শুরুতেই এক হাই প্রোফাইল সাহেবের কীর্তি স্মরণ করা যাক। তিনি ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস। সহজ বাংলায় বলতে গেলে তিনি বন্ধুর স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়েছিলেন। ভারতে আসার সময় জাহাজে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কার্ল ভন ইমহোপ ও তার স্ত্রী ম্যারিয়ান ইমহোপের। এরা ছিলেন জার্মান। ম্যারিয়ানের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন হেস্টিংস। মাদ্রাজে তার আতিথেয়তা গ্রহণ করে ইমহোপ দম্পতি, এদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় হেস্টিংসের। ১৭৭০-এর সেপ্টেম্বরে স্ত্রীকে হেস্টিংসের কাছে রেখে কলকাতায় যান কার্ল। কিছুদিন পর লেডি ইমহোপ চলে এলেন কলকাতায় স্বামীর কাছে। এর কিছুদিন পর হেস্টিংসের গন্তব্যও হয় কলকাতা। তখনো বাইরে কারো ধারণা ছিল না লেডি ইমহোপ আর হেস্টিংসের মধ্যে কী চলছে। ১৭৭২ সালে কার্লের সঙ্গে হেস্টিংসের সম্পর্কের অবনতি হলো। এর মধ্যে ইমহোপের ওপর ভারত ছাড়ার নির্দেশ এল। কিন্তু গোল বাঁধল লেডি ইমহোপকে নিয়ে। স্বামীকে জানালেন তিনি হেস্টিংসকে বিয়ে করতে চান। কার্ল রাজি হয়ে গেলেন। শোনা যায় হেস্টিংস ১০ হাজার পাউন্ড ঘুষ দিয়ে রাজি করান কার্লকে। দেশে ফিরে কার্ল আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। এরপর হেস্টিংস ও ম্যারিয়ান ইমহোপ বিয়ে করেন। তাদের বয়স যথাক্রমে ৪৫ ও ৩০। ১৭৭৭ সালের আগস্টে হয়েছিল এ বিয়ে। আইনি বিবেচনায় গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস হয়তো কোনো অপরাধ করেননি। কিন্তু কাজটি যে অনৈতিক ছিল তাতে আপত্তি করার সুযোগ নেই।

বাংলায় বসবাস করা উঁচুতলার সাহেবদের মধ্যে মদাসক্তি, ব্যাভিচার, ডুয়েল, ঝগড়া-বিবাদ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। হেস্টিংসের ওপরের কীর্তিটি কেবল একটি ছোট উদাহরণ। সাহেবদের মধ্যে নিচুতলার মানুষও ছিল প্রচুর। এরা ছিলেন ব্রিটেনের দরিদ্র মানুষ। ভাগ্যের সন্ধানে বাংলায় এসেও তাদের সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এদের ঠাঁই হয়েছে অপরাধীদের তালিকায়, নয়তো পাগলাগারদে।

কোম্পানির সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা ছিল নাবিকরা। বাংলায় বাণিজ্যসূত্রে প্রচুর বিলাতি জাহাজ আসা-যাওয়া করত। বন্দরে জাহাজ ভিড়লে অনেক নাবিক চাকরি ছেড়ে কলকাতা শহরে চলে আসতেন। জাহাজের বন্দিজীবন ছেড়ে এবার শহরে উদ্দাম সুখের সড়কে গা ভাসিয়ে দিতেন। নিখিল সুরের সায়েবমেম সমাচার বই থেকে—‘জাহাজ-পালানো এইসব নাবিক প্রায় প্রতিদিনই বন্দর ছেড়ে চলে আসত শহরে। অনেক জাহাজ বন্দরে বেশ কিছুদিন বিশ্রাম নিত নানা কারণে। সেই সময় নাবিকরা ঢুকে পড়ত শহরে। বিশেষ করে রবিবার বিকেল বেলায় তারা দলে দলে ঘুরে বেড়াত কলকাতার রাস্তায়। শোভাবাজারের কাছে নিষিদ্ধপল্লীতে যেত ঘন ঘন। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে তারা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাদের আচার-আচরণে সভ্যতার লেশমাত্র থাকত না। যথেচ্ছ মদ্যপান করে মাতলামি, খুন, ডাকাতি প্রভৃতি অপরাধে জড়িয়ে পড়ত হামেশাই। ১৮৫৫ সালে ম্যাজিস্ট্রেট ৫০০ অপরাধের মামলার বিচার করেন, যাতে নাবিকরা জড়িত ছিল। ১৮৫৬ থেকে ১৮৬১, পাঁচ বছরে ১৫২২ জন নাবিককে জেলে পোরা হয় বিভিন্ন অপরাধে। ১৮৫৫ সালে কলকাতার পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, নটা খুনের মধ্যে চারটে, আর আটটা মারধর করা মামলার আসামি নাবিক। ১৭৯৫-এ শহরে পরপর অনেকগুলো ডাকাতি হয়ে যায়। ডাকাতদলের একজন রাজসাক্ষী হয়ে জানায়, তারা দলে ছিল দুশোজন, পর্তুগিজ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় সায়েব। তাদের মতলব ছিল হিন্দুস্তান ব্যাংকে ডাকাতি করা। তখনই তারা ধরা পড়ে যায়। বিচারে শাস্তি হয় ছ’জনের।’

লালবাজার-বউবাজার এলাকায় উনিশ শতকে নাবিকদের হইহুল্লোড় আর হাঙ্গামা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক, তবে তা রোববার সীমা ছাড়াত। পুলিশকে বেগ পেতে হতো এসব মাতালদের সামলাতে। মিশনারির নানাভাবে চেষ্টা করেছেন এদের মদপান ও বেশ্যাগমনের অভ্যাস শোধরাতে। তবে খুব একটা কাজ হয়নি।

