ইংরেজের হাতে
তৈরি ১৮৬১
সালের ঐতিহাসিক
পুলিশ আইনের
ভিত্তি কার্যত
বাংলার অতীত
ইতিহাসের আইন-শৃঙ্খলা
ব্যবস্থার মধ্যেই
নিহিত ছিল।
ইংরেজ কোম্পানির
ঔপনিবেশিক শাসন
কায়েম হওয়ার
আগে বাংলায়
প্রাতিষ্ঠানিক পুলিশি
ব্যবস্থা বলতে
যে কিছু
ছিল না,
তা কিন্তু
নয়। অস্ত্রধারী
সিপাহি কি
থানাদার থেকে
চৌকিদার—এ
রকম বেশকিছু
পদ আদতে
সুলতানি আমল
থেকেই বাংলায়
ছিল। এমনকি
আইন-শৃঙ্খলা
সামলানোর জন্য
‘থানা’
নামের যে
প্রশাসনিক চৌহদ্দি
আজ সুপরিচিত,
তা-ও
সুলতানি আমলের
উদ্ভাবন—একটি
পরগণাকে একাধিক
ভাগ করে
এর নির্মাণ।
কিন্তু নতুন
শাসকের আগমণের
সঙ্গে সঙ্গে
অপরাধের বৈচিত্র্য
ও জটিলতাও
বাড়তে থাকে।
ফলে প্রয়োজন
হয় সুশৃৃঙ্খল
আইনি কাঠামোর।
বস্তুত ঔপনিবেশিক
বাংলায় আধুনিক
কেতার পুলিশ
ও প্রশাসনকে
শুরু থেকেই
নানা রকম
নতুন নতুন
অপরাধের মোকাবেলা
করতে হয়েছে।
ঔপনিবেশিক প্রশাসন
ও আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর
অপরাধ দমন
ও প্রশমনের
এ কাহিনী
একদিকে যেমন
গোয়েন্দা গল্পের
মতো রোমাঞ্চকর,
তেমনি আরেকদিকে
ইতিহাসের বহু
নিশানাও এর
মধ্যে যেন
লুকিয়ে রয়েছে।
পুলিশি প্যাট্রোলিং ও তদন্ত
ঔপনিবেশিক
প্রশাসন আসল
অপরাধীকে পাকড়াও
ও সম্ভাব্য
অপরাধ ঠেকানোর
ক্ষেত্রে শুরু
থেকেই নজর
দিয়েছিল যথাযোগ্য
তদন্ত প্রক্রিয়া
এবং মাঠপর্যায়ে
সড়গড় পুলিশি
তত্পরতা বা
‘পেট্রোলিং’য়ের
দিকে। কিন্তু
স্থানীয় পর্যায়ে
কোম্পানির কর্তাদের
জানাশোনা কম
থাকায় ও
দেশীয় পুলিশকর্মীদের
আধুনিক তদন্ত
প্রক্রিয়ার সঙ্গে
পরিচয় না
থাকার কারণে
কোম্পানি জামানার
প্রথম দিকে
পুলিশ প্রশাসনে
কিছু সমস্যা
তৈরি হয়।
তবে আরেকটি
বিশেষ কারণ
ওই সময়ের
(বিশেষ করে
১৭৯৩-৯৪)
বাংলায় একাধিক
অপরাধ মামলার
তদন্ত প্রক্রিয়া
এবং আগাম
অপরাধ ঠেকানোর
কার্যক্রমকে ব্যাহত
করছিল বলে
খোদ সরকারি
প্রতিবেদনেই লেখা
হয়েছে। তা
হলো অপরাধীদের
সঙ্গে দুুর্নীতিবাজ
প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি
ও সিপাহি-দারোগাদের
যোগসাজশ। অপরাধের
তদন্তপর্ব হোক
বা মাঠপর্যায়ে
অপরাধ দমন,
তখন সব
প্রক্রিয়াকেই অঙ্কুরে
নিঃশেষ করে
দিত এ
ধরনের অশুভ
সংযোগ। প্রকৃত
অপরাধী হাতের
মুঠোর বাইরে
চলে যেত,
মাঠপর্যায়ে পুলিশি
তত্পরতায় পড়ত
ঢিল। থানা
পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের
এহেন কাণ্ডের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নিতে তখন
আসরে নামতে
হতো ম্যাজিস্ট্রেটদের।
১৭৯৩ সালে
ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট
একজন দারোগাকে
বরখাস্ত করেন
এ অভিযোগে
যে তিনি
‘কোনো
ক্ষতি না
করার শর্তে
ডাকাতদের সঙ্গে
জোট বেঁধেছেন...
তাদের সঙ্গে
গোপনে দেখা
করেছেন এবং
এবং তাদের
থেকে ঘুষও
নিয়েছেন।’ ওই
একই বছর
মেদিনীপুরের দুই
দারোগাকেও অনেকটা
অনুরূপ অভিযোগে
বরখাস্ত করা
হয়, তারা
ডাকাতির দায়ে
অভিযুক্ত একাধিক
ব্যক্তিকে ঘুষ
নিয়ে ছেড়ে
দিয়েছিলেন। অনেক
সময় পুলিশের
কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও
তাদের সহকর্মীর
দুর্নীতির বিষয়ে
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে
জানাতেন। তবে
এ অভিযোগ
জানানোর বিষয়টি
সবসময় নির্দোষ
ছিল না।
কখনো কখনো
সহকর্মীর বিরুদ্ধেই
কেউ কেউ
চক্রান্তমূলক অপরাধে
লিপ্ত হতেন।
থানা প্রশাসনের
মধ্যেকার পারস্পরিক
রেষারেষি থেকে
এ রকম
অপরাধ ঘটত।
যেমন—১৭৯৪
সালের আগস্টে
রাজশাহী জেলার
একটি থানার
বরকন্দাজ একবার
নালিশ করলেন,
তার দারোগাবাবু
৫০ টাকা
ঘুষ নিয়ে
জনৈক ডাকাতকে
ছেড়ে দিয়েছেন।
পরে পাল্টা
অভিযোগ তুলে
আত্মপক্ষ সমর্থন
করে ওই
দারোগা তখন
জানান, পুরোটাই
আসলে একটি
চক্রান্তের অংশ।
ওই বরকন্দাজ
থানার জমাদার
ও মহুরির
থেকে ঘুষ
খেয়ে এমন
অভিযোগ বানিয়েছে।
কারণ ওই
জমাদার-মুহুরি
জুটি দারোগাকে
পছন্দ করে
না, উপরন্তু
বর্তমান দারোগাকে
সরিয়ে মুহুরি
নিজেই দারোগা
হয়ে বসতে
চায়। পরে
দারোগার কথাই
সত্য প্রমাণিত
হয়েছিল। বরকন্দাজ-মুহুরি-জমাদারত্রয়ী
শাস্তি পেয়েছিল।
অনেক সময়
জোর করে
নিজের ভুয়া
কৃতিত্বও জাহির
করতে চাইতেন
কোনো কোনো
দারোগা। উনিশ
শতকে পুলিশ
বাহিনীতে দারোগা
হিসেবে নিয়োগ
পাওয়া অজ্ঞাতনামা
এক ব্যক্তির
বহুল আলোচিত
আত্মকথা ‘দ্য
কনফেশনস অব
মিয়াজান’-এ
(১৮৬৯) এমন
ঘটনা ভূরি
ভূরি। মিয়াজান
নামের আড়ালে
থাকা দারোগাটি
নিয়োগই পেয়েছিলেন
সাতদিনের মধ্যে
নিজের আয়ত্তাধীন
থানা এলাকার
একটি ডাকাতির
মামলার কিনারা
করার শর্তে।
কিন্তু ওই
শর্তপূরণ করতে
গিয়ে তিনি
হাঁটেন ভুল
রাস্তায়। মামলার
বাদীকেই তিনি
ডাকাত বানাতে
চাইছিলেন। সেজন্য
বাদীকে ডেকে
এনে বন্দি
করে রাখেন।
আর থানার
জমাদারকে বাদীকে
আচ্ছামতো পেটানোর
নির্দেশ দেন।
যাতে মারের
চোটেই নিজেকে
সে স্বয়ং
ডাকাত বলে
স্বীকার করে
নেয়। কিন্তু
এ অশুভ
তত্পরতা খারাপ
দিকে মোড়
নিল। মারের
চোটে মামলার
বাদী শেষমেশ
প্রাণে বাঁচেননি।
পরে স্থানীয়
ডাক্তারকে গোঁজামিল
দিয়ে বুঝিয়ে
মেডিকেল রিপোর্টে
লেখা হয়
লোকটি মারা
গেছে হূদযন্ত্রের
ক্রিয়া বন্ধ
হয়ে। ডাকাতির
তদন্ত বাদীর
মৃত্যুর ফলে
থেমে গেল।
আর জেলার
হাকিমও এ
মৃত্যুকে (আদতে
খুন) অজুহাত
হিসেবে দেখানোর
কারণে মিয়াজানকে
দারোগা পদে
স্থায়ীভাবে নিয়োগ
দিয়ে দিলেন,
শর্তপূরণ না
করা সত্ত্বেও!
