ঔপনিবেশিক আমলে গাঁজা চাষ ও বিপণনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল নওগাঁর কিছু এলাকা। এমনকি তৈরি হয়েছিল কো-অপারেটিভ সোসাইটি। সংক্ষেপে এ অঞ্চল ‘গাঁজা মহল’ নামে পরিচিত।
সাধারণভাবে গাঁজার চাষ ও বিপণনের কথা বললে এখন আমাদের মাথায় অবৈধ ব্যবসার বিষয়টিই চলে আসবে। তবে নওগাঁর এ গাঁজা মহলের ছিল অর্থনৈতিক গুরুত্ব। এ কারণেই সে সময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রাজশাহীর ৭৬ বর্গমাইলে গাঁজার চাষ করা হতো। এ অঞ্চলের মধ্যে ছিল নওগাঁ, বদলগাছী ও মহাদেবপুর থানা। এ অঞ্চলের ৩২২টি গ্রাম নিয়ে ৯ হাজার ৯৪ একর জমি গাঁজা চাষের উপযুক্ত ছিল। ব্রিটিশ আমলে নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রশাসনিক বা কৃষিকাজ হতো এবং তাকে বলা হতো মহল। গাঁজা মহল মূলত সেখান থেকেই এসেছে। এ মহলে উৎপাদিত গাঁজা বাংলার অন্যান্য অঞ্চল এমনকি বিহার ও ওড়িশায়ও পাঠানো হতো। মহল থেকে কিছু পরিমাণ গাঁজা লন্ডনেও পাঠানো হতো।
১৯১৬ সালে প্রকাশিত রাজশাহী জেলা গেজেটিয়ারের তথ্য অনুসারে, এর আগের সাত বছরে ৯৭০ একর জমিতে গড়ে গাঁজা উৎপাদন হয়েছে ৮ হাজার মণ। প্রতি বছর কী পরিমাণ জমিতে চাষ হবে তা সরকার কর্তৃকই নির্ধারিত হতো এবং প্রতি বছর তা নতুন করে নির্ধারণ করাই ছিল সাধারণ নিয়ম। মহলে ভিন্ন ভিন্ন চত্বরে চাষ হতো গাঁজা। চত্বর মূলত চৌকো ধানি জমির মতো জায়গা। গেজেটিয়ারে পাওয়া তথ্য অনুসারে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে মোট ২০টি চত্বরে চাষ হতো। এর মধ্যে আছে মুরাদপুর সার্কেলের বোয়ালিয়া, বক্তারপুর, একারতারা, মুরাদপুর, নারায়ণপুর, শাহপুর ও শাহজাদপুর; কীর্তিপুর সার্কেলের বর্ষাইল, চক শঙ্কর, কীর্তিপুর, কুমারগুড়ি, মাধাউনগর, মারুনা ও পাহাড়পুর; গোবিন্দপুর সার্কেলের চক মোক্তার, গোবিন্দপুর, হাপানিয়া, মোগলামপুর, সালুকিয়া ও শ্রীবারঘাটি।
প্রতিটি চক নওগাঁর দেড় থেকে ১০ মাইলের মধ্যে অবস্থিত এবং এর প্রতিটি ৩ থেকে ১৫ একর পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনটি সার্কেলে বিভক্ত এ মহলের প্রতিটি সার্কেল একজন সাব-ইন্সপেক্টরের অধীনে থাকত। কোন কোন অঞ্চলে কীভাবে চাষ হবে তা কালেক্টর নির্দিষ্ট করে দিতেন। এর জন্য এক্সাইজের কমিশনারের অনুমোদন প্রয়োজন হতো। তবে চাষের জমির পরিমাণ ১০২৬ একরের বেশি যেন না হয় তা নিশ্চিত করা হতো। শুধু অনুমোদনপ্রাপ্ত চাষীরাই চাষের অধিকার রাখতেন। উপর্যুক্ত ২০০ বছরে তিন হাজার অনুমোদিত চাষী গাঁজা চাষ করতেন। মানভেদে প্রতি মণ গাঁজা ৪০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতো। খুচরা বাজারে প্রতি তোলা বিক্রি হতো ১০ থেকে বারো আনায়। বছরে গাঁজা থেকে রাজস্ব আসত প্রায় ৬৬ লাখ টাকা (সাড়ে ৪ লাখ পাউন্ড)।
নওগাঁর স্থানীয় প্রভাবশালী ও কৃষকবান্ধব ব্যক্তিরা একত্র হয়ে একটি সমবায় সমিতি তৈরি করার চিন্তা করেন। ১৯১৭ সালে ‘নওগাঁ গাঁজা কাল্টিভেটরস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ তৈরি করা হয়। শুরুতে এর কার্যনির্বাহী পর্ষদের সদস্য ছিলেন ১৮ জন। ১৯৬৫ সালে সদস্য সংখ্য ছিল ১২ জন। এ সময়ের আবার সমিতির নাম ‘নওগাঁ গাঁজা গ্রোয়ারস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’।
সমবায় সমিতিটি কেবল গাঁজা উৎপাদন ও বিপণনেই সাহায্য করেছে এমন নয়। তারা এ আয়ের মধ্য দিয়ে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজও করেছেন। ১৯২৩ সালে নওগাঁয় লিটন ব্রিজ নামে একটি ব্রিজ তৈরি করা হয়। এমনকি ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় এ সমবায় সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমবায়ের তহবিল থেকে দুস্থদের জন্য ২ লাখ টাকা সাহায্য দেয়া হয়। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের অবদান রয়েছে। ১৯১৬ সালে চাকলা, ১৯২১ সালে কীর্তিপুর ও চকতিথা এবং ১৯৩৬ সালে পাহাড়পুরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক






