আজ থেকে শতবছর আগে জাহাজের বিভিন্ন পদ নিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষদের নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের ইতিহাসের পাতায় ঢুঁ দিতে হবে বৈকি! এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৮৯০ থেকে ১৯২০ সময়ের মধ্যে হুগলি বন্দর দিয়ে জাহাজের খালাসির পদ বাগিয়ে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পূর্ব বাংলার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার উদ্দেশে এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বন্দরে জাহাজ নোঙর করার আগেই গভীর রাতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উপকূলে উঠে গা ঢাকা দিয়ে সেখানকার স্থায়ী অভিবাসী হওয়া ছিল শিপ জাম্পারদের স্বপ্ন। কাজটা যত সহজে বলা গেল, সত্যিকার অর্থে তা ছিল অনেক কঠিন। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে জাহাজ থেকে গা ঢাকা দেয়া এত সহজ ছিল না। তার পরও জীবনের প্রয়োজন বলে কথা! মনে রাখতে হবে, সেই সময় ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। কেউ কেউ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে জেলেও গিয়েছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে অনেক আসামি জাহাজের খালাসি হয়ে আমিরকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তত্কালীন সময়ে ‘এলিয়েন কনট্রাক্ট’-এর বিধিনিষেধের কারণে ভিনদেশী জাহাজের কর্মচারীরা আমেরিকার মাটিতে বৈধভাবে প্রবেশ করতে পারতেন না। এ আইনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তারা স্থায়ীভাবে এবং বৈধভাবে কাজও করতে পারতেন না। যে কারণে বেশির ভাগ জাহাজের খালাসিদের জাহাজ থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া অর্থাৎ জাহাজ থেকে সবার চোখে ধুলা দিয়ে পালানো ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা থাকত না। রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে তারা আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তেন। তারপর কোনো রকমে ডিশ ওয়াশার, লন্ড্রি ওয়ার্কার, লিফটম্যান, মেশিন ওয়ার্কার, হট ডগ বিক্রেতা, ফেরিওয়ালাসহ বিভিন্ন রকম কাজকর্মে তারা যুক্ত হতেন। একসময় নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে প্রচুর পরিমাণ বাঙালি হকারের দেখা মিলত। তারা মূলত ভারত থেকে নিয়ে আসা হাতের কাজ করা শাল, ওড়না, টেবিল ক্লথ, বিছানার চাদরসহ বিভিন্ন রকম শৌখিন জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। তবে পেশা যা-ই হোক, মার্কিন মুল্লুকে শুরু হতো তাদের নতুন এক জীবন। তখন সবার চোখ থাকত অর্থ উপার্জনের দিকে। ভাববেন না যে এ শিপ জাম্পাররা সবাই খুব অশিক্ষিত ছিলেন। মোটেও তা নয়। তাদের কেউ কেউ বেশ শিক্ষিত ছিলেন। বিশুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন।
১৮৯১ সালের ১৯ জুলাই প্রকাশিত ‘শিকাগো ট্রিবিওন’-এর একটি প্রতিবেদনে চোখ রাখলে দেখা যায়: প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘Hindoos in America’।
এই বসন্তে নিউজার্সির উপকূলে আসা কালো বর্ণের ভারতীয় হিন্দু জাহাজিদের আচার-আচরণ বেশ কৌতূহলদীপ্ত। তারা এখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) সবসময় নিজেরা কিছু একটা করতে বা বিক্রি করে জীবন চালাতে চেষ্টা করে । বলার অপেক্ষা রাখে না যে তারা দেখতে বেশ ছিমছাম, আধুনিক এবং চেহারাটাও বুদ্ধিদীপ্ত। সবাই হিন্দুস্তানি ভাষায় কথা বলে এবং মাঝে মধ্যে বাংলাও বলে। ইংরেজিতেও তাদের অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে...।
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাচারাইলেজশন বিভাগের নথিপত্রে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। আপনাদের কৌতূহল মেটাতে তা তুলে ধরছি—
১৫ জুন, ১৮৯৭ রাত ২টা। নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ড তখন ভয়াবহ আগুনে পুড়ছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই শহরজুড়ে আতঙ্ক! এ আগুন আবার গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়বে না তো! এরই মধ্যে সরকারি হিসাবে ৭৫ হাজার ডলারের ক্ষয়ক্ষতি গুনতে হয়েছে। তবে ভাগ্য ভালো যে আগুন লেগেছে ম্যানহাটন থেকে দূরে এলিস আইল্যান্ডে। অন্তত মাঝখানে একটা নদী আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এলিস আইল্যান্ড হলো ইমিগ্র্যান্টদের পোর্ট। পৃথিবীর তাবৎ মানুষ এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমেরিকার মাটির স্বাদ পাওয়ার জন্যে। নিউইয়র্ক সিটি দুদিনের জন্য এলিস আইল্যান্ডের ইমিগ্রেশন বিষয়ক সব রকম কাজকর্ম বন্ধ ঘোষণা করে।
ঠিক এর তিনদিন পরের ঘটনা। ‘সেন্ট লুইস’ নামের একটি জাহাজ ইংল্যান্ড থেকে এলিস আইল্যান্ডের বন্দরের জেটিতে ভিড়ল। নিউইয়র্কের আকাশে তখনো ঝকঝকে রোদ। জাহাজ থেকে একে একে অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে আরো ১২ জন যাত্রী নামলেন। তারা সবাই পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষ। পূর্ববঙ্গ থেকে হুগলি, হুগলি থেকে ইংল্যান্ড, তারপর ইংল্যান্ড হয়ে নিউইয়র্কের উপকূল এলিস আইল্যান্ড। তাদের কয়েকজনের নাম জানা গেল। মিন্টু মণ্ডল, মুসা মণ্ডল, মাকসুদ আলী, আবদুল আজিজ, বসিরউদ্দিন, ওবায়দুলল্লাহ, ফজলে রহমানসহ আরো ছয়জন। বন্দরে নেমেই তারা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাদের চেহারায় স্পষ্টতই ক্লান্তির ছাপ। ছয়দিনের এত ঝক্কিঝামেলা এ দুর্বল শরীরে সইবে কেন? তার পরও তাদের সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত আসা হলো এ স্বপ্নের শহরে! কিন্তু তার পরও চোখে-মুখে এক ধরনের আতঙ্ক! যদি ধরা পড়ে যাই। তারা স্মরণ করছেন পেছনে ফেলে আসা হুগলি, নোয়াখালী আর সিলেট নামের অস্পষ্ট কয়েকটা অঞ্চলের নাম। সেই সঙ্গে ফেলে আসা প্রিয় স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবা সবাইকে। সবাই তারা লাইন ধরে ইমিগ্রেশনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রথমেই মুখোমুখি হলেন পূর্ব বাংলার নোয়াখালী অঞ্চল থেকে আসা আবদুল আজিজ।
ভ্রূ কুঁচকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার প্রশ্ন: পেশা কী?
