এ কে পদ্ম অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

রামপুরের আকাশে হেলিকপ্টার ঘুরঘুর করছে। জয়াম্মা তার নিচু ছাপড়াঘরে মিনুকে জলদি করতে তাগাদা দিলেন। ‘মিনু তাড়াতাড়ি তৈরি হ, শিগগির আয়, হাত-মুখ ধুয়ে নে। ছটুকে আমি গোসল করাব। মিনুকে তাড়া দিয়ে ছটুকে গোসল করাতে জয়াম্মা বেরিয়ে গেল।

পনের মিনিটের মধ্যে মিনু ও জয়াম্মা দুজনই বাচ্চা কোলে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে মাঠে এসে পৌঁছে। এখানেই মঞ্চ, বহু বর্ণ পতাকা এবং মাইক বসানো হয়েছে। মাঠের হেলিপ্যাডে হেলিকপ্টার নেমেছে, বাচ্চা ও বুড়ো সবাই মুখে অনুসন্ধিত্সু দেঁতো হাসি নিয়ে ওটার কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করছে। প্রবেশপথেই একজন মচমচে নোট বিতরণ করছেন। বয়স্কদের ২০০ রুপি, আর বাচ্চাদের একশ। জয়াম্মা ও মিনু দুই বান্ধবী টাকাটা নিয়ে বেশ আয়েশ করে চেয়ারে বসল।

নির্বাচনের বক্তৃতা চলছে— বড় মানুষ মাচি রেড্ডি লাউড স্পিকারে কথা বলে যাচ্ছেন। বারবার তিনি তার বড় শরীরটা অনেকখানি নুইয়ে বলছেন নমস্তে, বড় করে হাসছেন। দুজন শুনল, তিনি বলেছেন,  আপনারা যদি আমাকে ভোট দেন, তাহলে সবাইকে বিনে পয়সায় প্রতি মাসে ৩০ কিলো করে চাল।

মিনু বলল ‘৩০ কিলো চাল! তুমি শুনলে? এত আমার জন্য অনেক! তাহলে হররোজ আমাদের মাঠে মজুরি খাটতে হবে না’।

জয়াম্মা হেসে বলল, হ্যাঁ, তখন আমরা বসে থাকব আর সারা দিন গুলতাম্মি মারব।

গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ তখনো চলছে। হঠাৎ হইচই পড়ে গেল। কেউ একজন শাড়ির ট্রাক খুলেছে এবং শাড়ি বিতরণ করতে শুরু করেছে। অমনি সব নারী সভা থেকে ট্রাকের দিকে ছুটল। পনের মিনিট ধাক্কাধাক্কি, পদদলন এসব উতরে দুই বান্ধবী দুটো সুন্দর শাড়ি নিয়ে বেরোতে সক্ষম হলো।

জয়াম্মা  শাড়ি পাওয়ার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলল, এই দেখ এগুলো সিল্ক শাড়ি, তুই লালটা নে, আমি নীলটা নেব।

তারা শাড়ি অদল-বদল করে, শাড়ি দেয়ার জন্য দাতাকে আশীর্বাদ করে এবং তারা সিদ্ধান্ত নেয় মাচি রেড্ডিকেই ভোট দেবে।

তখন জনতার ভেতর কেউ একজন বলে, মাচি রেড্ডি জিন্দাবাদ, অন্যরাও জিন্দাবাদ ধ্বনি দেয়, জয়াম্মা ও মিনু আন্তরিকভাবেই জিন্দাবাদে শামিল হয়।

নতুন শাড়ি আর মচমচে নোট হাতে তারা ঘরের দিকে রওনা হয়। মাচি রেড্ডির ভাষণ শেষ হয়, নাম ধরে ধরে তিনি সব গ্রামের মুরব্বিদের ধন্যবাদ দেন; স্বেচ্ছাসেবক এবং দর্শক ও শ্রোতাদের ধন্যবাদ দেন। তারপর তিনি হেলিকপ্টারে চড়েন এবং বিদায় নেন।

মাচি রেড্ডি এলাকার কুখ্যাত গুণ্ডা অঙ্কির একমাত্র পুত্র, আর লক্ষ কোটি রিয়েল এস্টেট ব্যবসার একমাত্র উত্তরাধিকারী। তার অনেক শিল্প-কারখানাও রয়েছে, হঠাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন টাকার সঙ্গে তার খ্যাতিও চাই।

সেজন্যই তার এ ইলেকশনে দাঁড়ানো। তিনি যখন তার নির্বাচন প্রচারকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানলেন, রামপুর আসার রাস্তাটিতে রীতিমতো খানাখন্দ, আঠালো কাদায় চাকা আটকে যায়, গাড়ি চালিয়ে এ নরকযাত্রা এড়াতে তিনি লোকজন পাঠিয়ে একটি অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণ করিয়ে নিলেন, তারপর হেলিকপ্টার ভাড়া করে গ্রামবাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন।

গ্রামের নারীদের জন্য সিল্কের শাড়ি বোঝাই ট্রাক আগেই পাঠিয়ে দেন। এটা তো ঠিক ভোটের বদলে তাকে কিছু একটা দিতে হবে।

 * * * *

সেদিনই বিকালে ৪টার দিকে মিনু শুনল কেউ একজন দরজায় টোকা দিচ্ছেন। দরজা খুলেই সে হতবাক হয়ে গেল। সুন্দর, শান্ত, সম্ভ্রান্ত বয়স্ক এক নারী তার দরজায় দাঁড়িয়ে। কপালে বড় টিপ আর উজ্জ্বল সাদা শাড়িতে তাকে দেবী লক্ষ্মীর মতো দেখাচ্ছিল।

করজোড় করে তিনি মিনুকে বললেন, ‘আম্মা, আমি জয়প্রজা পার্টির সুন্দরী। তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো আমি একজন নারী। তুমিও একজন নারী। একজন নারীই কেবল অন্য একজন নারীর সমস্যা বুঝতে পারে। তুমি আর বন্ধুরা নিশ্চয়ই আমাকে ভোট দেবে।’

একথা বলেই সুন্দরী দেবী ছটুকে কোলে তুলে নিলেন, নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে তার সর্দিঝরা নাক মুছলেন, কিছুক্ষণ কোলে নিয়ে রাখলেন।

মিনু খুবই মুগ্ধ, ‘এত ভালো মেয়ে মানুষ তার এত স্নেহ!’ সুন্দরী ছটুকে নামালেন, তার প্রচারণার সহযোগী স্বেচ্ছাসেবকের থেকে একটা কিছু নিয়ে মিনুর হাতে দিলেন এবং বললেন ‘ভোটটা কিন্তু আমাকেই  দেবে।’

লাল ক্রেপ কাগজে পেঁচানো বাক্সটা খুলে মিনু বিস্মিত। অবাক হয়ে দেখল খাঁটি রুপার এই বাক্সে কুমকুমে ভরা। তার মুখে রা সরছিল না। তার সারাটা জীবনেও তৈরি কিছুই সে পায়নি। মাত্র একটা ভোটের জন্য এ মহীয়ষী নারী তাকে এটা দিচ্ছেন!

মিনু বরল, ‘আমি কথা দিচ্ছি, আম্মা আপনাকেই ভোট দেব। আপনি আমার মায়েরই মতোন।’ মিনু নত হয়ে তার পা ছুঁয়ে সালাম করল।

তারপর সুন্দরী দেবীর এ বিনয়ী দলটি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাশের বাড়িতে চলে গেল।

মিনু দৌড়ে জায়াম্মার বাড়ি গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই রুপার বাক্স পেয়েছিস তো?’

‘হ্যাঁ, পেয়েছি, শোন আমরা সুন্দরী আম্মাকেই ভোট দেব। তারপর বুকভরা ভালোবাসা।’

দুই বান্ধবীই কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে উঠল।

সুন্দরী এবং জয়প্রজা পার্টির লোকজন গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। সুন্দরীর স্বামী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক’দিন আগে নিহত হয়েছেন, অবশ্য ব্যাপারটা দেখতে দুর্ঘটনাই মনে হয়েছে। নদীর পাড়ঘেঁষা জায়গাটা সুন্দরী দেবী চান, নেবেনও, সেই সঙ্গে সমাজের একটু সেবা করার সুযোগও তো দরকার! আসলে তাকে রাজনীতিতে নামতে হয়েছে তার ভবঘুরে ছেলে ও মেয়ের জন্য পথটা করে দিতে। মা হিসেবে তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দরীরই তো ভাবার কথা।

রামপুর যেতে তিনিও জিপ কিংবা কার নেননি। তার পিঠে ব্যথা আছে। তার নির্বাচন শিবিরের সবাই বলেছে, গাড়িতে এমন ভ্রমণের ঝক্কি তিনি সইতে পারবেন না। হেলিকপ্টারে ওঠার আগে তিনি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবানে হাত ধুয়ে ভালো করে মুছে নিলেন। এই সব পিচ্চি ছোকরারা কে যে কী রোগ বহন করছে, ইশ্বরই জানেন।

* * *

প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে, মিনুর রাতের খাবার রান্না হয়েছে। তার চোখে পড়ল সাদা কাপড় পরা আরেকটি দল তার আঙিনার দিকে এগিয়ে আসছে।

মিনু ভাবে— আজকের দিনটা তার জন্য দারুণ সৌভাগ্যের। ‘এরা আমাকে কী দেবে?’

প্রথম পেলাম শাড়ি আর টাকা, তারপর রুপার বাক্স— এমন কি? এবার নিশ্চয়ই সোনাদানার কিছু একটা!

মুখভরা হাসি নিয়ে মিনু তাদের স্বাগত জানায়।

‘আম্মা আমি শ্রীধর। আমি এসেছি আজাদী পার্টি থেকে, আমরা আপনার ভোট চাইতে এসেছি। তার আগে আমরা একটু পানি খেতে পারি?’

সবারই শ্বাস প্রায় ওষ্ঠাগত।

‘অবশ্যই’। সে এক জক ঠাণ্ডা পানি এবং কয়েকটি স্টিলের গ্লাস নিয়ে এল।

পানির জন্য ধন্যবাদ দিয়ে কথা বলতে শুরু করল।

‘আম্মা আমাদেরটা নতুন রাজনৈতিক দল। আমাদের তেমন পয়সাকড়ি নেই। তবে যদি আপনারা ভোট দেন, আর আমাদের দল ক্ষমতায় যায়, আমরা আপনাদের গ্রামের মঙ্গল করব।’ শ্রীধর বলেই চলেছেন। মিনু অধের্য হয়ে উঠছে। সে ভাবছে, ‘তা বেশ, আজ আমার জন্য কী নিয়ে এসেছ, অন্তত কিছু টাকা। এগুলোকে দেখতেই ভিক্ষুকের মতো লাগছে। আমি এ ভিখারিদের ভোট দেব না।

শ্রীধর তার সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা শেষ করে শেষে বলল, ‘আম্মা আপনাদের গ্রামবাসীর জন্য একটা স্কুল, আর একটা হাসপাতাল তৈরি করে দেব। আমরা জিতলে রাস্তাঘাটের অবস্থাও ভালো হবে। এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা। আমি দেখেছি রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, সামনে বর্ষা আসছে, রাস্তাটা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। আগামী মৌসুখে যাতে এটা পাকা করা যায়, আমরা সে চেষ্টা করব।

