজন্য বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন ছিল প্রাণীদের এমনভাবে রাখা, যেটা তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।&dquote;&dquote;

আঠারো শতকের শেষ ভাগে এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে জাতিরাষ্ট্রগুলো সাম্রাজ্যের জায়গা নিতে থাকে। ব্যক্তিগত মিনাজেরিগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ব্যক্তিগত অনুদানের পরিবর্তে এবার রাষ্ট্রের রাজস্ব দিয়ে এগুলোর ব্যয় নির্বাহ হতে শুরু করে।

এমন সময় শুরু হয় শিল্পবিপ্লব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং মধ্যবিত্তের বিকাশ। এ পরিস্থিতিতে এসব পাবলিক সংগ্রহশালা নতুন গুরুত্ব, মর্যাদা লাভ করে। এগুলো জুলজিক্যাল গার্ডেন, জুলজিক্যাল পার্ক এবং কথ্যরূপে জু নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতে, প্রথম আধুনিক চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৩ সালে প্যারিসে। ফরাসি বিপ্লবের পর বিপ্লবের নেতাদের সিদ্ধান্তে রাজা-রানীসহ অভিজাতদের সংগ্রহশালা থেকে পশুপাখি সরিয়ে নিয়ে Ménagerie du Jardin des Plantes-এ স্থানান্তরিত করা হয়। এটি এখনো প্যারিসের অন্যতম চিড়িয়াখানা। এখানে ২০০ প্রজাতির পশুপাখির বসবাস, যাদের এক-তৃতীয়াংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। তবে শুরুতে এটি এমন ছিল না। প্রতিষ্ঠার সময় এটি যতটা না বর্তমান প্রাকৃতিক আবাসের চেহারা নিয়ে ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল জাদুঘরের চেহারা। ছোট ছোট জায়গার মধ্যে প্রাণীদের প্রদর্শনের জন্য রাখা হতো। এর কয়েক দশকের মধ্যে লন্ডন, ডাবলিন, অ্যান্টওয়ার্প, মেলবোর্ন ও ফিলাডেলফিয়ায় চিড়িয়াখানা গড়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চিড়িয়াখানা স্থাপিত হয় পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় ১৮৭৪ সালে। এ চিড়িয়াখানা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির পালন এবং বংশবৃদ্ধির ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলায় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ১৮০১ সাল থেকে শুরু করে কলকাতায় চারটি প্রতিষ্ঠান ছিল, যেগুলো বন্য পশুপাখির সংগ্রহশালা, এমনকি চিড়িয়াখানাও বলা যায়। সে সময় বেশকিছু ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাও ছিল। (বাংলাপিডিয়া, মো. শহীদুল্লাহ) ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় পশুপাখি কেনাবেচা হতো। ভারতে কর্মরত ইংরেজদের জন্য ইংল্যান্ডের মতো এ দেশে সময় কাটানোর মতো উপযুক্ত বন্দোবস্ত ছিল না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত অনেক ইংরেজ তাই উদ্ভিদ ও প্রাণীবিষয়ক গবেষণায় মন দিয়েছিলেন। তাই তাদের অনেকে বিভিন্ন প্রাণী সংগ্রহে আকৃষ্ট হতেন। আবার স্থানীয় ধনাঢ্যরা বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করতেন। কলকাতা বন্দর দিয়ে জাহাজে করে ব্রিটিশ প্রশাসক ও বিত্তবানদের জন্য নানা দেশ থেকে বিলাসদ্রব্য আমদানি হতো। এ বন্দর দিয়ে বিদেশে ভারতীয় পশু যেমন রফতানি হতো, তেমনি গোলার্ধের অন্য প্রান্ত থেকে অদ্ভুতদর্শন নানা প্রাণী ভারতে আমদানি হতো।

