সীমান্তের ওইদিকে আমার জন্মভূমি, এইদিকে আমার স্বদেশ। ভেবেছিলুম কত অসংখ্য মানুষ তো তাদের জন্মভূমিকে একটু একটু করে ভুলে যায়, আমিও ভুলতে পারব। কিন্তু তা আর হলো কই! স্বদেশকে আমি ষোলোআনা আনুগত্য ও ভালোবাসা দিয়েছি, তার গৌরবকে আমারই আনন্দ এবং গ্লানিকে আমারই যন্ত্রণা বলে চিনেছি; তবু স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই, পুব বাংলার কথা আজও নিয়ত আমার মনে পড়ে, আমার রক্ত থেকে তার স্মৃতিকে এই এতগুলো বছরেও আমি মুছে ফেলতে পারিনি। পুব বাংলাকে আমি ভুলে যেতে, ভুলে থাকতে চেয়েছিলুম। কিন্তু ভোলা গেল না। তার শ্যামল মুখশ্রী আমার চেতনায় আজও স্পষ্ট হয়ে জ্বলছে। আজও রাত ১২টায় যখন আলো নিভিয়ে শুতে যাই তখন ফরিদপুর জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম তার সূর্যোদয়ের নম্র আলো ও সূর্যাস্তের কোমল অন্ধকার নিয়ে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দৃশ্যের এক দীর্ঘ মিছিল, যেন-বা চলচ্ছবির মতো আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। আমি দেখতে পাই সেই দোতলা কাঠের বাড়িটিকে, যার উত্তরে জনবসতি, পুবে ও পশ্চিমে পুকুর, দক্ষিণে ধু-ধু ধানক্ষেত। দেখতে পাই ভেতরের উঠোনের এক পাশে কার্তিক পুজোর দিনটিকে এগিয়ে আনবার জন্য ঠাকুমার দেয়া ‘হালা’র ভেতর থেকে চক্রাকারে ধানের চারা মাথা তুলছে। দেখতে পাই বাইরের উঠোনে তেহারদ্দি তার আলু-বেগুন-বরবটির ঝাঁকা নামিয়ে রাখল। দেখতে পাই উনুন থেকে ফেনাভাত নামিয়ে বড় কাকিমা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দেখতে পাই পুকুরে জাল পড়েছে, চিনিটোরা আমগাছের বেয়াড়া ডালটা ঢেউ তোলা টিনের চালে গা ঘষছে, কামলারা বসে ছ্যাচা বাঁশের বেড়া বাঁধছে, টিউবওয়েল থেকে জল নিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমপাড়ার মেয়ে-বউরা। পাঁচ-ছয় বছর বয়সের সেই ম্যালেরিয়ায় ভোগা রোগা শিশুটিকেও আমি দেখতে পাই, রাত ফুরোনোর আগেই যার ঘুম ভেঙেছিল; শেষ রাত্তিরের অন্ধকারে যে ঠাকুমার পাশে শুয়ে শুনেছিল— ‘যখন কৃষ্ণ জন্ম নিল দৈবকীর উদরে/ স্বর্গ হতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করে।’ এই মাত্র সে পুকুর থেকে মুখ ধুয়ে ফিরল; একখানা প্রমাণ-ধুতিকে চার ভাঁজ করে গলার পেছনে গিঁট লাগানো, হাতে খেজুররসের মস্ত গেলাস, ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে সে এখন খড়ের গাদার সিংহাসনের দিকে চলেছে। ওই সিংহাসনের উপরে বসে খেজুররসে চুমুক দিতে দিতে সে রোদ পোহাবে। শীতের সকাল। শিশির এখনো শুকিয়ে যায়নি। টিনের চাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় হিম ঝরছে উঠোনের উপরে। মাঠ থেকে হালকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা উঠছে। এই সবই আমি দেখতে পাই। ৪০ বছর দূর থেকে দেখা। তবু অতি দীর্ঘ এ দূরত্ব সত্ত্বেও, এমনকি সেই শিশুটিকেও আমি চিনতে পারি। কিছুই আমি ভুলিনি। কিছুই না। গোবিন্দপুর স্টেশন থেকে যে পথটা হঠাৎ ঢালু হয়ে খালের দিকে নেমে গিয়েছিল, সেই পথটা আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। খাল থেকে নৌকো কেরায়া করলুম, কাকার সঙ্গে গঞ্জ থেকে চিঁড়ে, মুড়ি, রসগোল্লা কিনে আনলুম, চলন্ত নৌকোর পাটাতনে উনুন সাজিয়ে মা খুব চটপট ভাত আর রায়েক মাছের ঝোল রাঁধলেন, মাঝিরা দাঁড় টানছে, দুদিকের জল মোচড় খেয়ে পেছনে চলে যাচ্ছে, ভ্যাসাল থেকে ছোঁ মেরে একটা মাছ তুলে নেবে— এ আশায় মাথার উপরে চক্রাকারে ঘুরছে একটা বাদামি রঙের চিল, খাল ছাড়িয়ে তিন মাল্লাই নৌকো গিয়ে ধানক্ষেতের দারার মধ্যে ঢুকল, অল্প জল, এখানে দাঁড় চলবে না, পেছনে উঁচু গলুইয়ে হাল ধরে বসে আছে বুড়ো মাঝি, সামনে দাঁড়িয়ে দুই জোয়ানে লগি ঠেলছে, ছইয়ের ফুটো দিয়ে হাত বাড়িয়ে জল ছুঁতে গিয়েছিলুম, ধানের ধারালো পাতায় আমার আঙুল ছড়ে গেল, কুমার নদে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধে, খাল-বিলের সীমানা ছাড়িয়ে নদীতে পড়বামাত্র স্রোতের টানে নৌকো হঠাৎ ঘুরে যায়, নৌকোর পেটে ঢেউয়ের ধাক্কা লেগে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ওঠে, সেই শব্দটাই-বা এখনো আমি ভুলতে পারলুম কই? মাঝি কখন ছইয়ের সামনে ঝোলানো লণ্ঠনটা জ্বেলে দিয়েছিল, জানি না; আকাশ আর নদী কখন কালো হয়ে গিয়েছিল, জানি না; নৌকোর দুলুনিতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, মাঝরাত্তিরে দিদি হঠাৎ ঠ্যালা মেরে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। ‘ওঠ খোকা, আমরা বাড়ি পৌঁছে গেছি।’ কলকাতায় আমাদের বাসা ছিল, পুব বাংলায় আমাদের বাড়ি। সেই বাড়ির কথা যখন মনে পড়ে তখন খাল-বিল, নদী-নালা, শর্ষেক্ষেত, হলুদ ফুল, বাঁশের সাঁকো, কাঠের ‘থল’, গঞ্জ, খামার, ধানের ‘মলন’, জলে ডোবানো পাটের গন্ধ, হাটের পাশে ডিঙির সারি, হিজলের ছায়া, বাঁশবনের মটমট শব্দ, ভোরের আলো আর সন্ধ্যার ম্লানতা আমাকে নিমেষে অধিকার করে নেয়। স্মৃতি বড় বেদনাবহ। কিন্তু আমাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই, ‘কে হায় হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।’ আমি বাসি। কেননা আমি জেনে গেছি যে, স্মৃতিচারণের এ বেদনাও বড় আনন্দময়। আজ তাকে নানা কারণে ভালোবাসি; কিন্তু প্রথম যৌবনে যে জীবনানন্দকে ভালোবেসেছিলুম, তার একটা মস্ত কারণ নিশ্চয় এই যে, পুব বাংলার এই শান্ত, শ্যামল হয়তোবা ঈষৎ করুণ মুখশ্রী তার ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র নানা কবিতায় বড় সুন্দর ফুটেছে। মনে পড়ে ‘মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে। আমার মুখের দিকে, ডাইনে আর বাঁয়ে/ পোড়ো জমি খড়-নাড়া-মাঠের ফাটল,/ শিশিরের জল’ কিংবা ‘অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে/ হিম হয়ে আসে/ বাঁশপাতা— মরা ঘাস— আকাশের তারা’ কিংবা ‘অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল/ জোনাকিতে ভরে গেছে; যে-মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে/ চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ...’ ইত্যাদি লাইন পড়তে পড়তে চোখ জ্বালা করত, বুকের মধ্যে ধক করে উঠত, গলার মধ্যে কিছু একটা আটকে যেত। মনে হতো যেন মন্ত্রবলে তিনি আমাকে সেই হারানো জগতের মধ্যে টেনে নিয়েছেন। এই চাঁদ, এই খড়-নাড়া মাঠের ফাটল, এই হিম হয়ে আসা বাঁশপাতা আর মরা ঘাস, এগুলোর কিছুই তো আমার অচেনা নয়, এসবই তো আমার জন্মভূমির, আমার পুরনো পরিচিত পৃথিবীর অনিবার্য অনুষঙ্গ, কিন্তু ঠিক এমন করে যে এদের ছবিকে কেউ ফোটাতে পারেন, তা আমি কখনো ভাবিনি।

ছবি, ছবি আর ছবি। আজ আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, আমরা যারা আর কখনো পুব বাংলায় ফিরে যাব না, এ ছবিগুলোই এখন তাদের একমাত্র সম্বল। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এখন যারা পুব বাংলার প্রতিষ্ঠিত কবি, তাদের রচনার দিকেও মূলত এই একই প্রত্যাশায়— ছবির প্রত্যাশায়— প্রথম আমি চোখ ফিরিয়েছিলুম।

প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়নি। আল মাহমুদের কবিতায় ‘কিছুই থাকে না কেন? করোগেট ছন্ কিংবা মাটির দেওয়াল/ গাঁয়ের অক্ষয় বট উপড়ে যায় চাটগাঁর দারুণ তুফানে...’ কিংবা ‘কুয়াশায় ঢাকা পথ, ভোরের আজান আর নাড়ার দহন/ পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ,/ মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল আর/ বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর’ ইত্যাদি লাইন যখন পড়েছি কিংবা শামসুর রাহমানকে যখন বলতে শুনেছি, ‘কাঁঠাল গাছের ডালে হলদে পাখি লেজটি নাচায়/ ঘন ঘন, বেলা বাড়ে.../ অনেক পেছনে রইল পড়ে/ লাউয়ের সবুজ মাচা, নদী, মাঠ,/ কলাইয়ের খেত আর পুকুরের ঘাট’ কিংবা হাসান হাফিজুর রহমান যখন গাঢ় কণ্ঠে জানিয়েছেন, ‘যাবে নদী দূরে দূরে সমন্বিত/ ভাঙা মাস্তুলের নৌকা ঠোঁটে নিয়ে’ কিংবা সৈয়দ আলি আহসান যখন প্রায় প্রার্থনার মতো অথবা— বলতে পারি— শ্রদ্ধাবিনম্র প্রণয় সম্ভাষণের মতো উচ্চারণ করেছেন, ‘আমার পৃথিবীর বৃষ্টি— মাটির/ গন্ধ, ধানখেত ভেসে যাওয়া/ আমগাছের ডাল ভেঙে পড়া/ হঠাৎ গরুর ডাক, ভিজে যাওয়া/ পাখির ডানা ঝাপটানো/ আবার পুকুরে নদীতে/ ডোবায় লাবণ্যের সাড়া/ আমার পুব বাংলার অনেক রাত্রে/ গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দের মতো’, তখন সন্দেহ নেই, মূলত এ কারণেই আমি অভিভূত হয়েছিলুম যে, শব্দ দিয়ে রচিত চিত্রাবলির এক আশ্চর্য অ্যালবাম এসব কবিতার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। সেই চিত্র পুব বাংলার চিত্র। আমার জন্মভূমির মুখচ্ছবি। পুব বাংলার কবিদের কবিতা পড়তে পড়তে মূলত এ কারণেই তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলুম যে, যে জন্মভূমিকে আমি ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি এবং যার কোলে আর কখনো আমার স্থায়ীভাবে ফিরে যাওয়া হবে না, আর কিছু না হোক, অন্তত তার শ্যামল মুখশ্রীকে এসব কবিতার মধ্যে বারবার আমি দেখতে পাব।

আমি জানি যে, শুধুই নদীনালা-গাছপালা-ক্ষেতখামার কি জ্যোত্স্না-রৌদ্র-মেঘ-কুয়াশার বর্ণনা দিয়ে একটা ভূখণ্ডের সার্বিক চিত্র তৈরি করা যায় না; উপরন্তু সেই ছবির মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটাও খুব জরুরি। জানি যে, চিত্রটাকে সপ্রাণ ও— অন্তত আধুনিক মানুষের কাছে— গ্রাহ্য করে তোলার জন্য মানুষের মুখশ্রীকেও তার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা চাই; ঈশ্বরের সৃষ্টির পাশাপাশি স্থাপন করা চাই মানবসমাজের আপন হাতের সৃষ্টিকে। পুব বাংলার তরুণ কবিরা এই দ্বিতীয় দায়িত্বের প্রতিও যে প্রথম থেকেই নজর রেখেছেন, তাদের কবিতাই তার প্রমাণ। হরেক রকমের মানুষের মুখ তারা তাদের লেখার মধ্যে এঁকে যাচ্ছেন; শহরের মাস্টার-কেরানি-ছাত্র-মজুরের মুখের পাশাপাশি ছোটখাটো গঞ্জ আর গ্রামাঞ্চলের জেলে, মাঝি, বেপারি, পাইকার, চাষী-গেরস্তের মুখও সেখানে এতই অবিরল ফুটছে যে, মানুষ সম্পর্কে তাদের মৌলিক আগ্রহের একটা সন্দেহাতীত সাক্ষ্য তার মধ্যে পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, একই কবি সব রকমের মানুষের কিংবা সব রকমের মানবিক পরিশ্রমের ছবি আঁকছেন না, সেটা সম্ভবও নয়, কিন্তু তাদের সামগ্রিক রচনাকর্মের ভেতর থেকে যে এ সবকিছুর একটা সার্বিক চিত্রই প্রবলভাবে ফুটে উঠছে, এটাই সুখের কথা।

উপরন্তু লক্ষণীয়, এই নবীন ও তেজি কবিসমাজের আপনাপন বিশ্বাসের ছবিও তাদের লেখার মধ্যেই ফুটছে। কী তাদের প্রতিজ্ঞা ও কিসে তাদের প্রত্যয়, তা জানার জন্য আলাদা করে কোনো ফতোয়া কিংবা ইশতেহার তাদের লিখতে হয়নি। তাদের কবিতা পড়েই আমরা জানতে পারছি যে, একদিকে যেমন পুব বাংলার ভৌগোলিক প্রকৃতি, তার জল হাওয়া আলো ও মাটির নিজস্ব চরিত্রকে তারা নিবিড়ভাবে ভালোবাসেন, অন্যদিকে তেমনি বুদ্ধিজীবী মানুষ হিসেবেও তাদের কর্তব্য সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ সচেতন। নিছক প্রকৃতি বর্ণনা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের উচ্চারণ কি কোনো সৎ কবিকে একালে আর তৃপ্তি দিতে পারছে? তিনি জেনে গেছেন যে, তার সমকালীন জনসমাজের আশা ও আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ ও যন্ত্রণাকে একটা বাঙ্ময় রূপ না দেয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই। তিনি বুঝে গেছেন, যা তার একান্ত নিজস্ব, সেই অনুভূতিগুলোর কথা লিখবেন ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে আপন সময় ও আপন সমাজের একটা ব্যাখ্যাও তাকে দিয়ে যেতে হবে— তার কবিতার মধ্যে। পুব বাংলার কবিদের লেখা পড়ে নিঃসংশয় হওয়া যায় যে, কবির এ বিশেষ দায়িত্বকে তারা কেউই অস্বীকার করছেন না। আজকের পুব বাংলায় তরুণ বয়সী এমন একজন কবিরও সম্ভবত সাক্ষাৎ মিলবে না, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে যিনি নীরব; এমন কবিরও না, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ঝরিয়ে অন্তত কয়েক লাইন যিনি লেখেননি। লক্ষ্য যখন স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, অত্যন্ত সংযত-বাক কবির কণ্ঠও তখন আবেগে কাঁপতে থাকে; উদ্দেশ্য যখন অত্যাচারীর সমালোচনা, অত্যন্ত নম্র স্বভাবের কবির কণ্ঠও তখন বিদ্রূপে বেঁকে যায়। জন-আন্দোলনের ওষ্ঠে অব্যর্থ শব্দ যোজনা করে শহিদ কাদরি তখন বলেন, ‘সব কিছু আজ চিত্কার করে চাইতে হয়— স্বাস্থ্য, স্বস্তি এবং আয়ু।’ রাজপথে রক্ত ঝরতে দেখে হুমায়ুন আজাদ তখন বলেন, ‘প্রতিটি পথিক কিছু রক্ত রেখে যায় ব্লাড ব্যাংকে বাংলার মাটিতে।’ অত্যাচারীর মত্ত অবাধ হত্যালীলা দেখে এনামুল হক তখন বলেন, ‘আবার হত্যার ঢেউ বুড়িগঙ্গা-বন্দরে উঠেছে’ এবং জনতার অনিবার্য জয়যাত্রা প্রত্যক্ষ করে পলায়মান দুঃশাসকদের প্রতি ঘৃণা ঝরিয়ে গোলাম সারওয়ার তখন বলেন, ‘...ফুসমন্তর ফুসমন্তর ঝড় উঠেছে ওই, কোথায় জাঁহাপনা তাহার খয়ের খাঁরা কই?’

