মূল: জোখা আল হার্থি। অনুবাদ: রাজিয়া সুলতানা
পার্কে কাঠের বেঞ্চের দুই ধারে আমরা বসে আছি—আমি ডান দিকে আর ও বাঁ দিকে। এভাবে দুই প্রান্তে না বসলে যেন বেঞ্চের ভারসাম্যই রক্ষা হবে না।
লম্বা লম্বা গাছ, ভেজা ঘাস আর সূর্যের নরম আলোয় বসে থাকতে ভালো লাগছে।
ও আমাকে বলল, ‘আমার কোনো বন্ধুবান্ধব নেই, আমি একা আর এভাবে একা একাই ভালো আছি।’
আমি বললাম, ‘আমিও একা, আমারও বন্ধু নেই কোনো, কিন্তু আমি ভালো নেই, এজন্য আমার কষ্ট।’
আমি আমার ছোট্ট রুমে ফিরে আসি, ফ্রেশ হয়ে নিয়ে হোমওয়ার্ক করে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন আবার পার্কে গিয়ে সেই বেঞ্চিতে দুজন একইভাবে বসি। আমাদের চারপাশে ছেলেমেয়েরা হইচই করছিল আর বল খেলছিল।
ও বলল, ‘আমি বন্ধু পছন্দ করি না। সব বন্ধুত্বই শেষ পর্যন্ত প্রতারণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।’
আমি বললাম, ‘আমি পছন্দ করি, কিন্তু এখনো তেমন কাউকে খুঁজে পাইনি।’
এরপর বাচ্চাদের কোলাহল থেমে এলে আমি কাছের দোকান থেকে দুধ আর রুটি কিনে রুমে ফিরি। পরদিন ঝুম বৃষ্টির মধ্যে আর পার্কে যাইনি।
তৃতীয় দিন ও বলল, ‘গতকাল তোমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম।’
আমি বললাম, ‘বৃষ্টির জন্য আসতে পারিনি। আমরা কি বন্ধু নাকি যে আমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলে?’
ও বলল, ‘আমি তোমাকে বলেছি বন্ধুত্বে আমি বিশ্বাস করি না, বিশেষ করে ছেলে-মেয়ের মধ্যে যে বন্ধুত্ব। এভাবে ভালোবাসা বা প্রেমের মুখোমুখি হওয়াটা আসলে কাপুরুষতা।’ আমি শুনে চুপ করে রইলাম। তাকিয়ে দেখি আকাশে আবারো মেঘ জমছে, আবারো মুষলধারে বৃষ্টি নামতে পারে—এই ভয়ে ঘরে ফিরে এসে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন পার্কের কাঠের বেঞ্চিতে আমরা বসে আছি। হঠাৎ ও আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসল। এরপর ওর শৈশবের গল্প করতে করতে দুঃখজনক একটা ঘটনার কথা বলল। আমি আমার শৈশবের সুখের একটা ঘটনার কথা বললাম। ওর পায়ের কাছে একটা বল এসে পড়ায় সেটাতে ও লাথি মারল। তারপর শৈশবের আরেকটা গল্প শোনাল।
সেদিন ফেরার পথে লাইব্রেরিতে গিয়ে সেখানে রঙ-বেরঙের কিছু শিশুতোষ বই পড়লাম। সংবাদপত্রের দোকান থেকে গরম কফি কিনে রুমে ফিরলাম। বাতাসে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা ভাব; শীত করছিল আমার।
আরেক দিন। আমরা আবার সেই কাঠের বেঞ্চিতে বসে। আমি ডান দিকের প্রান্ত থেকে একটু সরে বসেছি আর ও বাঁ প্রান্ত থেকে আরেকটু সরে আমার কাছাকাছি এসে বসেছে। দাঁত কিড়মিড় করে ও শৈশবের আরেকটা ঘটনার কথা বলল, জানাল কীভাবে ওর বাবা ওকে ধরে মারত। আমি বললাম আমার মায়ের কথা, বললাম আমার মাও আমাকে ধরে মারত, বাবাও যে পেটাত, সে কথা আর লজ্জায় বলতে পারলাম না। বেঞ্চিতে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। আমি আমার শৈশব আর মায়ের গল্প করতে থাকলাম।
রুমে ফিরে এসে মাকে ফোন করলাম, কিন্তু মা ফোন ধরল না। আমি ব্রেড টোস্ট করে তাতে চিজ মাখিয়ে এক গ্লাস দুধ দিয়ে খেয়ে নিলাম। এরপর আমি ওকে কী প্রশ্ন করব, তা মনে মনে ঠিক করে ফেললাম। পরদিন বেঞ্চিতে আমার দিকে ওর শরীরটা কিছুটা ঘুরিয়ে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘জীবনে কতবার প্রেমে পড়েছ তুমি?’
‘একবারই। তখন আমার বয়স ছিল ৩০।’ শান্তভাবে ও জবাব দিল।
ঝুনঝুনি বাজিয়ে আইস্ক্রিমওয়ালা তার ভ্যান নিয়ে এসে হাজির হলো। যদিও তখনো আমার শীত করছিল, আমি আমাদের দুজনার জন্য দুটো আইস্ক্রিম কিনলাম। আইস্ক্রিম খাওয়া শেষ হলে ও বলল, ‘আমি যখন ওকে চুমু খাই, প্রথমবারের মতো অন্ধকার আলো করে ওর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে।’ শুনে আমার ভেতরটা কেমন করে উঠল। বুকে চিন চিন একটা ব্যথা অনুভব করতে লাগলাম। সেই অনুভূতিটা আর শেষ হতে চাইল না। আমি বললাম, ‘তারপর?’
তারপর সে বলেই চলল মেয়েটার কথা—ওর চোখ, কান, কানের লতি, এমনকি বগলের কথা পর্যন্ত বলে চলল ও। এরপর মেয়েটার নিষ্ঠুরতার কথা, ওকে ছেড়ে যাওয়ার কথা এবং মেয়েটাকে ঘিরে ওর যন্ত্রণা আর সুখের কথা বলতে বলতে ওর মুখটাও যে কখন আমাদের চারপাশটা আলোকিত করে তুলেছে, তা এতক্ষণ আমরা খেয়ালই করিনি। রুমে ফিরতে ফিরতে পুরোটা সময় আমি কাঁদলাম। যে কাপড় পরেছিলাম, সেই কাপড়েই ঘুমাতে গেলাম।
পরদিন পার্কে গিয়ে দেখি কাঠের বেঞ্চটাতে একটা উৎসর্গ-স্মরণ লেখা—‘আদরের মেয়েকে, যে সময়ের আগেই বিদায় নিয়েছে।’ এর আগে আমার নজরে পড়েনি। সেদিন আইস্ক্রিমের ভ্যান নিয়ে লোকটা এল না। আজকেও সেই মেয়েটার কথা বলেই চলল সে—ওর চুলের কথা, ফোন কলের কথা, বলতে বলতে চোখমুখে আবারো সেই খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ছিল।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফটো অ্যালবামের পৃষ্ঠাগুলো উল্টাচ্ছিলাম। এরপর বোনের কাছে ছোট্ট একটা চিঠি লিখলাম। সকাল উঠে হোমওয়ার্ক শেষ করে রুমের ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম পার্কে আর যাব না। খিদে পাচ্ছিল, তাই কাপড় পরে বাইরে বেরোলাম। কাছের ক্যাফেতে টুনা মাছের একটা স্যান্ডউইচ খেয়ে পার্কে গিয়ে দেখি ওর পাশে প্লাস্টিকের কাপে করে দুই কাপ কফি। বেঞ্চের ডান দিকে দূর প্রান্তে বসলাম। ও বলল, ‘দেরি করলে যে। কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’ আমি খুলে যাওয়া জুতার ফিতা বাঁধছিলাম। ও জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এখানে কী করো?’ আমি বললাম, ‘পড়াশোনা করি, তুমি কী করো?’
‘আমি চাকরি করি।’
সেদিন আর ঠাণ্ডা কফি খেলাম না আমরা। ও বলল, ‘পৃথিবীতে কেবল অল্প কিছু মানুষ ভালোবাসা পাওয়ার ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। ওরা ভাগ্যবান।’ আমি সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘একে ভাগ্যবান বোলো না।’
ও বলল, ‘ভাগ্যবানই তো।’
‘না,’
‘হ্যাঁ,’
আমরা তর্ক জুড়ে দিলাম।
তারপর ওকে আমার কথা বললাম—বললাম আমার প্রেমিকের কথা, মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাদের দেখা হয়েছিল। কত কথায় যে সে আমাকে ভুলিয়ে রেখেছিল। বলেছিল, সে আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসে। কত শহরে যে আমার সঙ্গে সে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আমি সেসব শহরে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করেছি। সে আসেনি। আমার বিরহ আর মন খারাপের কথা বলে কত যে লম্বা চিঠি লিখেছি। হূদয় উজাড় করে লিখেছি আমার ভালোবাসা আর কষ্টের কথা। আমি তার গার্লফ্রেন্ডের কাছ থেকে চিঠি পেলাম একদিন। সে লিখেছে, আমার চিঠিগুলো পড়ে নাকি সে অনেক মজা পেয়েছে, উপভোগ করেছে। আমি তাকে এও বলেছি যে ওর কারণে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম আমি। আমাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।
ও ডান দিকে একটু সরে এলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি চাও ওকে আমি খুন করি?’ ও জোরেশোরে বলল, ‘না, আমি তো মনে করি সে মরেই গেছে।’ আমি উঠে পড়লাম। রুমে এসে রঙিন কিছু ম্যাগাজিন আর সংবাদপত্রের পাতা উল্টাতে উল্টাতে গরম চকোলেট মিল্ক খেয়ে ঘুমাতে গেলাম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভাবলাম, আমাদের দুজনার মধ্যে এত মিল! সেজন্যই দুজন প্রতিদিন একই বেঞ্চিতে গিয়ে বসি।
পরদিন বেঞ্চের ডান আর বাঁ পাশে আমরা কিছু জায়গা ছেড়ে বসি। প্রতিদিনের মতো যথারীতি গল্পও করি, হাসি, দুজনে শূন্য কফির প্লাস্টিকের কাপ দুটো হাতের মধ্যে নিয়ে আঙুলে টোকা দিতে থাকি। ও আমাকে ওর শৈশবের ছবি বের করে দেখায়, আমার ফোন নম্বর চায়। আমি চুপ করে থাকি। চলে যাওয়ার সময় ও দাঁড়িয়ে বলল, ‘কোনো কারণ ছাড়াই ও আমাকে ছেড়ে চলে যায়, আমি ওকে অনুনয়-বিনয় করে চিঠি লিখি। আমার হাজার হাজার চিঠির সে কোনো উত্তর দেয়নি। আমিও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই।’
রুমে এসে লক্ষ করলাম, ছবিতে আমার ছোট ভাইয়ের চেহারার সঙ্গে ওর শৈশবের চেহারার অনেক মিল। ক্যামেরার সামনেও দুজনের একজনের মুখেও হাসি নেই।
পরদিন আমি পার্কে দেরি করে এলাম। ও আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। দুজনার কারো মুখে কথা নেই। বাচ্চারা লুকোচুরি খেলছিল, ওদের আনন্দ-চিত্কারের শব্দ ক্রমেই বাড়ছিল। আমার শীত করছিল।
‘ছবি কোথায় তোমার?’ ও জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম, ‘ছবি আনার কথা ছিল না তো।’ ও বলল, আমি নিষ্ঠুর, আমি বললাম ও রূঢ়, কর্কশ। এরপর আমি আর দেরি না করে রুমে চলে গেলাম। ফ্রিজ খুলে দেখি দুধ নেই, জুস নেই, রুটি নেই। খিদে নিয়েই ঘুমাতে গেলাম।
এরপর অনেক দিন কেটে গেল। আমাদের সম্পর্কে বিদ্বেষ আর বন্ধুতার মতোই কাঠের বেঞ্চের সেই দূরত্ব সংকুচিত আর প্রসারিত হলো। বৈরী ভাব তখন এতটাই প্রবল যে তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও আমরা ঝগড়া করতে শুরু করলাম। আমার অভিযোগ, ওর রুক্ষ স্বভাব। ওর অভিযোগ, আমি বেশি আবেগপ্রবণ। এভাবে একে অন্যের কাছে ক্রমেই তিক্ত আর অসহনীয় হয়ে উঠলাম।
পরীক্ষার কারণে আমি দুদিন পার্কে যেতে পারিনি। পরে যেদিন গেলাম, সেদিন ও ক্রোধ ঝেড়ে বলল, ‘আমাকে এখানে অপেক্ষায় বসিয়ে রেখে তুমি আমাকে অপমান করছ। ব্যাপার কী, ওই মিথ্যাবাদীটার খোঁজে সমস্ত শহর চষে বেড়াচ্ছ মনে হয়!’
‘ওই মেয়েকেই তো তুমি হাজার হাজার চিঠি লিখেছিলে। এখন আমার সঙ্গে এভাবে চিত্কার-চেঁচামেচি করছ, না? এখন সব দোষ আমার?’ ইচ্ছে করছিল এভাবে বলি।
রুমে এসে কাঠের টেবিলটা মুছলাম, একটা শুকনো তোয়ালে দিয়ে বিছানাটা ঝাড়লাম। ময়লা কাপড়গুলো হলের লন্ড্রিতে নিয়ে গিয়ে মেশিনে ধুতে দিলাম। টিভির সাউন্ড বন্ধ করে দিয়ে বেক করা শিমের বিচি খেতে খেতে কার্টুন ছবি দেখছিলাম। হঠাৎ নিচের ঠোঁটে শক্ত কামড় লাগল। বালিশের নিচে মাথা গুঁজে দিয়ে মনে হলো, বাস্তব জীবনে আসলে আমাদের ভূমিকার কোনো রদবদল হয় না।
আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। বাতাসে হিম হিম ভাবটাও কমে এসেছে। একদিন পার্কে ফিরে এসে দেখি কাঠের বেঞ্চটা ফাঁকা পড়ে আছে।