ঝটপট উত্তর: ব্যবসা।
কপাল কুঁচকে আবার প্রশ্ন: জাতীয়তা?
মুখস্থ উত্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া
এখানে আসার আগে কোথায় ছিলেন এবং কোথায় যাবেন?
ঝটপট উত্তর: যাব নিউজার্সি আর ছিলাম জাহাজে।
আবার ইমিগ্রেশন অফিসারের প্রশ্ন: আপনার জাহাজের টিকিট কে কিনে দিয়েছে?
আমিই কিনেছি, স্যার— মুখ নিচু করে উত্তর দিলেন আবদুল আজিজ।
হুম, বুঝলাম। কত টাকা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন?
৬ পাউন্ড।
আগে কি যুক্তরাষ্ট্রে কখনো এসেছিলেন? নাকি এটাই প্রথম?
হ্যাঁ, আগেও এসেছিলাম।
আগে কেন এসেছিলেন? আত্মীয়র সঙ্গে দেখা করতে?
না।
তবে কেন? কী ছিল সেই কারণ, জানা যাবে?
আবদুল আজিজের মুখে কোনো কথা নেই।
আপনি কি কমিউনিস্ট?
মাথা নেড়ে উত্তর দিল আজিজ।
তাহলে? আমেরিকায় কেন এসেছেন? কোনো কাজের চুক্তি নিয়ে এসেছেন? বা এখানে কাজ করতে চান?
আবদুল আজিজ আবার মাথা নাড়লেন, ‘না।’
তার পরের ঘটনা আরো করুণ। ইমিগ্রেশন অফিসারের প্রশ্নের উত্তর দিতে হোক অথবা ভয়ের কারণেই হোক, তারা সবাই একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলেন এবং ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের সবাইকে সন্দেহ করে জেলে পুরে দেয়। কারাবাস দিয়েই শুরু হলো তাদের আমেরিকার জীবন। পরে জেল থেকে বের হয়েই তারা গা ঢাকা দিলেন সবাই। তারপর কেউ মিশিগান, কেউ নিউজার্সি, কেউ নিউইয়র্কের হারলেমে ছড়িয়ে পড়লেন।
জাহাজ পলাতকদের নেটওয়ার্ক
১৮৯০ থেকে ১৯১০— এ ২০ বছর তত্কালীন পূর্ব বাংলা থেকে আমেরিকায় শিপ জাম্পারদের তত্পরতা রাতারাতিভাবে বেশ বেড়ে গিয়েছিল। এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে তত্কালীন সময়ে পূর্ব বাংলার শ্রমজীবী মানুষের চোখে, বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালীতে জাহাজের খালাসি পদ বাগিয়ে আমেরিকায় দেশান্তরী হওয়ার ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা ছিল না। সে সময়ে ঘাট সারেং পদটিকেও এ ভবিষ্যৎ জাহাজিরা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গেই দেখত। কারণ জাহাজি হতে হলে ঘাট সারেংদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা জরুরি। তাদের খুশি করতে পারলে লন্ডন বা নিউইয়র্কের কোনো জাহাজের খালাসি পদ বাগানো কঠিন কিছু ছিল না। একবার জাহাজ যদি লন্ডন অথবা নিউইয়র্কে নোঙর করে এবং জাহাজ থেকে গা ঢাকা দেয়া যায়, তাহলে জীবন ধন্য।
নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে জাহাজ ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গা ঢাকা দেয়ার যাবতীয় বুদ্ধি, শলাপরামর্শ আগে থেকেই ঠিক করা থাকত। দলবদ্ধ হয়ে তারা জাহাজ থেকে কীভাবে পালাবে এবং কোন পথে কে কোথায় যাবে, সেটিও আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকত। যদিও সব ঘটনা নাটকের স্ক্রিপ্টের মতো ঘটত না। তার পরও এ সাহসী স্বপ্নচারী জাহাজের খালাসিরা তাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে নিজেদের তৈরি করে রাখত। সাধারণত যা ঘটত, মোটামুটিভাবে তা অনেকটাই অনুমেয়। এলিস আইল্যান্ড বন্দরে নেমে এ ফেরারি জাহাজিরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আশপাশের বিভিন্ন শহর যেমন— নিউজার্সি, আটলান্টিক সিটি, আসবারি পার্ক, লং বিচ— এসব নিরাপদ স্থানে আশ্রয়স্থল খুঁজে নিত। নিউইয়র্কের হারলেম, লোয়ার ইস্ট সাইড, ব্রুকলিন এসব শহরও পলাতক জাহাজিদের খুব জনপ্রিয় জায়গায় পরিণত হয়েছিল। আরেকটা দল ছিল, যারা ভারত থেকে এলিস আইল্যান্ডে আসত বটে, কিন্তু তাদের গন্তব্য ছিল দক্ষিণে অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যের দিকে। এক্ষেত্রে তারা যেত নিউ অরলিন্স, মিশিগানসহ বিভিন্ন শহরে। বেশির ভাগ সময়েই সাউদার্ন রেলওয়ে ফাস্ট মেইল অথবা সাউথওয়েস্টার্ন ভেস্টিবুলড লিমিটেড ট্রেনে চড়ে ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন শহরে তারা তাদের বসত গড়ত। এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এ জাহাজ পলাতকদের আপাত স্বপ্ন আমেরিকায় বসত গড়া হলেও তারা তাদের নিজ দেশ থেকে যতটুকু সম্ভব বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র যেমন রেশম, মসলিন অথবা মনোহারি জিনিসপত্র, মসলাপাতি সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে আসত। উদ্দেশ্য ছিল একটাই। এসব বিক্রিবাট্টা করে যদি দুই পয়সা কামানো যায়। যে কারণে এ জাহাজিদের আরেকটা অংশ (খুব কমসংখ্যক) আমেরিকায় শীতের ঋতু আসার আগে আগেই ফিরতি জাহাজে ভারত চলে যেত। আবার বসন্ত আসার আগেই তারা বিপুল উৎসাহ ও উদ্যমে ভারতীয় মনোহারি জিনিসপত্র কিনে আমেরিকা অথবা লন্ডন পাড়ি দিত। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো তা হলো, পূর্ব বাংলা থেকে আসা এ জাহাজিদের তত্পরতা। তারা সেই হাতুড়ে যুগেও খুব সাধারণ অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে বড় আকারে একটি বাঙালি নেটওয়ার্ক তৈরি করার চেষ্টায় নিজেদের ব্যস্ত রাখত। ১৯০০-১০ সালে আমেরিকার আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী শুধু নিউ অরলিন্স শহরেই পূর্ব বাংলা থেকে আসা জাহাজ পলাতকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী ১৯০০-১০ সাল পর্যন্ত নিউ অরলিন্সে পূর্ব বাংলা থেকে আসা সে সময়ে বাঙালির সংখ্যা ছিল ৫০। এ ৫০ জন বাঙালি শহরের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে আটটি বাড়ি ভাড়া করে নিজেরা সবাই সেখানে গাদাগাদি করে থাকত। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, গড়ে একটি বাড়িতে ছয়-সাতজন করে জাহাজি থাকত। বসবাসরত এ ৫০ জন বাঙালির মধ্যে মাত্র পাঁচজন বাঙালি ছিলেন, যারা আরো অনেক আগেই নিউ অরলিন্সে এসে তাদের বসত গড়েছিল। তারা বয়সের দিক থেকেও ছিলেন প্রৌঢ়। আর বাদবাকি যারা নতুন এসেছিল, তারা ছিল বয়সে অপেক্ষাকৃত নবীন। তাদের বয়স ছিল ১৮-২৪-এর মধ্যে।
১৮৯০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত নিউ অরলিন্সে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে প্রথম পুরনো যে বাঙালিকে পাওয়া যায়, তার নাম হাজি হক। তার বয়স ৩৮। তিনি রাস্তায় রাস্তায় ভারতীয় রেশমের কাপড় ফেরি করে বিক্রি করেন। তিনি থাকেন নর্থ জনসন স্ট্রিটে আরো একজন রুমমেটের সঙ্গে। রুমমেটের নাম আবদুল আজিজ। তার বয়স ৬৫। আমেরিকায় এসেছেন আরো ১০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৯৭ সালে। নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে তার জাহাজ ভিড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরো দুজন বাঙালির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা নিউ অরলিন্সে চলে আসেন। আরো দুজন বাঙালি আছেন এ শহরে, যারা নিউ অরলিন্সে অনেক পুরনো। সোলায়মান মণ্ডল ও ফজলে রহমান। তারা দুজনই নর্থ রোমান স্ট্রিটে একটি ছোট বাড়ি ভাড়া করে থাকেন। ৫১ বছর বয়সী আবদুল গাফফার ও ৪৬ বছর বয়সী আবদুল মজিদ বসবাস করেন নর্থ ক্লেইবোর্ন এভিনিউয়ে। গাফফার ও মজিদ দুজনই এখানে সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দা। যারা নতুন আসেন, তাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে শলাপরামর্শ দেয়া তাদের অন্যতম কাজ। তারা দুজন এসেছিলেন ১৮৮৮ সালে নিউ অরলিন্সের কেসেল গার্ডেন শহরে। সাধারণত যা হয়, তারা দুজনই প্রথম এসেছিলেন নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে এবং পরবর্তী সময়ে নিউ অরলিন্সে এসে তারা গা ঢাকা দেন। দেখা যাচ্ছে, এভাবেই ১৮৯০ থেকে শুরু করে ১৯১০ সাল পর্যন্ত নিউ অরলিন্সে জাহাজিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১৯০৩ সালে মিশিগান থেকে প্রকাশিত ‘Biloxi Daily Herald’ পত্রিকার একটি সংবাদের ওপর চোখ রাখা যাক। সংবাদের শিরোনাম East Indian peddlers, প্রতিবেদক লিখছেন, ‘নিউ অরলিন্সের রাস্তায় সর্বত্রই এখন পূর্ব ভারত থেকে আসা জাহাজিদের দেখা যাচ্ছে। ১৯০০ সাল থেকেই এদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে এদের সংখ্যা নিউ অরলিন্সে এতই বেড়েছে যে তাদের খুব সহজেই শনাক্ত করা যায়। কথা হলো, হঠাৎ করে জাহাজ পলাতকদের কেনই বা নিউ অরলিন্সে এ আগমন ঘটল? এর মূল কারণ দুটো। প্রথম কারণ হলো নিউ অরলিন্সে বাঙালিরা খুব সহজেই আফ্রিকান মেয়ে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পেতেন। সুবিধাটি নিউইয়র্ক বা নিউজার্সিতে সম্ভব ছিল না। আর নিউইয়র্কে আফ্রিকান মেয়ে বিয়ে করা ছিল ব্যয়সাধ্য। নিউইয়র্কে যারা হারলেমে ছিলেন, তারা সে কারণে সবাই বিয়ে করতেন পুরতোরিকান মেয়েদের। কারণ তাদের স্বভাব-চরিত্র যেমন ছিল বাঙালি রমণীদের মতোই ঘরগৃহস্থালি কাজে দক্ষ, আবার টাকাপয়সার প্রতি অন্যদের মতো এত হাহাকারও তাদের ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো, হারলেমে এত পুরতোরিকান রমণী কোথায় মিলবে যে চাইলেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়বে? অতএব শেষ পথ হলো নিউ অরলিন্সে গিয়ে দেখেশুনে কোনো আফ্রিকান মেয়েকে বিয়ে করা। এর পেছনে আরেকটা সম্ভাব্য কারণ আছে। তা হলো, নিউ অরলিন্সে পুরনো বাঙালিরা সেখানে বেশ সুনামের সঙ্গেই বসবাস করত। বাঙালিরা নিরীহ আবার তারা কোনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয়। বউদের ভালোবাসে। সৎ উপার্জন করে আর সাদা মানুষদের খুব সমীহ করে চলে। সেখানকার বিয়ে বাজারে বাঙালিদের চাহিদা নেহাত মন্দ ছিল না। বাঙালিদের দলবেঁধে নিউ অরলিন্সে যাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো ব্যবসাপাতি। ততদিনে বাঙালিরা সেখানে ব্যবসাপাতি নিয়ে মোটামুটি জেঁকে বসেছে। বিশেষ করে ফেরি করে ভারতীয় রেশমের কাপড়চোপড়, মেয়েদের ওড়না, ছেলেদের রুমাল, নকশিকাঁথা বিক্রি করা ছিল তখন জাহাজিদের অন্যতম পেশা। আবার কেউ কেউ রাস্তায় ফুড ভেন্ডরের কাজও করত। প্রচণ্ড গরমে তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের জন্য দেশী কায়দায় লাল-নীল রঙ মিশিয়ে মনোহারি শরবত বিক্রি করত। অবশ্য এভাবে খোলা রাস্তায় শরবত বিক্রি করার কোনো অনুমতি তখন তাদের ছিল না। তাতে এ সাহসী জাহাজ পলাতক বাঙালিরা যে কোনো বিপদে পড়ত না তা কিন্তু নয়! ১৯১২ সালের ২২ জুলাই ‘ডেইলি হোরল্ড’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদন আমাদের সেদিকেই নিয়ে যায়— ‘গতকাল একদল পূর্ব বাংলা থেকে আসা ভারতীয়দের রঙ মাখানো শরবত বিক্রি করার দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ জাহাজিদের আচার-আচরণ খুবই কৌতূহলদীপ্ত। তারা স্থানীয় মানুষের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু আইন সবার জন্য সমান। তারাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’
পত্রিকার প্রতিবেদনে জাহাজ পলাতকদের কাহিনী
১৯২০ সালের অক্টবরের ‘দি ইনডিপেনডেন্ট হিন্দুস্তান’ পত্রিকার দিকে চোখ রাখা যাক। পত্রিকাটির প্রতিবেদক বসন্ত কুমার রায় তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘সম্প্রতি বেথেলহেম স্টিল কোম্পানি, পেনসিলভানিয়া থেকে ৩৯ জন ভারতীয় শ্রমিককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং তাদের কোনো জামিন না দিয়েই নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডের জেলে পুরেছে। লুসেরাস (Lucerus) নামে ব্রিটিশ এক জাহাজের ক্যাপ্টেন এ শ্রমিকদের তার জাহাজের খালাসি বলে শনাক্ত করেছেন এবং শ্রমিকদের জাহাজে পুনরায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু জাহাজের এ খালাসিরা ব্রিটিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেছে। উপরন্তু তারা দাবি করেছে এই বলে যে ‘এ ব্রিটিশ জাহাজে কাজ করার চেয়ে দোজখে পুড়ে মরাও অনেক ভালো।’
উল্লেখ্য, সেই ৩৯ জন জাহাজি সবাই পূর্ব বাংলা থেকে এসেছিলেন। তারা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন যে ব্রিটিশ জাহাজে ফেরত যাওয়া মানেই হলো তাদের পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া। তারা আরো জানতেন যে জেল থেকে তাদের নিশ্চয়ই জামিন হবে অথবা তারা কোনো উকিলের সহযোগিতা পাবেন এবং আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে থাকার যে স্বপ্ন, সে স্বপ্নটাও পূরণ হবে। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা সব জাহাজিরই প্রাথমিকভাবে চোখ থাকত নিউইয়র্কের দিকে। কারণ ছিল একটাই। নিউইয়র্ক অভিবাসীদের শহর এবং সেখানে বৈধভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। এভাবে মার্কিন মুল্লুকে স্থান পাওয়া জাহাজিরা নিউইয়র্ক ছাড়াও নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর, মিনেসোটা, নিউ অরলিন্সসহ আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বসবাস করতে শুরু করেন।
১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে এলিস আইল্যান্ড, নিউইয়র্কে ‘স্টলসেনফেলজ’ (Stolzenfels) নামে একটি জার্মান জাহাজ এসে ভেড়ে। সেই জাহাজে সাতজন বাদামি চামড়ার একটি দলকে জাহাজের পাটাতনে ইতিউতি ঘুরতে দেখা যায়। ব্রিটিশরা তাদের নাম দিয়েছিল লস্কর (Lascars)। কাকতালীয়ভাবে নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিকও সেই জাহাজের ছাদে ছিলেন এবং পরদিন তাদের নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের ভেতরের ৩ নম্বর পাতায় এ বিষয়ে বেশ সরস এক প্রতিবেদন ছাপান:
‘ছোট লস্করের একটি দলের দেখা পাওয়া গেল...। ফরটি সেকেন্ড স্ট্রিট ও দক্ষিণ ব্রুকলিন পিয়ারের দিকেই তাদের চোখ। দেখতে ছোট এ বাদামি বর্ণের জাহাজিরা জাহাজের ডেকে ইতিউতি ঘোরাফেরা করছিল। জাহাজটি যখন সূর্য বরাবর বন্দরে নোঙর করল, তখন তাদের একজন এই বলে সবাইকে আশ্বস্ত করছিল যে জাহাজটি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার উপকূলে ভিড়তে পেরেছে।’
বেশ বোঝাই যায় যে আমেরিকান সাংবাদিকের কলমে কিছুটা ‘খোঁচা’ ও শ্লেষ ছিল। অবশ্য সে সময়ে ভারত যখন বিলাতিদের অধীনে পরাধীন, তখন এ জাহাজিদের সামাজিক মর্যাদা যে একেবারেই ছিল না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর আমেরিকাও ছিল ঠিক বর্তমান সময়ের মতোই জাত-পাত ও শ্রেণীবৈষম্যে আচ্ছন্ন। অতএব নিউইয়র্ক টাইমস এ ‘বাদামি’দের নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে প্রতিবেদন তৈরি করবে, এটাই স্বাভাবিক।
বাঙালিদের বিয়েশাদির একটি তথ্যচিত্র
আমরা আগেই জেনেছি যে এ জাহাজ পলাতকরা কীভাবে জাহাজের বিভিন্ন রকম পদে চাকরি বাগিয়ে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন এবং নতুন এক জীবন গড়ার লক্ষ্যে নিজেদের তৈরি করতে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমেরিকার মাটিতে বৈধভাবে থাকার জন্য সে সময় এ স্বপ্নচারী বাঙালিদের প্রধান কাজ ছিল স্থানীয় কোনো আমেরিকান নারীকে বিয়ে করে সংসার পাতা। ১৯২০-৩০ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্ক শহরের ম্যারিজ সার্টিফিকেটে প্রদত্ত তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, তত্কালীন পূর্ব বাংলা থেকে আসা ১৭ জন প্রাক্তন জাহাজি বিভিন্ন সময় ভিনদেশী এ নারীদের বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেছিলেন। বয়সের হিসাবে তারা সবাই ছিলেন তরুণ। তাদের বয়স ছিল ২০-৩০ বছরের মধ্যে সীমিত। তাদের অনেকেই নিজেদের বাঙালি নাম পরিবর্তন করে আমেরিকান নাম ধারণ করেছিলেন। আবার এদের কেউ কেউ বিয়ে করার সময় বিয়ের সনদপত্রে নিজেদের মূল জন্মস্থান পূর্ব বাংলা পুরোপুরিভাবে গোপন রেখে ভুল কোনো দেশের নাম দিয়ে তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে স্বামী-স্ত্রীর কলহের জের হিসেবে অথবা যেভাবেই হোক বিষয়টি পত্রপত্রিকার পাতায় উঠে আসে এবং তাদের কারো কারো মূল পরিচিতিটি তখন প্রকাশিত হয়। ১৯৩৩ সালের আগস্টের সংখ্যায় নিউইয়র্ক আমস্টারডাম নিউজের একটি সংবাদে চোখ রাখা যাক।
‘নাসির মিয়া, বয়স ২৭, যিনি মূলত পূর্ব বাংলা থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন, কিন্তু বিয়ের সনদপত্রে নিজেকে বোম্বের বাসিন্দা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ১৯২৬ সেকেন্ড এভিনিউর বাসিন্দা লিলিয়ান পন্ডকে বিয়ে করেছিলেন। উল্লেখ্য, নাসির মিয়া ৩০১ ওয়েস্ট ১০২ স্ট্রিটে বসবাস করতেন।’
বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তত্কালীন সময়ে বিয়েশাদি নিয়ে পূর্ব বাংলা থেকে আসা এ স্বপ্ন শিকারিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে একটা বিষয় আপনাদের বিবেচনায় রাখতে হবে যে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নিউইয়র্ক ম্যানহাটন খুব জুতের শহর ছিল না। ড্রাগ, মাফিয়া, জাতিগত বিদ্বেষ, ধর্ম সবকিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করেই আমাদের এ সহজ সাধারণ বাাঙালিরা এখানে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। তবে বিয়ে করতে পারলে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থাকা যাবে, এটিই ছিল তখনকার সময় সবচেয়ে বড় হিসাব।
১৯২৩-৩৭ পর্যন্ত নিউইয়র্কে আসা কিছু নতুন বাঙালি দম্পতির কিছু তত্ত্বতালাশ— আমাদের পূর্ব বাংলা থেকে আসা এ বাঙালিরা কাদের সঙ্গে জীবনের গাঁট বাঁধছেন, কোথায় সংসার পাতছেন, কোথায় কী করছেন না করছেন, আর তাদের বাসস্থানের ঠিকানাটাই বা কী ছিল? এক পরিসংখ্যানমতে, ১৯২০-৩০ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে বিয়ের সনদপত্র অনুযায়ী ১৭ জন পূর্ব বাংলা থেকে আসা বাঙালি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন। তারা সবাই ছিলেন জাহাজি। নিউ অরলিন্স, বাল্টিমোর থেকে এ জাহাজিরা ধীরে ধীরে নিউইয়র্কে থিতু হন এবং হারলেম ও লোয়ার ইস্ট সাইডের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাদের বিয়ের সনদপত্রে দেয়া তথ্য অনুযায়ী কজন জাহাজির পরিচয়:
১. জন খান (John Khan) বয়স ২২। তিনি ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৩ সালে বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম দেখা যাচ্ছে কারমেন গুজমান (Carmen Guzman), বয়স ২৩। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর দেশ পুয়েরতোরিকো। জন খান পেশায় ছিলেন একজন লন্ড্রির হেলপার। গায়ের রঙ লিখেছেন সাদা। সে সময় তার ঠিকানা ছিল 1803, 3rd Ave, New York।
২. মোহাম্মদ আবদুল (Mohammed Abdul) বয়স ২৪। তিনি ১৬ আগস্ট, ১৯২৩ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম দেখা যাচ্ছে স্যাডি সিমন্ডস (Sadie Simmonds), বয়স ২০। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম নিউইয়র্ক ব্রুকলিনে। মোহাম্মদ আবদুল পেশায় ছিলেন লন্ড্রির হেলপার। গায়ের রঙ লিখেছেন সাদা। দেখা যাচ্ছে, সে সময় তিনিও একই ঠিকানা অর্থাৎ 1803, 3rd Ave, New York ব্যবহার করেছেন। তাতে মনে হচ্ছে, সম্ভবত তারা একই অ্যাপার্টমেন্টে শেয়ার করে থাকতেন।
৩. মুসলিম মিয়া (Muslim Mia) বয়স ২৪। তিনি ৩ জানুয়ারি, ১৯২৫ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম দেখা যাচ্ছে গ্রেস এম ডানবার (Grace M. Dunbar), বয়স ২২। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম এলমিরা, নিউইয়র্ক। গায়ের রঙ নিগ্রো। বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান। মুসলিম মিয়া পেশা উল্লেখ করেছেন শ্রমিক। তার নিজের গায়ের রঙ লিখেছেন নিগ্রো। দেখা যাচ্ছে, সে সময় তার ঠিকানা ছিল 3411 2W 4th Street. NY.
৪. রুস্তম আলী (Rustum Ali) বয়স ২৪। তিনি ১ সেপ্টেম্বর, ১৯২৫ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম দেখা যাচ্ছে বিয়েত্রিস ওয়েনস (Beatrice Owens), বয়স ২১। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম জ্যাকসনভিল, ফ্লোরিডা। গায়ের রঙ ‘কালারড’। রুস্তম আলী পেশা উল্লেখ করেছেন মেকানিক। তার নিজের গায়ের রঙ লিখেছেন কালারড। দেখা যাচ্ছে, সে সময় তার ঠিকানা ছিল 202 Broom street NY.
৫. আবদুল হাসান (Abdul Hasan) বয়স ২৮। তিনি ২ সেপ্টেম্বর, ১৯২৫ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম দেখা যাচ্ছে ইথেল লিভাইন (Ethel LeVine), বয়স ২১। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম নিউইয়র্কে। গায়ের রঙ উল্লেখ রয়েছে ‘কালারড’। আবদুল হাসান পেশা উল্লেখ করেছেন হেনডিম্যান। তার নিজের গায়ের রঙ লিখেছেন ‘হোয়াইট’। দেখা যাচ্ছে, সে সময় তার ঠিকানা ছিল 70 Broom street NY.