শ্রীধর ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন, তার স্বপ্ন নতুন ভারতের। এখনো সে বিশ্বাস করে ভারত এক দিন উন্নত দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার মর্যাদা পাবে। জনতার শক্তিতে তার অগাধ বিশ্বাস। কাজেই সে তার সামান্য জমিজমা যা ছিল, বিক্রি করে নিবেদিত প্রগতিশীল চেতনার সমমনা তরুণদের নিয়ে দল গঠন করেছে, নির্বাচনের প্রচারণা চালাচ্ছে। গাড়ি ভাড়া নিয়ে তারা রামপুর পর্যন্ত আসবে, সে পয়সাও নেই। কাজেই তারা হেঁটে রামপুর এসেছে। গ্রামের কী দরকার, তারা তা সরাসরি দেখে গেছে। রামপুরের নির্বাচন প্রচার শেষ করে তারা হেঁটেই শহরে ফিরে যায়।

*    *    *

মিনু তার ছাপড়ার বাইরে কটির জন্য অপেক্ষা করছে। মিনু সারা জীবনই দরিদ্র। শ্রমিক বাবার ঘরে জন্ম, স্বামীও শ্রমিক। স্বাচ্ছন্দ্য সে জীবনে কখনই দেখেনি। অন্য কারো জমিতে সে ও তার স্বামী কাজ করে। কোনো কোনো দিন কাজ একেবারেই পাওয়া যায় না, তখন অনাহারেই থাকতে হবে। অথচ আজো ওরা বাচ্চাদের খাবার দিয়েছে। আজকের দিনটার মতো এমন একটা দিন কল্পনাও করতে পারি না। অপ্রত্যাশিতভাবে এত কিছু পেয়ে সে আনন্দিত ও উত্তেজিত। ‘আগে কটি আসুক। আমি দেখতে চাই এতকিছু উপহার যখন, তাকে দেখাব কতটা খুশি হয়।’

কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে। মিনু উদ্বিগ্ন।

জমির কীটপতঙ্গ মারার ওষুধ আনতে কটি শহরে গেছে। আটটার মধ্যে তার আসার কথা, এখন রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে। এখনো আসার কোনো লক্ষণ নেই।

তখনই জায়াম্মার স্বামী বালা এসে খবরটা দিল। ট্রাকে চড়ে কটি ও গ্রামের অন্যরা শহর থেকে আসার পথে বড় পাথরে ধাক্কা লেগে ট্রাক উল্টে নিচে খাদে পড়ে যায়। বালা বলল, যখন তারা শহরে ছিল, সব বড় বড় রাজনৈতিক দল তাদের অঢেল মদ খেতে দিয়েছে এবং বিরিয়ানির প্যাকেট সরবরাহ করেছে। অবশ্য নির্বাচনের সময় বলেই দিয়েছে। ট্রাকের ড্রাইভারও আশ মিটিয়ে মদ খেয়ে অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ট্রাকটা সোজা একটা বড় পাথরের ওপর তুলে দিয়েছে। শহর থেকে আরেকটা ট্রাক্সি আনিয়ে আহতদের শহরের হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে।

মিনু বুক চাপড়ে বিলাপ করতে থাকে, ‘ভগবান হনুমান, ভগবান গনেশ আমার স্বামীকে রক্ষা করো। জয়াম্মা ও অন্য প্রতিবেশীরা এসে তাকে সান্ত্বনা দেয়। বালা তাকে সাইকেলে বসিয়ে সেই উঁচু-নিচু, কর্দমাক্ত বিপজ্জনক রাস্তা দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসে।

ডাক্তার মিনুকে শান্ত করেন এবং আশ্বাস দেন যে, কটি মরবে না। এখন সে বিপদমুক্ত, যদি হাসপাতালে আনতে আর পাঁচ মিনিট দেরি হতো, এত রক্তপাত হয়েছে যে, মরেই যেত।

মিনুর ভাগ্যটা ভালো, কটি বেঁচে গেছে। হাসপাতালে স্বামীর পাশে বসে সে তার চেনা সব ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সে ও তার স্বামী কাকে ভোট দেবে, সে সিদ্ধান্ত নেয়, জয়াম্মা ও তার বন্ধুদেরও রাজি করাবে।