নিষিদ্ধপল্লীতে গিয়ে খুনোখুনি করার রেকর্ডও আছে ইউরোপীয় নাবিকদের। ‘এলিজা’ নামের এক মার্কিন জাহাজের নাবিক ফ্র্যাঙ্ক ফোলস বিবিজান নামের এক গণিকার মাকে হত্যা করেছিল। বিবিজানকে দেয়ার মতো টাকা ফোলসের ছিল না। তখন তার মা বাধা দিয়েছিলেন। আর তাতেই ক্ষেপে গিয়ে ফোলস পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়ে এবং ঘটনাস্থলেই সেই নারীর মৃত্যু হয়। অবশ্য বিচারের সময় যথারীতি শ্বেতাঙ্গ হিসেবে বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন ফোলস। পুলিশের রিপোর্টে জানানো হলো ফোলস সেই নারীকে মারতে চায়নি, ভয় দেখাতে গিয়ে গুলি বেরিয়ে গিয়েছিল!

খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে পর্তুগিজদের জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল বেশি। মাঝেমধ্যে ইউরোপীয়দের অপরাধ অভিযানে জুটে যেত স্থানীয়রাও। যেমন ১৭৯৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচজন ইউরোপীয় ও আর এক বাঙালি মিলে চিনা বাজারে চৈতন্য শীলের বাড়িতে সিঁদ কেটে চুরি করে। এমনকি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মতো কিছু ডাকাত দলও তখন কলকাতায় ডাকাতি শুরু করেছিল। তারা বাঙালি কিংবা ইউরোপীয় উভয় জাতির মানুষই আক্রমণ করত। উনিশ শতকের শেষভাগে এসে এ রকম বহুজাতিক অপরাধী দলের কর্মকাণ্ড মিইয়ে আসে। পুলিশি ব্যবস্থার বিস্তৃতি, নগরায়ণের প্রভাবে এ রকম অপরাধ কমে এসেছিল।

১৭৮০ সালে জেমস হিকি তার হিকি’জ বেঙ্গল গেজেটে ব্যঙ্গ করে কয়েকটি কাল্পনিক প্রশ্নোত্তর প্রকাশ করেছিলেন। এতে সেকালে কলকাতায় অবস্থান করা সাহেবদের চরিত্রের চিত্র পাওয়া যায়—

প্রশ্ন: বাণিজ্য কী?

উত্তর: জুয়া খেলা।

প্রশ্ন: সর্বোত্কৃষ্ট গুণ কী?

উত্তর: ধন।

প্রশ্ন : স্বদেশপ্রেম কী?

উত্তর: আত্মপ্রেম।

প্রশ্ন: সময় সম্বন্ধীয় নিয়ম পালন কী?

উত্তর: ডুয়েল বা অভিসারের অঙ্গীকার পালন করা।

প্রশ্ন: ভদ্রতা কী?

উত্তর: অমিতব্যয়িতা।

ডুয়েল হতো মূলত নারীদের অধিকার করা নিয়ে। এছাড়া সামান্য কারণেও সাহেবার একে-অন্যের সঙ্গে ডুয়েল লড়তেন। এ যেন স্বদেশভূমি ছেড়ে বহু দূরে দাঁড়িয়ে বীরত্ব দেখানোর এক সুযোগ। চুরি-ডাকাতির পাশাপাশি অনেক সাহেব সে আমলে জাল টাকা তৈরির মতো ভয়ানক অপরাধেও জড়িয়ে গিয়েছিল। ১৮২৩ সালে জেমস ট্রিজার নামে এক সাহেবের কাছে উদ্ধার করা হয় ব্যাংক নোট ও কোম্পানির কাগজ জাল করার যন্ত্রপাতি।

নাবিক আর নানা ধরনের অপরাধীদের পাশাপাশি আরেকটি শ্রেণী সাহেবদের মান-মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছিল। এরা সহজ বাংলার ভবঘুরে। আঠারো শতকে কলকাতার পথে-ঘাটে এদের উৎপাত ছিল বেশ। পুরুষ ভবঘুরেদের অনেকে জড়িয়ে যেত অপরাধে আর নারীরা যুক্ত হতো পতিতাবৃত্তিতে। ব্রিটিশ প্রশাসন এ ভবঘুরে ও অপরাধীদের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়ত। কেউ এখন ভবঘুরে তো তখন অপরাধী। আবার অপরাধ শেষে সেই আগের ভবঘুরে বেশ।

সামাজিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়া অনেক ইউরোপীয় নারী বাংলায় পতিতাবৃত্তিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। অনেকে এই বিদেশে এসে স্বামী হারিয়ে বিপদে পড়তেন। বেছে নিতেন অন্ধকার দুনিয়ার পথ। এর মধ্যে একটি প্রতারক গোষ্ঠীও তৈরি হয়েছিল, যারা ইউরোপ থেকে নারীদের নানাভাবে প্রলুব্ধ করে ভারতে এনে এ পথে নামতে বাধ্য করত।

শ্বেতাঙ্গ হিসেবে দায়মুক্তি পেলেও অনেক সময় ইউরোপীয় অপরাধীরা তাদের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তিও ভোগ করেছেন। যেমন ১৭৯৫ সালে এসপ্লানেড রোডে ডাকাতির দায়ে তিনজন ইউরোপীয় ভবঘুরের হাত পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।

 

সূত্র: সায়েবমেম সমাচার, নিখিল সুর

 

এস এম রশিদ: লেখক