৬. সলোমোন খান (Solomon Khan) বয়স ২৩। তিনি ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৬ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম দেখা যাচ্ছে অ্যাগনেস উইকস (Agnes Weeks), বয়স ২৩। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম বারবাডোস। গায়ের রঙ উল্লেখ রয়েছে ‘কালারড’। সলোমোন খান পেশা উল্লেখ করেছেন বিক্রেতা। তার নিজের গায়ের রঙ লিখেছেন ‘হোয়াইট’। সে সময়ে তার উল্লিখিত ঠিকানা ছিল 1808 3rd Ave, NY.
৭. নোয়াব আলী (Nawab Ali) বয়স ২৪। তিনি ১০ জুলাই, ১৯২৬ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম ফ্রানসিস সানটোস (Frances Santos), বয়স ১৮। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম পুয়েরতোরিকো। গায়ের রঙ উল্লেখ রয়েছে ‘হোয়াইট’। নোয়াব আলী পেশা উল্লেখ করেছেন লন্ড্রিম্যান। তার নিজের গায়ের রঙ লিখেছেন ‘কালারড’। সে সময় তার ঠিকানা ছিল 222 E 100th Street, NY.
৮. মোখত আলী (Mokhd Ali) বয়স ২৬, তিনি ২ জুন, ১৯২৭ সালে বিয়ে করেন। সনদপত্রে তার স্ত্রীর নাম উল্লেখ আছে ম্যাবল লিয়োলা গিবসন (Mable Leola Gibson), বয়স ২১। বিয়ের সনদ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্ম বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ড। গায়ের রঙ উল্লেখ রয়েছে ‘হোয়াইট’। মোখত আলী পেশা উল্লেখ করেছেন শ্রমিক। তার নিজের গায়ের রঙ লিখেছেন ‘হোয়াইট’। দেখা যাচ্ছে, সে সময় তার ঠিকানা ছিল 36th W128 street, NY.
উল্লেখ্য, পূর্ব বাংলা থেকে আসা এ বাঙালিরা কেউই সেখানে কোন শহর থেকে এসেছেন, তা তাদের বিয়ের সনদে উল্লেখ করেননি। কেউ লিখেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া, কেউ ইন্ডিয়া, কেউ কলকাতা, ইন্ডিয়া, কেউ বোম্বে ইন্ডিয়া ইত্যাদি তথ্য দিয়েছেন। আগেই বলেছি, অনেকেই বিয়ের সময় নিজের সত্যিকার নাম-ঠিকানা গোপন রেখেছিলেন। কেন গোপন রেখেছিলেন, এটি বলা মুশকিল। তবে অনুমান করা যায়, ইমিগ্রেশনের চোখ এড়িয়ে গা ঢাকা দিতে অথবা নিজেকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে তোলার জন্যই হয়তো তারা এ ধরনের ছদ্মপরিচয়ের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বেঙ্গল গার্ডেন
১৯৪৯ সালেও নিউইয়র্কের ব্যস্ততম শহর টাইম স্কয়ার। বলা প্রয়োজন, সে সময় টাইম স্কয়ারে বর্তমান সময়ের মতোই নাটকপাড়া হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত। চারদিকে মানুষের হইচই। বেশ প্রাণচাঞ্চল্যকর। চারপাশে হকারদের হাঁকডাক আর নাটকের মনোহারি বিজ্ঞাপন লেগেই আছে। ৭ এভিনিউ ও ৪৬ রাস্তার ঠিক উত্তর-পশ্চিম পাশে চোখে পড়বে বড় একটা ব্রডওয়ে শোর পোস্টার। সেই পোস্টারে লেখা রয়েছে ‘Death of a Salesman or South Pacific’। আরেকটু সামনের দিকে এগোলে। মানুষের ভিড়ভাট্টা পার হয়ে ঠিক ৪৬ রাস্তার পাশেই দেখা যাচ্ছে সুন্দর একটা লাল আর নীল রঙ মেশানো সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা, ‘বেঙ্গল গার্ডেন।’ নাম দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এটি একটি বাঙালি রেস্তোরাঁ। তবে ১৯৪৯ সালে নিউইয়র্কের ফিরিঙ্গিদের শহরে বাঙালি রেস্তোরাঁর খোপ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আমেরিকানদের জিভে বাঙালি খাবারের একটি জায়গা করে দেয়া এবং সেই সুযোগে কিছু ব্যবসা করাই হলো এর মূল উদ্দেশ্য রেস্তোরাঁটার সাইজ খুব বড় না হলেও বেশ চলনসই। এর খদ্দেররা সবাই সাদা আমেরিকান। রেস্তোরাঁর ঠিক সামনেই এক স্প্যানিশ নারী খদ্দের শিকারে ব্যস্ত। কখনো তিনি হাঁকডাক দিচ্ছেন, কখনো হাত ধরে রেস্তোরাঁর ভেতর কাউকে কাউকে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। জানা গেল, খুব চটপটে আর বিনয়ী এ নারীর নাম ভিক্টোরিয়া এচেভারিয়া উল্লাহ। পার্টনারশিপ ব্যবসায় তিনিও এ রেস্তোরাঁর একজন মালিক। রেস্তোরাঁর ঠিক পেছনের অংশে, সাদা টেবিলক্লথ বিছানো পরিষ্কার একটা টেবিলে দুই হাতের কনুইয়ের ওপর মুখটা রেখে বসে আছেন খুব কেতাদুরস্ত এক ব্যক্তি। তিনি সিলেট থেকে এসেছেন। তিনিও একজন শিপ জাম্পার। তার নাম ইব্রাহীম চৌধুরী।