যা হোক,
এমন দুরবস্থার
পাশাপাশি সে
আমলে অপরাধ
দমনে পুলিশের
সৎ সক্রিয়তার
কথাও নজরে
আসে। উনিশ
শতকের গোড়ায়
‘সমাচার
দর্পণ’-এ
ছাপা হওয়া
একটি সংবাদে
(৭ ফেব্রুয়ারি
১৮২৪) পাই,
পুলিশ অপরাধ
দমনে নিজের
দায়িত্ব পালন
করছে কিনা
তা দেখার
জন্য হুগলির
ইংরেজ জেলা
ম্যাজিস্ট্রেট দেশীয়
পোশাক পরে
গভীর রাতে
পথে বেরিয়েছিলেন।
পথের মধ্যে
এক চৌকিদার
তাকে দেখতে
পেয়ে অপরাধী
সন্দেহে থামিয়ে
প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ
ও পরে
আটক করে।
ছদ্মবেশী ম্যাজিস্ট্রেট
তাকে ঘুষের
লোভ দেখালেও
সে বলে,
১০০ টাকা
দিলেও ছাড়ব
না। অবস্থা
বুঝে ম্যাজিস্ট্রেটের
সহযোগীরা আড়াল
থেকে বেরিয়ে
তার আসল
পরিচয় ও
নেপথ্যের ঘটনা
জানালে সে
নিবৃত্ত হয়।
ওই চৌকিদারকে
এর পরের
দিন সে
ম্যাজিস্ট্রেট ৫০
টাকা পুরস্কার
দিয়েছিলেন। অপরাধ
দমন করতে
গিয়ে পুলিশের
নিম্নস্তরের অনেক
কর্মী প্রাণও
হারাতেন। ২৬
ডিসেম্বর ১৮১৮-এর
‘সমাচার
দর্পণ’ জানাচ্ছে,
কলকাতার চুনা
গলিতে মতিউল্লা
নামের এক
চৌকিদার খুন
হয়েছেন। দুই
আরবদেশীয় লুটেরাকে
দেখে সন্দেহ
হওয়ায় তাদের
তিনি থানায়
সোপর্দ করতে
চাইছিলেন। এ
কথা শুনে
‘একজন
আরব আপন
ছুরি বাহির
করিয়া তাহার
পেটে মারিল।
তাহাতে সে
মরিল। সে
দুইজন তত্ক্ষণাৎ
কয়েদ হইল।...’
আবার অপরাধের
ঘটনাটি আলোচিত
বা ভয়াবহ
হলে তুলনামূলকভাবে
ত্বরিত ব্যবস্থা
নেয়ার প্রবণতা
সেকালেও ছিল
বৈকি। ‘সমাচার
দর্পণ’-এ
৮ সেপ্টেম্বর
১৮২১ প্রকাশ
পেয়েছিল তেমনই
এক ঘটনা।
কলকাতা থেকে
নিজ গৃহে
ফেরার সময়
এক ব্যক্তি
চন্দ্রহাটী নামের
গ্রামে ছিনতাইকারীর
খপ্পরে পড়েছিল।
তার কাছে
বিশেষ কিছু
না পেয়ে
রেগে দুই
ছিনতাইকারী তার
পুরুষাঙ্গ কেটে
দিয়ে পালিয়ে
যায়। পরে
আহত ব্যক্তি
ওই অবস্থায়ই
গঙ্গায় সাঁতরে
কাছের ত্রিবেণী
থানায় গিয়ে
নিজের অবস্থা
জানালে মুহূর্তেই
চারদিকে খবর
ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে ওই
রাতেই থানার
দারোগা চন্দ্রহাটী
গ্রামে গিয়ে
দুই ছিনতাইকারীকে
গ্রেফতার করে
পরের দিন
আদালতে পাঠান।
অপরাধের তদন্ত
করতে গিয়ে
স্থানীয় ‘ইনফরমারদের
দেয়া তথ্য
পুলিশ ও
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের
বেশ কাজে
এসেছে—এমন
ঘটনাও আছে।
১৮৬০-এর
দশকে ঢাকার
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট
হিসেবে নিয়োগ
পেয়েছিলেন জর্জ
গ্রাহাম। তার
স্মৃতিকথা ‘লাইফ
ইন দ্য
মফস্বল’-এ
ঢাকার তখনকার
পুলিশ সুপার
পিল সাহেবের
বয়ানে একটি
