কোনো অঞ্চল
যখন অন্য
একটি দেশ
বা জাতির
উপনিবেশে পরিণত
হয় তখন
স্বাভাবিকভাবেই সেই
নতুন ধরনের
শাসন কাঠামোর
কারণে অঞ্চলটির
বিকাশের ধারা
বদলে যায়।
পরবর্তী সময়ে
ইতিহাস হিসেবে
সাধারণত উপনিবেশের
অর্থনৈতিক ও
রাজনৈতিক অবস্থা
গুরুত্বসহকারে আলোচিত
হয়। সামাজিক
অবস্থা, পরিবর্তনের
কথাও উল্লিখিত
হয়। কিন্তু
আর্থসামাজিক পরিবর্তনের
সঙ্গে যে
বিভিন্ন ধরনের
অপরাধ দেখা
হয়—ক্ষেত্রবিশেষে
অপরাধের নতুন
ধারা সৃষ্টি
হয়—তা
ইতিহাসের মূল
ধারায় আলোচিত
হয় না।
কিন্তু আর্থসামাজিক
পরিবর্তনের সঙ্গে
সঙ্গে নতুন
ধরনের অপরাধপ্রবণতার
সৃষ্টি সামাজিক
কাঠামোর বিশ্লেষণে
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান
হিসেবে বিবেচিত
হতে পারে।
ভারত যে
সময়ে ইংরেজ
উপনিবেশে পরিণত
হয় সে
সময়ে এ
অঞ্চলেও বিভিন্ন
প্রকার অপরাধ
বহুকাল ধরেই
প্রচলিত ছিল।
ঔপনিবেশিক ভারতের
এককালে রাজধানী
কলকাতা হয়ে
উঠেছিল নানা
ধরনের নিত্যনতুন
অপরাধের লীলাভূমি।
ভিন্ন ভিন্ন
বৈশিষ্ট্যের অপরাধ,
দুর্ধর্ষ অপরাধী
আর তাদের
পেছনে ছোটা
পুলিশের অভিজ্ঞতা
বর্তমান সময়ের
কোনো গোয়েন্দা
গল্প থেকে
কম রোমাঞ্চকর
নয়।
সাধারণ চুরি
দিয়েই শুরু
করা যাক।
মাটির ঘরের
দেয়াল বা
মেঝে খোঁড়ার
এক অতি
সাধারণ কিন্তু
কার্যকরী যন্ত্র
সিঁধকাটি। ভারতের
বিশেষত বাংলার
চোরেরা এই
সিঁধকাটি দিয়েই
অতি অল্প
সময়ে মাটির
মেঝে কিংবা
দেয়াল খুঁড়ে
গৃহস্থের বাড়িতে
ঢুকে যেতে
পারত। কৌশল,
অনুশীলন তাদের
এমনই দক্ষ
করে তুলেছিল
যে মাত্র
দু-তিনজনে
স্বল্প সময়ের
মধ্যে একটি
ঘরে সিঁধ
কেটে চুরি
করে আসতে
পারত। সেকালের
একজন পাকা
সিঁধেল মনিরুদ্দিনের
মতো এমনও
চোর ছিল
যারা আধা
ঘণ্টার মধ্যে
ঘরের বাইরে
থেকে সিঁধ
কাঁটা শুরু
করে ঘরের
মধ্যে পৌঁছে
যেতে পারত।
মাটি নয়
কেবল, ইটের
দেয়ালের মধ্যেও
রন্ধ্র তৈরি
করতে পারত
তারা। ‘নিশি
রাতে বাঁশি
তার সিঁধকাটি
হয়ে/ চুপি
চুপি ঘরে
এসে বাজে
রয়ে রয়ে’—মান্না
দের কণ্ঠে
এ গান
অনেকেরই পরিচিত।
কৃষ্ণের বাঁশি
কেমন করে
সবার অগোচরে
রাধাকে উদ্বেল
করত, সে
কথা এই
গানে উল্লিখিত।
সিঁধকাটির সঙ্গে
তুলনা করার
কারণ হলো
সিঁধকাটি দ্বারাও
এ রকমই
সবার অগোচরে
চোরেরা ঘরের
ভেতরে প্রবেশ
করত।
সিঁধেল চোরদের
পাশাপাশি উনিশ
শতকের কলকাতায়
আরো বিভিন্ন
ধরনের চোর
বিচরণ করত।
পুলিশ রিপোর্ট
অনুসারে বিশের
বেশি প্রকারভেদের
কথা উল্লেখ
করা হয়েছে।
আবার চোরদের
মধ্যে কিছু
শ্রেণীবিভাগও ছিল।
যারা যে
ধরনের কাজ
করত সে
অনুসারে নাম,
যেমন—ফুট
(চুরি করে
দ্রুত পালানো
চোর, ফুটে
যাওয়া থেকে
এই নাম),
ফিতের কর্ম
(দরজার খিল
বা তালা
খোলার জন্য
এরা ফিতা
ব্যবহার করত)।
সময়ভেদে চুরি
করার রেওয়াজ
ছিল। ভোরের
চোররা ‘ভোরে
মারি’, দিনের
চোরেরা ‘দিনে
মারি’, সন্ধ্যার
চোরেরা ‘সন্ধ্যা
মারি’ প্রভৃতি
নাম ব্যবহার
করত। কোনো
কোনো চোর
কেবল ইউরোপীয়দের
বাড়িতেই চুরি
করত। ধোপদুরস্ত
পোশাক পরে
তারা এসব
বাড়িতে ঢুকে
পড়ত, কখনো
বাড়ির আশপাশের
গাছ বেয়ে
ভেতরে ঢুকে
চুরি করে
নিত। চোরদের
মধ্যে কিছু
উঁচু-নিচু
ভেদ ছিল,
যেমন—ছিঁচকে
চোররা সিঁধেলদের
চেয়ে নিম্নমানের
বলে মনে
করা হতো।
বাংলার বিভিন্ন
অপরাধীদের মধ্যে
এ চোরেরা
সম্ভবত অন্যদের
তুলনায় বিশেষভাবে
নিজেদের প্রস্তুত
করত। ছিনতাই,
জালিয়াতি, চোরাচালানির
চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই
চুরি একটি
প্রাচীন পেশা
(অবশ্যই অপরাধ)।
চৌর্যবৃত্তি অত্যন্ত
পুরনো এবং
যদিও এটি
ঔপনিবেশিক আমলের
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কোনো
অপরাধ নয়,
কিন্তু বস্তুত
উনিশ শতকে
চুরির ধরন
বদলে গিয়েছিল।
চোরেরা হয়ে
উঠেছিল কৌশলী,
বেপরোয়া ও
দক্ষ। সংঘবদ্ধভাবে
একেকটি চক্র
এ চুরি
পরিচালনা করত।
যেখানে কারো
কাজ ছিল
কেবলই রেকি
করে কোনো
বাড়ি বা
ব্যক্তি সম্পর্কে
তথ্য জোগাড়
করা। কখনো
একটি দলের
একজন সদস্য
একটি ধনী
গৃহস্থের ভৃত্য
হিসেবে সেই
ঘরে প্রবেশ
করত এবং
কোন জায়গায়
কোন সম্পদ
লুকানো তা
নিজের দলের
কাছে পৌঁছে
দেয়ার পর
চুরি সংঘটিত
হতো। যেমন
কলকাতার জনৈক
রমাকান্ত মুনশীর
বাড়িতে কর্মরত
বনমালীকে চাকরি
থেকে বরখাস্ত
করার পর
সে গোবিন্দরাম
নামে এক
সিঁধেলের সঙ্গে
মিলে রমাকান্তর
বাড়িতে চুরি
করেছিল।
এমন অনেক
চুরির বর্ণনা
পাওয়া যাবে
উনিশ শতকের
কলকাতার পুলিশ
রিপোর্টে। রিপোর্ট
অনুসারে ১৮৫১-৭১
সালের মধ্যে
কলকাতায় খুন
কমে গেলেও
চুরি, ডাকাতি,
ছিনতাই বেড়ে
গিয়েছিল। এ
সময়ে চোরেরা
বেপরোয়া হয়ে
পড়ে এবং
পকেটমার, ছিনতাই
বেড়ে যায়।
‘গাঁটকাটা’
শব্দটির সঙ্গে
অনেকের পরিচয়
না থাকলেও
সাধারণত একে
আমরা এ
যুগে চলতি
বাংলায় পকেট
মারিং বলি।
মূলত সেকালের
কলকাতার বেশির
ভাগ লোক
ধূতি পরিধান
করত এবং
কোমরের কাছে
একটি সরু
বস্ত্রখণ্ড বাঁধত,
যার সঙ্গে
ছোট একটি
টাকার থলে
সংযুক্ত থাকত।
কলকাতার চোরেরা
এ কাপড়ের
বেল্টের বন্ধন
কাটত। গিঁট
বা গাঁট
কেটে চুরি/ছিনতাই
করার কারণে
এদের নাম
হয়েছিল ‘গাঁট
কাটার দল’।
পরবর্তী সময়ে
কলকাতার শিক্ষিত
শ্রেণী ইউরোপীয়
পোশাক পরা
শুরু করলে
পকেট কাটা,
পকেট মারা
শুরু হয়।
গাঁট কাটা
থেকে পকেটা
কাটা—ঔপনিবেশিক
শাসনে সমাজিক
পরিবর্তনের সাক্ষী।
সবাই যে
টাকা চুরি
করত এমন
নয়। ঘড়ি,
আংটি এমনকি
রুমালও চুরি
হতো। রুমাল
চুরির এ
ঘটনা অবশ্য
ইংল্যান্ডেও ছিল।
ডিকেন্সের ‘অলিভার
টুইস্ট’ উপন্যাসে
এর চমত্কার
বর্ণনা পাওয়া
যায়।
জনৈক হাফিজ
সাহেবের (ছদ্মনাম)
স্ত্রী একদিন
সকালে মর্নিং
ওয়াকে গেলেন।
ফজরের পরপর
নিরিবিলি রাস্তায়
হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ সামনে
একজন সৌম্যদর্শন
বৃদ্ধকে দেখলেন
এবং বৃদ্ধ
তাকে সালাম
দিলে তিনিও
জবাব দিলেন।
তাদের মধ্যে
কিছু কথোপকথন
হলো। কিছুক্ষণ
পর ভদ্রমহিলা
ওই সৌম্যদর্শন
বৃদ্ধকে নিজের
বাসায় নিয়ে
এসে নগদ
টাকা, স্বর্ণালংকার
প্রভৃতি নিজের
হাতে দিয়ে
দিলেন। প্রায়
সম্মোহিত অবস্থায়
করা নিজের
এ কাজের
কোনো ব্যাখ্যা
তিনি দিতে
পারেননি। বছর
খানেক আগে
আমারই এক
প্রতিবেশীর এ
ঘটনার মতো
কলকাতার পথেঘাটে
অহরহ এ
ভিন্ন ধরনের
ছিনতাই/লুট
হতো। ‘উদাসী
ফকির’ নামে
পরিচিত হওয়া
এ দলটির
মধ্যে প্রধান
ব্যক্তি তার
‘টার্গেট’কে
লক্ষ্য করে
পথের মধ্যেই
সামনে গিয়ে
দাঁড়াত। ভারতে
স্বাভাবিকভাবেই ফকির-সন্ন্যাসীদের
সম্মান দেয়া
এবং তাদের
অলৌকিক ক্ষমতায়
বিশ্বাসের কারণে
এসব ভণ্ড
সন্ন্যাসী পথচারীদের
সহজেই প্রলুব্ধ
করত। ভবিষ্যৎ
কথন বা
কোনো বিপদের
নাম করে
তাদের মধ্যে
দুশ্চিন্তা সৃষ্টি
করা ছিল
এদের প্রথম
কাজ। পরে
দলের অন্য
দু-একজন
সদস্য এসে
‘বাবা/গুরু,
আপনার দয়ায়
আমার সংকট
কেটে গিয়েছে’
জাতীয় কথা
বলে ‘টার্গেট’
ব্যক্তির মধ্যে
বিশ্বাস সৃষ্টি
করা হতো।
উনিশ শতকের
কলকাতায় শিক্ষার
প্রসারের কারণে
মফস্বল থেকে
সেখানে কিশোর,
তরুণেদের আগমন
ঘটত। এদের
বলির পাঁঠা
বানিয়ে এ
ধরনের উদাসী
