উনিশ শতকের শেষপাদে বাংলা সাহিত্যের পুরোধা লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধে কিছুটা হাহাকার ও কিছুটা আশাবাদী হয়ে লিখেছিলেন:

বাঙ্গালার ইতিহাস নাই, যাহা আছে, তাহা ইতিহাস নয়, তাহা কতক উপন্যাস, কতক বাঙ্গালীর বিদেশী বিধর্ম্মী আসার পর পীড়কদিগের জীবনচরিতমাত্র। বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে?

তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী, তাহাকেই লিখিতে হইবে। মা যদি মারা যান, তবে মার গল্প করিতে কত আনন্দ। আর আমাদিগের সর্ব্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গালাদেশ, ইঁহার গল্প করিতে কি আমাদের আনন্দ নাই?

আইস, আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গালার ইতিহাসের অনুসন্ধান করি। যাহার যত দূর সাধ্য, সে তত দূর করুক, ক্ষুদ্র কীট যোজনব্যাপী দ্বীপ নির্ম্মাণ করে। একের কাজ নয়, সকলে মিলিয়া করিতে হইবে।

তার আবেগময় আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৎকালীন বাংলা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্বজ্জন, পণ্ডিত ও লেখকরা স্থানীয় ইতিহাস ও বাঙালির ইতিহাস রচনাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এই নতুন ভাবনার সর্বোত্কৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায় ‘বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি’ ও ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’কে। দ্বাদশ শতাব্দীর কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে বরেন্দ্রভূমিকে পাল রাজাদের জনকভূ (আদি নিবাস অর্থে) আখ্যা দেয়া হয়েছিল। বাংলার উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ভাস্কর্য, মুদ্রাতত্ত্ববিষয়ক জ্ঞানসাধনা ও নিদর্শনাদি আবিষ্কার-সংগ্রহের অভিলাষে এই সংগঠনদ্বয়ের জন্ম। ১৯১০ সালে পদ্মা নদীতীরবর্তী শহর রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি। উদ্যোক্তাদের মধ্যে নেতৃত্বে ছিলেন দিঘাপতিয়ার জমিদারদের বংশজাত শরৎ কুমার রায়, রাজশাহীর তৎকালীন প্রথিতযশা আইনবিদ ও ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, প্রত্নতত্ত্ববিদ, শিল্পকলা বিশারদ এবং ইতিহাসবিদ রামপ্রসাদ চন্দ্র। তাদের সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, শিল্পকলা ও প্রত্নতত্ত্ব অধ্যয়ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবীয় কর্মকাণ্ডের ছোয়া থেকে বেঁচে থাকা স্থাপনা, ভাস্কর্য ও সৌধমালা সম্পর্কিত জ্ঞান অনুসন্ধান, গবেষণা এবং জনসম্মুখে প্রকাশ করাই ছিল তাদের আরাধ্য সাধনা।

১৯১০ সালের এপ্রিলে এই ত্রিরত্ন-জ্ঞানসাধক আরো কয়েকজনকে নিয়ে দেওপাড়া, পালপাড়া, মালঞ্চ, জাগপুর, ইতাহার, চব্বিশনগর, মন্দাইল, কুমারপুর, খেতুর, বিজয়নগর ও রাজশাহীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, স্থাপনা, ভাস্কর্য ইত্যাদি অনুসন্ধানে বের হন। বর্তমান সময়ের আধুনিক জ্ঞানশাস্ত্র অনুযায়ী এটিকে ‘Archaeologicl Exploration’ হিসেবে মানতে অনেকেই কার্পণ্য করবেন হয়তো। তা সত্ত্বেও এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম দলগত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ করলে অত্যুক্তি হবে না বলে আমার বিশ্বাস। এক্ষেত্রে সাহেবদের উদ্যোগগুলোকে বাদ দিয়েই আমি মন্তব্যটি করলাম। মান্দইল থেকে দেবী চন্দ্রীর বেশকিছু মূর্তিসহ দলটির সংগৃহীত মূর্তির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২।

রাজশাহীতে ফেরার পর রাজশাহী শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দলটিকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানান। এ সভায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের রাজশাহী শাখার সম্পাদক শশধর চৌধুরীসহ অনেকেই সংগৃহীত প্রত্ননিদর্শনাদি রাজশাহীতেই রাখার জন্য প্রস্তাব করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে যাওয়া দলটির নেতৃস্থানীয়রাও এটিকে ধারণ করে রাজশাহীতে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১০ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। উল্লেখ্য, ১৯১২ সালে লর্ড কারমাইকেল সোসাইটির স্থাপিত জাদুঘরটির সংগ্রহশালা ও নিদর্শনাদি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তী বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ১১ নং সার্কুলারের মাধ্যমে স্থানীয় জাদুঘরগুলোকে ভাস্কর্য, মুদ্রা ও অন্যান্য প্রত্ন নিদর্শনাদির সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের অনুমতি দেয়া হয়। ১৯১১, ১৯১২ ও তারপর বিভিন্ন সময়ে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির পক্ষ থেকে উত্তর বাংলার বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উত্খনন কাজ পরিচালনা করা হয়।

বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, সংগ্রহ ও উত্খননের প্রধান জোগানদাতা ছিলেন জমিদার তনয় শরৎ কুমার। ১৯২৩ সালে সোসাইটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সমন্বিত প্রয়াসে পাল রাজাদের নির্মিত সোমপুর মহাবিহার বা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের উত্খনন কাজ শুরু হয়। কুমার এই কাজে প্রতি বছর ২ হাজার টাকা অনুদানের ওয়াদা করেছিলেন এবং তিন বছর তা (১৯২৫-২৬, ১৯৩০-৩১ ও ১৯৩৪-৩৫) দিয়েছিলেনও। বরেন্দ্র জাদুঘরের কিউরেটর এই উত্খননে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটিকে ১৯৩৭ সালে সরকারি নির্দেশনার কারণে জাদুঘরের পরিচালনার ভার ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে দিতে হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ জাদুঘর ও সোসাইটি উভয়ের জন্য চরম সংকটময় অবস্থা তৈরি করে। রাধা গোবিন্দ প্রসাদ, রমা প্রসাদ চন্দ, ইউএন ঘোষালসহ সোসাইটির একাধিক নিবেদক গবেষক ও কর্মী দেশত্যাগ করেন। দেশভাগের ঠিক দুই বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক দিঘাপতিয়া স্টেটের জমিদার শরৎ কুমার। দেশভাগ-পরবর্তী দুই দশক সোসাইটি ও জাদুঘর উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মতত্পরতা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ, দুর্বল ও নিষ্প্রভ। কালক্রমে এটি বন্ধের উপক্রম হয় এবং ১৯৬৩ সালে এর বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। দেশ বিভাগের পরবর্তী সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা নানাভাবে করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারও জাদুঘরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করে। দেশ বিভাগ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে তোলার জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প ছিল না। তবে তা ছিল অনিয়মিত। ১৯৬১ সালে সরকার তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের নিকট জাদুঘরের কর্তৃত্ব হস্তান্তরের শর্তারোপ করলে পরিচালনা পর্ষদ তা মানেনি। কর্তাব্যক্তিদের কাছে সেটি জাদুঘর ও সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী মনে হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে জাদুঘরের অনারারি কিউরেটর জাদুঘরটিকে বাঁচানোর একটি উদ্যোগ নেন। তিনি রাজশাহী শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি, জাদুঘরের পর্ষদ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জাদুঘরের দায়িত্ব নেয়ার জন্য সম্মত করাতে সক্ষম হন।

১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে এম জামিলুর রহমান, সিএসপি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অধ্যাপক মল্লিক একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মাধ্যমে বরেন্দ্র রিসার্চ জাদুঘরটির পরিচালনার সার্বিক কর্তৃত্ব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিন্ডিকেট জাদুঘরটির পরিচালনার জন্য ১৪ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে। উপাচার্য এ কমিটির সভাপতি এবং জাদুঘরের ডিরেক্টর মেম্বার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন।

একটি আদর্শ জাদুঘরের ত্রিবিধ কার্যাদি—নিদর্শন সংগ্রহ, প্রদর্শন ও গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা বরেন্দ্র রিসার্চ জাদুঘর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। রমা প্রসাদ চন্দের গৌড়রাজমালা কিংবা সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতমের ইংরেজি অনুবাদ, শামসুদ্দিন আহমেদের Inscriptions of Bengal অথবা মোখলেসুর রহমানের মূর্তিবিষয়ক ক্যাটালগ—এসবই এই প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের মুকুটের রত্নমণি। সংস্কৃত ভাষায় রচিত পুঁথি সংগ্রহটি বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামকে করেছে আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। বাংলার শিল্প-ইতিহাসের খনি হিসেবে জাদুঘরটির সমকক্ষ প্রতিষ্ঠান পাওয়া দুষ্কর। প্রদর্শিত মূর্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কাঠ ও প্রস্তর নির্মিত মূর্তি। মূর্তিগুলোর মধ্যে সূর্য, শিব, গণেশ ও বিষ্ণুর পাশাপাশি রয়েছে দুর্গা, গৌরী, উমা, পার্বতী, মার্তৃকা ও চামুণ্ডার প্রতিমা। এছাড়া আছে বৌদ্ধ বোধিসত্ত্ব, তারা ও জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি। লেখমালার মধ্যে রয়েছে তাম্রশাসন, প্রস্তর লেখ, মূর্তি লেখ—এসবই সংস্কৃত ভাষার ও আদিপর্বের নিদর্শন। মধ্যপর্বের আরবি-ফার্সি শিলালেখ, মসজিদের মিহরাব, অলংকৃত চৌকাঠ ও লিন্টেল, শের শাহের সময়ের কামানও স্থান পেয়েছে এই জাদুঘরের প্রদর্শনী গ্যালারিতে।

বঙ্কিমের আহ্বান সারা বাংলায় আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের যে জোয়ার সৃষ্টি করেছিল তার একটি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল পদ্মা তীরের শহর রাজশাহীতে। স্থানীয় ধনবান, বিদ্যুৎসাহী জনগণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার শিকড় অনুসন্ধানী গবেষক-প্রত্নবিদ-ইতিহাসবিদদের সম্মিলিত প্রয়াসে উন্মোচিত হয় বাংলার ইতিহাসের নানা দিক। আজকের বাংলাদেশের শেকড়-আত্মপরিচয়-অতীত ভাবনার মজুদখানা বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে তাদের শেকড়, অতীত, ঐতিহ্য। হালফিলের তিন দশকে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা-চর্চা ও সংগ্রহ ম্রিয়মাণ হলেও এটির জ্ঞানভাণ্ডার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষকদের অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ। এ নীরবতা ভাঙুক—এ প্রত্যাশায় ইতি টানছি।

 

শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

sahidul.hasan@du.ac.bd