খুনের তদন্তসংক্রান্ত
চমকপ্রদ বিবরণ
রয়েছে। একদিন
পিল খবর
পেলেন, স্থানীয়
জমিদার চণ্ডীচরণ
ও বলরাম
পালের মধ্যে
একটি কাছারিঘর
নিয়ে রেষারেষির
জেরে একজন
খুন হয়েছে।
খুনের খবর
শোনামাত্র পিল
সাহেব ঘোড়ায়
চড়ে দিলেন
ছুট। ২০
মাইল দূরের
ঘটনাস্থলে গিয়ে
দেখলেন, এক
বৃদ্ধের মরদেহ
পড়ে আছে।
গায়ে জখমের
দাগ থাকা
সত্ত্বেও পিলের
মন বলছিল,
এটা সেই
খুন হওয়া
ব্যক্তির মরদেহ
নয়। অতএব
মরদেহ পাঠানো
হলো ঢাকার
সিভিল সার্জনের
কাছে। পরে
কাছের এক
জমিদারের কাছারিতে
গিয়ে পিল
বসলেন, তখন
এক স্থানীয়
ব্যক্তি এসে
বলল—সে
পিলের একটা
উপকার করতে
পারবে, বিনিময়ে
সে পুলিশ
কনস্টেবলের চাকরি
চায়। এমন
প্রস্তাব শুনে
পিল তো
হতবাক। তবু
নিজেকে সামলে
কী এমন
উপকার সে
করতে পারবে,
তা জানতে
চাইলেন। জবাবে
ওই লোকটি
বলল, আসল
মরদেহ মিলবে
তিন মাইল
দূরে—লক্ষ্মীকান্তর
বাবার বাড়িতে।
ঘোড়া হাঁকিয়ে
লক্ষ্মীকান্তর বাবার
বাসায় গিয়ে
পুলিশ সুপার
দেখলেন, এক
যুবকের মরদেহ
ঘিরে কান্নাকাটি
চলছে। মরদেহটি
সেই লক্ষ্মীকান্তর।
মাথায় জখমের
দাগ স্পষ্ট।
লক্ষ্মীকান্ত ছিল
চণ্ডীচরণের লোক।
এমন সময়
সিভিল সার্জনও
খবর পাঠালেন,
বৃদ্ধটি আসলে
মারা গেছে
জ্বরে। আর
তার গায়ের
জখমটা মৃত্যুর
পরের। পিল
সাহেব যা
বোঝার তা
বুঝে নিয়ে
দ্রুত মামলা
রুজু করলেন।
আর সেই
‘নেটিভ
ইনফরমার’ও
কনস্টেবলের চাকরি
পেয়ে গেল।
অপরাধের তদন্ত
করতে গিয়ে
পুলিশদের ছদ্মবেশ
ধারণও সে
যুগে দুর্লভ
ছিল না।
উনিশ শতকে
বাংলার গোয়েন্দা
বিভাগের পুলিশ
কর্মকর্তা আমীন
উল্লার ছদ্মবেশ
নিয়ে অপরাধীকে
কুপোকাত করার
ঘটনা লিখে
গিয়েছেন সেই
সময়ের ডেপুটি
ম্যাজিস্ট্রেট রামাক্ষয়
চট্টোপাধ্যায় (১৮২৯-১৯১৪)।
এক ধনী
ব্যবসায়ীর অধীনস্থ
কর্মচারী কান্ত
ঘোষ ৩
হাজার টাকা
নিয়ে এক
ব্যক্তিকে পৌঁছে
দিতে যাওয়ার
সময় যাত্রাপথে
লুটেরা দলের
সামনে পড়েন।
তার সঙ্গে
দুজন অস্ত্রধারী
পাহারাদারও ছিল।
তার পরও
তাদের পিটিয়ে
টাকা ছিনিয়ে
নেয়া হয়।
কান্ত ঘোষ
বেঘোরে মারা
পড়েন। প্রহরী
দুজন আহতাবস্থায়
হাসপাতালে ভর্তি
হয়। একে
খুন, সঙ্গে
টাকা লুট।
এত গুরুতর
মামলা হওয়া
সত্ত্বেও পুলিশ
কিনারা করতে
পারছিল না।
অতঃপর ডাক
পড়ে দক্ষ
গোয়েন্দা আমীন
উল্লার। পুরো
ঘটনা শুনে
তার সন্দেহ
পড়ে ওই
দুই প্রহরীর
ওপরে। তিনি
ডাক্তার সেজে
হাসপাতালে তাদের
পাশের বিছানায়
ঠাঁই নেবেন
বলে মনস্থির
করলেন। যেমন
কথা তেমনি
কাজ। হাসপাতাল
কর্তৃপক্ষকে বলে
দুই প্রহরীকে
দুই ঘরে
রাখার ব্যবস্থা
হলো। ডাক্তার
সেজে তাদের
সঙ্গে ভাব
জমিয়ে ফেললেন
আমীন উল্লা।
পরে একদিন
সুযোগ বুঝে
তাদের গাঁজা
সেবন করিয়ে
নেশার ঘোরে
পেট থেকে
এ খবর
বের করে
আনলেন যে
তারাই আদতে
কান্ত ঘোষের
খুনি। পরে
দুজনকে নিয়ে
খুনের জায়গায়
গেলে তারা
ঠিকই মাটি
খুঁড়ে বাক্সবন্দি
ওই ৩
হাজার টাকা
বের করে
দিয়েছিল।
প্রতিবেদন কী
বলে
অপরাধ দমনের জন্য প্রশাসন ও পুলিশের তরফ থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্যমাফিক কর্তব্য নির্ধারণে প্রতিবেদন রচনার কেতার শুরু ঔপনিবেশিক আমলেই। অপরাধ দমন থেকে আরম্ভ করে অপরাধীদের সংশোধনের জন্য দরকারি তথ্য নথিবদ্ধ ও বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তখনই প্রশাসনযন্ত্র অনুভব করতে পেরেছিল। সমাজের নানাবিধ পরিবর্তন কী করে অপরাধের মাত্রা ও বিন্যাস পাল্টে দেয়, তা ওই সময়ের বহু পুলিশি কি প্রশাসনিক প্রতিবেদনে ধরা আছে। আঠারো শতকের শেষভাগে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ার লক্ষণ দেখেছিল ইংরেজ প্রশাসন। গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহী তত্পরতা ও খাদ্যাভাবের কারণে লুটতরাজ কি খুনখারাবি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে—এমন অভিমত একাধিক সরকারি রিপোর্টে মেলে। সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানির পাট চুকিয়ে প্রত্যক্ষ ইংরেজ রাজশাসন এল, আর ওই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নতুন নির্মম অপরাধের কথা শোনা গেল তখনকার পুলিশি প্রতিবেদনে। সেটি জ্ঞাতসারে আপন শিশুকে হত্যা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে তো বটেই, বাংলার বহু জেলায় অনেকে দারিদ্র্যের কারণেও নিজের সদ্যোজাত সন্তানকে আর কিছু না ভেবেই নিকেশ করে দিয়েছিল—এমনটাই একাধিক প্রতিবেদনের ভাষ্য। ১৮৮২ সালে চট্টগ্রামের এক তরুণী বিয়ের আগেই সন্তান ধারণ করায় তার কন্যাশিশুকে হত্যা করে, ১৮৮৪ সালে মেদিনীপুরে এক বিধবা যমজ সন্তানের জন্ম দিয়ে সমাজে একঘরে হওয়ার ভয়ে দুজনকেই হত্যা করেছিল। ‘সমাজের হেয় হওয়ার ভয়ে’ ঘটানো এমন শিশুহত্যার পাশাপাশি মেলে জটিল মানসিক অস্থিরতা থেকে সংঘটিত হত্যার খবরও। রাজশাহী জেলায় এক বিবাহিত নারী তার যমজ সন্তানের একটিকে হত্যা করার পর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে; পরে জেরার মুখে জানায়, ‘দুজনকে সমান আদর করতে না পারার শঙ্কা’ থেকেই একটি সন্তানকে সে নিরুপায় হয়ে খুন করেছে (ঘটনাটি ১৮৮৪-এর)। অভাবের তাড়নায়, খাদ্যের অভাবে সন্তান হত্যার মর্মান্তিক সংবাদও পুলিশি নথিতে আছে।
সেকালের পুলিশি
প্রতিবেদন বহিরঙ্গে
শুকনো ও
কাঠখোট্টা হলেও
সেগুলো খানিক
তলিয়ে পড়লে
অতীতের যে
অপরাধচিত্র সামনে
আসে—তা
কখনো কখনো
রীতিমতো চাঞ্চল্যকর।
ইতিহাস রচনার
আকর্ষণীয় উপাদানও
বটে। দ্রব্যমূল্য
বৃদ্ধির সঙ্গে
অপরাধপ্রবণতা বাড়ার
সম্পর্ক যে
আছে, তাও
পুলিশ কর্মকর্তারা
সেই প্রায়
দেড়শ বছর
আগেই বুঝেছিলেন।
১৯১০ সালে
বাংলা পুলিশের
তদানীন্তন আইজিপি
এলএফ মোর্সহেড
একটি প্রতিবেদনে
বিশ্লেষণ করে
দেখিয়েছিলেন শিল্পায়ন
ও রেলওয়ে-রাজপথ
নির্মাণের অগ্রগতির
ফলে বাংলায়
অপরাধের পরিমাণ
এবং বৈচিত্র্য—দুই-ই
বৃদ্ধি পেয়েছিল।
যেসব জেলায়
শিল্প কলকারখানা
তৈরি হয়,
সেসব জেলায়
ডাকাতি-রাহাজানির
পরিমাণও বাড়তে
থাকে। ওই
‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল
পকেট’সমূহে
মোটা দাগের
অপরাধ বৃদ্ধির
পাশাপাশি ‘হোয়াইট
কলার’ অপরাধেরও
দেখা মিলছিল;
তখনকার সমাজবাস্তবতায়
যা ছিল
নতুন ধরনের
ব্যাপার। বাংলায়
ব্যবসায়িক তত্পরতার
বিস্তারের সঙ্গে
সঙ্গে প্রতারণা,
অর্থ আত্মসাৎ
কিংবা জালিয়াতির
মতো অপরাধের
ঘটনাও সামনে
আসা শুরু
হয়। এসবের
সঙ্গে অভিজাত,
ধনী ও
শিক্ষিত ব্যক্তিদেরও
জড়িত থাকার
খবর মিলতে
থাকে। ঔপনিবেশিক
বাংলায় টাকা-পয়সাসংক্রান্ত
অপরাধের একটি
পরিসংখ্যানের দিকে
চোখে দেয়া
যাক। পুলিশি
নথি থেকে
প্রাপ্ত তথ্য
অনুযায়ী ১৮৭০-৯৫
পর্যন্ত বাংলায়
অর্থনৈতিক জোচ্চুরি
বা প্রতারণাসংক্রান্ত
কোনো অভিযোগ
লিপিবদ্ধ না
হলেও ১৯০০
সালে গিয়ে
সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে
৪১১। আর
১৯০৪-এ
এমন কেসের
সংখ্যা ৬০১।
১৯০৪-০৫
সালে বাংলা
পুলিশের গোয়েন্দা
বিভাগ জাল
নোটসংক্রান্ত একটি
মামলা তদন্ত
করতে গিয়ে
মোট ১৪
জনের হদিস
পায়। এদের
প্রত্যেকেই ছিল
উচ্চশিক্ষিত। তিনজন
ছিল বেঙ্গল
ব্যাংকের কর্মকর্তা।
সবাইকে ধরা
সম্ভব হয়নি।
তবে ওই
তিন ব্যাংক
কর্মকর্তা ধরা
পড়েছিল ও
প্রত্যেকেরই কয়েক
বছর করে
হাজতবাসের সাজা
হয়। অভিজাত
ও ‘শিক্ষিত’
বাঙালিদের অপরাধের
চালচিত্রও রিপোর্টগুলো
ঘাঁটলে পাওয়া
যাবে। শ্রীরামপুরের
সুপরিচিত পরিবারের
সন্তান বামাপদ
মুখোপাধ্যায়ের কথাই
ধরা যাক।
বাবার ওপর
রাগ করে
বাড়ি ছেড়ে
তিনি নদীয়ায়
চলে যান,
তখন তার
বয়স ২৫
বছর। নদীয়া
গমনের কিছুদিন
পরই পুলিশ
তার বিরুদ্ধে
নেশাদ্রব্য খাইয়ে
শান্তিপুর-কৃষ্ণনগরের
একাধিক রূপোপজীবিনীর
সর্বস্ব লুটের
অভিযোগ এনে