ফকিররা নিজেদের
ডেরায় কিংবা
নিরিবিলি স্থানে
নিয়ে সর্বস্ব
লুট করত।
ঔপনিবেশিক কলকাতার
অপরাধের ইতিহাস
ঘাঁটলে দেখা
যাবে সেকালেও
দুপুরবেলা পুরুষের
অনুপস্থিতিতে পণ্য
বিক্রি কিংবা
অন্য ওজুহাতে
কিছু চোর
অন্দরে ঢুকে
নারীদের সম্মোহিত
করে অলংকার,
অর্থ প্রভৃতি
লুট করত।
এ চোরেরা
কতটা বেপরোয়া
ছিল তা
একটি চুরির
উদাহরণ থেকে
বোঝা যাবে।
রমজান চোর
একদিন এক
বাড়িতে ঢুকে
গৃহকর্ত্রীর চেতনা
লুপ্ত করে
তার এক
হাতের বালা
নিতে না
নিতে তিনি
সচেতন হয়ে
উঠলে সে
পালিয়ে যায়।
কিন্তু পরে
পরিবারের কর্তা
পুলিশে রিপোর্ট
করার খবর
রমজানের কানে
গেলে সে
পুলিশের জমাদারের
পোশাক পরে
এসে বালার
নমুনা হিসেবে
অন্য হাতের
বালাটি হস্তগত
করে।
কর্তাকে মূলত
বুদ্ধির বলে
বোকা বানিয়েছিল
রমজান। কিন্তু
নারীদের অচেতন
করার কৌশল
কী? সুমন্ত
ব্যানার্জি বলেন,
ফাঁপা বাঁশের
কঞ্চির মধ্যে
এক ধরনের
নেশাদ্রব্য রেখে
সময় বুঝে
তা ফোঁকা
হয়। এসব
ক্ষেত্রে সম্মোহন
কিংবা চেতনা
লুপ্ত করতে
ঠিক কী
ব্যবহার করা
হতো তা
নিয়ে ধোঁয়াশা
আছে। তবে
মনোজ বসু
তার বিখ্যাত
উপন্যাস ‘নিশিকুটুম্ব’তে
‘নিদালী
বিড়ি’র
উল্লেখ করেছেন।
সাধারণত সিঁধেলরা
সিঁধ কেটে
কোনো নারীর
অঙ্গ থেকে
অলংকার খোলার
আগে এই
বিড়ির ধোঁয়া
তাদের নাকেমুখে
ছাড়ত। অর্থাৎ
কোনো না
কোনো প্রকার
নেশার বস্তু
এতে মিলিত
থাকত।
নেশার বস্তুই
কেবল নয়,
রীতিমতো নানা
বিষাক্ত রাসায়নিক
ব্যবহার করেও
লুট করা
হতো। যেমন
আজকের দিনে
আমরা যে
‘অজ্ঞান/মলম
পার্টি’র
নাম শুনি,
এদেরও পূর্বসূরি
ওই উনিশ
শতকেই ছিল।
সেকালেও নদীপথ
কিংবা স্থলপথে
যে ব্যবসায়ী
বা পথিকরা
চলাচল করত
তাদের কাছ
থেকে অর্থ-সম্পদ
আত্মসাৎ করার
মতো অপরাধীর
অভাব ছিল
না। এরা
সাধারণত পথিক,
ভ্রামণিক বা
দলের সঙ্গে
প্রথমে নিজেকে
পরিচিত করত।
সুযোগ বুঝে
তাদের খাবার
বা পানীয়তে
বিষাক্ত দ্রব্য
মিশিয়ে দিয়ে
অজ্ঞান করার
মাধ্যমে সম্পদ
লুট করত।
অজ্ঞান করার
ক্ষেত্রে এদের
প্রধান উপাদান
ছিল ধুতুরা।
উনিশ শতকে
ইসলাম নামে
একজনের হদিস
পাওয়া যায়,
যে কিনা
এই অজ্ঞান
করার বিষয়ে
একজন বিশেষজ্ঞ।
সাতজনের একটি
দলের প্রধান
এ ব্যক্তি
গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক
রোডকে নিজের
অপকর্মের লীলভূমি
করে তুলেছিল।
বহুদিন এ
পথে চলাচলকারীদের
লুট করার
পর অবশেষে
সে ধরা
পড়ে ১০
বছরের নির্বাসন
দণ্ডে দণ্ডিত
হয়েছিল।
চোর, ছিনতাইকারী
থেকে আরম্ভ
করে সেকালের
কলকাতায় আরেক
শ্রেণীর অপরাধীর
আবির্ভাব কিংবা
বলা যায়
সৃষ্টিই হয়েছিল।
এদের মধ্যে
যে বিষয়টি
লক্ষ করা
যায় তা
হলো দলের
মধ্যে কোনো
ধর্মীয় বিভেদ
ছিল না।
একজন মুসলিমের
অধীনে হিন্দুরা
নির্দ্বিধায় কাজ
করত। কিংবা
হিন্দু নেতা
মুসলিম কর্মী
নিতে কখনো
দ্বিধা করত
না। চোর,
অজ্ঞানকারী লুটেরারা
মূলত প্রান্তিক
পর্যায়ের মানুষ।
এদের কাজের
ভিত্তি ছিল
অভিজ্ঞতা আর
অনুশীলন এবং
তত্কালীন পুলিশ
বিভাগের মতে,
‘অপরাধ
করার পদ্ধতিকে
এরা শিল্পের
পর্যায়ে নিয়ে
গিয়েছিল।’ কিন্তু
সময়ের সঙ্গে
কলকাতা তথা
বাংলায় শিক্ষিত
শ্রেণীর উদ্ভব
হলে অপরাধের
ধরন বদলে
যায়। পরিশ্রমের
সঙ্গে বুদ্ধি
খরচ করতে
শুরু করল
একশ্রেণীর অপরাধী
দল। এদের
সহজ কথায়
প্রতারক, জালিয়াত
বলা চলে।
জাতিয়াতির প্রকারের
বিশ্লেষণ না
করে একটি
ঘটনা উল্লেখ
করা যায়।
একদা ত্রিপুরার
তরুণ মহারাজ
লক্ষ করলেন
তিনি দেনায়
ডুবন্ত, নগদ
অর্থ ঋণ
করা প্রয়োজন।
সহকারী শশিভূষণ
বসুকে তিনি
কলকাতায় প্রেরণ
করলেন। মেছুয়াবাজারে
একটি ঘর
ঠিক করে
সেখানে তিনি
একজনের সঙ্গে
পরিচিত হলেন,
যিনি জানালেন
তিনি মূলত
একজন মহারাজকে
চেনেন যিনি
কিনা অর্থ
দিতে সক্ষম।
অকুস্থলে পৌঁছে
শশিভূষণ লক্ষ
করলেন মহারাজ
জুয়ায় হেরে
হাজার টাকার
বান্ডিল অবলীলায়
দান করলেন।
মহারাজকে নিজের
সংকটের কথা
জানালে তিনি
বললেন, অবশ্যই
তিনি অর্থ
দান করবেন,
পাশাপাশি ব্যবসার
জন্য আলাদা
অর্থও দান
করবেন। কিন্তু
সেখান থেকে
৫ শতাংশ
তাকে প্রদান
করতে হবে।
নির্দিষ্ট দিন
মহারাজকে ‘কমিশন’
প্রদানের পর
শশিভূষণ যখন
মহারাজের কাছ
থেকে মূল
অর্থ গ্রহণ
করবেন, অন্দর
থেকে খবর
এল মহারাজের
শিশুপুত্র আহত।
তিনি দ্রুত
গমন করলেন
এবং শশিভূষণকে
বললেন তিনি
যেখানে পাটের
ব্যবসা করতে
চান সেই
অঞ্চলে টাকা
প্রেরণ করা
হবে।
শশিভূষণের সে
কাঙ্ক্ষিত অর্থ
কোনোদিনও আসেনি
এবং তিনি
যখন কলকাতায়
সেই বাড়ির
সম্মুখে পুনরায়
পৌঁছেন, জানতে
পারেন বাড়িটি
কিছুদিনের জন্য
ভাড়া নেয়া
হয়েছিল। মূলত
ঔপনিবেশিক কলকাতায়
এ রকম
অনেক মহারাজের
সৃষ্টি হয়েছিল,
যারা অসামান্য
দক্ষতায় রীতিমতো
একটি নাটকের
সেট তৈরি
করে নাটক
মঞ্চস্থ করত,
যা শশিভূষণের
মতো শিক্ষিত
মানুষের পক্ষেও
বোঝা অসম্ভব
হতো। পরবর্তী
সময়ে শশিভূষণ
যখন পুলিশের
কাছে অভিযোগ
করেন, দলের
প্রত্যেকে একে
একে ধরা
পড়ে, যাদের
মধ্যে একজন
লক্ষৌয়ের,
একজন কলকাতার
মানিকতলার অধিবাসী
এবং মূলত
এরাই মূল
হোতা। রাজা
হিসেবে যাকে
সাজানো হয়েছিল
সে নেহাত
একটি পুতুল।
শশিভূষণ আরো
জেনে অবাক
হন যে
জুয়ায় হেরে
রাজা সাহেবের
দান করা
হাজার টাকার
বান্ডিলের কেবল
ওপরের নোটটিই
হাজার টাকার,
ভেতরে সব
সাদা কাগজ।
কিন্তু পুলিশ
আরো অবাক
হয় যখন
জানতে পারে
যে ওই
একটি নোটও
নকল!
মুদ্রা জালিয়াতিও
নতুন কিছু
নয় এবং
ঔপনিবেশিক বাংলায়
এ চর্চা
ছিল আরো
বিস্তৃত। ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
যখন ক্ষমতা
গ্রহণ করে
তখন সম্রাট
শাহ আলমের
নামে থাকা
‘সিক্কা’
চালু ছিল।
১২ গ্রাম
ওজনের এ
রুপার টাকা
বেনারস, ফররুখাবাদ
ও বোম্বে
থেকে তৈরি
হতো। ১৮১৯
খ্রিস্টাব্দে শোনা
যায়, পুরনো
মুদ্রার উচ্চমূল্যমানের
কারণে কোম্পানির
চালু করা
নতুন মুদ্রার
পাশ ঘষে
পুরনো বলে
চালানোর চেষ্টা
করা হচ্ছে।
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে
কোম্পানি একটি
নতুন টাঁকশাল
স্থাপন করে
যা ৭
ঘণ্টায় ৩
লাখ সিক্কা
তৈরি করতে
পারত। মেজর
ফোর্বসের তৈরি
এ আধুনিক
যন্ত্র কিছুকালের
জন্য কোম্পানিকে
স্বস্তি দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে
কোম্পানি কাগুজে
মুদ্রাও চালু
করে। কিন্তু
কোনো ক্ষেত্রেই
মুদ্রা জালিয়াতের
অভাব হয়নি।
সিক্কা বা
ধাতব মুদ্রার
ক্ষেত্রে পোদ্দার,
কামার, অলংকারশিল্পীরা
জালিয়াতি করত।
তবে সবাইকে
ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন
শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়।
রসায়নবিদ্যা ও
প্রযুক্তির সাহায্য
নিয়ে শ্যামাচরণ
এবং তার
তিন-চারজন
সাগরেদ মিলে
‘রানীর
মুদ্রা’ জালিয়াতি
করে এমন
পর্যায়ে নিয়ে
গিয়েছিল যে
ব্রিটিশ মুদ্রা
কলকাতার বাজারে
মুখ থুবড়ে
পড়ার মতো
অবস্থা হয়।
এ শ্যামাচরণের
পেছনে গোয়েন্দা
বিভাগ উঠেপড়ে
লেগেছিল। অফিসারদের
মধ্যে একজন
ছিলেন ‘দারোগার
দপ্তর’ লেখক
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়।
তিনি এ
জালিয়াতের পেছনে
ব্যয় করা
তার শ্রম
ও অভিযানের
বিস্তৃত বর্ণনা
দিয়েছেন। প্রিয়নাথের
মতে, শ্যামাচরণ
একজন দক্ষ
মুদ্রা জালিয়াত,
পাকা অভিনেতা
ও অসাধারণ
দলনেতা। কেননা
প্রথমবার প্রিয়নাথ
যখন চোরবাগানের
ডেরায় শ্যামাচরণের
মুদ্রা তৈরির
ব্যবস্থা নিজের
চোখে দেখেন
(অবশ্যই গোপনে),
পরে সেখানে
অভিযান চালিয়ে
শূন্য ডেরা
ছাড়া কিছু
পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময়ে
প্রিয়নাথ যখন
আবার এ
ব্যক্তিকে খুঁজে
বের করে
হাতেনাতে ধরতে
যান, যে
বাড়িটিকে প্রিয়নাথ
লক্ষ্য হিসেবে
বেছে নিয়েছিলেন,
সেখানে এক
মরণাপন্ন ব্যক্তির
শেষ মুহূর্ত
উপস্থিত দেখতে
পান। সেখানে
একজন বিখ্যাত
ডাক্তারের সঙ্গেও
পরিচয় হয়,
যিনি প্রিয়নাথকে
একটি ভিজিটিং
কার্ড দেন।
মরণাপন্ন ব্যক্তির
মৃত্যু হলে
সবাই তাকে
নিয়ে শ্মশানে
গেলে প্রিয়নাথ
সেই শেষ
শয্যার নিচে
একটি গুপ্ত
কুঠুরির খুঁজে
পান, যেখানে
মুদ্রা নকল
করার যন্ত্রপাতির
কিছু অংশও
ছিল। কিন্তু
নিমতলা বা
কালীঘাটে খবর
নিয়ে জানতে
পারেন নির্দিষ্ট
সময়ে সেখানে
কোনো শবদাহ
হয়নি এবং
সেই বিখ্যাত
ডাক্তার বলে
পরিচয় দেয়া
ব্যক্তি মূলত
ডাক্তারের কার্ডটি
হাতিয়ে প্রিয়নাথকে
দেখিয়েছিল।
এসব ঘটনা
থেকে সেকালের
জালিয়াতদের দক্ষতা
ও মরিয়াপনার
কথা বোঝা
যায়। তারা
সরাসরি পুলিশকে
বোকা বানাতেও
কসুর করত
না। যদিও
প্রায় চার
মাস পর
প্রিয়নাথ দারোগা
এ শ্যামাচরণকে
ধরেছিলেন, কিন্তু
এমন হেনস্থার
শিকার হয়েছিলেন
আরেক দারোগা
বাকাউল্লাহ। হরিদাস
নামের জালিয়াতকে
গ্রেফতার করার
পর সেই
জালিয়াত নিজেকে
কৃষ্ণদাস বলে
পরিচয় দিয়েছিল।
নদীয়ায় এ
গ্রেফতারের পর
তত্ক্ষণাৎ পুলিশ
স্টেশনে যাওয়া
সম্ভব ছিল
না বলে
ওই ব্যক্তির
ঘরেই রাতের
খাবার খেতে
হয়েছিল বাকাউল্লাহর
এবং দুজন
সেপাইসহ তার
খাবারের সঙ্গে
ধুতুরা মিশিয়ে
দেয়া হয়।
মূলত এ
জালিয়াতরা অজ্ঞান
করার ক্ষেত্রে
কী পরিমাণ
ধুতুরা ব্যবহার
করতে হয়
তা জানত
বলে বাকাউল্লাহ
বেঁচে গিয়েছিলেন।
হরিদাস যদি
চোরা কারবারি
হতো, তাহলে
হয়তো বাঁচতেন
না। সেকালের
‘অজ্ঞান
পার্টি’র
অনেকে এ
পরিমাণ সম্বন্ধে
না জানার
কারণে তাদের
অনেক ‘শিকার’
মৃত্যুবরণ করত।
উনিশ শতকের
শেষের দিকে
চোরাকারবার ফুলেফেঁপে
ওঠে। মূলত
ওই সময়ে
নীল চাষের
পাশাপাশি আফিমের
বাজার বৃদ্ধি
পাওয়ার কারণে
নদীপথে চোরাচালান
বাড়ে। অবশ্য
নানা প্রকার
চোরাচালান আরো
আগে থেকেই
প্রচলিত ছিল।
বিশেষত দাস
ব্যবসার কারণে।
এতক্ষণ যদিও
কলকাতাভিত্তিক অপরাধের
কথাই বলা
হয়েছে, তবে
এ পর্যায়ে
পূর্ব বাংলাও
যুক্ত হবে।
চোরাচালানের ক্ষেত্রে
হুগলি থেকে
বঙ্গোপসাগর হয়ে
চট্টগ্রাম পর্যন্ত
অপরাধ বিস্তৃত
হয়েছিল। মূলত
তখনো মগ
জলদস্যুরা চট্টগ্রামসহ
বর্তমান বাংলাদেশের
সন্দ্বীপ, বাকেরগঞ্জ
(বরিশাল) ও
সুন্দরবন অঞ্চলে
জলদস্যুতা করত।
এরা যুক্ত
হয়েছিল দাস
ব্যবসার সঙ্গে।
এসব উপকূলীয়
অঞ্চল থেকে
কিশোর-কিশোরী,
যুবক ও
নারীদের অপহরণ
করা হতো।
কোম্পানি শাসনের
শুরুতেই দাস
ব্যবসা নিষিদ্ধ
হয়নি। পরবর্তী
সময়ে সে
রকম নিষেধাজ্ঞা
এলেও কিশোরী-তরুণীদের
অপহরণ করে
কলকাতায় বিক্রি
করা অন্যতম
লাভজনক ব্যবসা
হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কেননা তখন
কলকাতায় ‘বাবু
কালচার’ বেড়ে
উঠছিল এবং
বাইজি, পতিতা
ও মাদক
ছিল তাদের
অন্যতম বিলাস।
কলকাতার উঠতি
ধনীদের এসব
বিলাস সরবরাহ
করার জন্য
আফিম, মদ
চোরাচালানের পরিমাণ
বেড়েছিল। পাশাপাশি
আরেক শ্রেণীর
ধাপ্পাবাজ গড়ে
উঠেছিল। ‘কাপ্তেন’
বলে পরিচিত
এসব লোকের
কাজ ছিল
নব্য ধনী
বা এ
প্রকারের লোকদের
ধরে নির্দিষ্ট
কোনো বাইজিখানায়
নিয়ে যাওয়া।
অতঃপর মফস্বলের
কোনো জমিদার
বা ব্যবসায়ীর
নির্বিচার খরচের
মধ্য থেকে
এদের পকেট
ভারী হয়ে
উঠত। এদের
কেউ কেউ
আবার নোট
কিংবা স্ট্যাম্প
জালিয়াতির সঙ্গেও
যুক্ত ছিল
বলে জানা
যায়। চোরাচালান
এদের কারো
কারো মূল
ব্যবসাও ছিল।
সঙ্গে সঙ্গে
এ সময়ের
চোরাচালানের মধ্যে
অস্ত্র ও
গোলাবারুদ জায়গা
করে নিয়েছিল।
বাবুদের বিলাসের
আরেকদিকে শোষিত
হওয়া মানুষ
যখন বিদ্রোহের
মুখে, তখন
অস্ত্র হয়ে
উঠেছিল অন্যতম
পণ্য। ফলে
সেসব জোগানের
পদ্ধতি হয়ে
দাঁড়ায় চোরাকারবার।
অবশ্য সে
অস্ত্র কেবল
স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহীদের
হাতেই যায়নি,
অন্যান্য অপরাধীর
হাতেও পৌঁছেছিল।
যেমন এখনো
পৌঁছে থাকে।
মূলত ঔপনিবেশিক
আমলের সেসব
অপরাধের নানা
বিবর্তিত রূপ
এখনো দক্ষিণ
এশিয়ার সমাজে
প্রচলিত রয়েছে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





