নবী কেন তার আপত্কালীন জাহাজে মানুষ নিতে চাননি, আজ বুঝতে পারি। তিনি প্রজ্ঞাপরিমিতির কারণে বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ একদিন এতই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে যে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করে বসবে। তিনি চেয়েছিলেন সৃষ্টির সুন্দর সব পশুপাখি ভালো থাক, জোড়ায় জোড়ায়। প্লাবন-পরবর্তী পৃথিবী হয়ে উঠুক আরো সবুজ ও প্রাণময়। এদিক থেকে ভেবে দেখলে পৃথিবীর প্রথম চিড়িয়াখানা তার পুরাণেতিহাসের সেই নৌকা, যা কিনা অবিকল্প। তিনি ভেবে ভেবে প্রতিটি প্রাণীকেই তার জাহাজে স্থান দিয়েছিলেন। উল্টো দিকের কাণ্ড হচ্ছে মহাভারতের খাণ্ডব দাহন পর্ব, যেখানে অসংখ্য পশু দগ্ধ হয়, অগ্নিদেবতার উত্তেজনাবশত। অরণ্য আর চিড়িয়াখানা প্রাণীর জন্য মুক্তি ও বন্দিত্বের সমার্থক। সব প্রাণীই পরমা প্রকৃতির সন্তান। ইতিহাসে যখন প্রথম শ্রেণীবিভাজন ঘটল, আবিষ্কার ঘটল তালার, এল সন্দেহ, এল শেকল, বন্দিত্ব আর প্রাণির স্বাধীনতা হারানো একই ঘটনা। ভেবে দেখলে মানুষ যেদিন পশুপালন শিখেছে, সেদিন থেকেই চিড়িয়াখানার উৎস কেন না ততদিনে ‘পেলে ভরপেট নইলে উপোস’— এ-ই আদিম সাম্যবাদ মানুষের পেরিয়ে আসতে হলো। পশু তার প্রবৃত্তির নিয়মেই বংশবৃদ্ধি করত, স্বাধীন অরণ্যে বিচরণ করত, মানুষের কর্তৃত্ব প্রথমেই তার স্বাধীনতা হরণ করল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রজননের অধিকার। স্বাদ বৃদ্ধির জন্য পশুর অঙ্গছেদন মানবিক সভ্যতার ব্যাধি। মানুষের মানুষের প্রতি ব্যবহারে, মানুষ পশুর প্রতি ব্যবহারে যত দিন যাচ্ছে আরো অসভ্য, বর্বর হয়ে উঠছে সামগ্রিকভাবে। বিলুপ্ত প্রজাতির সংখ্যা বাড়ছে নিয়ত। চিড়িয়াখানার ধারণাও এখান থেকে। যাযাবর মানুষ নদীর তীরে ছোট ছোট বসতি তৈরি করেছে, প্রাণীকে পোষ মানিয়ে খেলা দেখানো শুরু করেছে, নানা রকম প্রাণীতে অলীক শক্তি আরোপ করে বিক্রি করেছে। এ-ই একবিংশ শতাব্দীতেও এমনকি মানুষ চড়ুইয়ের মতো একটি নির্মল, ছোট চঞ্চলতাকে খেতে চায় নিজের ইচ্ছাশক্তি বাড়াতে, ব্যক্তিগত মানুষীর সঙ্গের একান্ত সম্পর্কের উন্নয়ন বিধানে।

 

***&dquote;&dquote;

চিড়িয়াখানার কথা ভাবলে প্রথমেই মনে পড়ে, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ কাহিনী চিড়িয়াখানা, এখানে মানবপ্রকৃতির নানা প্রবণতার একত্র সন্নিবেশকে রহস্যসাহিত্যিক চিড়িয়াখানার সঙ্গে তুল্য ভেবেছেন। আর মনে পড়ে, আরণ্যক-এর সেই মানুষের কথা, যে অরণ্যকে ভালোবাসে অথচ বন কেটে বসত বসাতে এসেছে। এ-ও এক রকম চিড়িয়াখানা স্থাপন। নতুন বসতি স্থাপন মাত্রই কত পদের, কত রকম মানুষের এইখানে পাশাপাশি থাকা, মনের ভেতর কত গুপ্ত নখ, দাঁত হিংসার হাসি নিয়ে। বালক অপু বিস্মিত অস্তিত্ব দিয়ে দেখেছিল, একটি খরগোশের লাফিয়ে যাওয়া। অরণ্যের এ-ই প্রাণীকে দেখার পরেই অপুর জীবন বয়ে যাবে এক অপূর্ব ঘূর্ণির ভেতর দিয়ে, যেখানে অনেক চাপা ব্যথার মধ্য দিয়ে বন্দি হয়ে পড়তে হবে নিয়তির খ্যাঁচাকলে, যেমন কিনা অরণ্যের স্বাধীন প্রাণীকে নগরে খাঁচাবন্দি করে নাম দেয়া হয় চিড়িয়াখানা। জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাসের মধ্যেও অসংখ্য পশুপাখির উপস্থিতি। বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ আর বিভূতিভূষণই বোধ করি, প্রাণীকে প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্ন করে দেখেছেন সবসময়। মাল্যবান উপন্যাসের নায়ক স্ত্রীকে নানা রকম পশুপাখির নামে গালাগাল করলেও সেসব পশুপাখি বন্দি নয়। ভোঁদর, টিকটিকি, মাকড়সা গালাগালের অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে। এই দুজনের লেখাবিশ্বে চিড়িয়াখানার প্রাণীরা চরিত্রদের মগজে। বেবুনের বিপন্নতা যিনি খেয়াল করেন, তিনি যে চিড়িয়াখানা সমর্থন করেন না, তা তো বোঝা-ই যায়। রুশ শিশুসাহিত্য প্রথমবার বিশ্বের নানা দেশের শিশুকে শেখাল প্রাণীকে ভালোবাসতে। এখানে প্রাণীরা রূপকথার রাজ্যের, কথা কইতে পারে, পারে শিশুদের সঙ্গে মিশে যেতে। এখানে প্রাণীতে মানুষে কোনো বৈরিতা নেই, বন্দিত্বের ধারণা নেই। এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় মনে মন মিশিয়ে পৃথিবীকে ভালোবাসা। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চরাচর-এর কথাই ভাবুন, পাখি বিক্রি করা যার খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতি সে-ই যদি পাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়, তাদের ছেড়ে দেয়!

 

***&dquote;&dquote;

কয়েক বছর আগে আমি আর বাবা গিয়েছিলাম মিরপুর চিড়িয়াখানায়। আমাদের ভালো লাগেনি। ময়ূরকে কী ক্লান্ত পা ফেলতে দেখেছি! আর বানরকে দেখি খাঁচার বাইরে কী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে! বিবর্তনের খানিকটা হেরফেরে অবস্থাটা পাল্টে যেতে পারত না! বাঘের সেই শৌর্য যেন নেই, মরা মরা, গায়ের লোম খসে পড়া যেন, আর সিংহদের দেখে মনে হয় তাদের ছায়া। সিংহ বললেই যেমন এক টুকরো প্রখর রোদের ঝিলিক, তেমন নয় মিরপুরের সিংহ, বয়োবৃদ্ধ, যেন কোনোমতে দিনগত পাপক্ষয় করছে। স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, নানা সময় পত্রিকায় পড়া খবর, পশুর বরাদ্দকৃত খাবার মানুষের হাপিস করে দেয়ার চিরাচরিত গল্প। আমার মামাবাড়ির এক বন্ধুর ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ছিল। হাঁস, মুরগি, কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগল, ইঁদুর, টিয়া, ময়না এমনকি এতই দুরন্ত ছিল একটা শেয়াল সংগ্রহ করেছিল, যদিও সে বেশি দিন বাঁচেনি। তিনটে বানর খাঁচায় ছিল। কানে ভাসে, পারিবারিক কলার বাগান থেকে কলা ছিঁড়ে এনে বানরকে দিত, চিত্কার করে বলত, ব্রেকফাস্ট ব্রেকফাস্ট। তারপর টানাসুরে, হুজুউউউর! এ-ই তার মজা। পরে বন্ধুর বিয়ে হলো, সে তার চিড়িয়াখানা মুক্ত করে নিজেই নতুন চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়ল। এখন তার তিনটে মেয়ে, তাদের নিয়ে সে গ্রামে হাঁটতে বেরোয় আর জীবজন্তুর গল্প বলে।

 &dquote;&dquote;

দুই হাজার ষোলো সালে ওড়িশার নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় যাওয়ার সুযোগ ঘটে। সে এক বিশাল অঞ্চল! এক সকালে চন্দ্রভাগা, ধৌলী, লিঙ্গেশ্বর, কোনার্ক হয়ে প্যাকেজ ট্যুরের শেষ আকর্ষণ হিসেবে নন্দনকানন ভ্রমণ। সারা দিন ঐতিহাসিক ও পুরাণস্মৃতিমথিত এত জিনিস একসঙ্গে মাথার মধ্যে ধানি লংকা, মুড়ি, পেঁয়াজ, বিটলবণ, ধনেপাতার মতন মিশেমিশে মিশ্র অনুভূতি তৈরি করছিল। এখন যেখানে হাইওয়ে অবন ঠাকুররা পালকি চড়ে গিয়েছিলেন বেড়াতে, কোনারক নিয়ে অরুণ সেনের ছোটো, লম্বু বইটার কথা মনে পড়ে। প্রতিক্ষণ একটু লম্বাটে বই বের করত এ-ই সিরিজে, তাই লম্বু বই নাম। নন্দনকাননের পশুপাখি তুলনামূলক হেলদি, খায়দায় ভালো। শেষ বিকালের রোদ সিংহের গায়ে তার যৌবনের রোশনাই এঁকে দেয়। সাদা বাঘের সামনে বেশ ভিড়। লোকজন হামলে পড়ে দেখছে। সাদা বাঘ আমার অত বিউটিফুল লাগল না। আমার গোদা কুমিরের হাই তোলা ম্যাজিস্টিক লেগেছিল। এর ঝকঝকে দাঁত পেপসোডেন্ট সেনসোডাইনবিহীন কী ঝকঝকে। নানা চেনা অচেনা পাখি এ-ই অঞ্চলের সম্পদ।  তাদের জন্য জায়গাও অনেকটা ছেড়ে দেয়া। ফলে মুক্তি আর বন্দিত্বের মাঝামাঝিতে এগুলোর অবস্থান।

 

****

অবশ্য আমাদের ভাষার সাহিত্যিকরা ছেলেমেয়েদের প্রাণীপ্রেম শিখিয়েছেন। অধীর বিশ্বাসের কথা যদি ভাবি তার সমগ্র শিশুকিশোর সাহিত্যে পশুপাখি কথা বলে, মানুষের সঙ্গে মিতালি পাতায়। এখানে একত্রবাস সুন্দর। কেউ কারো স্বাধীনতায় হাত দেয় না। এ-ই যে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী কিংবা তার পুত্র সুকুমার রায় তাদের জীবজন্তু পশুপাখি আমাদের ছেলেবেলার বন্ধু। সেই টুনটুনির কথা মনে পড়ে যে রীতিমতো রাজাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছিল! আমাদের লোককথা পশুপাখির বন্ধুত্বে বিশ্বাস করে। প্রাচীন বিপ্লবীদের মতো আমাদের লোককথাও মুক্তাঞ্চলে বিশ্বাস করে, প্রাণীর প্রকৃতির মুক্তাঞ্চল। এখানে চিড়িয়াখানার শিকল, তালা এককথায় প্রাণকে আটকে রাখার জায়গা নেই।