মামলা ঠুকে
দেয়। পরে
বামাপদর সন্ধান
পাওয়া যায়
গোয়ালন্দে, ১৮৮৮
সালে। সেখানে
তিনি মানি
অর্ডার জালিয়াতির
দায়ে গ্রেফতার
হয়েও আদালতে
হাজিরা দেয়ার
সময় পালিয়ে
যান। পরে
অবশ্য উত্তর
প্রদেশ থেকে
তাকে আটক
করে হাজতে
পাঠানো হয়েছিল।
হুগলির শ্রীরামপুরের
ধনী গোঁসাই
পরিবারের সদস্য
মন্মথ নাথ
মৈত্র রীতিমতো
একটি দল
তৈরি করে
ভয়ানক জুয়াচুরি
করতে নেমেছিলেন।
তিনি ও
তার ‘গ্যাং’-এর
বিরুদ্ধে ১৯০৫-০৮
এ সময়ে
১৭টি প্রতারণার
মামলা হয়েছিল।
অবশ্য কেউ
কেউ বলতে
পারেন, এ
দুজন তো
অভিজাত পরিবারের
‘বখে
যাওয়া সদস্য’।
কিন্তু খোদ
এক জমিদারের
জাল টাকার
কারবারের কথাও
বাংলা পুলিশের
নথিতে লভ্য।
আনন্দমোহন রায়
ছিলেন ধনী
জমিদার, তার
ওপর কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট।
১৯১১ সালে
তার টালিগঞ্জের
বাড়িতে গিয়ে
প্রচুর জাল
রুপির নোট
উদ্ধার করেছিল
পুলিশ। সঙ্গে
মেলে জাল
তৈরির জন্য
দরকারি সব
উপাদান ও
যন্ত্রপাতিও। যদিও
পরে আদালতে
গিয়ে তিনি
সূক্ষ্ম বুদ্ধির
জোরে খালাস
পেয়ে যান।
অপরাধের ইতিহাসের ধূসর অধ্যায়
ঔপনিবেশিক
বাংলার অপরাধ
জগৎ নিয়ে
প্রশাসন ও
পুলিশের কর্মকর্তাদের
যে লিখিত
আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক
বয়ান আমরা
পাই, তা
নেহাত একটেরে
নয়। প্রশাসনের
‘ইনসাইডার’
হওয়ার কারণে
সব তথ্য
খোলামেলাভাবে প্রকাশ
করতে তারা
পারেননি ঠিকই,
কিন্তু ছাঁকনি
গলে যেটুকু
আমরা হাতে
পাই—তা-ও
কম কৌতূহলোদ্দীপক
বা কম
বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়।
বঙ্গীয় অপরাধের
জগৎ যে
নিছক সাদা-কালো
ছকে আবদ্ধ
ছিল না,
তার মধ্যেও
বহু ধূসর
আখ্যান লুকিয়ে
আছে—সেই
ইশারাটুকু পুলিশ-প্রশাসনের
নথিপত্র ও
কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত
স্মৃতিকথার মধ্যে
লভ্য। বাংলার
অপরাধ জগতের
ইতিহাস রচনা
করতে গেলে
তাই এ
লিখিত বিবরণগুলোর
দিকে চোখ
ফেরানো ছাড়া
একালের গবেষকের
গতি নেই।
তথ্যসূত্র:
ক্রাইম
অ্যান্ড পাবলিক
ডিসঅর্ডার ইন
কলোনিয়াল বেঙ্গল
১৮৬১-১৯১২-অরুণ
মুখোপাধ্যায়
ক্রাইম
অ্যান্ড কন্ট্রোল
ইন আর্লি
কলোনিয়াল বেঙ্গল
১৭৭০-১৮৬০-
বাসুদেব চট্টোপাধ্যায়
পুলিশ
ও লোকরক্ষা-রামাক্ষয়
চট্টোপাধ্যায়
অবিভক্ত
বাংলার পুলিশের
ইতিহাস-কাবেদুল
ইসলাম
মিয়াজান
দারোগার একরারনামা-অরিন্দম
দাশগুপ্ত অনূদিত
উনিশ
শতকে বাংলার
মফস্বল-জি.
গ্রাহাম, আখতার
জাহান দোলন
অনূদিত
মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক





