মহাত্মা অভীক ওসমান আমার সনাতন বন্ধু। সেই দাবিতে আমি এই পরিচায়িকা লিখিতেছি। আর এই দাবিতে সবকথা লিখিতে পারিতেছি না। অভীক ওসমান, ওসমান গণি চৌধুরীর তাখাললুস ওরফে ময়ূরপুচ্ছ নাম। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি কবি। সমস্যার মধ্যে তাঁহার পরিচয় একাধিক। অনেক দিন গত হইবার পর ইংরেজি সন ১৯৯৪ নাগাদ কবি পরিচয়ে পহিলা কিতাব প্রকাশ করিয়াছিলেন তিনি। নাম বিষাদের জার্নাল। তখন আমি কিছুদিন অন্যদেশ সফরে ব্যাপৃত ছিলাম বলিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঐ পুস্তকটি পড়িবার সুযোগ পাই নাই। অনেক দিন পর পড়িলাম। পড়িয়া বুঝিলাম অভীক যাহা দাবি করিয়াছেন তাহা ষোল আনা সত্য নহে। তিনি বোদলেয়র ‘আকণ্ঠ পান’ করেন নাই। যদি বা করিয়া থাকেন তো নাভির সামান্য উপর পর্যন্ত। আমরা যাহাকে অনুবাদ বা পুনরাবৃত্তি বলি তাহা তিনি করেন নাই। পুনরাবৃত্তি মানে নতুন কিছুর সৃষ্টিও বটে এই বাক্যই তিনি ফলাইয়াছেন। শার্ল বোদলেয়র যাহাকে বিতৃষ্ণা বা ‘আঁনুই’ (ennui) বলিয়াছেন অভীক ওসমান তাহাকেই জ্ঞান করিলেন বিষাদ। পার্থক্য শুধু এইটুকু নহে। বোদলেয়রের কবিতায় বিষাদের ভিতর আদর্শও ছিল। অভীক ওসমান তাহা অঙ্গীকার করিয়াছেন আঠার বছর পর। আঠার বছর মানুষ ভোটাধিকার পর্যন্ত পায়। কাব্যাধিকার পাইবে না কেন! অভীক বহুত তাড়াহুড়া করিয়াছেন এমন কথা আশা করি পাঠিকা নিতান্ত অসাবধানেও বলিবেন না।
অভীকের দোসরা প্রস্থানে আমি আদর্শের মানে প্রীতির, তস্য মানে স্মৃতির পদই বরং বেশি পাইতেছি। কালিদাসের কালের সংস্কৃত ভাষায় ‘স্মৃতি’ শব্দের গোড়া ‘স্মরা’ (smara) শব্দে পাওয়া যায়। এস্তেমাল করিলে দেখা যাইবে ইহার অর্থ ‘মনে পড়া’ যেমন তেমনি ‘প্রেমে পড়া’ ও বটে। স্মরণ না করিলে রমণ হয় না। দেখিতেছি অভীক ওসমানও এখন রমণরণে রত। তাঁহার এই রতরমণেরই অপর নাম দাঁড়াইল ‘তোমার জন্যে এই অরণ্যে’। তোমার মানে অপরের বটে।
ফ্রয়েড ১৮৯৯ সালে এক জায়গায় ‘স্ক্রিন মেমোরিজ’ ওরফে পর্দাস্মৃতি নামা প্রবন্ধে লিখিয়াছিলেন, যাহাকে আমরা বাল্যস্মৃতি বলি তাহা প্রকৃত প্রস্তাবে ছয় কি সাত এমনকি দশ বৎসর বয়সে স্মরণ করা বাল্যকালের বানোয়াট কাহিনী মাত্র। ভাষা ছাড়া স্মরণ হয় না। শেষবিচারে সকল স্মৃতিই বর্তমানে অবিস্মৃত অতীতের কাহিনী। প্রেম মাত্রই যে ভাষার ফলাফল তাহা জানিতে লা রশেফুকো পড়িবার দরকার নাই, অভীক ওসমানের স্মৃতিকথা পড়িলেও চলিবে। ফ্রয়েডের কথাই অকরুণ সত্য বলিয়া ঠেকিবে। একটা উদাহরণ দিতেছি।
রিকশায় তুমি, আমি বলি নগরীর নৌকা
রিকশায় তুমি বাসায় ফিরছ।
.....
অথচ আমার ভালো লাগছে চল্লিশোর্ধ্ব তুমি
কিশোরী ললিপপ খেতে খেতে বাসায় যাচ্ছ
মুগ্ধ চোখে আমিও দেখছি। ভালো লাগছে
অথচ রিকশায় তোমার পাশে আমি নেই।
(‘বসন্ত বিকেলে রিকশায় তুমি’)
এই বিষাদ এই আদর্শ, এই সন্ন্যাস এই গৃহ। অভীক ওসমান সেই জাতের কবি যাঁহারা কবিতা ও ব্যবসায় দুই জাহানেই সমান নেকি অর্জন করিতে পারেন। তিনি ‘রমণীয়’ কবি। রমণীয় নামক বাংলা কথাটি ইংরেজি বুলিতে ‘রোমান্টিক’ রূপ ধারণ করিয়াছে।
আমি আরো এক কারণে অভীক ওসমানকে অভ্যর্থনা করিতেছি। একদা বাংলা সাহিত্যের শেষ আশ্রয় ছিল চট্টগ্রাম। একদা মানে শুধু সতের ইয়াসির কথা বলিতেছি না। গত বিশ শতকেও শশাংকমোহন সেনের মত চিন্তাব্যবসায়ী চট্টগ্রামে বসিয়াই ভারতবিখ্যাত কেতাবপত্র লিখিতেছেন। এই ১৯৪৭ সালের আগেও চট্টগ্রামের হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া যে সংস্কার-সভ্যতা গড়িয়া তুলিয়াছিলেন আজ তাহা স্মৃতি মাত্র। আহা, কেন এমন হইল সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে হইবে। সৌভাগ্যের মধ্যে অভীক ওসমান শুধু কবিতা ব্যবসায়ী নহেন, উচিতবিদ্যার কদরও তিনি জানেন। নচেৎ মৌলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর গদ্য তিনি কেন অঙ্গীকার করিবেন। কে না জানেন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অক্ষয় কীর্তি এই চট্টগ্রামই ধারণ করিয়াছে?
আজ চট্টগ্রামের সাহিত্য দেখিলে আমার চোখে শুদ্ধ লবণ আসে। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় চড়া জাগিতেছে দেখিয়া জাহাজ যেমন ঠেকিয়া যায় আমার প্রাণের স্পন্দন তেমন মন্দন অনুভব করিয়া থাকে। কেন এই ভাটার যুগ, কেন এই মরাকাটাল আর কাটিতেছে না শহর চট্টগ্রামের? অভীক ওসমানেরও বয়স হইয়াছে। চট্টগ্রামের কেন বয়স হইতেছে না! চাটগাঁয়ে আসিলে কেন বলিতে হইতেছে পাড়াগাঁয়ে আসিলাম বুঝি!
অভীক ওসমানের কবিতার মধ্যে চট্টগ্রাম গাঢ় ছায়া ফেলিয়াছে। আমি বিশেষ প্রীতিলাভ করিয়াছি তাহার একপ্রস্ত হর্ষ ও বিষাদ গীতিকা পড়িয়া। ‘হাই পাওয়ার চশমা’ নামা কবিতায় একটি চরিত্র আছেন। নাম মুরিদুর আলম। এই চরিত্র কবির মুখে শুনিলাম ঐতিহাসিক বটে। কিন্তু ইহাকে কোনো পাঠিকা রূপকজ্ঞানে পড়িলেও দোষ দেওয়া যাবে না। মুরিদুর আলম শহিদ হইয়াছেন। কবিই তো লিখিয়াছেন বাঁচিয়া থাকিলে মুরিদ ‘একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক হইতেন।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কতখানি যে স্বাধীনতা ব্যবসায়ে পর্যবসিত হইয়াছে চল্লিশ বৎসর পরের এই কবিতায় তাহা জলছাপের মতন অজ্ঞানে আঁকা দেখিতেছি। সেই জন্যই কি পিরের দেশে মুরিদ নাম? ইহার চাইতে মানানসই আর কী হইতে পারে!
বাংলামুলুকের মুক্তিযুদ্ধ হইতে যে বিপুল গণতন্ত্র জন্ম লইতে পারিত তাহা প্রবল অপচয়ে পরিণত হইয়াছে। পরিণত হইয়াছে মুরিদের সহিত মুরিদের যুদ্ধে। এক মুরিদের অপর নাম দাঁড়ায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ওরফে জাসদ। আজ ভাবিতে অবাক লাগে এই জার্মান নাম কেমন করিয়া বাঙ্গালামুলুকে বিক্রয় হইয়াছিল। তবে সকল বিক্রয়ের ক্রয় থাকে। মনে রাখিতে হইবে অভীক ওসমান জাসদের অলাতচক্র হইতে ক্রয় হইয়াছেন। যেমন হইয়াছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম আহমদ ছফা। অতএব বলিতে হইবে অপচয়ের অপর নাম পরিচয়। যে বিপুল অপচয়ের নাম জাসদ সেই পরিচিত গোবরগাঁদা হইতে কয়েকটি পদ্যফুল ফুটিয়া বোকার মতন মুখব্যাদান করিয়া আছে।
‘অভীক ওসমানের দুই কবিতার বই’ বিষাদের জার্নাল ও তোমার জন্যে এই অরণ্যে— তাহারই বঙ্গীয় একেবানা। গোবরে না, গদ্যের বরে পদ্যফুল।
লেখক : সমাজচিন্তক ও গবেষক