ভারতবর্ষের প্রথম চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যারাকপুরে, সেটা ১৮০২-০৩ সালের কথা। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তা, ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড রিচার্ড কলি ওয়েলেসলি। তিনি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার আগেই এশিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোয় থাকা পশুপাখির বিজ্ঞানসম্মত বিবরণী তৈরির উদ্যোগ নেন। এশিয়ার প্রথম প্রকৃতি গবেষণা কেন্দ্র ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত। গবেষণার জন্য সংগৃহীত পশুদের দিয়েই শুরু হয়েছিল ব্যারাকপুরের চিড়িয়াখানা। এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল প্রকৃতিবিদ ফ্রান্সিস বুকাননকে। কিন্তু ১৮০৫ সালে ওয়েলেসলি ও বুকানন ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ায় গবেষণা উদ্যোগ বিশেষ এগোয়নি। তবে ব্যারাকপুরের চিড়িয়াখানাটি টিকে ছিল আরো ৭৫ বছর।

বাংলার প্রথম চিড়িয়াখানা হিসেবে বিবেচনা করা হয় কলকাতার মার্বেল প্রাসাদ চিড়িয়াখানা। এ চিড়িয়াখানার প্রতিষ্ঠাকাল ধরা হয় ১৮৫৪। মার্বেল প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক বাহাদুর। রাজেন্দ্র এ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন ১৮৩৫ সালে। নির্মাণশৈলী, ইউরোপীয় ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম ও আসবাব সংগ্রহের কারণে মার্বেল প্রাসাদ বিখ্যাত। প্রাসাদ প্রাঙ্গণে স্ত্রীর আবদারে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক ১৮৫৪ সালে একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করেন। “রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক জীব-ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর বাসগৃহের বন্যপ্রাণিশালায় ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত বহু পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল। সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়ার আগেই এ চিড়িয়াখানায় বন্য পশুর একটি বড় সংগ্রহ ছিল। মল্লিক বাহাদুর লন্ডন চিড়িয়াখানাসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য পশু দান করেন। কলকাতা চিড়িয়াখানায়ও তিনি বহু মূল্যবান পশু দান করেন এবং সেজন্য সেখানকার প্রথম পশুশালাটি তাঁরই নামে নামাঙ্কিত হয়ে আছে। পৃথিবীর চমকপ্রদ, সুন্দর ও আকর্ষণীয় প্রাণী সম্পর্কে গভীর আগ্রহী ও যত্নশীল বহু ব্যক্তিই মার্বেল প্যালেস চিড়িয়াখানার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সেখানকার প্রাণী সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে যথেষ্ট চিন্তাভাবনার নিদর্শন রয়েছে।”(বাংলাপিডিয়া, মো. শহীদুল্লাহ)&dquote;&dquote;

ব্যারাকপুর বন্য প্রাণিশালা চালু থাকলেও ১৮৪১ সালের গোড়ার দিকে কলকাতায় একটি আধুনিক চিড়িয়াখানার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা ওঠে। Calcutta Journal of Natural History পত্রিকার জুলাই (১৮৪১) সংখ্যায় র্যালে (Raleigh) একটি চিড়িয়াখানা স্থাপনের প্রস্তাব করেন। ১৮৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেঙ্গল এশিয়াটিক সোসাইটির কাউন্সিল সদস্য এল শুয়েন্ডিয়ার (Schwendier) চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশদ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এশিয়াটিক সোসাইটি ও অ্যাগ্রোহর্টিকালচারাল সোসাইটি পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে।

বাংলার সরকার আলীপুরে ১৪ হেক্টর জমি বরাদ্দ দেয় এবং বাংলার তত্কালীন লে. গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পলের আগ্রহে চিড়িয়াখানার কাজ শুরু হয়, আসে ৫ হাজার টাকার বরাদ্দ। ১৮৭৫ সালের মধ্যে কয়েকজন দাতার স্বতঃস্ফূর্ত অনুদানের কল্যাণে মাঝারি মানের একটি বন্য প্রাণিশালা গড়ে ওঠে। দাতাদের মধ্যে ছিলেন ময়মনসিংহের রাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী, ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গণি ও খাজা আহসানুল্লাহ খান বাহাদুর প্রমুখ। তত্কালীন প্রিন্স অব ওয়েলস, সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড ১৮৭৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতার অভিজাতদের উপস্থিতিতে চিড়িয়াখানার মধ্যে দিয়ে বেলভেডর যান এবং ১৮৭৬ সালে ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে চিড়িয়াখানা উদ্বোধন করেন। এটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয় ১৮৭৬ সালের ১ মে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ঢাকা শহরের শাহবাগে তত্কালীন নবাবরা একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানার গোড়াপত্তন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে চিড়িয়াখানা তৈরির প্রয়োজন অনুভূত হতে থাকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা চিড়িয়াখানা পশুপাখি প্রদর্শনশালা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে, এর অবস্থান ছিল হাইকোর্ট চত্বরে।

ঢাকায় আধুনিক চিড়িয়াখানা স্থাপনের ব্যাপারে প্রথম সরকারি সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৯৫০ সালে। সে সময়ের কৃষি, সহযোগিতা ও ত্রাণ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঢাকার উপকণ্ঠে একটি চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ উদ্যান স্থাপনের ঘোষণা দেয়া হয়। সে বছর ২৬ ডিসেম্বর প্রস্তাবনাটি চূড়ান্ত করা হয়। ১৯৬১ সালের ১১ মার্চ খাদ্য ও কৃষি বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে উপদেষ্টা পরিষদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ পরিষদের কাজ ছিল প্রস্তাবিত চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ উদ্যান স্থাপন ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দান। তদানীন্তন পশুপালন সার্ভিসের পরিচালক এ পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।

বর্তমান ঈদগাহসংলগ্ন এলাকায় চার-পাঁচ একর জায়গা নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ চিড়িয়াখানায় একটি বড় পুকুর ছিল। এখানে মূলত ছিল বিভিন্ন ধরনের পাখি। আরো ছিল বানর, হনুমান আর হরিণ। সরীসৃপের মধ্যে ছিল অজগর ও কুমির। ১৯৬৪ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানা আনুষ্ঠানিক যাত্রা করে। স্থানস্বল্পতার কারণে ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন চিড়িয়াখানা মিরপুরের বর্তমান ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা চিড়িয়াখানার নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা করা হয়।

আমেরিকান জু অ্যান্ড অ্যাকুয়ারিয়াম অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দুনিয়াজুড়ে ১০ হাজারের বেশি চিড়িয়াখানা আছে। আধুনিক সময়ে চিড়িয়াখানা প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। ১৯০০ সালের আগের এবং পরের দশকে পশ্চিমা দুনিয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়টি জোরদার হয়ে ওঠে, এতে জুলজিক্যাল পার্কগুলো নতুন গুরুত্ব পেতে থাকে। দুনিয়ার বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির শেষ আশ্রয় এখন চিড়িয়াখানা। অবশ্য এ বিলুপ্তির ঝুঁকি প্রধানত মানুষের কর্মকাণ্ডেই সৃষ্টি হয়েছে।

চিড়িয়াখানা সাহিত্যকর্মেও জায়গা করে নিয়েছে। ২০০১ সালে প্রকাশিত লাইফ অব পাই। এ উপন্যাস অবলম্বনে পরে সিনেমাও নির্মিত হয়েছিল। বই ও সিনেমা দুটোই দুনিয়াজুড়ে আলোচিত হয়। কানাডীয় ঔপন্যাসিক ইয়ান মার্টেলের লাইফ অব পাইয়ের মূল চরিত্র পাইয়ের বাবা ছিলেন জুকিপার। তিনি ভারতের পণ্ডিচেরী চিড়িয়াখানার জুকিপার। প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে ভারত থেকে কানাডায় যাচ্ছিল পাই। তার নৌকায় ছিল তার পরিবার এবং চিড়িয়াখানার সব পশু। পথিমধ্যে নৌকাডুবি ঘটে, বেঁচে যায় শুধু পাই আর চিড়িয়াখানার রয়েল বেঙ্গল টাইগার। মাঝ সাগরে লাইফবোটে শুধু পাই আর রয়েল বেঙ্গল, যার নাম রিচার্ড পার্কার।