আগেই আমি বলেছি যে, কিছু ছবিই ছিল আমার প্রাথমিক ও প্রধান প্রত্যাশা। আমি আমার জন্ম-মৃত্তিকার মুখচ্ছবিকে আবার নতুন করে দেখতে চেয়েছিলুম এবং তারই জন্য হাত বাড়িয়েছিলুম পুব বাংলার এ কবিসমাজের দিকে। কিন্তু এখন দেখছি নিতান্ত কিছু ছবিই আমার হাতে তারা তুলে দেননি, তাদের বিশ্বাস ও আদর্শের একটি নির্ভরযোগ্য পরিচয়পত্রও ওই কবিতাবলির মাধ্যমে তারা আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের কবিকর্মই প্রমাণ দিচ্ছে যে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ও মানবধর্মে আস্থাশীল। হিন্দু মানুষ, মুসলিম মানুষ ইত্যাদি সংকীর্ণ পরিচয়ে কোনো আস্থাই তারা রাখেন না। মানবপরিচয়কেই তারা তাবৎ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় বলে জেনেছেন।

অন্যদিকে বাঙালি হিসেবেও তাদের গৌরববোধের অন্ত নেই। প্রশ্ন উঠবে, বিশুদ্ধ বাঙালিয়ানার এ গৌরব কি মানবিকতার বৃহত্তর আদর্শের বিরোধী? না, তা নয়। একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। আয়ুব খাঁর সফরের বিবরণ পাঠানোর জন্য ১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে দেশী-বিদেশী আরো অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে পুব বাংলার জেলায় জেলায় কয়েকটা দিন আমাকে খুব ঘুরতে হয়েছিল। আয়ুব যেদিন পদ্মায় তার স্টিমারে আমাদের সঙ্গে মিলিত হন, সেদিন ছিল ২৬ জানুয়ারি। ঠিক করলাম, আমরা ভারতীয়রা আমাদের আনুষ্ঠানিক ভারতীয় পোশাক পরে নিমন্ত্রণ রক্ষা করব। সেই অনুযায়ী পাতলুনের উপরে গলাবন্ধ কোট পরে নিচ্ছি, এমন সময়ে ঢাকার এক তরুণ কবি-সাংবাদিক সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ব্যাপার কী দাদা? পোশাক পাল্টাচ্ছেন কেন?’

বললুম, ‘বা! আজ যে আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবস। তোমাদের প্রেসিডেন্টের পার্টিতে তো আজ পুরোদস্তুর ভারতীয় পোশাকেই আমাদের যাওয়া উচিত।’

তরুণ কবিবন্ধু এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে, বিষণ্ন গলায় বললেন, ‘দাদা, আপনি ভাগ্যবান, নিজেকে আপনি ভারতীয় বলে ভাবতে পারেন। আমরা কিন্তু নিজেদের আর পাকিস্তানি বলে ভাবতে পারি না। আমরা বাঙালি।’

জিজ্ঞেস করেছিলুম, নিজেকে পাকিস্তানি ভাবতে তার অসুবিধে হয় কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, হয়, তার কারণ কোনো রকমের গোঁড়ামিতে তাদের বিশ্বাস নেই এবং পাকিস্তান ভাবনার ভিত্তি যে একটা প্রচণ্ড গোঁড়ামি, তা তারা জেনে গেছেন। সেই গোঁড়ামিকে যদি একবার মেনে নেন, তাহলে উদার মানবিকতার ক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছুনো তাদের পক্ষে শক্ত হবে।

আমার পরবর্তী প্রশ্ন: ‘কিন্তু বাঙালি পরিচয়টাও তো মানব পরিচয়ের চেয়ে অনেক ছোট। এ ছোট পরিচয় কি বড় পরিচয়কে আড়াল করে দেবে না?’

জ্বলজ্বলে গলায় তিনি উত্তর দিলেন, ‘না। হোক ছোট, তবু এ পরিচয়ের মধ্যে কোনো গোঁড়ামি নেই। আর তাই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের এ পরিচয় কাউকে দূরে ঠেলে না, কাউকে পর বলে ভাবতে শেখায় না। দেখবেন, আপনারা যেমন ষোলোআনা বাঙালি থেকেও ষোলোআনা ভারতীয় হতে পেরেছেন, আমরাও তেমনি ষোলোআনা বাঙালি থেকেও ষোলোআনা মানুষ হতে পারব।’

তিনি ঠিকই বলেছিলেন। বাংলাদেশের সব কবির সব রচনা আমি পড়িনি। কিন্তু যে কয়জনের যা কিছু পড়েছি, তাতে বলতে পারি যে, ষোলোআনা মনুষ্যত্বের পরিচয়ই তাদের সেই লেখার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ফুটেছে।

[নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর গদ্য সমগ্র থেকে সংকলিত]