ইব্রাহীম চৌধুরী রেস্তোরাঁ ব্যবসার চেয়ে স্থানীয় রাজনীতি, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার নিয়ে বেশি ব্যস্ত। তার টেবিলের সামনে গোটা চারেক পূর্ব বাংলা থেকে আসা মানুষ অর্থাৎ কিছু ভারতীয় বসে আছেন এবং মন দিয়ে তার কথা শুনছেন। ইব্রাহীম চৌধুরী মাঝে মধ্যে রেস্তোরাঁর ভেতর ঢুকে খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের খোঁজখবর রাখছেন এবং আবার খুব দ্রুত সেই টেবিলে এসে আড্ডায় ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন। ইব্রাহীম চৌধুরীও এ বেঙ্গল গার্ডেনের একজন মালিক। রেস্তোরাঁর ভেতরে, রান্নাঘরটা বেশ পরিপাটি চকচকে ঝকঝকে। বিভিন্ন রকম খাবারের ঘ্রাণ নাকে আসছে। চিকেন কারি, চিংড়ি মালাইকারি, বিরিয়ানি আরো কত কি...। রান্নাঘরটিতে একজন বাঙালি পাচক খুব ব্যস্ত সময় পার করছেন। কখনো তিনি খাবারের ডিশ খদ্দেরের টেবিলে পৌঁছে দিচ্ছেন, কখনো তিনি নিজেই রান্নার এঁটো পরিষ্কার করছেন আবার দেখা যাচ্ছে, তিনি একাই রেস্তোরাঁর এ মাথা থেকে ও মাথায় বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। কে এ লোকটা? জানা গেল, তার নাম হাবিব উল্লাহ। রেস্তোরাঁয় দরজার সামনে ভিক্টোরিয়া নামের যে স্প্যানিশ নারীকে আমরা দেখেছিলাম, তিনি হলেন তার স্বামী। অসাধারণ কর্মঠ। তত্কালীন পূর্ব বাংলার নোয়াখালী থেকে আসা লোক। তিনিও শিপ জাম্পার। তিনিও এ রেস্তোরাঁর একজন গর্বিত মালিক।
ইব্রাহীম চৌধুরী ও হাবিব উল্লাহ দুজনই তত্কালীন পূর্ব বাংলার লোক। ইব্রাহীম চৌধুরী তুলনামুলকভাবে শিক্ষিত। বাংলাদেশে সিলেটে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে ১৯২০ সালের দিকে হুগলির একটি আমেরিকাগামী জাহাজের সারেংয়ের চাকরি নিয়ে নিউইয়র্ক শহরের উপকূলে এসে জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে, নিউইয়র্ক শহরে নতুন জীবন শুরু করেন। ইব্রাহীম চৗধুরী স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তিনি সবসময় নিজেকে সোচ্চার রেখেছেন। পাশাপাশি আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তিনি জীবনের শুরুতে হারলেমে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ওয়েস্ট ৯৮ সড়কে অপেক্ষাকৃত ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায় নিজের ঠিকানা রচনা করেন।
হাবিব উল্লাহ
হাবিব উল্লাহ মাত্র ১৪ বছর বয়সে জাহাজের খালাসি হয়ে আমেরিকায় আসেন। সেটা ছিল ১৯৩৫ সাল। তার জাহাজটি যখন বোস্টনের বন্দরে ভিড়বে, ঠিক সেই মোক্ষম সময়ে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেন এবং বোস্টন থেকে নিউইয়র্ক শহরে চলে আসেন। হাবিব উল্লাহ ইংরেজি বলতে বা পড়তে জানতেন না। তিনি নিউইয়র্ক শহরে এসেই স্প্যানিশ এলাকা পূর্ব হারলেমের ১০২ রাস্তা ও সেকেন্ড এভিনিউয়ে একটি অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করে থাকতে শুরু করেন। প্রথমে হট ডগ ও পরে একটি রেস্তোরাঁর ডিশ ওয়াশার হিসেবে কাজে যোগ দেন। এ পূর্ব হারলেমেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় পুয়েরতোরিকো থেকে আসা মেয়ে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে। প্রথম পরিচয়ে প্রেম, ভালোবাসা তারপর বিয়ে। অবশ্য হাবিব উল্লাহর মূল আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল। ভিক্টোরিয়াকে বিয়ে করলে তার থাকার বৈধ কাগজের একটা ব্যবস্থা হবে।
আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে আমেরিকায় আসা এ স্বপ্নচারী বাঙালি জাহাজ পলাতকদের জীবনের গল্পের মাত্র উন্মোচন হচ্ছে, তাই তাদের গল্পগাথার কি শেষ আছে? একদিন জীবন বাজি রেখে শুধু মনের জোরেই তারা দেশান্তরী হয়েছিলেন। তাদের রেখে যাওয়া পদচিহ্নকে অনুসরণ করে এখনো বাঙালির অনেকেই নিত্যই হেঁটে চলেছে, দেশান্তরী হচ্ছে। এই শিপজাম্পারদের অভিবাসী জীবনের যৎসামান্য গল্প।
সহায়ক তথ্য:
Bengali Harlem and the Lost Histories of South Asian American, writer: Vivek Bald, Published by Harvard Univesity Press, 2013.
Museum of family history
New York Times