জাপানি লেখক উকিয়ো সুচিয়ার নন-ফিকশন বই ফেইথফুল এলিফ্যান্টস: আ ট্রু স্টোরি অব এনিমেলস, পিপল অ্যান্ড ওয়ার। বইটির অলংকরণ করেছেন টেড লেভিন। টোকিওর উনিও চিড়িয়াখানার তিনটি হাতির গল্প নিয়ে এ বই। ঘটনার সময়কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকাল।

আমেরিকান লেখক রাসেল হোবানের আবেগময় উপন্যাস টার্টল ডায়েরির ঘটনাস্থল লন্ডন চিড়িয়াখানা। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। উইলিয়াম ও নিয়েরার বয়স ৪০-এর কোটায় এবং দুজনই একাকী। চিড়িয়াখানার অ্যাকুয়ারিয়ামে তিনটি সবুজ কচ্ছপ দেখতে গিয়ে তাদের পরিচয়। তারা কচ্ছপগুলোকে মুক্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা আঁটে। এক সহানুভূতিশীল জুকিপারের সহায়তায় তারা কচ্ছপগুলোকে মুক্ত করতে সফল হয়।

ব্রায়ান কে ভনের গ্রাফিক নভেল প্রাইড অব বাগদাদ। ইরাক যুদ্ধের সময় বাগদাদের চিড়িয়াখানা থেকে চারটি সিংহ মুক্তি পায়। এ সত্য ঘটনা উপজীব্য করে ব্রায়ান তার উপন্যাসের কাহিনী তৈরি করেছেন। ২০০৩ সালে আমেরিকানদের বোমা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সিংহগুলো চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে যায়। লেখক এখানে সিংহদের পক্ষ থেকে তাদের গল্প বলেছেন। চিড়িয়াখানার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বাগদাদে স্বাধীনভাবে ঘুরে-বেড়িয়ে এ সিংহরা জীবন রক্ষার সংগ্রাম করছিল। পাঠকরা শুনতে পাবেন সিংহের কথা, সিংহের মুখ থেকে।

‘উইনি দ্য পুহ’-এর স্রষ্টা ইংরেজ লেখক এ. এ. মিলনে কবিতা লিখেছেন অ্যাট দ্য জু শিরোনামে। শিশুর চিড়িয়াখানা ভ্রমণ এ কবিতার বিষয়। কবিতায় মিলনে চিড়িয়াখানা পশুদের অস্বস্তির কথা জানান দিয়েছেন—

যদি বাইসনের সঙ্গে কথা বলতে যাও,

সে তোমার ভাষা বুঝবে না;

তুমি মিঙ্গোদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারবে না-

তারা হাত মেলাতে পছন্দ করে না।

সিংহ আর গর্জন করা বাঘ

‘তুমি কেমন আছ?’ জিজ্ঞেস করতে চায় না।

তার পরও আমি চিড়িয়াখানায় গেলে

হাতিকে রুটি দিই!

ইউজেন ও’নীলের অদ্ভুত এক নাটক আছে দ্য হেয়ারি এপ নামে। ব্রিটিশ লেখক অ্যাঙ্গাস উইলসনের উপন্যাস দি ওল্ড মেন অ্যাট দ্য জু প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে।

বিখ্যাত কবি টেড হিউজেস তার জাগুয়ার কবিতায় শুনিয়েছেন চিড়িয়াখানায় বন্দি পশুপাখির বেদনা—

‘টিয়াগুলো তীক্ষ স্বরে চিত্কার করছে যেন তাদের গায়ে আগুন লেগেছে ...’

এ লাইনে বন্দি পাখিটির দুর্দশা-বেদনা যেমন স্পষ্ট, তেমনি হিউজেস নাম না উল্লেখ করেও মানুষকে তার নিষ্ঠুরতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। কবিতায় আরো আছে টিয়াগুলো দর্শনার্থীদের কাছ থেকে বাদাম পাওয়ার জন্য নানা কসরৎ করছে। এ অংশটি পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে হয় রাস্তায় নানা কায়দা করে ভিখারিদের ভিক্ষা চাওয়ার দৃশ্য। পাখিগুলো কোনোকালেই ভিখারি ছিল না, মানুষই তাকে এহেন অমর্যাদাকর পরিস্থিতিতে এনে ফেলেছে। ভিক্ষা পশুদের সমাজে প্রচলিত নেই, আছে মানুষের সমাজে। মানুষ তার ভাইকে ভিখারি করে দিতে পারে আর বনের টিয়া তো কোন ছার!

হিউজেস লিখেছেন বাঘ ও সিংহের মতো ক্ষিপ্র, সাহসী পশু চিড়িয়াখানায় এসে ম্রিয়মাণ, তারা সূর্যের মতো স্থির হয়ে বসে আছে। দুনিয়ার অন্যতম দীর্ঘ সাপ বোয়া কনস্ট্রিকটর খাঁচার মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, তার কোথাও নড়ার উপায় নেই। মনে হবে, সাপটি যেন ফসিল হয়ে গেছে। কবি লিখেছেন, এসব দেখে চিড়িয়াখানার দর্শনার্থীরা আনন্দিত নন, তারা উত্তেজিত হতে পারেন না। তারা এগিয়ে যান, তাদের আগ্রহের কেন্দ্র একটি জাগুয়ার। সে অবশ্য হার মেনে নেয়নি, জাগুয়ার তার খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। তার চোখে ক্রোধের আগুন—‘ব্লাইন্ড ইন ফায়ার’—ক্রোধের আগুনে অন্ধ চোখ। খাঁচা অবশ্য জাগুয়ারকে শারীরিকভাবে বন্দি করতে পারলেও তার স্বাধীনতাকে পারেনি। খাঁচার মধ্যেও সে স্বাধীন ভঙ্গিতে হাঁটে, সে বাইরে দূরে তাকায় না। জাগুয়ারটি নিজেই এক বিস্তৃত দিগন্ত।

টেড হিউজেস দ্য জাগুয়ার কবিতাটি লিখেছিলেন নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা কেন্দ্র করে। কবিতাটি তার প্রথম সংকলন দ্য হক ইন দ্য রেইন (১৯৫৭)-এ অন্তর্ভুক্ত। বেন সনারবার্গকে লেখা এক চিঠিতে টেড লিখেছিলেন—

“১৯৫৪ সালের শরতে আমি রিজেন্ট পার্ক চিড়িয়াখানায় কাজ করতাম। সেখানে আমি একটা জাগুয়ারকে বিশেষভাবে চিনতাম।”

মানুষের আরেক কলঙ্কের কথা না বললে চিড়িয়াখানা অধ্যায় অপূর্ণ থেকে যাবে। পশুপাখির বাইরে মানুষ নিজের ভাইকেই চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনীর বস্তু করেছিল। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি ইউরোপের বাইরে অনেক জাতির মানুষকে বনের পশুর মতো চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিল। ধারণা করা হয়, প্রথম মানব চিড়িয়াখানা দেখা গিয়েছিল মেক্সিকোয়—এখানে বামন, কুঁজো, ধবল রোগে আক্রান্তদের প্রদর্শন করা হতো। আধুনিককালে মানুষের প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল আমেরিকায় ১৮৩৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ১৮৭০-এর দশকে প্যারিস, হামবুর্গ, অ্যান্টওয়ার্প, বার্সেলোনা, লন্ডন, মিলান ও নিউইয়র্কে মানব চিড়িয়াখানা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এসব চিড়িয়াখানায় মূলত আফ্রিকা ও আমেরিকার আদিবাসীদের প্রদর্শন করা হতো।

চিড়িয়াখানা নিয়ে জোরদার সমালোচনা আছে। পশুপাখিকে মুক্ত জীবন থেকে বন্দি করে নিজেদের বিনোদনের খোরাক করা অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য। টেড হিউজেসের দেখা জাগুয়ারের মতো নিশ্চয়ই আরো অনেক বন্দি পশুপাখি দর্শনার্থী মানুষের দিকে প্রতিদিনই রক্তলাল ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে আছে।